একবছরে দাম বেড়েছে ৪০ পণ্যের, কমেছে ১০টির

14

পূর্বদেশ ডেস্ক
আগের সপ্তাহের তুলনায় এই সপ্তাহে পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ডালসহ বেশিরভাগ নিত্যপণ্যের দাম কমেছে। তবে পুরো বছরজুড়ে ভোক্তাদের এসব পণ্য কিনতে হয়েছে বাড়তি দামে। সরকারের বিপণন সংস্থা টিসিবি’র হিসাবে গত একবছরে যে কয়টি পণ্যের দাম কমেছে, তার চেয়ে দাম বৃদ্ধি পাওয়া পণ্যের সংখ্যাই বেশি।
টিসিবির তথ্য বলছে, গত একবছরে ৫০টি পণ্যের মধ্যে ৪০টি পণ্যেরই দাম বেড়েছে। আর কমেছে মাত্র ১০টির। দাম কমার তালিকায় আছে— আটা (প্যাকেট), ময়দা (প্যাকেট), ছোলা, অ্যাংকর ডাল, হলুদ, লবঙ্গ, তেজপাতা, ব্রয়লার মুরগি, দেশি মুরগি ও ফার্মের মুরগির ডিম। এর মধ্যে আটা ও ময়দার দাম কেজিতে কমেছে ৩ থেকে ৪ টাকা। ডিমের দাম কমেছে হালিতে ৩ টাকা। খবর বাংলা ট্রিবিউনের
সরকারি তথ্য বলছে, দাম বাড়ার তালিকায় রয়েছে গরিবের খোলা আটা, খোলা ময়দা, মোটা চালসহ বাকি সব পণ্য।
টিসিবি’র হিসাবে, গত একবছরে আলুর দাম বেড়েছে ৫৩ শতাংশ। গত বছরের ৫ জুন যে আলুর দাম ছিল ১৮ থেকে ২০ টাকা কেজি। গতকাল ৫ জুন শুক্রবার সেই আলু বিক্রি হয় ২৮ থেকে ৩০ টাকা কেজি। অর্থাৎ একবছরের ব্যবধানে প্রতিকেজি আলুর দাম বেড়েছে ১০ টাকা।
টিসিবি’র দেওয়া তথ্য অনুযায়ী একবছরের ব্যবধানে মশুর ডালের (মাঝারি) দাম কেজিতে বেড়েছে ৫০ টাকা। অর্থাৎ গত বছরের এই দিনে যে ডাল ৬০ টাকায় পাওয়া যেতো। গতকাল শুক্রবার সেই ডাল ক্রেতাদের কিনতে হয়েছে ১১০ টাকায়। একইভাবে ৫৫ টাকা কেজি দামের মশুর ডাল (বড় দানা) বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৭৫ টাকা। আর ১০০ টাকা কেজি দামের মশুর ডাল (ছোট দানা) এখন বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা করে। একবছরে মুগ ডালের দাম কেজিতে বেড়েছে ১০ টাকা। অর্থাৎ ৮০ টাকা কেজির মুগ ডাল এখন বিক্রি হচ্ছে ৯০ টাকা দরে। গত একবছরের ব্যবধানে দেশি পেঁয়াজের দাম বেড়েছে কেজিতে ১৫ টাকা। আর আমদানি করা পেঁয়াজের দাম কেজিতে বেড়েছে ৫ থেকে ১০ টাকা। মসলা জাতীয় এই পণ্যটি ক্রেতাদের নাগালের বাইরে ছিল দীর্ঘ ছয় মাসেরও বেশি সময়। মাত্র ২০ টাকার পেঁয়াজ ২৫০ টাকা দিয়েও কিনতে হয়েছে। ৭০ টাকা কেজি দেশি রসুন এখন কিনতে হচ্ছে ১২০ টাকা দিয়ে।
শুকনো মরিচের দাম কেজিতে বেড়েছে ১০০ থেকে ১৩০ টাকা পর্যন্ত। গত বছর দেশি শুকনো মরিচের দাম ছিল ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি। এখন সেই শুকনো মরিচ বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা করে। আর আমদানি করা প্রতিকেজি শুকনো মরিচের দাম বেড়েছে ১৩০ টাকা পর্যন্ত।
এদিকে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) এর তথ্য বলছে, ২০১৯ সালে ঢাকায় জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ এবং পণ্য ও সেবার দাম বেড়েছে ৬ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। বৃদ্ধির এই হার আগের বছরের চেয়ে বেশি। ক্যাব বলছে, ২০১৮ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির হার ছিল ৬ শতাংশ এবং পণ্য ও সেবার মূল্য বৃদ্ধি পায় ৫ দশমিক ১৯ শতাংশ।
এ প্রসঙ্গে ক্যাবের সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, এখন মানুষের হাতে টাকা নেই। কাজেই পণ্যের দাম যাতে নিয়ন্ত্রণে থাকে, সে ব্যাপারে সরকারের সজাগ দৃষ্টি থাকা জরুরি। শুধু পণ্যের অভাবেই একটি দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় না, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না থাকলেও তেমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এদিকে টিসিবি’র হিসাবে দেখা যাচ্ছে, একবছরের ব্যবধানে আমদানি করা আদার দাম বেড়েছে কেজিতে ২০ টাকা। একবছরের ব্যবধানে জিরার দাম বেড়েছে কেজিতে ১০০ টাকা। একইভাবে দারুচিনির দামও বেড়েছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। অর্থাৎ প্রতিকেজি ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা দামের দারুচিনি এখন কিনতে হচ্ছে ৪০০ টাকা ৫০০ টাকায়। এলাচের দাম প্রতি কেজিতে বেড়েছে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা। গত বছরের ১২০ টাকা কেজি দামের ধনে এখন বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকা কেজি দরে।
