এন্টিবায়োটিকে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

ফারুক আবদুল্লাহ

46

রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া এন্টিবায়োটিক ব্যবহার বিপজ্জনক। দেশে যত্রতত্র এন্টিবায়োটিকের ব্যবহারের কারণে মানবদেহে স্বাস্থ্যঝুঁকি ক্রমেই বেড়ে চলছে। বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়লেও এসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের। এছাড়া বাজারে যেসব ওষুধ বিক্রি হচ্ছে সেগুলোর মান ও দাম নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বর্তমানে দেশের বাজারে উচ্চমাত্রার এন্টিবায়োটিকসহ হাজার হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ বাজারজাতকরণের অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। উন্নত বিশ্বের যে কোন দেশে ওভার দি কাউন্টার (ওটিসি) তালিকাভুক্ত ছাড়া অন্য যে কোন ওষুধ চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও আমাদের দেশে পাড়া-মহল্লার মুদি দোকান থেকে শুরু করে নগর কিংবা গ্রামে ব্যাঙের ছাতার মতো ছড়িয়ে পড়েছে হাজার হাজার ফার্মেসি। এসব দোকানে সব ধরনের ওষুধ অবাধে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া হালকা জ্বর, সর্দি-কাশি বা গলা ব্যথায় আক্রান্ত হয়ে ডাক্তারের পরামর্শ না নিয়ে ওষুধের দোকানে যায় রোগী। ওষুধ বিক্রেতা প্যারাসিটামলের সাথে ধরিয়ে দিচ্ছে অ্যাজিথ্রোমাইসিন অথবা ক্ষমতাসম্পন্ন শক্তিশালী এন্টিবায়োটিক। এক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিকের আদৌ কোনো প্রয়োজন ছিল কিনা তা দেখার প্রয়োজনও মনে করছে না ওষুধ বিক্রেতা। অপরদিকে পুরো কোর্স শেষ হওয়ার পূর্বেই রোগ কমে গেলে রোগী আর ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন মনে করেন না। এতে করে এন্টিবায়োটিকের অপূর্ণমাত্রার প্রয়োগে জীবাণু সহজেই এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। রোগী পুনরায় একই জীবাণু দ্বারা সংক্রামিত হলে ওই এন্টিবায়োটিক আর কাজে আসছে না।
গত ২৪ মার্চ ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর কর্তৃক এন্টিবায়োটিক ব্যবহার সংক্রান্ত সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়, অপ্রয়োজনে, অযৌক্তিকভাবে ও অসম্পূর্ণ মেয়াদে এন্টিবায়োটিক গ্রহণের কারণে প্রতিরোধী জীবাণুর মাধ্যমে আমাদের ও ভবিষ্যত প্রজন্মের মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে। জেনে রাখা ভালো যে, ভাইরাসজনিত সর্দি-কাশি-ডায়রিয়াতে এটিবায়োটিক কাজ করে না। বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, শুধুমাত্র রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন মোতাবেক এন্টিবায়োটিক বিক্রয়, সেবন বা গ্রহণ করতে হবে। এন্টিবায়োটিক সেবন বা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রেসক্রিপশনে উল্লেখিত সময় ও নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। শারীরিকভাবে সুস্থতা অনুভব করলেও প্রেসক্রিপশনে নির্দেশিত এন্টিবায়োটিকের কোর্স সম্পূর্ণ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের দেশে সরকারি কোনো নিয়মনীতি না থাকার কারণে যে কোনো লোক ওষুধের ব্যবসা করতে পারে। যাদের ওষুধের গুণাগুণ সম্পর্কে বিন্দুমাত্র কোনো ধারণা নাই, তারাও ওষুধ বিক্রি করে। যখন তখন উচ্চমাত্রার ওষুধ ব্যবহারের ফলে অনেক সময় তা কার্যকারিতা হারায়। অপ্রয়োজনে উচ্চমাত্রার ওষুধ সেবনে মানবদেহে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে তা কিডনি, লিভার ও হৃৎপিন্ডের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। দেখা দিতে পারে দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগ।