এ ভ্রমণ আর কিছু নয়

স্বদেশ দত্ত

53

এক
শায়লা কাগজটাতে চোখ বুলিয়ে বলল অরিন্দমটা কে?
কেন? আমি।
তুই?
হ্যাঁ। রবীন্দ্রনাথের ভানুসিংহ, সুনীলের নীল লোহিত। আর এই মোশাররফ করিম হচ্ছে অরিন্দম।
ও, এই কথা। এবার তাহলে ছদ্ম নামে শুরু করবি ? বেশ ভাল। কিন্তু এটা কী লিখলি ?
কী আবার? গল্প।
এই দুই লাইনের?
পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট ভৌতিক গল্পের মতন। ‘পৃথিবীর শেষ মানুষটা বদ্ধ ঘরে বসে বই পড়ছে। হঠাৎ শুনতে পেল কে যেন কড়া নেড়ে ডাকছে।’ কার লেখা এই মুহূর্তে বলতে পারব না। তবে অনুবাদটা এই রকম।
হুঁ, তার আদলে এই গল্পটা? কিন্তু কিছুইতো বুঝতে পারছি না।
না বুঝার কী আছে ? ‘প্রেমিকার খোঁজে’ নাম দিয়েই তো বুঝা যাচ্ছে, প্রেমের গল্প।
এখানে গল্প কোথায় ? ‘প্রিয়তোষ প্রেমের গল্প লিখতে গিয়ে দেখতে পেল, তার কোন প্রেমিকা নেই। তাই সে প্রেমিকার খোঁজে বের হয়ে গেল।’ এটা কোন গল্প হলো ? এটাতো একটা ম্যাসেজ।
কেন ?হঠাৎ শুরু, হঠাৎ শেষ। আর রবিঠাকুর তো বলেছেন, শেষ হইয়াও, হইল না শেষ।
শায়লা কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই মোশাররফ বলল ঠিক আছে , কাগজটা দে। আর কয় লাইন লিখে দিই। তারপর বলবি , গল্প হলো কি , হলো না।
মোশাররফ শায়লার বাড়িয়ে দেওয়া কাগজটি কোলে রাখা বইয়ের উপর রেখে লিখতে লাগল।
‘ প্রিয়তোষ ঘর থেকে বের হয়ে উঠান পেরিয়ে মেঠো পথ ধরে হাঁটছে। তার উল্টো দিক থেকে আসছে সহপাঠিনী মিথিলা।
মিথিলার মুখখানি একেবারে রবীন্দ্রনাথের হঠাৎ দেখার মতন চিকন গৌর বর্ণ। কবিতার ওর মতন বেশ সাহসও আছে। যেকোন কথা সরাসরি বলতে পারে। সেদিন কলেজে যাওয়ার পথে পিছন থেকে ছুটে এসে রাখঢাক ছাড়াই বলেছিল এই প্রিয়তোষ তোকে আমার ভাল লাগে। কোন মেয়ের কাছ থেকে প্রথম একথা শুনার পর বেশ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েছিল। কিছুক্ষণের জন্য থেমে গিয়েছিল। আর মিথিলা হাসতে হাসতে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিল।
সেই থেকে প্রিয়তোষ মিথিলার সামনে পড়ে নাই। দূর থেকে মিথিলাকে দেখে প্রিয়তোষ ভেবেছে উল্টা দিকে হাঁটা দিব নাকি ?পরক্ষণে মত বদলে মনে মনে বললপাশ কাটিয়ে চলে যাই।
প্রিয়তোষ পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিল।
মিথিলা থেমে পাশ কাটানোর আগে জিজ্ঞেস করল হন্তদন্ত হয়ে কোথায় যাচ্ছিস?
প্রেমিকার খোঁজে।
প্রেমিকার খোঁজে? খুঁজে আয়। কিন্তু শেষে আবার বলিস না, ‘এ ভ্রমণ আর কিছু নয়, কেবল তোমার কাছে যাওয়া।’
মিথিলা হাসতে হাসতে হাঁটতে শুরু করেছে। কিন্তু প্রিয়তোষ থেমে আছে। তার কানে বারবার বাজতে লাগল এ ভ্রমণ আর কিছু নয়।
মোশাররফ লেখা শেষে কাগজটা এগিয়ে দিল।
শায়লা পড়া শেষে বলল এবার হয়েছে। কিন্তু নাম পরিবর্তন করতে হবে।
যাক বাবা, স্বীকৃতি পেলাম। নামটা তুই ঠিক করে দে।
এ ভ্রমণ আর কিছু নয়।
ট্রেন বটতলীর কাছাকাছি চলে এসেছে। শায়লা কাগজটা এগিয়ে দিতে দিতে বলল, কী যেন বলবি
বলেছিলি ? বললি না তো?
এতক্ষণ যেহেতু বলি নাই, কালকে বলব।
কালকে বলবি? তার মানে আবার দেরি করে ফিরতে হবে ?
কয়েকটা দিন না হয় ফিরলি ।
ঠিক আছে।
ট্রেন বটতলী চলে এসেছে।

দুই
দু’জন মুখোমুখি বসেছে। ট্রেন চলতে শুরু করেছে। মোশাররফ ব্যাগ থেকে একটা কাগজ বের করে শায়লার দিকে এগিয়ে দিল।
আবার গল্প?
না। কবিতা।
কবিতা? তা গল্প ছেড়ে কবিতা শুরু করলি?
গল্প-কবিতা বুঝি না। মাথার মধ্যে যা ঠোকাঠুকি করে তা লিখে ফেলি।
লেখালেখির ক্ষেত্রে মাথার চেয়ে, হৃদয়টাকে বেশি কাজে লাগাতে হয়।
একদম ঠিক। এবার তর্ক রেখে কবিতাটা পড়। থুককু। আবৃত্তি কর। তুই তো আবৃত্তিকার।
ঠিক আছে, আগে পড়ে নিই। আবৃত্তির ক্ষেত্রে আগে আত্মস্থ, পরে প্রকাশ।
শায়লা বিড়বিড় করে পড়ে যাচ্ছে
অ্যাডেনিন, গুয়ানিন আছে থায়ামিন
তারি সাথে সাইটোসিন নাচে ধিন ধিন
এই চার ক্ষার মিলে , যায় মালা গেঁথে
বংশের ধারা বয় ডিএনের (উঘঅ এর) স্রোতে
ডিএনেতে (উঘঅ তে) আঁকা আছে জীবনের নকশা
বংশের বাহিকায় জিন থাকে ঠাসা
শায়লা দুইবার পড়ে বলল বড্ড বেশি সায়েন্স। তত্তে¡র কচকচানি। তোর জীববিজ্ঞানকে শুধু ছন্দে বেঁধেছিস। একটু ভাবাবেগ না থাকলে কবিতা হয়?
ঠিক আছে, কাগজটা দে। একটু নেড়েচেড়ে দিই।
শায়লা কাগজটা বাড়িয়ে দিল।
মোশারফ শেষের তিন লাইন ব্রেকেট বন্দী করে, আবার নতুন ভাবে লিখতে শুরু করেছে
অ্যাডেনিন, গুয়ানিন আছে থায়ামিন
তারি সাথে সাইটোসিন নাচে ধিন ধিন
এই চার ক্ষার মিলে , যায় মালা গেঁথে
জীবনের নকশা আছে উঘঅ তে
উঘঅ তে বয়ে চলে বংশের ধারা
‘ওঁয়া’ ডাক শুন্য তুমি আমি ছাড়া
মোশাররফ লেখা শেষে কাগজটা এগিয়ে দিল।
শায়লা একবার পড়েই বলে উঠল আরে শেষ লাইনে ভাবাবেগ একেবারে উপচে পড়ছে।
তার মানে কবিতা হয়েছে?
হয়েছে।
তাহলে তো এবার আবৃত্তি করা যায়।
শায়লা দুই লাইন আবৃত্তি করেই বলল আরে ট্রেন তো ষোলশহর চলে এসেছে, এখন আমায় নামতে হবে।
এখানে কেন?
কাল টিউটোরিয়াল পরীক্ষা। ছন্দ জিনিসটা ঠিক বুঝতে পারছি না। মিতুর কাছে যাব।
যা বলার ছিল, তা তো বলা হলো না।
অসুবিধা নেই। কাল বলবি। কাল না হয় আবার দেরি করে ফিরব।
ট্রেন প্লাটফর্মে চলে এসেছে। শায়লা নামার জন্য সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।

তিন
আচ্ছা তুই কেমন ছেলে? একটা দিন প্র্যাকটিক্যাল ফাঁকি দিলে কী হয় ? তোর না হয় প্র্যাকটিক্যাল আছে, এই সময়টা আমি কেমনে কাটাই তোর খবর আছে?
কেন ?লাইব্রেরিতে বই পড়ে কাটাস।
বই না, ছাই। পড়া কি আর মাথায় ঢুকে? একা থাকলে শুধু তার কথা মনে পড়ে।
কার কথা?
