একাল-সেকাল

আ .জ. ম. সামশুল হক

8

আদি সভ্যতা বলতে মিশরীয় সভ্যতাকে বুঝায়। মিশরীয় সভ্যতার নিদর্শন এবং স্থাপত্যশৈলী উজ্জ্বল এবং গৌরবময়। ইসলামের ইতিহাসে মিশরের অবস্থান অনেক সুদৃঢ় ও ঐতিহ্যে ভরা। তবে একবিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক টানাপোড়নে বর্তমানে সেই জৌলুস এবং অনুশাসন একটু ভাটা পড়েছে বৈকি। অপর দিকে ছোট্ট একটি ভূখন্ড এবং ছোট একটি দেশ মালদ্বীপ। সেই মালদ্বীপে অতীতের কোন এক সময়ে পৌরাণিক কিছু কর্মযজ্ঞ ছিল। দেবতাকে তুষ্ট করার জন্য যাহা কিছু করা হত, তাহা ছিল অপসংস্কৃতি এবং অসভ্যতায় ভরা। আজকের সেই মালদ্বীপে অসভ্যতার ছোঁয়া নেই বলা যায়। নেই কোন রাজনৈতিক উত্তাপ এবং অস্থিরতা। পৃৃথিবীর মানচিত্রে মালদ্বীপ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় এক শান্তিময় এবং সম্প্রীতির দেশ।
বৃটিশ শাসন আমলে পাকভারত উপমহাদেশে জমিদারী ব্যবস্থার প্রচলন ছিল। জমিদার বাড়ির জলসা ঘর ইংরেজদের উপস্থিতিতে সরব ছিল। জমিদারদের অমতে বৃটিশ সরকার এই ভূখন্ডে কোন ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করেনি। এলাকার সার্বিক ব্যবস্থাপনা জমিদারদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। জমিদারেরা এলাকার প্রজাদের থেকে খাজনা আদায় এবং খবরদারি করতেন প্রত্যক্ষভাবে। তৎকালীন সময়ে জমিদারদের পক্ষ থেকে একশত প্রজা মেরে ফেললেও তাঁদেরকে কোনদিন বিচারের সম্মুখীন হতে হয়নি। বরং ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবার জমিদারদের অত্যাচারের ভয়ে পালিয়ে বেড়াত। তা ছিল, সম্পূর্ণ সাম্রাজ্যবাদী এবং পুঁজিবাদী ব্যবস্থাপনা। সেই ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা বর্তমানে নেই। জমিদারদের সেই সা¤্রাজ্য কালের বিবর্তনে বিলুপ্ত হয়ে যায়। জমিদারদের জামদারীও নেই এবং সেই জলসা ঘরও নেই। এই দেশের বর্তমান শাসন ব্যবস্থায় খুন,হত্যা এবং অপরাধের সাথে যেই জড়িত হোক না কেন, আদালতের কাঠগড়ায় তাকে দাঁড়াতে হবে। মন্ত্রী, এমপি, আমলা এবং বিত্তশালী কেউ আদালতের কাছে আলাদা নয়। এমনকি চাকর ক্ষতিগ্রস্ত হলে মনিবের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করার সুযোগ বর্তমান। টাঙ্গাইলের এমপি জনাব আমানুর রহমান খান খুনের মামলার দায়ে বিচারের আওতাধীন। প্রাক্তন মন্ত্রী জনাব আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে বর্তমানে কারাগারে বন্দী। বিত্তশালীদের মধ্যে অনেকে ঋণখেলাপি মামলার আসামি।
আগেকার দিনে সরকারি উচ্চ পদে আসীন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলাতো দুরে থাক, কোন ধরনের হয়রানি করা যেত না। হয়ত বা তাঁরা দুর্নীতিপরায়ণ ছিলেন না বা মানুষের আস্থা ভঙ্গ হয়, এমন কাজ সরকার করতেন না। বর্তমানে ডিআইজি মিজানুর রহমান দুর্নীতি এবং ঘুষ লেনদেনের মামলার আসামি। সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় বর্তমানে কারাগারে আছেন। সাবেক ডিআইজি (প্রিজন্স) জনাব পার্থ গোপাল বণিকও দুর্নীতি মামলার দায়ে কারাগারে বন্দী। বাসায় বস্তাবন্দী আশি লাখ টাকার হিসাব দিতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। থানার ওসি এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদের কথা নাই বা বললাম। সেই সমস্ত কারণে পুলিশের দূর্নীতির কথা বলতে জনগণ এখন ভয় পায়না। এই দেশে পুলিশ প্রশাসন এবং ব্যাংক