এবার বর্ষায়ও অতি বর্ষণের আভাস

তুষার দেব

44

কালবৈশাখীর শিলাবৃষ্টি ও বৈশাখের তাপদাহের মতো এবার বর্ষা মৌসুমও টি- টোয়েন্টির মারকাঠারি মেজাজে হাজির হতে পারে। শীতের বিদায়ের পর ফাগুনের প্রথম সপ্তাহ থেকেই এবার কালবৈশাখী যাত্রা শুরু করেছিল। যদিও সেটা কালবৈশাখীর প্রাক-প্রস্তুতিকালীন সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শিলাবৃষ্টি হয়েছে রেকর্ড পরিমাণ। দৈর্ঘ্যও বেড়েছে কালবৈশাখী মৌসুমের। একইভাবে বৈশাখের একেবারে গোড়া থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় বইছে অস্বস্তির তাপদাহ; যা অব্যাহত আছে। আসন্ন বর্ষা মৌসুমেও স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি বৃষ্টিপাতের আভাস মিলেছে আবহাওয়াবিদদের কাছ থেকে।
প্রতিবেশি ভারতের আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ওয়েদার অব ওয়েস্টবেঙ্গল এবারের বর্ষার নির্ঘন্ট ও অর্ধশত বছরের বর্ষার গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে দীর্ঘমেয়াদী পূর্বাভাস দিয়েছে। তাতেই দেখা যাচ্ছে, ইন্ডিয়ান ওসিয়ানিক ডাইপোল পজিটিভ হওয়া এবং এল নিনো তীব্রতা কমে যাওয়ায় উত্তর পূর্ব ভারতের অধিকাংশ রাজ্যগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশেও এবারের বর্ষায় স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বৃষ্টিপাতের আলামত দেখছেন আবহাওয়াবিদরা। সেক্ষেত্রে এ বছর বর্ষায় ভারতের আসাম, মেঘালয়, মণিপুর ও ত্রিপুরার মতো বাংলাদেশের চট্টগ্রামসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে স্বাভাবিকের থেকে অনেকগুণ বেশি বৃষ্টিপাত লক্ষ্য করা যাবে। ওয়েদার অব
ওয়েষ্টবেঙ্গলের দীর্ঘমেয়াদী পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশে এ বছর বর্ষায় যথেষ্ট বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে এবং কোথাও কোথাও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকগুণ বেশি বৃষ্টিপাত হবে। স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকগুণ বেশি বৃষ্টিপাত হবে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে। এর ফলে চট্টগ্রামসহ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলো অতি ভারি বর্ষণ ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বন্যায় আক্রান্ত হতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছর অর্থাৎ ১৪২৫ বঙ্গাব্দের বৈশাখেই ‘শ্রাবণের উপস্থিতি’ আগাম বর্ষার একধরণের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। সেই বছর মধ্য বৈশাখ পর্যন্ত দেশে যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, তা গত সাড়ে তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে, এবার কালবৈশাখী মৌসুমের দৈর্ঘ্য বাড়লেও সদ্যবিদায়ী বৈশাখে দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার তাপদাহ বয়ে গেছে। মাসের শেষে সিলেট, ময়মনসিংহ, নেত্রকোণাসহ কিছু কিছু অঞ্চলে বিক্ষিপ্তভাবে কালবৈশাখীর দাপট পরিলক্ষিত হলেও সামগ্রিকভাবে তাপদাহেই পুড়তে হয়েছে বেশিরভাগ এলাকার মানুষকে। বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসারে, আষাঢ়-শ্রাবণকেই বর্ষাকাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে, ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত বর্ষার রেশ থেকে যায়। অর্থাৎ জুনের শেষ থেকে আগস্টের শেষ সপ্তাহ পর্যন্তই বর্ষা মৌসুম ধরা হয়। আগস্টের তৃতীয় বা শেষ সপ্তাহে এবার বড় বন্যার আশঙ্কা করছেন সতর্কীকরণ কেন্দ্রের কর্মকর্তারা।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন বলছেন, মৌসুমী বৃষ্টিপাতের পাশাপাশি উজানে ভারি বর্ষণে বন্যার শঙ্কা থাকে বেশি। এবার আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে ভারি বৃষ্টি হলে বন্যা দেখা দিতে পারে। গত বছরের শুরুতেই বৈশাখী ঝড়ঝঞ্ঝায় প্রতিবেশি দেশ ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের আসাম রাজ্য প্রথম দফা বন্যার কবলে পড়ে। বন্যার পানিতে ভেসে যায় ওই রাজ্যে থাকা বিশ্বের বৃহত্তম নদী-বদ্বীপ মাজুলীর একাংশ। রাজ্যের প্রধান নদী ব্রহ্মপুত্র রাজ্যের বেশ কিছু এলাকার মানুষের জন্য কান্নার ঢল নিয়ে আসে। আমাদের দেশের নদ-নদীগুলোর সাথে প্রতিবেশি দেশের সুস্পষ্ট সংযোগ রয়েছে। তাই, এবারও সেখানে অতি বর্ষণ হলে আমাদের দেশে বন্যার শঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না।
আবহাওয়াবিদদের সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, একটানা কয়েকবছর দেশে বর্ষাঋতুর দৈর্ঘ্য অনেকটা কমে এসেছিল। আগাম বন্যা ঠাঁই নিতে শুরু করেছিল ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু, ২০১৭ সালে বাঁক বদল ঘটিয়ে স্বমহিমায় আবির্ভূত হয় বর্ষাকাল। ওইবছর দেশে বন্যায় শতাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটে। সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয় অর্ধ কোটিরও বেশি বন্যাদুর্গত মানুষকে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়। হাওরের বাঁধ ভেঙ্গে বন্যার পানিতে ফসল তলিয়ে যায়। এছাড়া, বন্যাকবলিত অন্তত ৩২টি জেলার বাড়িঘর ও ফসলাদি মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়। দেশের নদনদীর পানির ৯৩ শতাংশই আসে উজানের দেশগুলো অর্থাৎ নেপাল, ভারত এবং কিছুটা ভুটান থেকে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, গঙ্গা-পদ্মা এবং মেঘনা অববাহিকায় বৃষ্টিপাতের ওপরই বাংলাদেশে বন্যা হবে কিনা তা অনেকটাই নির্ভর করে। উজানের পাশাপাশি দেশে অতিবৃষ্টি হলে জুনের শেষ দিক থেকে ক্রমাগতভাবে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পায়। আর নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করলেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অধীনে দেশের তিনটি নদী অববাহিকার ৩৪৩ টি পানি সমতল পর্যবেক্ষণ পয়েন্ট রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান প্রধান নদ-নদীর ৯০টি পয়েন্ট থেকে ৫৪টি পয়েন্টে পানির উচ্চতা পর্যবেক্ষণ করে বন্যার পূর্বাভাস দেয়া হয়।
উল্লেখ্য, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংরক্ষিত তথ্যভাÐার থেকে সংগৃহীত তথ্যানুযায়ী, দেশে ১৯৮৮ সালে প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি বিপদসীমার একশ’ ১২ সেন্টিমিটার এবং ১৯৯৮ সালে বিপদসীমার ৮৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বন্যার সৃষ্টি করেছিল। এরমধ্যে ১৯৮৮ সালের বন্যায় দেশের ৬১ শতাংশ এবং ১৯৯৮ সালের বন্যায় ৬৮ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেলেও এরপর আর এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়নি। তবে, ২০১৭ সালে হাওরে আগাম বন্যা ও উত্তরাঞ্চলে দুই দফা বন্যায় ব্যাপক ফসলহানি ঘটে।