একটি সমিতিই বদলে দিল দুই হাজার নারীর জীবন

ওয়াসিম আহমেদ

21

নগরীর বাকলিয়া এলাকার নাজমা বেগম। দুই দশক আগে সাদাসিধে ঘরকোণো গৃহিণী ছিলেন। কখনও ভাবেননি তাকে দিয়ে জীবন বদলানোর গল্প রচিত হবে। তবে কল্পনা না করলেও অদম্য সাহস আর পরিশ্রমের দরুণ তা-ই হয়েছে। তিনি আজ সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদের জেগে উঠার অনুপ্রেরণা। সময়টা ২০০৬ সালের শেষের দিকে। স্বামীর একার আয়ের উপর ভর করে পাঁচজনের পরিবারে দু’মুঠো ভাতের ব্যবস্থা করা দুর্বিষহ ছিল। বর্তমানে সেই নাজমা বেগমের কারখানায় কাজ করে সংসার চালান আরও ২২ জন নারী। নাজমা বেগম বদলে গিয়ে বদলে দিয়েছেন আরও অনেক নারীর জীবন। তারা সবাই করেছেন আত্মকর্মসংস্থান।
শুধু একজন ঘরকোণো গৃহিনী নাজমা বেগমের জীবনের গল্প বদলায়নি। বদলেছে আরও ২ হাজার নারীর জীবনের গল্প। অস্বচ্ছল-অসহায়ত্বের জীবনের গল্প মুছে দিয়ে তারা গড়েছেন স্বচ্ছল-সফলতার গল্প। এসবের পেছনে প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তা দিয়ে কারিগরের ভূমিকা পালন করে আসছে ‘বাকলিয়া মহিলা বহুমুখি সমবায় সমিতি লিমিটেড।’ এমন অসামান্য অবদানের জন্য শ্রেষ্ঠ মহিলা সমবায় সমিতি হিসেবে জাতীয় সমবায় পুরস্কার অর্জন করেছে সমিতিটি। গত ২ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে সমিতিরি হয়ে পুরস্কারটি গ্রহণ করেছেন সমিতির ব্যবস্থাপক রিনা বেগম। তিনি জানান, এই পর্যন্ত ২ হাজার ১৫৩ জন নারী ঋণ ও প্রশিক্ষণ নিয়ে স্ব-কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন।
বদলে যাওয়া জীবনের কথা জানাতে গিয়ে নাজমা বেগম পূর্বদেশকে বলেন, আমার শুরু মাত্র ৫ হাজার টাকা ঋণ দিয়ে। তখন স্বামী আর আমি মিলে জালি ব্যাগের ব্যবসা শুরু করি। সময়ের সাথে ব্যবসা বড় হতে থাকে। আবারও ১০ হাজার টাকা ঋণ নিই। পরে এভাবে করতে করতে সর্বোচ্চ দেড় লাখ পর্যন্ত ঋণ গ্রহণ করি সমিতি থেকে। শুধু ঋণ সহায়তা নয়, কিভাবে লাভবান হতে হবে, তারই সবধরনের সহায়তা আমি পেয়েছি। আজকে আমার কারখানায় ২২ জন নারী ও ২ জন পুরুষ কাজ করেন। আমি কখনও ভাবিনি এমনটা আমাকে দিয়ে সম্ভব হবে। সেদিন বাকলিয়া মহিলা সমিতি মনোবল ও ঋণ দিয়ে সহায়তা করেছিল বলে হয়ত এতটুকু আসা সম্ভব হয়েছে।
সময়টা তখন ২০০০ সালের শেষের দিকে। তখন বাকলিয়া এলাকার অশিক্ষিত, ঘরকোণো, অসচেতন নারীদের নিয়ে কাজ শুরু করে ওয়ার্ল্ড ভিশন এনজিও। তারা ৫৫টি ছোট ছোট উন্নয়ন দল গঠন করে সঞ্চয় করার কৌশল ও প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। সেখান থেকে ২০০৭ সালের শুরুতে ২০ জনের ছোট ছোট উন্নয়ন দল নিয়ে শুরু হয় বাকলিয়া মহিলা বহুমুখি সমবায় সমিতি লি.। সেসব উন্নয়ন দল থেকে ৬ জনের একটি পরিচালনা কমিটি করে সমবায় থেকে নিবন্ধন লাভ করে ওই বছরের ৭ মে। মাত্র একলাখ টাকা সঞ্চয় নিয়ে ২০ জনের শুরু করা সেই সমিতির সদস্য সংখ্যা এখন ১ হাজার ৮৭৬ জন। আর মূলধনের পরিমাণ প্রায় কোটি টাকা।