প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা ছিল বেশি। বর্তমানে তা শূন্যের কোটায় বলা যায়। মাঝপথে কতেক ব্যাংক ম্যানেজার, কর্মকর্তা এবং ক্যাশিয়ারের যোগাসাজশে গ্রাহকের আমানতের টাকা খেয়ানত করে কেউ চাকুরিচ্যুত হয়েছেন এবং অনেকে কারাবন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। বেসিক ব্যাংকের এমডি এবং ফারমার্স ব্যাংকের এমডি মহোদয় দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত। তাছাড়া ১৬২ কোটি টাকা আত্মসাতের দায়ে রুপালী ব্যাংকের সাবেক এমডি জনাব এম ফরিদ উদ্দিনসহ দশ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা দায়ের করা হয়েছে। প্রাপ্ত খবরে প্রকাশ, ব্যবসায়াীদের যার-পর-নাই সহযোগিতা করতে গিয়ে নিজেরা স্বনামে-বেনামে ব্যবসা খুলে বসেছিলেন।
বৃটিশ শাসনামলে পাকভারত উপমহাদেশে সরকারি উচ্চপদে বিশেষ করে জমিদারদের নিকটতম লোকজন বা বংশ মর্যাদা সম্পন্ন বিত্তশালী লোকজন দায়িত্ব পালন করতেন। পরবর্তীতে যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ প্রদান করা হয়। পাকভারত উপমহাদেশে জনাব পিজে আবদুল কালাম একজন পদার্থ এবং পরমাণু বিজ্ঞানী ছিলেন। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি সরকারি উচ্চপদে আসীন ছিলেন। অতঃপর ভারতের রাষ্ট্রপতির পদ অলংকৃত করেন। পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও যোগ্যতার মানদন্ডে জনাব আতিউর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন।
বাংলার নবাব সিরাজদৌল্লা, জর্ডানের বাদশাহ হোসেন, জাপানের সম্রাট আকিহিতো এবং রাজা গোবীন্দ চন্দ্র রায়ের নাম আমরা শুনেছি। রাজা বাদশাহ সম্রাট-নবাব এই সমস্ত নাম আগে এই দেশে ব্যবহার হতনা। বর্তমানে মাদক সম্রাট ও মাদক সম্রাজ্ঞী বহাল তবিয়তে সাম্রাজ্য গড়েছে ঢাকা কড়াইল বস্তি এবং জিয়া বস্তিতে। ইতোমধ্যে আমাদের দেশে কেসিনো সম্রাটের আবির্ভাব ঘটেছে। রাজা-বাদশাহ এবং নবাবদের রেল লাইনের পাশের ঝুপড়িতে সন্ধান মিলে।
নবাব সিরাজদৌল্লার শাসন আমলে মীর জাফর এবং মাহতাব চাঁদ ওরফে জগৎশেঠের মত লোকদের খপ্পরে পড়ে বাংলার মসনদ তছনছ হয়ে যায়। তাদের দূরভিসন্ধিতে বাংলার মহানায়কের মৃত্যু হয় নির্মমভাবে। তেমনিভাবে খোন্দকার মোস্তাক আহমদ সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের সাথে একাত্ম হয়ে ষড়যন্ত্রের জাল বুনে নৃশংস হত্যাকান্ডের মধ্যে দিয়ে স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তীতে ষোলটি বৎসর সামরিক জান্তার কবল থেকে দেশ তলাবিহীন ঝুড়ি উপাধি লাভ করে। তাতে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন কার্যতঃ ঝিমিয়ে পড়ে। পূর্ণ গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে সরকার এখন ও হিমশিম খাচ্ছে। রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেই থাকুক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ে উঠবে,তাই জনগণের প্রত্যাশা।
আইয়ুব খাঁনের শাসন আমলে ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে এলাকার পুকুর/জলাশায় থেকে কচুরীপানা পরিষ্কার করার ব্যাপারে হুকুম জারি করে, সেই সময় আমরা দলবদ্ধভাবে কচুরীপানা পরিষ্কার করতে বাধ্য হই। বর্তমানে ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়া এবং ম্যালেরিয়া রোধে সিটি কর্পোরেশন তথা সরকারের পক্ষ থেকে জনগণকে শতবার বলে কাজ হচ্ছে না। যেহেতু আমাদের চারপাশে বর্জ্য ফেলে আমরা নিজেরাই এডিসের প্রজনন ক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়েছি। সম্প্রতি মশা নিধনকল্পে ঔষধ ক্রয়ে যে কেলেঙ্কারি সৃষ্টি হয়েছে, তা সমাধান হতে হতে ডেঙ্গু সারা দেশ ছেয়ে যাবে এবং বাস্তবে চেয়ে গেছে।
