ধর্মঘটের নামে মবিল সন্ত্রাস

এই জিম্মিদশার শেষ কোথায়?

চৌধুরী মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম

10

পরিবহন ধর্মঘট ডেকে মানুষকে দুর্ভোগে ফেলে দাবি আদায় পরিবহন সংশ্লিষ্টদের পুরোনো সংস্কৃতি। সাধারণ মানুষদের দুর্ভোগে ফেলে দাবি আদায় কোন সুন্দরকাজ নয়। শ্রমিকেরা যদি হয়রানির শিকার হয় তাহলে তারা তা বিভিন্নভাবে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সমাধান করতে পারে। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে দাবি আদায় কখনো কাম্য নয়। এবারের মুলদাবি সদ্য পাশ হওয়া সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ এর ৩০২ ধারা ও চালকের যোগ্যতা পঞ্চম শ্রেণি করা সহ আট দফা দাবিতে ৪৮ ঘণ্টার পরিবহন ধর্মঘট ডাকে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে চিত্র নায়ক ইলিয়াছ কাঞ্চনের পঁিচশ বছরের আন্দোলন ও রমিজউদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় বিশ্বের বিরল শিশু কিশোর আন্দোলনের কারণে সড়কে নেয়া অনেকগুলো পদক্ষের মধ্যে ৬ অক্টোবর সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ সংসদে পাশ করা হয়। আন্দোলনের পর থেকে মূলত ট্রাফিক আইন অমান্য করা ও লাইসেন্স বিহীন চালক ও ফিটনেস বিহীন গাড়ি চলাচলের সুবিধা অনেকাংশে কমে যায়। বি আর টি এর মেজিষ্ট্রেট নিয়মিত অভিযানে অনেক চালককে দন্ড, জরিমানা করেছে । সম্প্রতি চবি ১ নং গেইটে বি আর টি এর অভিযান চলাকালে একটি গাড়িকে পুলিশ সদস্য থামার ইশারা দিলে বাস চালক দিদারুল আলম গাড়ি না থামিয়ে আদেশ অমান্য করে বিপজ্জনকভাবে চালিয়ে পালিয়ে যায় । পরে চালককে আটক করে ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা ও ৩ মাসের কারাদন্ড দেন নির্বাহী মেজিষ্ট্রট মো. জিয়াউল হক মীর। এই দন্ডের প্রতিবাদে পরিবহন শ্রমিকেরা রাঙামাটি-খাখড়াছড়ি সড়কে হঠাৎ করে ধর্মঘট ডেকে আধাবেলা মানুষকে চরম ভোগান্তিতে ফেলে। এটা ঠিক যে শিশু-কিশোর আন্দোলনের পর সড়কে যে ধরনের পরিবর্তন আসার কথা ছিল পথচারী, যাত্রী, চালক, হেলপার, নেতা সকলের সচেতনতার অভাব ও দুর্নীতি, ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগের অভাবে ততটা আসেনি। বিষয়টি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য চরম দুঃখজনক। যাত্রী হয়রানি, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের জন্য যাত্রীরা প্রতিবাদ করলে চালক, হেলপার মিলে যাত্রীকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল, মারধর, এমনকি বাস থেকে ফেলে রেজাউলের মত ফেলে পিষে হত্যা করতে দ্বিধা করেনা। মন্দের ভাল সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ আইনটিও পরিবহন নেতারা মানতে নারাজ। গত ২৫ অক্টোবর রাজধানীর কেরানীগঞ্জে বাংলাদেশ চীন মৈত্রী প্রথম বুড়িগঙ্গা সেতুর ঢোল নিয়ে শ্রমিকদের পুলিশের সাথে সংঘর্ষে একজন নিহত হয়। বিশৃংখল গণপরিবহনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ দৈনন্দিন চলাচল করছে। প্রতিদিন গড়ে ১১ জন লোক সড়কে মারা যাচ্ছে। সড়কে মৃত্যুর মিছিল কোনভাবে থামছেনা। একটি সভ্য দেশে এভাবে চলতে দেয়া যায়?। আশ্চর্যের বিষয় হল নিরাপদ সড়কের জন্য আন্দোলন করার কারণে শ্রমিকেরা চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনকেও অবাঞ্চিত ঘোষণা করে। তাহলে কি বাংলাদেশে নিরাপদ সড়কের কথা বলা যাবে না? গণপরিবহন কি যেমন খুশি তেমন চলতে থাকবে। কিশোর আন্দোলনে দেখেছিলাম এম্বুলেন্সের জন্য আলাদা লেন সৃষ্টি ও সহ গাড়ির জন্য লেন সৃষ্টি করে শিশু- কিশোরেরা। চালকদের সাথে সুন্দর ব্যবহার করেছে। সম্প্রতি পরিবহণ ধর্মঘটে দেখলাম শ্রমিকদের বর্রবতা, অমানবিক, মূর্খতা, নিষ্ঠুরতা, হিংস্রতার নির্মম চিত্র। রোগীবাহী এ্যাম্বুলেন্স আটকে দেয়া, এ্যাম্বুলেন্সে মবিল মারা। একজন ভদ্র ঘরের কলেজ শিক্ষার্থী মেয়ের গায়ে মবিল মারা, চালকের মুখে মবিল মেখে দেয়া সহ চরম নৈরাজ্য। যাদের মুখে, গায়ে মবিল মেখে দেয়া হয়েছে তাদের কান্না যেন পুরো জাতির লজ্জা। এ লজ্জা রাখি কোথায়? আমরা কি তাহলে বর্বরতায় ফিরে যাচ্ছি? পরিবহন নেতাদের যদি প্রশ্রয় না থাকে তাহলে যারা এম্বুলেন্স আটকে দিচ্ছে, মবিল মারছে, কলেজ শিক্ষার্থী, চালকের মুখে মবিল মাখছে তাকেতো আটক করে কঠোর শাস্তি দেয়ার কথা। এক সময় গ্রামে দেখা যেত কোন ব্যবিচার সহ চুরি করলে মুখে কালি মেখে সারা গ্রামে ঘুরাত। সেই জঘন্য বর্বরতা শ্রমিকেরা সাধারণ মানুষের সাথে করল। মৌলবীবাজারে সাত দিনের যে শিশুটির এম্বুলেন্স শ্রমিকেরা আটকে চালককে মারধর করেছিল সে শিশুটি রাস্তাতেই মারা যায়। ভাবতে আবাক লাগে আমরা কতটা বর্বর! ধর্মঘটের দিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় সারাদেশের ১ লক্ষ ৩৬ হাজার ২৪৭ জন ছাত্র-ছাত্রী অংশ গ্রহণ করে। শ্রমিক নেতারা সেটিও বিবেচনায় নেয়নি। ধর্মঘটে সাধারণ মানুষ সিটি কর্পোরেশনের ময়লাবাহী গাড়িতে নাক চেপে অফিসে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ সবদিকে অসহায় একদিকে চাকরি বাঁচাতে হবে অন্যদিকে শ্রমিকদের নৈরাজ্য বাধ্য হয়েই ময়লার গাড়িতে চড়ে গন্তব্যে পৌঁছা। পরিবহন নেতারা ভাল করেই জানে যে সরকারের শেষ সময়ে দাবি মানা সম্ভব নয়। তারপরেও শক্তি প্রদর্শন ও সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার জন্য এই ধর্মঘট। গণপরিবহন সেক্টরে বিশৃংখলা রোধে টেকসই পদক্ষেপে কোন সরকারই এগিয়ে আসেনি। যার ফলে শ্রমিকেরা বার বার জিম্মিদশার উদ্যত, বর্বর আচরণ করে। শ্রমিক-সাধারণ মানুষ কেউ কারো প্রতিপক্ষ নয়। সবাই আইনের প্রতি যথাযথ সম্মান করবে। পথচারী, যাত্রীরা যেভাবে ট্রাফিক আইন মেনে চলবে তেমনি চালক,হেলপারও আইন মেনে চলবে। সড়কে শৃংখলার জন্য প্রশাসনকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
লেখক : প্রাবন্ধিক