এলার্জিজনিত রোগবালাই প্রতিরোধে চাই সচেতনতা

এমরান চৌধুরী

12

prevention is better than cure- এ আপ্ত বাক্যটি বর্তমান বিশ্বে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশ্বের সচেতন জনগোষ্ঠী মাত্রই বিশ্বাস করেন এ মুহূর্তে যে কোনো রোগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই বেশি জরুরি। এ কারণে চিকিৎসা বিজ্ঞানের পাশাপাশি সচেতন জনসমাজ রোগপূর্ব সচেতনতা সৃষ্টির উপর জোর তাগিদ অনুভব করছেন। তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল একটি দেশ বাংলাদেশ। আয়তনের তুলনায় জনের, সম্পদের তুলনায় ভাগিদারের, আয়ের তুলনায় ব্যয়ের, সুখের তুলনায় দুঃখের, চিকিৎসার তুলনায় রোগের আধিক্যের কারণে আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষের জীবনযাত্রা দিন দিন অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে আছে আমাদের শিশুরা। আমরা আমাদের শিশুদের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবীর বদলে নিয়ত বিনির্মাণ করে যাচ্ছি একটি ধোঁয়া আর ধুলিময় পৃথিবী। ফলে আমাদের আগামী প্রজন্ম বেড়ে উঠছে নানা রোগবালাই এর মধ্য দিয়ে। এসব রোগবালাই এর মধ্যে এলার্জিজনিত সমস্যা অন্যতম। জনসংখ্যার চাপ, অপরিকল্পিত নগরায়ন, অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন, পরিবেশদূষণকারী জ্বালানির ব্যবহার, কলকারখানার ধোঁয়া, যেখানে সেখানে ধূমপান সর্বোপরি প্রতিকূল পরিবেশ এবং এলার্জিজনিত রোগের উৎস সম্পর্কে অভিভাবকদের সঠিক জ্ঞান ও সচেতনতার অভাবের কারণে আমাদের শিশুকিশোররা নানা এলার্জিতে আক্রান্ত হচ্ছে।
আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এলার্জির উৎস। তাই আমাদের এবং আমাদের শিশুকিশোরদের এসব রোগবালাই তথা অসহনীয় এজমাসহ অন্যান্য এলার্জিজনিত রোগবালাই থেকে বাঁচতে হলে আগে জানতে হবে এলার্জির উৎস ও কারণ। মনে রাখতে হবে আমাদের একটুখানি সচেতনতা, সদিচ্ছা তথা আন্তরিকতায় আমরা আমাদের আগামী প্রজন্মকে উপহার দিতে পারি একটি সুস্থ, সুন্দর ও জীবাণুমুক্ত পৃথিবী।
যেসব বস্তুর সংস্পর্শে এলে সচরাচর এলার্জি হওয়ারসমূহ সম্ভাবনা থাকে তাহলো ডাস্ট মাইট (ধুলোবালি), এনিমেল ডেন্ডার (পোষা প্রাণী থেকে উদ্ভূত), মোল্ড (পুরাতন বইপত্রে থাকা অতিশয় ক্ষুদ্র জীবাণু), ইরিট্যান্ট ( বিরক্তিকর বস্তু) এবং পলেন (ফুলের পরাগ রেণু) ইত্যাদি। আমরা প্রতিনিয়ত ঘরের ভিতরে আর বাইরে ধুলোবালির মুখোমুখি হচ্ছি। কখনো পথের ধুলো, কখনো চলমান গাড়ির ধুলো, কখনো পথচারীর পায়ের ধুলো, বাসার কার্পেট বা পাপোশের ধুলো আর কখনো বাতাসের নির্বিচারে উড়ানো ধুলো অনায়াসে আমাদের নাসারন্ধের গহবর দিয়ে ঢুকে যাচ্ছে শরীরে। সে সাথে রান্না, গাড়ি আর কলকারখানার কালো ধোঁয়া তো নাগরিক জীবনের নিত্য সংগী। এসব ধুলোবালি আর ধোঁয়া আমাদের নিশ্বাসের সাথে অবলীলায় আমাদের শরীরে ঢুকে পড়ছে। সে সাথে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সংস্পর্শে এসে ক্রমশঃ কলুষিত করে তুলছে। মানবদেহে এই পলিউশন এর মাত্রা যখন ছাড়িয়ে যায় তখন যে কেউ এলার্জিজনিত সমস্যার সম্মুখিন হতে পারে। বিশেষত এসব এলার্জিজনিত সমস্যা ছোটোদের জন্য মারাত্মক হতে পারে।
গ্রামে বা শহরে অনেকে সখ করে নানা প্রাণি পুষে থাকেন। কারো পছন্দ বিড়াল, কারো কাছে খরগোশ আবার কেউ কেউ কুকুরও পুষে থাকেন। শহরাঞ্চলে আলীশান বাসাবাড়িতে অনেক বিলেতি কুকুরও পুষতে দেখা যায়। কিন্তু তাঁদের অনেকেই জানেন না সখের বশে তারা যা করছেন তা এক সময় পরিবারের কোনো না কোনো সদস্যের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ এসব পোষা প্রাণি যখন গা ঝাড়া দেয় তখন ওদের শরীরের ক্ষুদ্রাংশ বাতাসে উড়তে থাকে, এরকম বস্তুকে এনিমেল ডেন্ডার বলে। এই এনিমেল ডেন্ডার নানা রকম রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী। আমাদের শিশুরা যখন নিশ্বাস গ্রহণ করে তখন তা অতি সহজেই তাদের নাকের ভেতর দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে নানা এলার্জিজনিত রোগের সৃষ্টি করে। পোষা পাখি বিশেষত কবুতর থেকেও এ জাতীয় এলার্জি হতে পারে।
