পেছানো হলো চতুর্থ দফায়

এ মাসে চালু হচ্ছে না ই-পাসপোর্ট

রতন কান্তি দেবাশীষ

53

পূর্বঘোষণা অনুযায়ী জুলাই মাসের শুরুতে ই-পাসপোর্ট ইস্যু করার কথা থাকলেও তা আর হচ্ছে না। চতুর্থ দফায় তা পেছানো হলো। চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে বা আগামি মাসের শুরুতে ই-পাসপোর্ট চালু করা হতে পারে বলে জানা গেছে। চট্টগ্রামে ই-পাসপোর্ট চালুর কোনো প্রক্রিয়াই শুরু হয়নি বলে জানান একজন কর্মকর্তা। তাদের কোনো ধরনের নির্দেশনাও দেয়া হয়নি। তবে এরইমধ্যে ঢাকাস্থ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে তিনটি ই-পাসপোর্ট গেট স্থাপন করা হয়েছে।
পাসপোর্ট অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ১ জুলাই থেকে ই-পাসপোর্ট চালুর কথা থাকলেও তা তৃতীয়বারের মতো পিছিয়ে গেছে। জার্মান কোম্পানির চুক্তি নিয়ে গড়িমসি, পাসপোর্ট অধিদপ্তরের প্রস্তুতির অভাব, ছাপাখানা তৈরির কাজ শেষ না হওয়াসহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ে চলছে তোড়জোড়। স¤প্রতি জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, জুলাইয়ের শেষে দৃশ্যমান হবে ই-পাসপোর্ট।
বারবার কেন পিছিয়ে যাচ্ছে এ প্রক্রিয়া- খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জার্মান কোম্পানী ভেরিডোসের সাথে ১০ আঙ্গুলের ছাপ নেয়ার কথা থাকলেও এখন তারা দুই আঙ্গুলের বেশি নিতে চাচ্ছে না। নিজেদের আনুষঙ্গিক প্রস্তুতিও শেষ করতে পারেনি পাসপোর্ট অধিদপ্তর। ছাপানোর মেশিনসহ উত্তরা নতুন অফিসের কাজেও রয়েছে ধীরগতি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পৃথিবীতে ১১৯টি দেশের নাগরিকরা ই-পাসপোর্ট ব্যবহার করে। বাংলাদেশও ওই দেশগুলোর সঙ্গে যুক্ত হতে যাচ্ছে। ই-পাসপোর্ট প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা। পাঁচ ও ১০ বছর মেয়াদি হতে পারে এই পাসপোর্ট। মেয়াদ ও ফি নির্ধারণ নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একের পর এক বৈঠক করেছে। ফি নির্ধারণ কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাধারণ পাসপোর্টের জন্য ৬ হাজার (২১ দিন), এক্সপ্রেস ডেলিভারির জন্য ১২ হাজার (সাত দিন) ও সুপার এক্সপ্রেস ডেলিভারির জন্য ১৫ হাজার টাকা (এক দিন) ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া দুই ক্যাটাগরির পাসপোর্ট থাকছে। একটি ৪৮ পৃষ্ঠার, আরেকটি ৭২ পৃষ্ঠার। যারা ৭২ পৃষ্ঠার পাসপোর্ট নেবে তাদের ক্ষেত্রে ফিও বেশি হবে।
পাসপোর্ট অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ই-পাসপোর্ট প্রকল্পে ৩ কোটি পাসপোর্ট বাংলাদেশে প্রিন্ট করা হবে। সে জন্য উত্তরায় কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানের যন্ত্রে পাঠযোগ্য পাসপোর্টের মতোই ই-পাসপোর্টেও একই ধরনের বই থাকবে। তবে যন্ত্রে পাঠযোগ্য পাসপোর্টের বইয়ের শুরুতে ব্যক্তির তথ্যসংবলিত যে দুইটি পাতা আছে, তা ই-পাসপোর্টে থাকছে না। সেখানে থাকবে পলিমারের তৈরি একটি কার্ড। এতে একটি এমবেডেড ইলেকট্রনিক মাইক্রোপ্রসেসর চিপ থাকবে। এই চিপে পাসপোর্টধারীর বায়োগ্রাফিক ও বায়োমেট্রিক (ছবি, আঙুলের ছাপ ও চোখের মনি) তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। আর ই-পাসপোর্টের সব তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষিত থাকবে পিকেডিতে (পাবলিক কি ডাইরেক্টরি)। আন্তর্জাতিক এই তথ্যভান্ডার পরিচালনা করে ইন্টারন্যাশনাল সিভিল অ্যাভিয়েশন অর্গানাইজেশন (আইসিএও)। ইন্টারপোলসহ বিশ্বের সব বিমান ও স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ এই তথ্যভান্ডারে ঢুকে তথ্য যাচাই করতে পারবে। এর ফলে পাসপোর্ট নিয়ে জালিয়াতি কঠিন হবে।
