এ যেন মহামিলনের মহেন্দ্রক্ষণ ৪১ এ পা রাখল মেঘমল্লার

রুবেল দাশ প্রিন্স

5

খেলাঘর দৈনিক সংবাদের একটি পাতা, যে পাতাটি বের হয় ১৯৫২ সালের ২ মে, শিশুতোষ সব লেখা ছাপা হত এই পাতায়। কচি হাতের লেখাগুলো স্থান পেত এখানে। ৬০ এর দশকে দৈনিক সংবাদের এই খেলাঘর পাতাটি রূপ নেয় শিশু সংগঠনে। যেটি এই যাবৎকালে বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ শিশু-কিশোর সংগঠন। ৬৭ বছরের বুড়ো খোকা খেলাঘর। জাতীয় শিশু-কিশোর সংগঠন খেলাঘর ৬৭ বৎসরের পথ পরিক্রমায় সৃষ্টি করেছে লাখো আলোকিত প্রজন্ম। যারা মুক্তিযুদ্ধ চেতনায় উজ্বীবিত হয়ে দেশপ্রেমের মহামন্ত্রে দিক্ষিত। শহীদদের স্বপ্ন অসম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বির্নিমানে সদা প্রস্তুত খেলাঘর এর কর্মী সংগঠক ও ভাই বোনোরা। প্রায় ৬ শতাদিক শাখা আসরের মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ, বিজ্ঞান মনষ্ক ও দেশ প্রেমিক নাগরিক সৃষ্টিতে অবিরাম কাজ করে চলেছে খেলাঘর। শিশুদের বাসযোগ্য বাংলাদেশ বির্নিমানে খেলাঘর তাই আজ শুধু শিশু-কিশোর সংগঠন নয়। তা আজ একটি আন্দোলনের নামও। দেশের গন্ডি পেরিয়ে খেলাঘর এর কর্মযজ্ঞ দেশের বাইরেও সমাদৃত হয়েছে। ৫২ এর ভাষা আন্দোলনে চেতনায় জন্ম নেয়া খেলাঘর এর স্বপ্ন দ্রষ্টারা হলেন- কবি হাবিবুর রহমান, শহীদ শহীদুল্লা কায়সার, সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, বজলুর রহমান’র মত এই দেশের সূর্য সন্তান। পাহাড়-সাগরের অপূর্ব মেলবন্ধনে সীতাকুন্ড। প্রকৃতির এক নৈস্বর্গিক স্থান সীতাকুন্ডে ১৮ অক্টোবর, ১৯৭৮ সালে আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় শিশু-কিশোর সংগঠন খেলাঘর এর শাখা আসর মেঘমল্লার খেলাঘর আসর। সংগঠনটি এই বছর অতিক্রম করল গৌরবের ৪ দশক। মহাআনন্দের এই মহেন্দ্রক্ষণে সীতাকুন্ড সেজেছিল বর্ণিল সাজে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ও ১ মার্চ অনুষ্ঠিত ২ দিনব্যাপি এই আনন্দযজ্ঞে জড়ো হয়েছিল ৪০ বছর আগ থেকে খেলাঘর আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকা ভাই-বোনেরা। ৪০ বছর আগ থেকে খেলাঘর আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকা সেই দিনের সেই শিশু-কিশোর ভাই-বোনটি আজ যেন যৌবন পেরিয়ে বাধ্যকে এসে পৌছেছে। ২ দিনের এই বর্ণিল আয়োজনে সীতাকুন্ড জেলা পরিষদ মিলনায়তন এক মহা মিলনের কেন্দ্রে পরিণত হয়। আয়োজনে ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্মৃতিচারণ, গুণীজন সংবর্ধনা, বর্ণাঢ্য র‌্যালি ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা। শত শত শিশু-কিশোরের কল কাকলিতে উৎসব অঙ্গন মুখর হয়ে উঠে। সম্মেলনের ১ম দিন উদ্বোধক ছিলেন সীতাকুন্ড উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মিল্টন রায়, প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা পরিষদ সদস্য আ.