সমিতির শুরুর থেকে সদস্যদের নেতৃত্ব বিষয়ক টিম বিল্ডিং, জেন্ডার উন্নয়ন ও সোস্যাল এনালাইসিস প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজেদের আচার আচরণ, সমাজে তাদের অবস্থানসহ নিয়ে আত্মসচেতন করা হয়। এরই পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা, জন্ম নিবন্ধন নিশ্চিতকরণ, নিউট্রেশন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সচেতন করে গড়ে তোলা হয়। বয়স্ক শিক্ষা ও প্রি-স্কুল পরিচালনা করে তাদের এবং তাদের পোষ্যদের শিক্ষামুখী করা হয়। প্রতিটি সদস্যের আর্থিক উন্নয়নের লক্ষ্যে তাদের এবং তাদের পোষ্যদের কম্পিউটার, বিউটি পার্লার, টেইলারিং, বল্ক বাটিক, ড্রাইভিং, ফাস্ট ফুড প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন ট্রেড প্রশিক্ষণের দেওয়া হয়। এই সমিতির সদস্যদের বর্তমানে এলাকা ভিত্তিক স্বাস্থ্য সচেতনতা, দুর্যোগ মোবাবেলার জন্য সকলকে প্রস্তুত থাকার বিষয়ে সচেতন করা হয়। বর্তমানে জুয়েলারি পণ্য তৈরি প্রি-স্কুল স্বাস্থ্য বিষয়ক এবং দুর্যোগ বিষয়ক প্রশিক্ষণ চলমান রয়েছে। এই ধরনের ৪৯৭০ জন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ৫৪৮ জন সদস্যের ও সদস্যের পোষ্যদের বেকারত্ব দূরিকরণ করতে স্ব-কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সমিতিতে বর্তমানে ০৬ জন নিয়মিত বেতনধারী কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে এবং ৩ জন প্রি-স্কুল শিক্ষক, ১ জন প্রশিক্ষক সহ মোট ১০ জনের সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
সমিতির ম্যানেজার রিনা বেগম পূর্বদেশকে বলেন, আমরা প্রতিটি প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য কর্মকান্ডের উপর নিয়মিত জরিপ কার্য পরিচালনা করি। তারপর আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করি।এতে দেখা যায় এই পর্যন্ত সমিতির সদস্যদের সর্বমোট ২১ কোটি ৬১ লাখ ৭৪ হাজার ২শ টাকা ঋণ প্রদান করেছি। এসব ঋণ গ্রহীতা সদস্যদের মধ্যে ২ হাজার ১৫৩ জন সদস্য ও পোষ্যদের বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসা ও অন্যান্য কর্মকান্ডের মাধ্যমে বেকারত্ব দ‚রীকরণ ও কর্মসংস্থানের সযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে সমিতির আর্থিক উন্নয়নের পাশাপাশি সদস্যদের আত্ম-সামাজিক উন্নয়নে বলিষ্ঠ ভ‚মিকা রেখে আসছে। সমিতির ভবিষ্যৎ স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘ মেয়াদী বিভিন্ন পরিকল্পনা ও প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সমিতির জন্য স্থায়ী সম্পদ, সদস্যদের জন্য বাসস্থান, সদস্যদের উৎপাদিত পণ্যের বিপণন কেন্দ্র, ডে-কেয়ার সেন্টার। আধুনিক যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ প্রশিক্ষণ ল্যাব এবং প্রশিক্ষিত সদস্যদের নিয়ে ক্ষুদ্র অথবা মাঝারী শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।
তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে স্থানীয়ভাবে অত্র সমিতি চট্টগ্রাম জেলার শ্রেষ্ঠ সমিতি হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছে। এখন শ্রেষ্ঠ মহিলা সমবায় হিসেবে জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেছে। সেটা আমাদের অনেক আনন্দের। এমন স্বীকৃতি আমাদের অনকে দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।