আগেকার দিনে রাষ্ট্রপতির সাথে সাধারণ জনগণের দেখা মিললেও দেশের প্রধান বিচারপতি জনগণের দৃষ্টির বাইরে ছিল। অথচ জনাব এস কে সিনহার মত প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি অর্থ পাচার মামলায় অভিযুক্ত। একথা ভাবতে অবাক লাগে। তিনি পুরো বিচার ব্যবস্থাকে কলুষিত করেছেন নিঃসন্দেহে । সম্প্রতি নড়াইলে এক হত্যা মামলার প্রধান আসামিকে অভিযোগপত্র থেকে নাম বাদ দিয়ে অভিযোগ গঠন করাতে তা হাইকোর্টের নজরে আসে। সেই কারণে নড়াইলের জেলা ও দায়রা জজের বিচারিক ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া হয়।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রাক্তন চেয়ারম্যান জনাব কে এম হারুনসহ অনেকে দুর্নীতি এবং জালিয়তির সাথে সম্পৃক্ত। এফ.আর. টাওয়ারের ঘটনার রেশ ধরে অতীতের সব তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। এমনি অবস্থায় মাননীয় গণপূর্তমন্ত্রী জনাব স.ম রেজাউল করিম দুর্নীতির বিরুদ্ধে ইস্পাত কঠিন শপথ নিয়েছেন। সাধুবাদ জানাই মন্ত্রী মহোদয়কে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই দেশে আগেও গণপূর্তমন্ত্রী ছিলেন।
দুর্নীতি দমন কমিশন একটি সাংবিধানিক এবং স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। ইতোমধ্যে ১৪৩ কোটি টাকা আত্মসাতের দায়ে বড় পুকুরিয়া কয়লা খনির সাবেক এমডি জনাব হাবিব উদ্দিনসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে দুদকের পক্ষ থেকে চার্জশীট জমা দেওয়া হয়। অনুরূপভাবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের শুধু আবাসন প্রকল্পে ৩৬ কোটি টাকা লোপাটের ঘটনায় এলপিআরে থাকা প্রধান প্রকৌশলী জনাব মোঃ রফিকুল ইসলাম, নির্বাহী প্রকৌশলী জনাব মাসুদুল আলমসহ ৫০ জনের অধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুদক হাইকোর্টে প্রতিবেদন জমা দেয়। রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে শুরুতেই গলদ, শেষটা ভাল হয় কি করে। জাহালামের তিন বছর জেল খাটা এবং দুর্ভোগের পিছনে ব্যাংক কর্মকর্তাসহ দুদকের চৌদ্দ জন কর্মকর্তার নাম ওঠে আসে। মূল আসামি আবু সালেকের স্থলে জাহালামকে দুদকের পক্ষ থেকে সনাক্ত করা হয়। তাছাড়া ডিআইজি মিজানুর রহমানের কাছ থেকে চল্লিশ লক্ষ টাকা ঘুষ গ্রহণের দায়ে দুদকের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির অভিযুক্ত হয়ে কারাগারে। কৌতুহলী মানুষের প্রশ্ন, দুর্নীতিরোধে দুদক কাজ করছে, দুদকের দুর্নীতি ঠেকাবে কে?
১৯৭০ সাল। চট্টগ্রাম সিটি কলেজের অধ্যক্ষ জনাব রেজাউল করিম আমাদের বিএ ১ম বর্ষে ইংরেজির ক্লাস নিচ্ছিলেন । ইংরেজি কবিতা ড্যাফোডিল পড়ানোর সময় আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “আমি তোদের মত গাধাদের ঘোড়া বানানোর চেষ্টা করছি”। তাঁহার এই কথায় আমরা তিরস্কৃত হয়নি এবং হতাশও হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে অজুহাত সৃষ্টি করে, ইউএসটিসির ইংরেজি বিভাগের প্রবীণ শিক্ষক ড. মাসুদ মাহমুদের গায়ে ছাত্রদের পক্ষ থেকে কেরোসিন ঢেলে দেওয়ার খবরে দেশবাসী হতাশ এবং বিস্মিত।
লেখক : কলামিস্ট