ম.ম দিলশাদ, বিশেষ অতিথি ছিলেন সীতাকুন্ড সমিতি চট্টগ্রামের সাবেক সভাপতি গিয়াস উদ্দিন, অধ্যক্ষ সুনীল বন্ধু নাথ, প্রদীপ বিশ্বাস, মো. বেলাল হোসেন, আবুল কাশেম ওয়াহিদি, খালেদ মোশারফ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন মেঘমল্লার খেলাঘর আসরের সাধারণ সম্পাদক সুজিত পাল, সভাপতিত্ব করেন ৪০ বৎসর পূর্তি উৎসব ও সম্মেলনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা: এ কিউ এম সিরাজুল ইসলাম। অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় ছিলেন তপন মজুমদার ও পূজা চক্রবর্ত্তী। সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন নজরুল সংগীত শিল্পী- শিল্পী দাশগুপ্তা, রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী- পাপড়ি ঘোষ, আধুনিক ও লোক শিল্পী- দীপক আচার্য্য, গীতা আচার্য্য, নৃত্য শিল্পী লাবনী দে ও রবিউল হোসেন। আলোচনার শেষে ভাই-বোনদের পরিবেশনায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়। সম্মেলনের ২য় দিন পুনমিলনী উৎসবের উদ্বোধন করেন আলহাজ্ব দিদারুল আলম এম.পি। প্রধান অতিথি ছিলেন খেলাঘর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতিমন্ডলীর সদস্য অধ্যাপক নিরঞ্জন অধিকারী। বিশেষ অতিথি ছিলেন খেলাঘর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতিমন্ডলীর সদস্য হান্নান চৌধুরী। বিশিষ্ট অভিনেতা মীর সাব্বির, অধ্যক্ষ জরিনা আকতার, মুক্তিযোদ্ধা মৃণাল ভট্টাচার্য্য, প্রদীপ ভট্টাচার্য্য, অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র নাথ, ইপসা’র প্রধান নির্বাহী আরিফুর রহমান, কবি আশীষ সেন, প্রকৌশলী রূপক চৌধুরী, অধ্যাপক রওশন আরা ইউসুফ, গল্পকার দেবাশিস ভট্টাচার্য্য, লাবণ্য ভট্টাচার্য্য, শিক্ষিকা ঝর্ণা সরকার, শিক্ষাবিদ অজিত কুমার আইচ, পলাশ চৌধুরী, শাহ সুলতান শামিম, মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, শিক্ষক রূপন চন্দ্র দে। স্বাগত বক্তব্য রাখেন- ৪০ বছর পূর্তি উৎসব ও সম্মেলন উদ্যাপন পরিষদের আহব্বায়ক মোরশেদুল আলম চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন- উৎসব উদ্যাপন পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম সিরাজুল ইসলাম। প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় ছিলেন মো. সাইফুর রহমান শাকিল। অনুষ্ঠানে ৮ গুণীজনকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। তারা হলেন- অধ্যপক ডা. এ কিউ এম সিরাজুল ইসলাম, মো. সামসুল আলম, মো: আরিফুর রহমান, প্রদীপ ভট্টাচার্য্য, মুক্তিযোদ্ধা মৃণাল কান্তি ভট্টাচার্য্য, শিক্ষাবিদ নজির আহম্মদ, অধ্যক্ষ জরিনা আখতার ও