মোল্ড হলো অতিশয় ক্ষুদ্র এক ধরনের জীবাণু যা সাধারণত বাতাসে উড়ে বেড়ায় এবং পুরাতন বইপত্র, আসবাবপত্র, বুক সেলফ ও কার্পেটে থাকে। এই মোল্ড এলার্জি বিশেষ করে এজমার জন্য বিশেষভাবে দায়ী। ইরিট্যান্ট তথা কিছু কিছু ক্যামিকেলও এলার্জি সৃষ্টি করে থাকে। বিশেষ করে যারা ছাপাখানা বা রঙের কারখানায় কাজ করেন তাদের এলার্জি হওয়ার সন্মুখ সম্ভাবনা থেকে যায়। আবার বাসা বাড়িতে রঙ করার সময় রঙে থাকা নানা ক্যামিকেলের ঘ্রাণ বড়দের যেমন এলার্জির কারণ হতে পারে, তারচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে থাকে শিশুরা। পলেন অর্থ ফুলের পরাগ রেণু। এ পরাগ রেণুর সংস্পর্শে এলে অনেকের এলার্জি হয়।
এলার্জির জন্য যেসব কারণ দায়ী বা যে যে বস্তুর সংস্পর্শে এলে এলার্জি হয় তা যথাযথ অনুধাবন করে উত্তরনের পথ নির্দেশই এলার্জি থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়, এ জন্য চিকিৎসক ও পরিবেশবাদীরা অভিন্ন মত পোষণ করেন। আর তাহলো পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ। সুস্থ, সুন্দর ও জীবাণুমুক্ত পরিবেশের জন্য তাঁরা যেসব পরামর্শ দিয়েছেন তা অতীব গুরুত্বপূর্ণ।
১। ধুলোবালিজনিত এলার্জি প্রতিরোধে সবার আগে প্রয়োজন ধুলোমুক্ত গৃহকোণ। এ জন্যে ঘরের অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে ফেলতে হবে। ঘরদোর এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে করে ঘরে আলো বাতাস অবাধে চলাচল করতে পারে। কার্পেটের ব্যবহার ঘরের সৌন্দর্য বাড়ালেও কার্পেট যেহেতু ধুলোবালির অন্যতম উৎস সেহেতু পারতপক্ষে কার্পেট ব্যবহার না করাই উত্তম।আর যদি ব্যবহার করতেই হয় তাতে প্রতিদিন জীবাণুমুক্তকরণ পদার্থ ব্যবহার করা উচিত।
২। প্রাণির প্রতি দয়া বা সখ ভালো। কিন্তু সে সখ যদি নিজের বা সন্তানের ক্ষতির কারণ হয় তাহলে তা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। পোষা প্রাণি যাতে ঘরের ভেতর যেখানে সেখানে বিচরণ করতে না পারে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। সে সাথে পোষা প্রাণিটির নিয়মিত গোসল ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
৩। মোল্ড প্রতিরোধে পুরাতন পত্রিকা, ঘরের আলমিরা আর কেবিনেটসমূহ নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। বালিশ ও লেপতোশকে পাতলা প্লাস্টিক কভার ব্যবহার করতে হবে।
৪।ইরিট্যান্ট তথা বিরক্তিকর বস্তুর সংস্পর্শ থেকে শিশুদের অবশ্যই দূরে রাখতে হবে। শুধু শিশু নয় পরিবারের বয়স্ক লোকেরাও আসবাবপত্রের রঙ ছাপাখানার কালির ঘ্রাণে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। তাই বিরক্তিকর বস্তু থেকে শিশু ও বয়স্কদের দূরে রাখাই হবে এ জাতীয় এলার্জি থেকে মুক্ত থাকার একমাত্র উপায়।
৫। পলেন বা ফুলের পরাগ রেণু থেকে উদ্ভূত এলার্জি প্রতিরোধে ঘরের বারান্দায় বা আঙিনায় লাগানো গাছপালা বা টবের সংখ্যা সীমিত রাখতে হবে। ঘরের দরজা বা জানালার পাশে ফুলের গাছ থাকলে ঐ সব দরজা জানালা বন্ধ রাখতে হবে। পরাগ রেণু বেশি হয় এমন মৌসুমে শিশুদের ফুলের বাগানে যাওয়া কমিয়ে দিতে হবে।
মোট কথা- সুস্থ, সুন্দর ও জীবাণুমুক্ত পরিবেশের জন্য চাই পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ তথা উন্নয়ন। আর এই উন্নয়নের জন্য সামগ্রিক অর্থে চাই সচেতনতা। আপনার আমার একটুখানি সচেতনতা আমাদের সন্তানদের অনেক অনাকাক্সিক্ষত রোগবালাই থেকে মুক্তি দিতে পারে।

লেখক : শিশু সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক