একটি সেমিনার ও আল্লামা নুরীর যৌতুক বিরোধী আন্দোলন- ২

মুহম্মদ মাসুম চৌধুরী

12

আল্লামা আবুল কাশেম নুরী যৌতুক নামক এমন একটি সামাজিক রোগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন, যে রোগে আজ গ্রামের অশিক্ষিত মানুষ হতে মন্ত্রী সচিব ধনাঢ্যরা পর্যন্ত আক্রান্ত। এই রোগের চিকিৎসা কঠিন। তিনি কঠিন কাজটিকে ভালোবেসে গ্রহণ করেছেন। কবির ভাষায় বলতে হয়; সত্য যে কঠিন/কঠিনরে ভালোবাসিলাম/সে মোরে করে না বঞ্চনা।
সমাজবিজ্ঞান বলে, পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানটি নষ্ট হয়ে গেছে সমাজ নষ্ট হয়ে যায়, পরিবার মানব সভ্যতার সূতিকাগার। পরিবার সমাজের উৎস। পরিবার ধ্বংস হওয়া মানে মানব সভ্যতার ভিত ধ্বংস হওয়া। যৌতুকের কারণে শত শত পরিবার ভেঙে খান খান হয়ে গেছে, এসব পরিবারের সন্তান হয়ে পড়েছে অসহায়। স্বামী-স্ত্রীর জীবন হয়েছে বিপন্ন। যৌতুক একটি সামাজিক ব্যাধি, এই রোগ হতে কেউ মুক্ত থাকতে পারে না। যে পিতা সন্তানের জন্য যৌতুক গ্রহণ করে সে পিতা তার কন্যার বিয়েতে যৌতুক প্রদান করতে হবে। এই সামাজিক ব্যাধি সামাজিক আন্দোলনের মধ্যদিয়ে প্রতিরোধ করতে আল্লামা নুরী হুজুরের যৌতুক বিরোধী নানা কর্মসূচি বাংলাদেশে সাড়া জাগিয়েছে।
ইসলাম একটি সহজ ধর্ম। দেনমোহর ও ওয়ালিমা ছাড়া বিয়েতে আর কোন খরচ নেই। বিনা পুঁজির ব্যবসার নাম যৌতুক। বিনা পুঁজির ব্যবসা যে করে সে জগতের সেরা ভিক্ষুক। এ ধরনের লেনদেন ইসলাম অনুমোদন করে না। ইসলাম পাঁচটি মৌলিক খাত হতে সম্পদ অর্জন এবং মালিকানা স্বীকার করে। ১) শ্রমের বিনিময়ে অর্জিত সম্পদ ২) বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ। ৩) উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদ। ৪) রাষ্ট্রকর্তৃক প্রদেয় অর্থ ও সম্পদ। ৫) দান-সদকা, যাকাত ও পুরস্কারের সম্পদ। এই পাঁচটি মৌলিক খাতের মধ্যে যৌতুক নেই।
মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হায়াতে জিন্দেগীতে নিজের চার কন্যাকে বিয়ে দিয়েছেন এবং বহু সাহাবীর তাঁর উপস্থিতিতে বিয়ে হয়েছে খোলাফায়ে রাশেদীন, সাহাবী, চার মাজহাবের ইমামগণ বহু বিয়ে সম্পাদিত করেছেন। তাঁরা নিজেরাও বিয়ে করেছেন কিন্তু এসব বিয়েতে যৌতুক প্রথার অস্তিত্ব খোঁজে পাওয়া যায় না।
মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি হাদিসে বর্ণিত আছে, ‘হযরত ফাতিমা (রা.)‘র বিয়েতে তিনি একটি ইয়ামনী চাদর, একটি কম্বল, একটি পেয়ালা, দুইটি আটা পিষার চাক্কি, একটি পানি রাখার থালা এবং একটি চৌকি স্বেচ্ছায় প্রদান করেন’। এসব কিন্তু যৌতুক ছিল না। তা ছিল হযরত মওলা আলী (রা.)’র টাকা দ্বারা ক্রয়কৃত আসবাবপত্র। নবীজীর চাচা আবু তালেব (রা.) ছিল মওলা আলী (রা.)’র বাবা। আবু তালেব ইন্তেকালের পূর্বে ছিলেন প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভিভাবক আর ইন্তেকালের পর নবীজী ছিলেন মওলা আলী (রা.)’