এখনো ভোর হয়নি…

রোমেনা আফরোজ

158

আমার জন্ম এবং অনেকখানি বেড়ে উঠা গ্রামের পরিবেশে। যখনকার কথা বলছি, তখন নিতান্ত ছোট। এত ছোট যে বাড়ির গন্ডি পার হয়ে বাঁধের পথে পা রাখতে পারিনি। আমাদের আর দক্ষিণ পাড়ার সংযোগস্থলে লম্বা বাঁধটি টানটান করে শুয়ে আছে। একেবারে নিথর দেহ। চুপচাপ। কোন কথা বলে না। মানুষের চলাচল দেখে আর ঘুমায়। আমাদের গ্রামে একটি স্কুল আছে। সে স্কুল দক্ষিণ পাড়ায়। সেখানে যাওয়ার বয়স হয়নি। ও পাড়ার পথ দিয়ে অনেকদূর হেঁটে গেলে স্কুল। তারও অনেক পর হাটখোলা। সেখান থেকে নৌকা নিয়ে তিন কি চার ঘন্টা পথ গেলে কালিয়াকৈর। সভ্যতার শুরু সেখান থেকে। বড়্দির স্কুলে যাওয়ার সময় হলে আমি হাপুস নয়নে তাকিয়ে থাকি আর ভাবি, কবে বড় হব। কবে বই খাতা হাতে নিয়ে স্কুলের পথে পা রাখব। তখনও শরীরের ভেতর ইঁদুরের উপদ্রব শুরু হয়নি। ইঁদুরের জন্ম অনেক পরে। যৌনতা স¤পর্কে পুরোপুরি অজ্ঞ। বুকের জায়গা জমিন সমতল। সারাদিন ফ্রক পরে গাছে গাছে, দৌড়াদৌড়ি। গোল্লাছুট। এক্কাদোক্কা। মায়ের কড়া শাসনের কারণে গোসল, খাওয়া দাওয়া ঠিকমত করতে হয়। নিয়ম-শৃঙ্খলার এ অধ্যায়টি একেবারে বিরক্তিকর। কেন যে সময়ের কাজ সময়ে করতে হয়, বুঝি না! সব আনন্দের মধ্যে কে যেন একচিমটি ছাই ছিটিয়ে দেয়। যদি খাবার-দাবারের পর্বটিও গাছে সারা যেত তবে আনন্দের সীমা থাকত না। মিনা ফুফুর বিয়ের আয়োজন চলছে। কেউ কাগজ কাটছে। কেউ ঘর সাজাচ্ছে। আমিও ছোট ছোট হাত দিয়ে কাগজ নাড়াচাড়া করছি। এসব কাজে আমার প্রবল আগ্রহ। কিন্তু কিছুই করতে পারছি না। কাগজ নষ্ট হচ্ছে। কে যেন একবার ধমকে উঠলেন। মেঝো ফুফু ঝাড়–র কাঠি দিয়ে নিপুণ হস্তে মেহেদি আঁকছেন। আমি অনুরোধের সুরে বললাম, ফুফু আমার হাতেও মেহেদি দিয়ে দাও। তিনি মুখ না তুলেই বললেন, যখন তোর বিয়ে হবে তখন ঠিক এঁকে দেব।
তিনি শুধুমাত্র কনের হাতে আলপনা আঁকতেন। এ নিয়ে আমার মনে এক প্রস্ত অভিমান জমা হল। এটা কেমন কথা, শুধুমাত্র কনের হাতেই রঙ পড়বে। রঙ তো সকলের। কথাগুলো বলে উঠতে পারলাম না ঠিকই তবে অমন একটা ভাব নিয়ে অন্যদিকে গেলাম। বিভিনś ব্যস্ততার কারণে অভিমান নাকি রাগ বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না। বিয়ের নিমন্ত্রণে অনেক অতিথি এসেছেন। বাড়ি ভর্তি মানুষ। আমরা সমবয়সী কয়েকজন পুব ঘরে ঘুমাতে গেলাম। সেদিনই প্রথম মায়ের কাছ ছাড়া হলাম। নিজেকে বড় ভাবতে বেশ আনন্দ লাগছে।
পুব আর উত্তর ঘরে বিশাল খাট পাতা। ঘরের প্রস্থ বরাবর, একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের দেয়াল পর্যন্ত, দুটি খাট একত্রে জোড়া দেওয়া। সেখানে আমরা সাত/ আটজন শুয়ে আছি। আমার বামপাশে ছোট ফুফু রাবিয়া। অপর পাশে এক অপরিচিত ছেলে। আমি জানি, ওর বাড়ি দক্ষিণ পাড়ায়। কিন্তু কোন্ বাড়ির তা জানা নেই। মুখচেনা ছেলে। আমরা গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে গেলাম।
মধ্যরাতে আমার পেছনে, নিম্নদেশে শক্ত কিছুর চাপ অনুভব করলাম। তাতে ঘুম ভেঙে গেল। ভয়ে, শঙ্কায় আলগোছে চোখ মেলে দেখলাম, ঘরে আবছা অন্ধকার। একটি হারিকেন, অদূরের মাটিতে নিভে যাওয়ার অভিপ্রায়ে দপদপ করে জ্বলছে। বাড়ির সকলে ঘুমিয়ে গেলেও হারিকেন অন্তিম শ্বাস নিয়ে জেগে থাকত। সবসময়। অনেকবার দেখেছি, মাটির ঘরের অন্ধকার দুর্ভেদ্য হয়। ঘন কালো। অসূচিভেদ্য। আমি জেগেও ঘুমের ভান করে পড়ে রইলাম। বুঝতে চাইছিলাম, কী ঘটছে। আদতে সেটি ঘটছে, নাকি স্বপেś দেখছি। কিছুক্ষণ পর আবার একই রকমের চাপ। এবার সতর্ক হলাম। কিছুটা হলেও বুঝলাম, পাশের ছেলেটি কিছু একটা করতে চাইছে। সেটা কী এবং কেন, বোঝার বয়স তখনো হয়নি। না বুঝলেও আমার শরীর এসব কদাচার মেনে নিতে অপ্রস্তুত। আমি এমনভাবে ঘুরে গেলাম, যেন মনে হয়, ঘুমের মধ্যে পাশ পরিবর্তন করেছি। আমার মুখ এখন অপরিচিত ছেলেটির দিকে। ঘুরে গিয়ে শরীরটাকে এমনভাবে গুটিয়ে নিলাম, যাতে শরীরের কোন অংশ স্পর্শ করা না যায়। আমার দুই হাঁটু, মাথা, হাত সব একসাথে। বৃত্তাকার। ছেলেটার হাতের নাগালের মধ্যেই আছি কিন্তু অনভিপ্রেত কিছু করতে চাইলে বৃত্তটাকে ভাঙতে হবে। এত সতর্কতার পরেও ভয় হচ্ছে। প্রচন্ড ভয়। ইচ্ছে করছে, এক দৌড়ে মায়ের কাছে চলে যাই। কিন্তু অত রাতে তাকে ডাকা উচিত হবে না। যদি কেউ প্রশ্ন করে, কী হয়েছে, কেন মায়ের কাছে যেতে চাচ্ছি তখন অজুহাত দেখাবার মত কিছু খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এসব সাতপাঁচ ভেবে মটকা মেরে পড়ে আছি। হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে। পানির পিপাসাও লাগছে। কিন্তু এ ঘরে কলসি নেই। থাকলেও উঠে যেয়ে খাওয়ার মত সাহস অবশিষ্ট নেই শরীরে।
যদি ছেলেটা আবার চেপে ধরতে চায় তবে আমার পদক্ষেপ কী হবে। কী হলে কেউ ঘুম থেকে জেগে উঠবে না অথচ নিরাপদ থাকব, এমন অনেক পথ খুঁজতে লাগলাম কিন্তু বার বার ব্যর্থ হচ্ছি। ছোটবেলা থেকে আমি এক কাতে ঘুমাতে পারি না। বারবার পাশ ফিরতে হয়। আজ পাশ ফিরছি না। শরীরকে সতর্ক করে দিয়েছি, যাতে পাশ না ফেরে। এভাবে অনেকক্ষণ নিজেকে পাহারা দিলাম। একসময় ঘুম। চোখ মেলে দেখলাম, আমি একা। অন্যরা উঠে গেছে। ঘরের জানালা বন্ধ থাকায় তখনো অন্ধকারের রাজত্ব শেষ হয়ে যায়নি। দরজার এক ফাঁক দিয়ে দেখলাম, উঠান ভর্তি সূর্যের ঝলমলে হাসি। আলোর দিকে চোখ রেখে সন্দেহ হল, সত্যিই কি ভোর হয়েছে! নাকি আলোর পথ এখনো অনেক বাকি?