গল্পকার দেবাশিস ভট্টাচার্য্য। এছাড়াও এ যাবৎকালে মেঘমল্লার খেলাঘর আসরের দায়িত্ব থাকা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। আসরের শতাধিক ভাই-বোনদের পরিবেশনায় সমবেত কন্ঠে জাতীয় সংগীত ও পরে খেলাঘর সংগীত ‘আমরতো সৈনিক শান্তির সৈনিক’ পরিবেশিত হয়। এরপর ব্যানার, পেস্টুন ও বাদ্যযন্ত্র সহকারে বর্ণিল র‌্যালি সীতাকুন্ডের মূল সড়ক প্রদক্ষিণ করেন। এতে আসরের পাঁচ শতাধিক ভাই-বোন অংশ নেই। শুরুতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দলীয় পরিবেশন নিয়ে হাজির হন সীতাকুন্ডস্থ খেলাঘর শাখা আসর সুরাঙ্গন খেলাঘর আসরের ভাই-বোনেরা। দলীয় নৃত্য ছিল ‘একদিন ছুটি হবে’, ‘আমরা সবাই রাজা’। দলীয় সংগীতে ছিল ‘আহা কি আনন্দ’, ‘ধনধান্যে পুষ্পে ভরা’, ‘জন্মেই দেখেছি বাংলাদেশ’। ভাই-রবানদের প্রাণবন্ত পরিবেশনায় পুরো মিলনায়তন করতালিতে মুখর হয়ে উঠে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনায় ছিলেন ঋক ভট্টাচার্য্য। স্মৃতিচারণ পর্বে এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকেই অশ্রু সংবরণ করতে পারে নাই। সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণীর শেষে মেঘমল্লারের নতুন কমিটি ঘোষিত হয়। ৩৭ সদস্য বিশিষ্ট কমিটিতে সভাপতি নির্বাচিত হয় তপন মজুমদার ও সাধারণ সম্পাদক সুজিত পাল ও সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল খালেক রুবেল। সবশেষে ২ দিন ব্যাপি উৎসবের সমাপনীতে মূল আকর্ষণ গীতি নৃত্য নাট্য- “আমাদের স্বপ্ন” পরিবেশিত হয়। নাটকে শিশুদের জন্য মুক্ত স্বদেশ ছবির মত বাংলাদেশের দৃশ্যপট ফুটে উঠে। সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নেন নুসরাত সাদিয়া, সুরাইয়া, শ্বেতা, স্বচ্ছ, ঐচিতা, সুস্মিতা, রূপকথা, অনন্য, সেতু, অপূর্ব, অতনু, অন্তী, সুপা, চন্দ্রিমা, রাত্রি, অনুশ্রী, তনুশ্রী, সৌম্যদ্বীপ, জয়ী, চৈতী, প্রান্ত, গোপা, পরিণিতা, রাত্রি, আকিব, স্মৃতি, প্রীতম, চাঁদনী, শ্যামা, প্রমা, জিসান, শ্রাবন্তী, ঐদ্রি, সুমিতা, ববি, ঐশী, আনিকা, অনিন্দিতা, অদ্রিতা, রাতুল, কতা, অভিজিত শ্যাম, ধ্রুব, শুভ, বিজয়, টিংকু, আলো, পুনম, প্রিয়ন্তী, সৃজন, সৌমেন, বিজন, অয়ন্তী, ইন্দ্রানী, মাহেন্দ্রী, মুনমুন, সুপ্রীতা, নিতু, ঋতু, প্রিয়াংকা, অহনা প্রমুখ। গীতি নৃত্য নাট্য গ্রন্থনায় ছিলেন তপন মজুমদার। সংগীত পরিচালনায় ছিলেন রূপেন চৌধুরী। নৃত্য পরিচালনায় ছিলেন মুনমুন বণিক। সার্বিক পরিচালনায় সমীরণ ভট্টাচার্য্য। কিবোর্ড এ ছিলেন- দীপক আচার্য্য, তবলায়- রনি ঘোষ। সীতাকুন্ডে শিশুদের মনন বিকাশে মেঘমল্লার খেলাঘর আসর আগামীতেও তাদের এই মহৎ কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাবে। জয়তু খেলাঘর, খেলাঘর আন্দোলন দীর্ঘজীবী হোক।