সূত্র জানায়, ই-পাসপোর্টে ৩৮ ধরনের নিরাপত্তা ফিচার থাকবে। বর্তমানে এমআরপি ডেটা বেইসে যেসব তথ্য আছে, তা ই-পাসপোর্টে স্থানান্তর করা হবে। পাসপোর্টের মেয়াদ হবে বয়স ভেদে ৫ ও ১০ বছর। ই-পাসপোর্ট চালু হলেই এমআরপি পাসপোর্ট বাতিল হবে না। তবে নতুন করে কাউকে এমআরপি পাসপোর্ট দেওয়া হবে না। যাদের এমআরপির মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে তারা রিনিউ করতে গেলে ই-পাসপোর্ট নিতে হবে। এভাবে পর্যায়ক্রমে এমআরপি পাসপোর্ট তুলে নেওয়া হবে।
বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের উপ-পরিচালক আবু নোমান মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, ই-পাসপোর্ট চালুর প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। তবে চট্টগ্রামে কোনো ধরনের তথ্য এখনো আমরা পাইনি। কবে থেকে চালু হচ্ছে সেটাও আমাদের জানার কথা নয়। সরকার এবং পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী আমাদের কার্যক্রম চলবে। সরকার যখন চালু করে তখন এখানেও চালু হবে। আমরা সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করি। আমাদের কাছে এখনো নির্দেশনা আসেনি। এমআরপি’র ফরম দেয়া হচ্ছে এখনো।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৬ সালের ২৪ এপ্রিল পাসপোর্ট সেবা সপ্তাহ উদ্বোধনের সময় ই-পাসপোর্ট চালুর বিষয়ে ঘোষণা দেন। ২০১৭ সালের ১৮ ফেব্রæয়ারি জার্মানির সরকারি প্রতিষ্ঠান ভেরিডোস জেএমবিএইচের সঙ্গে ই-পাসপোর্ট চালুর বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিবের সভাপতিত্বে কারিগরি কমিটির কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকগুলোতে জার্মানির রাষ্ট্রদূত ও উপরাষ্ট্রদূত উপস্থিত ছিলেন। চুক্তি স্বাক্ষরের পর বলা হয়েছিল, ওই বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ই-পাসপোর্ট চালু হবে। এরপর গত বছরের মার্চ মাসের মধ্যে ই-পাসপোর্ট চালু হবে, এমন কথা বলা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেটিও বাস্তবায়ন হয়নি। পরবর্তীতে ৩০ জুনের মধ্যে ই-পাসপোর্ট চালু করে ১ জুলাই থেকে ইস্যু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাও পিছিয়ে দেয়া হলো।
পাসপোর্ট অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, কোনো ভুয়া পাসপোর্টধারী ইমিগ্রেশন পার হওয়ার চেষ্টা করলেই ধরা পড়ে যাবেন ই-গেটে। ফলে কোনো অপরাধী পরিচয় গোপন করে ই-গেট অতিক্রম করতে পারবেন না। ই-পাসপোর্ট ই-গেটের একটি নির্দিষ্ট স্থানে রাখার সঙ্গে সঙ্গে বাহকের পরিচয় নিশ্চিত করবে। ভ্রমণকারী নির্দিষ্ট নিয়মে দাঁড়ালে অটোমেটিক ক্যামেরায় ছবি তুলে নেবে। ফিঙ্গারপ্রিন্ট যাচাইসহ সব ঠিকঠাক থাকলে দ্রæততম সময়ের মধ্যেই ভ্রমণকারী ইমিগ্রেশন পেরিয়ে যেতে পারবেন। তবে ভুল কিংবা অন্য কারণে লাল বাতি জ্বলে উঠলে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সঠিকভাবে ই-পাসপোর্ট ব্যবহারে সহযোগিতা করবেন।