এখনো মনেপড়ে আমার চয়নিকা’র কথা

লিটন দাশগুপ্ত

25

তিন দশকের বেশী সময় পার হয়ে গেল, তিন যুগের কাছাকাছি হয়ে গেল; তারপরেও, এখনো আমার মনেপড়ে চয়নিকা’র কথা। এত বছর পরে একটুও বিস্মৃতি হয়নি ‘চয়নিকা’ নামটি। চয়নিকা’র ছবি, গল্প, মিষ্টি ছড়া ইত্যাদি আমাকে আকৃষ্ট করেছিল সে সময়। তাই এই সময়েও সাহিত্য আসরে ভাবতে থাকি, জাতীয় শিক্ষাক্রমে খুঁজতে থাকি সেই আমার প্রিয় চয়নিকাকে।
ও আচ্ছা, আমি চয়নিকার পরিচয় দিতে ভুলে গেছি। যেটা আসলে আগেই দেয়া উচিৎ ছিল। কারণ আগে দিলেই চয়নিকা নিয়ে পাঠকসমাজ বিভ্রান্ত হত না, তবে আমাদের সমবয়সী হয়ত অনেকেই জানেন চয়নিকার সম্পর্কে, হয়ত আমার মত তাঁদেরও মনেপড়ে চয়নিকাকে। আর যারা আমাদের পরের প্রজন্ম, তাদের অনেকের মনে অনেক প্রশ্ন জাগতে পারে চয়নিকা কে বা কি ? তাই নতুন প্রজন্ম সহ আমার প্রিয় সকল পাঠক-পাঠিকা, ভাই-বোনদের চয়নিকার পরিচয় নিয়ে কৌতুহল মেটাতে আর বেশী দেরী করা সমীচীন হবেনা।
***রাম গরুড়ের ছানা
হাসতে তাদের মানা
হাসির কথা শুনলে বলে
হাসবো না-না না-না।
সদাই মরে ত্রাসে
ঐ বুঝি কেউ হাসে
এক চোখে তাই মিটমিটিয়ে
তাকায় আশে পাশে।
হ্যাঁ, বুঝতেই পারছেন এই রকমই মিষ্টি মধুর, ছড়া-গল্প সমৃদ্ধ বইয়ের নাম হচ্ছে চয়নিকা। অর্থাৎ চয়নিকা হচ্ছে আমাদের সময়কার একটি পাঠ্যবই, যেটি বাংলার সাথে সংযুক্ত ছিল। আরো সহজ করে বলি, স্কুল পর্যায়ে চয়নিকা হলো একটি আলাদা সাহিত্যধর্মী পাঠ্যবই, পরীক্ষায় এই বই হতে ২০ নম্বর প্রশ্ন (সঠিক মনে নেই সম্ভবত ২০ নম্বর) মূল বাংলা বইয়ের সাথে সংযুক্ত থাকত। কবিতা, গল্প, ছড়া সমৃদ্ধ সাহিত্যধর্মী এই বইয়ের প্রতি আমাদের সময় শুধু যে ক্লাসের পাঠ্যবই, সেই কøাসের শিক্ষার্থীর নয়. অন্যান্য ক্লাসের ছাত্রছাত্রী সহ সকল বয়সী মানুষের, অভিভাবকের আকর্ষণ ছিল বেশী। এই বইয়ে শিশুতোষ নানা রকম গল্প, ছড়া, কবিতা পড়ে আমরা আনন্দ পেতাম। এখানে বর্ণিত ও কল্পিত বিভিন্ন বস্তু বা ঘটনাকে নিজের ইচ্ছেমত করে বিভিন্ন ভাবে উপভোগ করতে পারতাম। এটাতেই শৈশবে আমাদের চিন্তাশক্তির বিকাশ ও কল্পনার বীজ বপন হয়ে যেত। যেমন-
***মামুদ মিয়া বেকার
তাই বলেকি সাধ নেই তার
বিশ্ব ঘুরে দেখার?
আসলো যখন চেকার
মামুদ মিয়া বললো হেসে
ট্রেনকি তোমার একার?
