এবার ২৫ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা কখন উঠবে সেই সূর্য?

22

মিয়ানমারের রাখাইনে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য দেশটির সরকারের কাছে বাংলাদেশে আশ্রিত ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকে ৬ হাজার রোহিঙ্গা পরিবারের প্রায় ২৫ হাজার লোকের তালিকা দিয়েছে বাংলাদেশ। সোমবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন মেঘনায় মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে এই তথ্য জানান ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রসচিব কামরুল আহসান। বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব কামরুল আহসান। মিয়ানমার প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন দেশটির পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ে। তালিকা হস্তশান্তরের পর ভারপ্রাপ্ত সচিব কামরুল আহসান সাংবাদিকদের বলেন, রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফিরে যাওয়ার জন্য আস্থা তৈরি করা দরকার। এ জন্য মিয়ানমার প্রতিনিধি দলের প্রথম সফর হলো। তারা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের সমস্যার কথা শুনেছেন। তবে আমরা মনে করি, এক সফরে সব সমস্যার সমাধান হবে না। মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলের হয়তো আরও বেশ কয়েকবার আসতে হবে। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। রোহিঙ্গাদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত আস্থা সৃষ্টি করা না যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত রোহিঙ্গারা ফিরে যাবে না। যদি রোহিঙ্গারা মনে করে পরিস্থিতি অনুকূলে আছে, তাহলে তারা তো যে কোনো সময় ফিরে যেতে পারেন। উল্লেখ্য, আগে দুই দফায় ৩০ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা দেয়া হয়েছিল। তার মধ্যে ৮ হাজার রোহিঙ্গার পরিচয় সত্যায়িত করে মিয়ানমার। তাদের ফিরিয়ে নেয়ার সব প্রস্তুতির কথা শোনা গেলেও সর্বশেষ ফিরিয়ে নেয়নি মিয়ানমার। নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করছে। এ যেন পুর্বে আর সূর্যের দেখা মিলছে না। এবার সেই সূর্য উঠবে তো, আলো ছড়াবে তো-এমনটি প্রশ্ন দেশের মানুষের, বিশ্বের কোটি বিবেকের।
আমরা দীর্ঘদিন থেকে লক্ষ্য করে আসছি, মিয়ানমার এবং তার মিত্র দেশগুলোর পক্ষ থেকে কেবল আশ্বাসের বাণী শোনানো হচ্ছে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। পর্যায়ক্রমে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন করা হবে এই ধরনের আশ্বাস বাংলাদেশকে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তা বাস্তবে আলোর মুখ দেখছে না। অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় যে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া জটিল থেকে জটিলতর দেখছি। ১১ লাখের অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত জেলা কক্সবাজারের রামু, উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে অবস্থান করছে। বিপুল জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশের জন্য এটি বড় বোঝাই নয় শুধু, এ রোহিঙ্গাদের নিয়ে রীতিমত উদ্বেগ এবং উৎকণ্ঠায় দিন কাটাতে হচ্ছে দেশের মানুষ ও সরকারকে। সূত্র জানায়, রোহিঙ্গা যুবকরা নানা অপরাধের জড়িয়ে পড়ছে। ক্যাম্পে ও ক্যাম্পের বাইরে অনেক রোহিঙ্গা যুবক সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। অনেকে আশ্রয় ক্যাম্প ত্যাগ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। ওই এলাকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্যানিটেশন পরিবেশ হুমকির মধ্যে। গাছপালা, পাহাড়, টিলা, ভূমি কর্তন করে গড়ে উঠেছে রোহিঙ্গাদের আবাসন। তাদের আশ্রয়ে হাজার হাজার একর পাহাড় গাছগাছালি ধ্বংস, পশু-পাখি, জীব-জন্তুর বিচরণ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অতিথি পশু-পাখিদেরও সেখানে আর ঠিকানা হচ্ছে না। লাখ লাখ বাংলাদেশি নাগরিক সেখানে বেকার হচ্ছে। খাল-বিল মিল-কারখানায় রোহিঙ্গারা ঢুকে পড়ছে। ক্যাম্প ও ক্যাম্পের বাইরে রোহিঙ্গারা অনেকেই এখন ছোটখাটো ব্যবসা চালাচ্ছে, সুযোগে মাদকের ব্যবসাও করছে। এসব আশ্রিত রোহিঙ্গাদের কারণে পরিবেশের ও প্রতিবেশের যে ক্ষতি তা কতদিন নাগাদ জনগণ সহ্য করবে-তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রায় ১৭ কোটির অধিক বাংলাদেশি নাগরিকের জনবহুল বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের চাপ আর কতদিন সইতে হবে। মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দেয়ার অর্থ এই নয় যে, তাদের আজীবন রাখতে হবে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, এটা এখন বাংলাদেশের জন্য বিরাট বোঝা। বাংলাদেশ চায় সুষ্ঠু সুন্দর ব্যবস্থাপনায় নাগরিক মর্যাদায় তাদের পূর্ণ অধিকার দিয়ে ফেরত নেয়া হোক। তারা যেন তাদের নাগরিক অধিকার নিয়ে ঠিকভাবে তাদের দেশের (রাখাইন রাজ্যের) বাড়িঘরে গিয়ে উঠতে পারে, চাষবাস, শিক্ষা ও পূর্ণ নাগরিক অধিকার যেন তারা ভোগ করতে পারেন- সেই প্রত্যাশাই করে বাংলাদেশসহ মানবিক বিশ্ব। আমরা আশা করব এবারসহ তিনবার মিয়ানমার সরকারের কাছে তালিকা দেয়া হয়েছে, তালিকা নিয়ে যেন বাহানা না ধরে এ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ হোক। আর যেন সময়ক্ষেপণ না হয়, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে।