নির্মাণ সামগ্রীর দাম বাড়ছেই

এক মাসের ব্যবধানে প্রতিটন লোহায় বেড়েছে ১২-১৫ হাজার টাকা, সিমেন্টে বস্তায় বেড়েছে ৫০-৭০ টাকা

ইকবাল হোসেন

41

হঠাৎ করেই হু হু বাড়ছে নির্মাণ সামগ্রীর দাম। এতে করে বিপাকে পড়েছেন সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন কাজে জড়িত ঠিকাদার ও আবাসন ব্যবসায়ীরা। এক মাসের ব্যবধানে প্রতিটন লোহায় বেড়েছে ১২-১৫ হাজার টাকা ও সিমেন্টে বেড়েছে প্রতিবস্তায় ৫০-৭০ টাকা। পাশাপাশি ইট, পাথরের দামও বেড়েছে আশংকাজনকহারে। তবে নির্মাণ গ্রামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের দাবি, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, ডলারের দাম বৃদ্ধি, বন্দরের ডেমারেজ, ব্যাংক সুদ ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণেই বাড়ছে নির্মাণ সামগ্রীর দাম।
সূত্রে জানা গেছে, সিমেন্ট তৈরির বেশিরভাগ কাঁচামাল আসে চীন ও ভিয়েতনাম থেকে। সম্প্রতি চীন ও ভিয়েতনাম সিমেন্টের কাঁচামাল ক্লিংকার রপ্তানি কমিয়ে দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের সিমেন্টের বাজারে। একইভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপ জাহাজ ও লোহার দামও বেড়েছে।
জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট দেখা দেয়ায় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে আন্তঃ ব্যাংক লেনদেনে বেড়েছে ডলারের দামও। সবগুলোর প্রভাব পড়েছে আমদানি পণ্যের উপর। আর নির্মাণ সামগ্রীর মধ্যে রডের কাঁচামাল স্ক্র্যাপ লোহা, সিমেন্টের কাঁচামাল ক্লিংকার আমদানি করতে হয়। আবার বিগত দুই বছর ধরে নির্মাণের আরেক উপকরণ পাথরও আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হচ্ছে। ফলে ডলারের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে এসব সামগ্রীর উপর।
বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গতকাল ১৫ মার্চ বিএসআরএম ব্রান্ডের ৬০ গ্রেড প্রতিটন রড মিল থেকে বিক্রি হয়েছে ৬৫ হাজার টাকা। যা খুচরা বাজারে ৬৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। একমাস আগে প্রতিটন বিএসআরএম রড বিক্রি হয়েছে ৫২ হাজার টাকায়। একইভাবে বৃহস্পতিবার কেএসআরএম ব্রান্ডের রড মিল থেকে বিক্রি হয়েছে ৬৪ হাজার টাকা। এক মাস আগেও এ ব্রান্ডের রড বিক্রি হয়েছে ৫১ হাজার টাকায়। আরএসআরএম, একেএস, জিপিএইচ ব্রান্ডের লোহাও ৬৪ হাজার থেকে ৬৪ হাজার ৫শ টাকায় বিক্রি হয়েছে। একমাস আগে এসব রডের দাম ছিল ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা কম। গত কয়েকদিন থেকে প্রতিদিনই ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়ছে রডের দাম।
একইভাবে বিভিন্ন ব্রান্ডের প্রতিবস্তা সিমেন্ট এক মাস আগে ৩৫৫ টাকা থেকে ৩৭০ টাকায় বিক্রি হলেও গত সোমবার বাজারে বিক্রি হয়েছে ৪২০ থেকে ৪৩০ টাকা পর্যন্ত।
রড ও সিমেন্ট ব্যবসায়ী আবদুল লতিফ বাবু বলেন, ‘গত একমাস ধরে হঠাৎ করেই সব ধরনের নির্মাণ উপকরণের দাম বাড়ছে। প্রায় প্রতিদিনই লোহার দাম বাড়ছে। দাম বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে বাড়ি-ঘর নির্মাণে সাধারণ মানুষকে বেগ পেতে হবে। কারণ নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ, যারা স্বল্প টাকা যোগাড় করে দালান তৈরির কথা ভাবছেন, তাদের স্বপ্ন ভেঙে যাবে। সরকারের উচিত নির্মাণ সামগ্রীর দাম নিয়ন্ত্রণে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়া।’
শাহ জব্বারিয়া কন্সট্রাকশনের মালিক ইঞ্জিনিয়ার আবদুল্লাহ টিটু পূর্বদেশকে বলেন, ‘আমরা একবছর আগের মূল্যে টেন্ডারে কাজ করছি। গত একমাস থেকে অস্বাভাবিকভাবে নির্মাণ সামগ্রীর দাম বাড়ছে। প্রত্যেক সামগ্রীর দাম ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এতে ঠিকাদার হিসেবে আমরা বিপুল লোকসানের মুখে পড়ছি।’
রেনকন প্রপার্টিজ লি. এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্রকৌশলী তানভীর শাহরিয়ার রিমন পূর্বদেশকে বলেন, ‘২০১৫ সালে আবাসন খাত সবচেয়ে বেশি মন্দার শিকার হয়েছে। ২০১৬ সাল থেকে আবাসন খাত ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। ২০১৭ সালে মধ্য আয়ের মানুষদের নাগালে ছিল ফ্ল্যাট। এখন ২০১৮ সালে নতুন বছরের শুরুতে সব ধরনের নির্মাণ উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় আবাসন খাত একটি ধাক্কা খেল।’
তিনি বলেন, ‘গত ১৫ দিনেই সিমেন্টের দাম বেড়েছে ১৭ শতাংশ, রডের দাম বেড়েছে ২০ শতাংশের মতো। দাম বৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের আবাসন খাত একেবারে মুখ থুবড়ে পড়বে।’
দেশে সবচেয়ে বেশি লোহা প্রস্তুতকারী ও রডের বাজার নিয়ন্ত্রণকারীদের অন্যতম প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম। দেশীয় চাহিদার মধ্যে সবচেয়ে বেশি লোহা উৎপাদন করে চট্টগ্রামের এ প্রতিষ্ঠানটি। রডের দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে বিএসআরএম এর নির্বাহী পরিচালক তপন সেন গুপ্ত পূর্বদেশকে বলেন, ‘পাঁচ কারণে দেশে রডের দাম বাড়ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের দাম বৃদ্ধি ও ব্যাংক সুদের হার বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে। পাশাপাশি জাহাজ থেকে কাঁচামাল খালাসে দীর্ঘসূত্রিতার জন্য বন্দরের ডেমারেজ গুণতে হচ্ছে। একইসাথে বেড়েছে পরিবহন ব্যয়ও। যে কারণে বাজারে রডের দাম বাড়ছে।’