এই রকম হরেক রকম ছড়ায় শিশুদের মন আকৃষ্ট করা হত। যদিও সব গল্প, ছড়া এখন আর সঠিকভাবে মনে আসছেনা, বেশ কিছু ছড়ার লাইন এলোমেলো ভাবে মনে পড়ছে ,বিচ্ছিন্নভাবে গল্পের বিষয়বস্তু মনে আসা যাওয়া করছে, যেমন আর একটি ছড়া-
***কাঠফাটা সেই দুপুরে
কাকটা গেল পুকুরে,
পানি খাওয়ার আমেজে
পানিতে সে নামেযে;
এরপরের লাইনগুলো যদিও মনে নেই, তবে বিষয়বস্তু হচ্ছে এই রকম- অতিরিক্ত তৃষ্ণার্থ এক কাক পুকুরে পানি পান করতে গিয়ে, পানিতে তার ছায়া দেখে সে মনে করল এই পুকুরটি অন্য কাক দখলে নিয়েছে। শেষ পর্যন্ত নিজের ছায়ার সাথে ঝগড়া বিবাদ করে, ক্ষোভে রাগে পানি পান না করে উড়াল দিল। স্মৃতি পটে আরো ভেসে আসছে-
***ভোলানাথ লিখেছিল
তিনচারে নব্বই
গণিতের মার্কায়
কাটা গেল সর্বই,
তিন চারে বারো হয়
মাস্টার তারে কয়
লিখেছিনু ঢের বেশী
এই তার গর্বই।
শিশুদের উপযোগী গল্প, রূপকথা, কল্পকাহিনী ভ্রমন কাহিনী চয়নিকায় অর্ন্তভুক্ত ছিল। ছিল কুমির শেয়ালের গল্প, নুনেরমত ভালোবাসা, নিজাম ডাকাত, টাকার গাছ ইত্যাদি ইত্যাদি হরেক রকম গল্প। তাই সেসময় আমাদের মত শিশুরা অনুশীলন করে কল্পময়তা, চিত্রময়তা ধারণ করে চিন্তা শক্তি বিকশিত হয়ে স্বাধীন ভাবে পরিস্ফুট হবার সুযোগ পেত বা সুযোগ সৃষ্টি হত, আর এতে করেই শিশুদের সৃজনী প্রতিভার বিকাশ ঘটত। একইসাথে গল্প পড়ার মাধ্যমে পঠন দক্ষতা, শোনার মাধ্যমে শ্রæতির দক্ষতা, সাবলীল ভাবে বলার দক্ষতা অর্জিত হত। এখনকার সময়ের পাঠ্যবইয়ে সেই ধরনের ছড়া চোখে পড়েনা। এখানে সব ছড়া এখন আর মনে নেই, আবার যা মনে আছে তাও অর্ধেক বা একটু আধটু, যেমন-
***ক্রিং ক্রিং টেলিফোন
হ্যালো হ্যালৈা হ্যালো
কে তুমি কাকে চাও
বলো বলো বলো ?
আমি ম্যাও হুলো ক্যাট
ইদুঁরকে চাই
…………..
………….
আমি গেছি মার্কেটে
বাড়িতে নাই।
এই মজার ছড়াটি আমার পুরো মনে নেই, তবে বিষয় বস্তু ছিল চমৎকার। এখানে ইদুঁর বিড়াল টেলিফোন যোগাযোগ। বিড়ালে ইদুঁরের কাছে টেলিফোন করেছে, ইদুঁর রিসিভ করে বলছে সে বাড়ি নেই, মার্কেটে গেছে। কথোপকথনের একপর্যায়ে সম্ভবত বিড়াল পরিচয় জানতে পারে, এইঅবস্থায় ইদুঁর দুর দুর করে টেলিফোন লাইন কেটে দেয়।
ছড়াগুলো অনেক দিন আগের কথা। এইঅবস্থায় ছড়ার কিছু অংশ মনে আছে, কিছু অংশ মনে নেই; বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে ভুলে গেছি। তাই কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুরোপুরি নাও হতে পারে বা ভুলও হতে পারে। এখানে চয়নিকায় সংশ্লিষ্ট কবি, ছড়াকার, গল্পকার যারা ছিলেন, তাঁরা নিশ্চয় এখন আর জীবিত নেই। তাই তাঁদের আত্না ও স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এবং ক্ষমা চেয়ে, ছড়া ও বিষয় গুলো যতটুকু মনে পড়ে উল্লেখ করছি, যেমন-