র অভিভাবক। হযরত ফাতিমা (রা.) ও মওলা আলী (রা.) দুইজনই ছিলেন নবী পরিবারের সদস্য। দুই জনের অভিভাবক হিসেবে তাঁদের নতুন সংসারের কথা চিন্তা করে এসব আসবাবপত্র ব্যবস্থা করে দেন। তা যৌতুক ছিল না। এসব যদি যৌতুক হতো তাহলে অন্যান্য বিয়েতেও তিনি এ ধরনের আসবাবপত্র প্রদান করতেন। মাওলা আলী আহমদ রচিত গ্রন্থ ‘শাদী আওর শাবীয়াত’- এ উল্লেখ আছে, মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ফাতিমা (রা.)’র বিয়েতে যেসব উপহার প্রদান করেছিলেন, তা মাওলা আলী (রা.) অর্থ দিয়ে ক্রয় করা আসবাবপত্র ছিল। এ প্রসঙ্গে তিনি দলিল হিসেবে একটি হাদিস উল্লেখ করেন। হাদিসে বর্ণিত আছে, বিয়ের পূর্বে হযরত আলী (রা.)‘র নিকট মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে চাইলেন, তোমার নিকট কিছু আছে কী ? তিনি বললেন, আমার কাছে একটি ঘোড়া এবং একটি লৌহবর্ম আছে, নবীজী জানালেন, ঘোড়া প্রয়োজনীয় জিনিস (এটি তোমার কাছে রেখে দাও) লৌহবর্মটি বিক্রি করে মূল্য আমার নিকট নিয়ে এসো। হযরত আলী (রা.) তা হযরত উসমান (রা.)‘র নিকট চারশত টাকা বিক্রি করে প্রিয়নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট অর্পণ করেন। তিনি হযরত উম্মে সালমা (রা.)’কে কিছু দিরহাম দিলেন সাজানী ও আতর গোলাব ক্রয় করার জন্য। বাকি টাকা হযরত বেলাল (রা.)’কে দিলেন গৃহের আসবাবপত্র ক্রয় করার জন্য। (বারকারী : মাওয়াহিব)
এসব সামান দ্বারা যৌতুকের বৈধতা প্রমাণিত হয় না। যৌতুক দ্বারা এক মুসলমানের সম্পদ আরেক মুসলমান অন্যায়ভাবে গ্রাস করে। ইসলামি শরীয়তের দৃষ্টি এ ধরনের প্রথা সম্পূর্ণ হারাম। মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা নিজেরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।’ (সূরা বাকারা : ১৮৮) বিখ্যাত সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত আছে, প্রিয়নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘হে যুবকগণ! তোমরা যাদের সামর্থ্য আছে তারা বিয়ে করো আর যাদের সামর্থ্য নেই তারা রোজা রাখো’। মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অর্থ সামর্থ্য না থাকলে যৌতুক নিয়ে বিয়ে করতে বলেননি, রোজা রাখতে বলেছেন। যৌতুক জুলুম ও শোষণের হাতিয়ার। মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে সমস্ত জুলুম হারাম করেছেন। পবিত্র কোরআনে তিনি ঘোষণা করেছেন, তোমরা জুলুম করবে না এবং তোমাদের উপর জুলুম করা হবে না।’ (সূরা বাকারা : ২৭৯)
‘যৌতুক’ শব্দটির প্রতিশব্দ আরবি, উর্দু ও ফারসি ভাষায় নেই। এতে আত্মস্থ হয় যে, যৌতুকের উৎস আরব বা ভারত উপমহাদেশের বাইরের কোন মুসলিম দেশে নয়। অর্থাৎ যৌতুকের উৎস ইসলাম ধর্মের নয়। এর উৎস হিন্দু সংস্কৃতির। আমি পূর্বে উল্লেখ করেছি, হিন্দু ধর্মের বিধান মতে কন্যা সন্তান বাবার সম্পত্তির অংশ পায় না বলেই যৌতুক প্রদান করে থাকে। ইসলামের বিধান হলো মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করা, অথচ আমরা তাঁর উত্তম আদর্শ অনুসরণ না করে বিপরীত সংস্কৃতি অনুসরণ করে চলছি। ইসলামি সংস্কৃতিকে সুস্থ ধারণা ফিরিয়ে আনার যে সকলেই সম্পৃক্ত হওয়া ঈমানী দায়িত্ব। (চলবে)

লেখক : কলাম লেখক ও রাজনীতিক