টিসিবির তথ্য বলছে, গত বছরের এই সময়ে ৫৪ টাকায় এককেজি চিনি পাওয়া যেতো। এখন প্রতিকেজি চিনি কিনতে খরচ করতে হচ্ছে ৬৫ টাকা।
একবছরে সব ধরনের গুঁড়ো দুধে দামও বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। গত বছরের ৪ জুন ফ্রেস ও মার্কস দুধ পাওয়া যেতো প্রতিকেজি ৪৩০ টাকায়। এখন সেই দুধ ক্রেতাদের কিনতে হচ্ছে ৫৪৫ থেকে ৫৭০ টাকা দিয়ে। গত বছরে ডানো এবং ডিপ্লোমা পাওয়া যেতো প্রতিকেজি ৫৭০ টাকায়। বর্তমানে একই দুধ কিনতে হচ্ছে ৬০০ থেকে ৬২০ টাকায়।
টিসিবি’র হিসাবে, একবছরে রুই মাছের দাম বেড়েছে কেজিতে ৫০ টাকা। ইলিশের দাম কেজিতে বেড়েছে ৪০০ টাকা। গরুর মাংসের দাম বেড়েছে কেজিতে ৩০ টাকা। অর্থাৎ গত বছর গরুর মাংসের দাম ছিল ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি। এখন বিক্রি ৫৮০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা। এ সময়ে খাসির মাংসের দাম বেড়েছে কেজিতে ১০০ টাকা। গত বছর খাসির মাংস প্রতিকেজি ৮০০ টাকায় পাওয়া গেলেও এবার কিনতে হচ্ছে ৯০০ টাকা দিয়ে।
এ বিষয়ে টিসিবি’র মুখপাত্র হুমায়ুন কবির বলেন, ‘জিনিসপত্রের দাম যাতে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে, সে জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ কাজ করছে। বাজার নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে টিসিবি’র পরিচালনায় নিয়মিত ডিলারের মাধ্যমে স্বল্প মূল্যে পেঁয়াজ, মশুরের ডাল, সয়াবিন, চিনি বিক্রি করা হয়।’
টিসিবি’র হিসাবে গত বছর যে মোটা চালের দাম ছিল ৩৪ টাকা কেজি, এখন সেই চাল বিক্রি হচ্ছে ৩৬ থেকে ৪৫ টাকায়। আর একবছরের ব্যবধানে ৪৪ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরের মাঝারি মানের চাল এখন ৪৫ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত বছর সরু চালের (মিনিকেট ও নাজির) দাম ছিল প্রতিকেজি ৫২ টাকা, এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৫৪ থেকে ৬৫ টাকা করে।
টিসিবি জানায়, করোনা শুরুর সময় মার্চ মাসে চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। তবে রোজার মাসে সব ধরনের চালের দাম কিছুটা কমে আসলেও তা গত বছরের তুলনায় কেজিতে ৭ থেকে ৯ টাকা বেশি।
টিসিবি’র দেওয়া তথ্য মতে, গত বছর খোলা আটার দাম ছিল ২৭ টাকা কেজি, বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ২৮ থেকে ৩২ টাকা। একইভাবে এক বছরের ব্যবধানে খোলা ময়দার দাম বেড়েছে কেজিতে ২ থেকে ৪ টাকা।
ভোজ্য তেলের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, একবছর আগে খোলা সয়াবিন তেল ৭৭ টাকা লিটার দরে বিক্রি হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ৮৮ থেকে ৯০ টাকায়। ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন গত বছর ৪৫০ টাকায় পাওয়া গেলেও এখন সেই সয়াবিন কিনতে হচ্ছে ৪৬৫ থেকে ৫২০ টাকা দিয়ে। আর একবছরের ব্যবধানে ৯৫ টাকা দামের এক লিটার সয়াবিন এখন বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকা করে। এছাড়া, ৬০ টাকা দামের প্রতি লিটার খোলা পাম তেল এখন ৬৫ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। গত বছরে ৬৬ টাকায় এক লিটার পাম (সুপার) পাওয়া গেলেও এখন এই সুপার পাম কিনতে হচ্ছে ৭৫ থেকে ৮০ টাকা দিয়ে।