একুশে পদকে ভুষিত হচ্ছেন ইলিয়াস কাঞ্চন

42

সমাজসেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় ‘একুশে পদক-২০১৮’ পুরস্কার পাচ্ছেন জনপ্রিয় চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। ১৯৯৩ সালে ‘নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)’ নামে একটি সংগঠন তৈরি করেন তিনি। সড়ক দুর্ঘটনা নিরসনে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।

প্রশ্ন: ‘একুশে পদক-২০১৮’ পুরস্কারে ভূষিত হচ্ছেন আপনি। কেমন লাগছে?
ইলিয়াস কাঞ্চন: ঘণ্টা দুয়েক আগে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে ফোন পেয়েছিলাম। খবরটি জানার পরই খুব ভালো লাগছে। কাজ করে যখন তার স্বীকৃতি পাওয়া যায় তখন সবারই ভালো লাগে। আমি মনে করি, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রæয়ারি আমাদের স্বাধীনতার প্রথম ধাপ। একুশকে ঘিরে আমার ছোটবেলার অনুভূতিগুলো এখনও হৃদয়ে অমলিন।
মনে পড়ে, জীবনের প্রথম কবিতাটা লিখেছিলাম একুশে নিয়ে ‘আমার মালা’। ছোটবেলায় ফুল চুরি করে মালা বানিয়ে ভোরে শহীদ মিনারে যেতাম। সেই অনভূতি থেকেই কবিতাটা লিখেছিলাম। সেকারণে একুশে পদক প্রাপ্তিটা সত্যিই আমার কাছে অন্যরকম।
প্রশ্ন: অভিনেতা হলেও আপনার পুরস্কারটা এলো সমাজসেবায়।
ইলিয়াস কাঞ্চন: বেশকিছু সামাজিক কর্মকাÐকে তুলে আনা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলন।
সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা যায় এটা দেশের মানুষের চিন্তার মধ্যেও ছিল না। আন্দোলনটা শুরুর পর থেকেই আমাদের চিন্তাটা ছড়িয়ে পড়া শুরু করেছে।
আগে সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ মারা গেলে আত্মীয়-স্বজনরা বলতেন, ‘আমাদের আর করণীয় কী? আল্লাহর মাল আল্লাহই নিয়ে গেছেন’। কিন্তু এখন আর মানুষ চুপ করে থাকে না। সচেতনতা বেড়েছে। পেয়েছে প্রতিবাদের ভাষা।
প্রশ্ন: দেশীয় তারকাদের সমাজসেবায় যুক্ত হওয়ার নজির হাতে গোনা।
ইলিয়াস কাঞ্চন: ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই আমি চিন্তা করতাম, সামাজিক কর্মকাÐের সঙ্গে যুক্ত থাকব। পরে যুক্ত হয়েছিও। তবে এটা ঠিক আমাদের দেশের তারকাদের মধ্যে এই ধরনের কাজে যুক্ত হওয়ার প্রবণতাটা খুব কম।
কিছুদিন আগে ব্যাংককে এক ইন্টরন্যাশনাল সেমিনারেও এ বিষয়ে আলোচনা করেছি। সেখানেও বলেছি, সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে তারকাদের নানা কর্মকাÐে যুক্ত হতে হবে।
কারণ একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে এই ধরনের কাজ করা যতোটা কঠিন তারকাদের পক্ষে ততটাই সহজ। তারকা বলতে শুধু ফিল্মেরই হতে হবে এমন কোনও কথা নেই। খেলোয়াড় থেকে শুরু করে অন্য অঙ্গনের তারকারাও এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন।
প্রশ্ন: পুরস্কার প্রাপ্তির পর আপনার সামাজিক দায়বদ্ধতাও বেড়ে গেল নিশ্চয়ই। নিসচা নিয়ে কী ধরনের পরিকল্পনা আছে আপনার?
ইলিয়াস কাঞ্চন: পুরস্কার পেলেও আমি সবসময় একটা জিনিস মনে করি, রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এ দেশ। বাংলাদেশের জন্ম না হলে ইলিয়াস কাঞ্চনেরও জন্ম হতো না। ফলে আমি দেশের কাছ থেকে কী পেলাম তার চেয়ে বেশি চিন্তা করি, আমি দেশকে কী দিতে পারছি। দেশের জন্যই কাজ করে যেতে চাই।
প্রশ্ন: ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ সংগঠনের প্রতিষ্ঠার পেছনের গল্পটা জানতে চাই।
ইলিয়াস কাঞ্চন: আমি একবার ভয়ানক সড়ক দুর্ঘটনায় পড়েছিলাম। হাত-পা পঙ্গু হওয়ার মতো দুর্ঘটনা। দেশের ডাক্তাররা বলেছিলেন, হাত-পা কেটে ফেলতে হবে। কিন্তু আমার স্ত্রী বলেছিলেন, হাত-পা কাটা যাবে না। পঙ্গু হয়ে প্রতিদিন কষ্ট পাওয়ার চেয়ে আমার মৃত্যুই ভালো।
আমার স্ত্রী’র বিচক্ষণতার কারণে সেদিন আমার হাত-পা কাটা থেকে রেহাই পেয়েছিলাম আমি। তখন ক্ষমতায় ছিলেন এরশাদ সাহেব। উনি আমাকে সিঙ্গাপুর পাঠালেন। সুস্থ হয়ে ফিলে এলাম।
আমি মনে করি আমার স্ত্রী’র বিচক্ষণতার কারণেই পঙ্গুত্বের হাত থেকে রেহাই পেয়েছিলাম। সেই মানুষটাই সড়ক দুর্ঘটনায় আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেল।
যে ভালোবাসে তার প্রতিদান ভালোবাসা দিতে না পারলে সে মানুষ না, অমানুষ। স্ত্রীর মৃত্যুর পরই সিদ্ধান্ত নিলাম, সন্তানদের মানুষ করব আর ফিল্মে অভিনয় করব না।
সেইবার একজন সাংবাদিক আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার স্ত্রী তো চলে গেছেন। এখন আপনার লাখো জীবিত ভক্ত অকালে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করছেন। তাদের জন্য কিছু করবেন না?
সেই থেকেই সংগঠনটির কাজ শুরু করলাম। তখন অনেকে বলেছিল, শিল্পীরা আকাশের তারা। তারা যখন মাটিতে নেমে আসে হিরো থেকে জিরো হয়ে যায়। তখন আমি বলেছিলাম, যে মানুষগুলোর জন্য আমি হিরো তাদের জন্য আমি মাটিতেই থাকতে চাই।