একুশে পুরস্কার প্রাপ্ত আঞ্চলিক গানের শিল্পী শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব স্মরণে

সুমন গোস্বামী

3

বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মধ্যে রয়েছে লোক সংস্কৃতির বিরাট ভূমিকা। আর এই লোক সংস্কৃতির আরেক দিকপাল হলেন শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের শিল্পী শ্যামসুন্দরের জন্ম ১৯২৭ সালে হাটহাজারী উপজেলার ফতেয়াবাদ নন্দীরহাট এলাকার সম্ভ্রান্ত এক বৈষ্ণব পরিবারে। কম বয়সে বাবার মৃত্যুর কারণে পরিবারের হাল ধরতে হওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া খুব বেশি করতে পারেনি তিনি।
শ্যামসুন্দরের গানের তালিম হয় পিতামহ জয়দাশ বৈষ্ণবের কাছে। তিনি আধ্যাত্মিক গানের একনিষ্ঠ সাধক ছিলেন। সেই সুবাদে পারিবারিক আবহেই গানের ভুবনে প্রবেশ করেন শ্যামসুন্দর। শিশুকাল থেকে আঞ্চলিক গানের সাথে কৌতুক পরিবেশের করতেন শ্যাম।
১৯৬৩ সালে মহি আল ভান্ডারী খ্যাত গীতিকার ও সুরকার সৈয়দ মহিউদ্দিনের রচিত ও সুরে করা দুটি আঞ্চলিক গান বেতারে পরিবেশনের মধ্যে দিয়ে আনুষ্ঠানিক সঙ্গীত জীবনে পর্দাপণ করেন শ্যামসুন্দর। এরপর ১৯৭৫ সালের দিকে বাংলাদেশ টেলিভিশন তালিকাভুক্ত কন্ঠশিল্পী হন। এরমধ্যে ১৯৬৪ সালে রেডিওতে গান করতে গিয়ে শিল্পী শেফালী ঘোষের সাথে পরিচয় ঘটে শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবের। তারপর বাকিটা পথ এই জুটি বাংলা গানের জগতে এক অনবদ্য ইতিহাসের জন্ম দিয়েছেন কয়েক দশক জুড়ে।
শেফালী ঘোষ রেডিওতে গান করতেন। পরে দ্বৈত গানে একজন সঙ্গীর প্রয়োজন হচ্ছিল তাঁর। ওই সময় শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবের কথা বলেন সবাই। একসঙ্গে গাওয়া রেডিওতে তাঁদের প্রথম গানটি ছিল ‘নাইর গেলে বাপের বাড়ি, আইস্যু তাড়াতাড়ি…’। এই জুটি গান নিয়ে ২৯টি দেশে ঘুরেছেন। গানের সময় কখনো স্বামী-স্ত্রীর, কখনো বা প্রেমিক-প্রেমিকার অভিনয় করে গানের কথায় দর্শকদের আনন্দ দিতে তাঁরা জুটিবদ্ধ গানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। সেসময়কার গানের অনুষ্ঠানগুলোতে তাঁদের কখনো আলাদা ডাক পড়ত না। আঞ্চলিক গানের শিল্পী শ্যাম সুন্দরের বাল্য বন্ধু ছিলেন গায়ক, গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক সত্য সাহা।
শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব এর জনপ্রিয় কিছু গানের মধ্যে হলো- ‘ও বাস কন্ডাকটার’, ‘বানুরে ও বানু, ‘আঁর বাইক্য টেঁয়া দে’, ‘দেশে গেলে কইয়েনগো ভাইজান চাটিগাঁয়ে চাকরি একখান হাইছি’, ‘ও জেডা ফইরার বাপ’, ‘আঁর বউঅরে আঁই কিলাইউম’, ‘ওরে সাম্পানওয়ালা’সহ কালজয়ী অনেক গান।
সরকারি ও বেসরকারিভাবে অনেক পুরস্কার এবং সম্মাননা পেয়েছেন
তিনি। এরমধ্যে আছে শহীদ নতুন চন্দ্র সিংহ পুরস্কার, বাংলাদেশ বেতার গুণীজন সংবর্ধনা পুরস্কার, মুক্তিযুদ্ধের বিজয়মেলা পুরস্কার, বাংলাদেশ উদীচী পুরস্কার, চট্টগ্রাম শিল্পী সংস্থা পুরস্কার, ধ্রুব পরিষদ পুরস্কার,আলাউদ্দিন ললিতকলা একাডেমী, ত্রিতরঙ্গ, ফতেপুর রুদ্র পল্লীবাসী, হাটহাজারী কন্ঠ, সম্মিলিত বর্ষবরণ, বীর চট্টগ্রাম মঞ্চ, রয়েল ক্লাব অব মেট্রোপলিটনসহ অনেক পুরস্কার রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। মৃত্যুর পর ২০০৮ সালের দিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে একুশে পদক পুরস্কার প্রদান করা হয় শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণবকে।
মৃত্যুর পর এই গুণী শিল্পীর জন্য শুধুমাত্র চট্টগ্রাম টেলিভিশন কেন্দ্র একটি অনুষ্ঠান করা হয়। এছাড়া নগরীর চেরাগি পাহাড় এলাকাতে ছোট আকারে এক দুইটি অন্ষ্ঠুান করা হয় বলে জানান শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবের সন্তান বিশ্বজিৎ বৈষ্ণব। তিনি আরও জানান যে, শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবের নামে একটি গানের ইনস্টিটিউট করা হলে আঞ্চলিক গানের নতুন নতুন শিল্পী তৈরি হবার সুযোগ পেতেন।
তবে গত কয়েক বছরে ধরে শ্যামসুন্দরের গ্রামের বাড়ি নন্দীরহাটে পারিবারিকভাবে এই শিল্পীর স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আঞ্চলিক গানের শিল্পী শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব ছোট ছেলে শিল্পী প্রেম সুন্দর বৈষ্ণবও বাবা সেসব কালজয়ী গান গেয়ে দেশ-বিদেশে সুনাম কুড়িয়েছেন।