জানা যায়, দেশে অনেক জেনেরিক (মূল) ওষুধের কার্যকারিতা ইতোমধ্যে কমে গেছে, অনেক ওষুধই মানুষের শরীরে আগের মতো কাজ করছে না। এ সব ওষুধের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। আর ওষুধ কোম্পানিগুলো কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই বাজারে আনছে আগের জেনেরিকের সঙ্গে ‘প্লাস’ কিংবা ‘এক্সট্রা’ কিংবা ‘কম্বো’ বিশেষণের নানা সমন্বয়ের ওষুধ, যা মূলত এক ধরনের কারসাজি বা প্রতারণা। অনেক সময় কম্বিনেশন ওষুধে তাৎক্ষণিক উপকার পাওয়ার লোভে সাধারণ রোগীরাও ঝুঁকিপূর্ণ এসব ওষুধের প্রতি ঝুঁকে পড়েন। ওষুধ কোম্পানির মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে চিকিৎসকরাও নতুন কম্বিনেশনের ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেন।
অনেক রোগী ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধের দোকান থেকে এসব ওষুধ নিয়ে থাকে। যেমন জ্বর ও গায়ে ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিলে অনেকেই দোকানে গিয়ে সরাসরি প্যারাসিটামল বিপি ৫০০ মিলিগ্রাম + ক্যাফিনো ইউএসপি ৬৫ মিলিগ্রাম সমন্বিত ট্যাবলেট কেনে। কিন্তু এসব কম্বিনেশনের আড়ালে ওষুধগুলো পরিণত হয় উচ্চমাত্রার ডোজে। শুধু এন্টিবায়োটিকই নয়, অন্যান্য ওষুধ নিয়েও এ ক্ষেত্রে উদ্বেগ বাড়ছে। সেই সাথে প্যারাসিটামলের যত্রতত্র ব্যবহার এমনিতেই সর্বনাশ ডেকে আনে রোগীর জন্য। ক্যাফিনো যুক্ত বা প্লাস ব্র্যান্ডের প্যারাসিটামল মানুষের কিডনির ও লিভারের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ও আতঙ্কের বিষয়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সামনে কয়েকটি ওষুধের দোকানের বিক্রেতাদের সাথে কথা হয়। বিক্রেতারা বলেন, সারাদিন চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন দিয়ে যত ওষুধ বিক্রি করেন, তার শতকরা ৭০ ভাগ প্রেসক্রিপশনে এন্টিবায়োটিক ওষুধ দেয়া হয়। একইভাবে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ওষুধের দোকানে অবাধে বিক্রি হচ্ছে এন্টিবায়োটিক। ভুক্তভোগী রোগীরা এসব দোকানে গিয়ে নিজের অসুস্থতার কথা বললে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের এন্টিবায়োটিক। এছাড়া নগরীর বাইরে বিভিন্ন উপজেলায় ওষুধের দোকানে অবাধে বিক্রি করা হচ্ছে এন্টিবায়োটিক। যত্রতত্র এন্টিবায়োটিক বিক্রির প্রবণতা শহরের তুলনায় গ্রামে অনেক বেশি।
সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, কথায় কথায় এন্টিবায়োটিক খাওয়া যাবে না। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে এন্টিবায়োটিক সেবন করতে হবে। দুই একদিন খেয়ে ডোজ পূর্ণ না করে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করা যাবে না। হালকা জ্বর ও কাশি নিয়ে এন্টিবায়োটিক খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। জনগণকে প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ না খাওয়ার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা দরকার।
এন্টিবায়োটিকের অপপ্রয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গর্ভবতী মায়ের বাচ্চা মারা যেতে পারে। কিডনী ও লিভার নষ্ট হতে পারে। হার্টের সমস্যা এবং ব্রেইন স্ট্রোক হতে পারে।
চমেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. অশোক কুমার দত্ত বলেন, ভাইরাসজনিত জ্বর হলে প্রচুর পরিমাণ পানি ও ফলের রস খাওয়া যায়। শুধু নাপা বা প্যারাসিটামল খেলে ভাল হয়ে যাবে। দিনে ৩ বার করে ৪-৫ দিন খেতে হবে। এসব রোগের জন্য বড় ধরনের দামি ওষুধ খাওয়ার দরকার নেই। জ্বরের কারণে শরীর বা জয়েন্টে ব্যথা অনুভব হলে ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া যায়। প্রয়োজন ছাড়া এন্টিবায়োটিক গ্রহণ করা উচিত নয়।