ঐ পাশের বাসার আনিস মাহমুদ সুজন। হবু ডাক্তার। হাইপাওয়ারের চশমা পড়ে।
আমি কখনও তোদের বাসায় গেছি ?বর্ণনা শুনে মনে হচ্ছে, তোদের আশেপাশে কে থাকে সব আমার জানা।
তা ঠিক। বর্ণনা রেখে আসল কথায় আসি। উনি যখন ইন্টারে, আমি তখন নাইনে। সেই সময়ে বছরখানেক তাঁর কাছে পড়েছি। যোজনী পড়াতেন হাত ধরে। তিনি বলতেন, ‘ যোজনী হচ্ছে হাতের মতন। ধর আমি হলাম অক্সিজেন যার যোজনী দুই। তুমি হলে হাইড্রোজেন। যোজনী এক। আমার এক হাত, তোমার এক হাতকে ধরবে। আমার আরেক হাত তোমার মতন আরেক জনের হাতকে ধরবে। এইভাবে এইভাবে দুই যোজী একটি অক্সিজেন পরমাণু এক যোজী দুইটি হাইড্রোজেন পরমাণুর হাত ধরে হয়ে যায় পানি, এইচ টু ও।
হাত ধরলে তুই কিছু বলতি না ?
মিথ্যে বলব না। প্রথম প্রথম অস্বস্তি লাগলেও, পরে ভালই লাগতো। বিষয়টা উপভোগ করতাম। এবার পুরা ঘটনা শুন। মাঝখানে কথা বললে খেই হারিয়ে ফেলি। উনি বায়োলজিটা ভালই বুঝাতেন। ছেলেদের থাকে এক্স-ওয়াই, মেয়েদের থাকে এক্স-এক্স। তাই ছেলে হবে নাকি মেয়ে হবে – তা বাবার ক্রোমোজমের উপর নির্ভর করে, মায়ের কোন ভূমিকা নেই। উনি যখন তখন এই বিষয়টা টেনে আনতেন এবং প্রায় সময় বুকের দিকে তাকিয়ে থাকতেন।
তার মানে তুইও তার দিকে তাকিয়ে থাকতি। না হলে কেমনে বুঝতি?
আরে না। একদিন হঠাৎ করে ওড়না সরে গেছে, খেয়াল নাই। উনি বললেন ,‘ওড়না ঠিক কর’।
এরপরও ওর কাছে পড়তি?
ওর কেন রে ? উনি আমাদের দুই বছরের সিনিয়র। এরপর বেশিদিন পড়তে হয় নাই। আমি যখন ক্লাস টেনে, উনি তখন পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত। ইন্টার পাশের পর প্রথমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োলজিতে, পরেরবার দিনাজপুর মেডিক্যালে। সেখান থেকে মাইগ্রেশান করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল।
উনার ইতিহাস শুনাচ্ছিস কেন?
ঠিক আছে কী পয়েন্টে চলে আসি। কয়েক মাস আগে থেকে বেশ উৎপাত শুরু করেছেন।
উৎপাত ? সেটা আবার কেমন?
তোকে নিয়ে এই এক সমস্যা। পুরাটা না শুনলে বুঝবি কী করে ? ঠিক আছে, শেষের ঘটনাগুলি বলি। কয়েকদিন থেকে সুযোগ পেলেই কবিতার বই নিয়ে চলে আসে। বলে কি না, আবৃত্তি করি। ঘুরেফিরে মূল কবিতা দুইটা। পূর্ণেন্দু পত্রীর কথোপকথন। নন্দিনী হয়ে শুরুটা আমাকেই করতে হয়। ‘তুমি আমার সর্বনাশ করেছ শুভঙ্কর।/ কিচ্ছু ভালো লাগে না আমার। কিচ্ছু না।/জ্বলন্ত উনোনে ভিজে কয়লার ধোঁয়া আর শ্বাসকষ্ট/ ঘিরে ফেলেছে আমার দশদিগন্ত।’ শেষটা করে হবু ডাক্তার। ‘তুমিও কি আমার সর্বনাশ করনি নন্দিনী?/ আগে গোল মরিচের মতো এতটুকু ছিলাম আমি।/ আমার এক ফোঁটা খাঁচাকে তুমিই করে দিয়েছ লম্বা দালান।/ আগাছার জমিতে বুনে দিয়েছ জ্বলন্ত উদ্ভিদের দিকচিহ্নহীন বিছানা।’
আর বলতে হবে না। পরেরটাতে চলে যা।
এরপরই সেই অন্ধকারের কবিতা। ‘তুমি অন্ধকারকে সর্বস্ব, সব অগ্নিস্ফুলিঙ্গ খুলে দিতে পার কত সহজে।/ আর শুভঙ্কর মেঘের মতো একটু ঝুঁকলেই/ কী হচ্ছে কি?/ শুভঙ্কর তার খিদে-তেষ্টার ডালপালা নাড়লেই/ কী হচ্ছে কি?/ শুভঙ্কর রোদে-পোড়া হরিণের জিভ নাড়লেই/ কী হচ্ছে কি?/ পরের জন্মে দশদিগন্তের অন্ধকার হব আমি।’ যতক্ষণ আবৃত্তি চলে ততক্ষণ ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকে। একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, এভাবে তাকিয়ে থাকেন কেন? বলে কি নাÑতুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি/ এ কি মোর অপরাধ?
