ছেলেধরার গুজব অতঃপর গণপিটুনিতে হত্যা

এ অপরাধ বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে

19

পদ্মাসেতুতে মানুষের মাথা দরকার- বেশ কিছুদিন ধরে এমন বিপজ্জনক গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর দেশে একধরনের সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। অপসংস্কৃতি ও অজ্ঞতার খেসারত দিতে হচ্ছে অসহায় ও নিরীহ মানুষকে। ছেলেধরা সন্দেহে আইন হাতে তুলে নিয়ে অমানবিক নির্যাতনের ঘটনাই ঘটছেনা শুধু, খুনের মতো ভয়ঙ্কর বিপর্যয়েরও শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। বিশেষকরে বেশ কয়েকজন নারীর উপর ঘটে যাওয়া নির্মম ঘটনা সর্বস্তরে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বৃদ্ধি পেয়েছে। সূত্র জানায়, পদ্মাসেতু নির্মাণের শেষ পর্যায়ে মানুষের মাথা লাগবে এমন গুজব কেবা কারা ছড়িয়ে দেয়ার পর দেশজুড়ে সৃষ্টি হয় আতঙ্ক। বিশেষ করে ছোট ছোট বাচ্চার বেলায় এমন গুজব মায়েদের যেভাবে ভীতসন্ত্রস্ত পর্যায়ে নিয়ে যায় তা সংবাদমাধ্যমেও উঠে আসে। ফলে মানুষের প্রতি বিশ্বাস নামক ব্যাপারটি আজ প্রশ্নবিদ্ধ। যে কারণে কারোর মধ্যে কথাবার্তায় সামান্য অসঙ্গতি পাওয়া গেলেই তাকে ছেলেধরা অপবাদ দিয়ে গণপিটুনিতে নাজেহাল ও ক্ষতবিক্ষত করাই শুধু নয়, একেবারে প্রাণে মেরে ফেলার মতো অঘটনও ঘটছে। যদিও পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে পুলিশ প্রশাসন ‘মানুষের মাথা’ লাগার বিষয়টিকে পুরোপুরি গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছে; তারপরও ছেলে ধরা সন্দেহ ও গণপিটুনি থেমে নেই।আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতে এমন হত্যাকান্ড ফৌজদারি অপরাধ। এ অপরাধের চরম শাস্তির কথা পুলিশের পক্ষ থেকে বার বার বলার পরও থেমে নেই গণপিটুনি বা লাঞ্ছনা-অপবাদ।
উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, খোদ রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিজের সন্তানকে ভর্তি করাতে যাওয়া এক নারীকে ‘ছেলে ধরা’ সন্দেহে গণপিটুনি দেয়া হয়। পরে পুলিশ উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে ওই নারীকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়।
এছাড়া গত শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গণপিটুনিতে দুই নারীসহ অন্তত পাঁচজন প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া একই সময়ে ৯ জেলায় ভিক্ষুক ও প্রতিবন্ধীসহ অন্তত ১১ জনকে মারধর করা হয়েছে। রোববারও নওগাঁয় অন্তত ৬ জনকে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষিত মানুষের তত্ত্বাবধানে যদি এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে, তবে আমাদের সমাজ কত কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও গুজবে বিশ্বাসী, তা চিন্তা করে শিউরে উঠতে হয়। কেবল যে বর্তমানে ‘ছেলে ধরা’ সন্দেহে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা ঘটছে তাই নয়, মাঝে মাঝেই চোর, ডাকাত ও ছিনতাইকারী সন্দেহে বা অন্যান্য কারণেও গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা ঘটে।
সূত্র জানায়, এ পর্যন্ত ছেলেধরা সন্দেহে যাদের গণপিটুনীতে হত্যা করা হয় তাদের অপরাধী বলে শনাক্ত করা যায়নি। ভুক্তভোগীদের মধ্যে একজন ভদ্র মহিলা ও চারজন মানসিক প্রতিবন্ধী। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী নিছক সন্দেহের বশে এমন সব নিরীহ ও অসহায় মানুষের ওপর অমানবিক নৃংশসতা কোনভাবেই চলতে পারে না। কারণ অপরাধের শাস্তি দেয়ার আগেই অপরাধীর কর্মবিধি সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা নিয়ম। অন্যায় এবং জবরদস্তির মনোবিকৃতি নিয়ে অন্যের ওপর পাশবিক হামলা আইন ও বিধি মোতাবেক মোটেও কাম্য নয়। যথার্থ অপরাধী শনাক্ত না করা পর্যন্ত কাউকেই আটক কিংবা হত্যার পর্যায়ে নেয়া আইনশৃঙ্খলার পরিপন্থী। আর যিনি এমন অনৈতিক, অসঙ্গত কাজ করবেন তিনিও শাস্তির হাত থেকে রেহাই পাবেন না।
মূলত, আইনের প্রতি আস্থাহীনতা, গুজবে কান দেয়া এবং নৈতিক-সামাজিক অবক্ষয় থেকে মানুষ জীবিত আরেকজন মানুষকে পিটিয়ে হত্যার মতো জঘন্য কাজ করতে পারে। এ ধরনের হত্যার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কাউকে দায়ী করতে না পারার সুযোগটি কাজে লাগায় অপরাধপ্রবণ লোকরা। এ অবস্থায় যেকোনো গুজবে কান না দিয়ে গণপিটুনিতে মানুষ হত্যা বন্ধ করার জন্য সচেতনতা গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
অপরিচিত কোনো নারী-পুরুষকে কোনো কারণে সন্দেহ হলে তাকে আটকে রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেয়াই সচেতন নাগরিকদের দায়িত্ব। এ বিষয়ে গণসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া দরকার অবিলম্বে। এরই মধ্যে পুলিশ সদর দফতর থেকে জানানো হয়েছে, গণপিটুনি ফৌজদারি অপরাধ। স্থানীয় থানা থেকে মাইকিংসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে এ ব্যাধি নিরাময়ের কার্যকর উদ্যোগ নেয়া দরকার।