***মালয়দ্বীপে এক যে বোকা শেয়ালে,
লাগলে ক্ষিদে মুরগী এঁকে দেয়ালে,
আপন মনে চাটতে থাকে খেয়ালে।
চয়নিকায় অন্তর্ভুক্ত গল্পের উপজীব্য বা বিষয়বস্তু ছিল- বিভিন্ন ধরনের জীবজন্তু, ফলফুল, ফসল, নদী, মাঠঘাট, গাছপালা, পশুপাখি, ভূতপেত্নী, রাজারাণি, রাক্ষসপুরী ইত্যাদি। এই সকল বিষয়বস্তুর সাথে সংশ্লিষ্ট চিত্র, শিশুদের মনে এনে দিত বৈচিত্রের স্বাদ, বাড়িয়ে দিত পড়ার ও জানার আগ্রহ, শিশু শিক্ষার্থীরা বইয়ের প্রতি প্রেষিত হত ও আকৃষ্ট হত। ছড়া ছিল শিশুদের বাস্তব প্রেক্ষাপট ও বয়সভিত্তিক চাহিদা মত, যেমন-
***পারিস কি তুই শীতের ভোরে
দিঘীর জলে নামতে,
ডুপটি দিয়ে চুপটি করে
আপন মনে থাকতে;
জানি আমি পারবিনে তুই
করতে এসব কিচ্ছু,
কান্না জুড়িস হঠাৎ করে
দেখলে কোন বিচ্ছু।
এখনকার সময়ে অর্থাৎ গত কয়েক বছর আগে থেকে ইউনিসেফ পরিকল্পিত সরকার প্রদত্ত বেশ কিছু সম্পুরক বই বিদ্যালয়ে দেয়া হয়েছে বা হচ্ছে। যেগুলো শুধু গল্পের। এখানে ছড়া, কবিতা বা সাহিত্যের অন্য ধারাসমুহ অনুপস্থিত। তাছাড়া পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করার কোন উপায় নেই। ফলে অনেক বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রী বইগুলোর নামও জানেনা।
আগে বা আমাদের সময় প্রায় প্রতিদিন, আমার জানামতে প্রায় প্রতিবিদ্যালয়ে ছুটির আগে চয়নিকার গল্প শিক্ষকেরা এমনভাবে অভিনয়ের মাধ্যমে বলতো, যেন কোন এক বাস্তব নাটকের দৃশ্যে অন্য এক জগতে পৌঁছে যেতাম। হয়ত বিভিন্ন বিদ্যালয়ে বিভিন্নভাবে উপস্থাপনা ছিল, তবে চয়নিকা বইটি সব বিদ্যালয়ে বাধ্যতামুলক ছিল। কোন কোন ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের উপস্থিতিতে পালাক্রমে পড়ত। অন্যরা অনুধাবন করে একেক জনে মর্মার্থ বুঝেয়ে দিত। চয়নিকার প্রতিপাতায় নিউজপ্রিন্ট কাগজে ছড়া গল্প গুলোর বিষয়বস্তুর সাথে সম্পর্কযুক্ত স্কেচ গুলো এখনো চোখে ভাসে স্মৃতিতে আসে। এমনকি সেই সময়ের পশুপাখি ফুলফল প্রকৃতি পরিবেশ ছিল আত্নীয় স্বজনের মত, মানুষের মাঝে ছিল অন্যরকম আন্তরিকতা। স্মৃতির আল্পনায় যখন আঁকি পুরানো হারানো সেই সব স্মৃতি, সত্যি আমি যেন চলে যায় দুর থেকে আরো বহুদুরে, অন্য এক পৃথিবীতে। আবার যদি ফিরে পেতাম সেই শৈশবকাল, যখন আমার সাথী ছিল সুনিবিড় প্রকৃতি এবং সাথে ছিল আমার বন্ধু চয়নিকা বই। এই সকল বিষয় ভেবে সত্যিই আমি অশ্রুসিক্ত।
সবশেষে আমার অনুরোধ, যা একটি দাবীও বটে; বর্তমান সময়ে সাহিত্যের বিভিন্ন ধারা সমৃদ্ধ ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত শ্রেনি উপযোগি, একটি করে পূর্ণাঙ্গ চয়নিকার মত বই পাঠ্য করা হোক। জানি ফিরিয়ে আনা যাবেনা সেইসময়ের মায়াবীস্মৃতির মধুর পরিবেশ, তবে ফিরিয়ে আনা হোক সেই হারানো পুরানো শিক্ষাক্রম সহপাঠ চয়নিকা।