মোশাররফ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললÑতা ঠিক আছে। এখন আর কিছু শুনতে ইচ্ছা করছে না।
আরে শুন না। অনেক সময় অনুরোধে ঢেঁকি গিলতে হয়। তোর অনুরোধে চারটার ট্রেনে যাচ্ছি না ?যাক হবু ডাক্তারের কথা শেষ করে ফেলি। সেদিন বলে কি না জান, আমি অন্ধ হয়ে যাচ্ছি। অন্ধ হলে ভালই হবে। তখন তোমার হাত-মুখ সব ধরে ধরে দেখতে পারব। কি বিশ্রী কথা? এসব শুনলে কান গরম হয়ে যায়।
তখনও উনার সামনে বসে ছিলি?
ছিলাম। বিশ্রী কথাগুলাই কেন যেন ভাল লেগে গেল। মনের অজান্তেই হাত বাড়িয়ে বললাম, অন্ধ হওয়ার আগে একটু ছুঁয়ে দেখুন।
মোশাররফ উঠে দাঁড়িয়েছে।
উঠে দাঁড়ালি যে?
ভাল লাগছে না। সামনে যাই।
ও মা। এ কেমন কথা? কিছুক্ষণ আগের হাসি-খুশি অরিন্দম, হঠাৎ করেই বিষাদে আক্রান্ত।
মোশাররফ কোন উত্তর না দিয়ে, দুই সিট সামনে গেল। দরজার কাছে রিটু সিগারেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মোশাররফ ‘সিগারেট’ বলে রিটুকে ডাক দিল। রিটু এসে এক স্টিক বেনসন দিল। অনভ্যস্ত মোশাররফ তিনবারের চেষ্টায় সিগারেট ধরাল। দুই টান দিতেই ‘খক’ করে কেশে উঠল। পিছন থেকে শায়লা কাঁধে হাত রেখেছে। মোশাররফ সেই হাত সরিয়ে দিল। শায়লা সেই সরানো হাত শক্ত করে কাঁধে রাখল। মোশাররফ ঘাড় ফিরিয়ে বলল কী বলবি ?
দাঁড়িয়ে বলা যাবে না। বসতে হবে। চল সিটে যাই।
ওরা পাশাপাশি বসেছে।
সিগারেটটা ফেলে দে।
কেন ?
কেন আবার ?ধুমপান স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর, এই জন্য।
মোশাররফ সিগারেট ফেলে দিয়েছে।
এবার আমার দিকে তাকা।
মোশাররফ অনিচ্ছা সত্ত্বেও শায়লার দিকে তাকাল। করুণ চাহনি। যেখানে মিশে আছে ঘৃণা, ক্রোধ ও হতাশা।
শায়লা হো-হো করে হেসে বলল তুই তো মিথ্যা ধরতে পারিস, তাই না ? মিথ্যা বলার সময় মানুষের চোখের কোনা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কুঁচকে যায়। চোখের পাতা ঘনঘন উঠা নামা করে। আরো কত কী ? আসলে তুই তত্ত¡ জানিস, ব্যবহারিক পারিস না। না হলে, আমি যে এতগুলা মিথ্যা বললাম, ধরতে পারলি না কেন ?
মুহূর্তের মধ্যে মোশাররফের চেহারায় একশ আশি ডিগ্রি পরিবর্তন। চোখে মুখে যুদ্ধ জয়ের ছবি। একই সাথে প্রকাশ পেয়েছে বিষ্ময়। সে ‘এ্যাঁ’ বলে তাকিয়ে আছে।
এই হাঁ বন্ধ কর। এভাবে তাকাতে নেই। বিশ্রী লাগে। কী যেন বলতে চাচ্ছিলি? বলে ফেল।
মোশাররফ কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল এ ভ্রমণ আর কিছু নয়,
শেষেরটুকু শায়লাই শেষ করল কেবল তোমার কাছে যাওয়া।