গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

এই গাছের ছাল ওই গাছের বাকল নিয়ে হয়েছে ঐক্য

11

১.নির্বাচনকালে মন্ত্রিসভার আকার কমানো নাও হতে পারে- এমন ইংগিত

২.নতুন জোটকে জানালেন স্বাগত, তবে তাদের সামর্থ্য নিয়ে তুললেন প্রশ্ন

৩.ড. কামালের সঙ্গে আছেন সাজাপ্রাপ্ত আসামির দলসহ কয়েকটি স্বার্থান্বেষী গ্রæপ

৪.ঐক্যফ্রন্টের সংলাপের আহŸান সম্বলিত চিঠি পাওয়ার পর জানাবেন প্রতিক্রিয়া

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা নিয়ে সংলাপের আহবান সম্বলিত চিঠি পাওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানাবেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।
সৌদি সফর করে ফেরা প্রধানমন্ত্রী গতকাল সোমবার গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে একথা জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, “আগে চার দফা ছিল। এখন সাত দফায় পৌঁছেছে। দফাটা আর কতদূর যায়, তারপরে আমি আমার বক্তব্য দেব। এখন তো কেবল সাত দফা, আর কত বাড়ে দেখেন না, হাসতে হাসতে বলেন তিনি।
সংসদ ভেঙে, খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিয়ে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি সম্বলিত সাত দফা দিয়েছে কামাল হোসেন নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, যে জোটে বিএনপিও রয়েছে। খবর বিডিনিউজের গত রবিবার এক বৈঠকের পর ফ্রন্টের নেতা আ স ম রব বলেছেন, তারা ৭ দফা নিয়ে সংলাপে বসতে সরকারকে চিঠি দেবেন।
শেখ হাসিনা বলেন, চিঠিটা এখনও পাইনি। চিঠিটা তৈরিই হয়নি। এটা নিয়ে প্রতিক্রিয়া দিবটা কী বলেন? চিঠি পেলে তখন দেখা যাবে। একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে এই ধরনের নতুন জোটকে স্বাগত জানালেও তাদের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। তিনি বলেন, এই গাছের ছাল ওই গাছের বাকল নিয়ে একটি ঐক্য তৈরি হয়েছে। তারা ভালো কাজ করুক সেটাই চাই।
এক সময়ের নেতা কামাল হোসেনের বিএনপির সঙ্গে যাওয়া নিয়ে যেমন প্রশ্ন তুলেছেন শেখ হাসিনা; তেমনি বিএনপির শীর্ষনেতাদের আদালতে দÐ পাওয়ার কথাও বলেন তিনি। তিনি বলেন, কারা কারা এক হল, সেটাও দেখতে হবে। যারা এখানে ঐক্যবদ্ধ হল, তারা কোন ধরনের, কোন চরিত্রের, বাচনভঙ্গি কেমন?
তিনি বনে, এখানে স্বাধীনতাবিরোধী আছে, জাতির পিতার হত্যাকারীদের মদদদানকারী বা ইনডেমনিটি দিয়েছিল, তাদেরকে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেছিল, এমনকি যারা জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছে, এদেশকে পাঁচ দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন করেছে, এই রকম সব ধরনের লোক এক জায়গায় হয়েছে।
ঐক্যফ্রন্টে সক্রিয় মইনুল হোসেনের আচরণ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, জোটের একজন সদস্য, যে আপনাদের একজন সাংবাদিককে যে ধরনের নোংরা কথা বলতে পারে, তারা সবাই এক।
জরুরি অবস্থার সময় সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত¡াবধায়ক সরকারে মইনুলের থাকা প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, “এরাই তো জরুরি অবস্থা জারি থেকে শুরু করে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা, এরেস্ট করা- সবই করেছে। আবার এর মধ্যে অনেকেই তো ছিল আমাদের দলে। আওয়ামী লীগ থেকে তারা দূরে চলে গেছে, এখন তারা জোট করেছে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে।
কামালের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ড. কামাল হোসেন ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন কাদের সাথে? বাংলাদেশে ১০ ট্রাক অস্ত্র পাচার করার ফলে যে সাজাপ্রাপ্ত আসামি তার নেতৃত্বে হচ্ছে বিএনপি দল। একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি। এতিমের টাকা আত্মসাৎ করার কারণে সাজাপ্রাপ্ত। আবার এতিমের মামলা আত্মসাতের মামলা যিনি করেছিলেন, তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন, তিনিও এই ঐক্যের সঙ্গে আছেন। এরা সব এক হয়েছে। যুদ্ধাপরাধী, যারা সাজাপ্রাপ্ত তারা এর মধ্যে আসছে।
রাজাকার, আল বদর বাহিনী সৃষ্টি করে একাত্তর সালে যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে, তারাও এই গ্রæপে আছে। যারা দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন, জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ যারা সৃষ্টি করেছিল, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে পুড়িয়ে জীবন্ত মানুষ হত্যা করছে.. সেই মানুষ হত্যাকারী, তারা সব এক হয়েছে। এরা যেখানে এক সেখানে রাজনীতিটা কোথায়? আমি তো দেখছি কয়েকটি স্বার্থান্বেষী গ্রুপ এক হয়েছে।
সংসদ ভেঙে দিয়ে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আছে ঐক্যফ্রন্টের সাতদফার মধ্যে; পঞ্চদশ সংশোধনীর ফলে সেটা করার সুযোগ এখন আর নাই।
শেখ হাসিনা বলেন, কামাল হোসেন সাহেবকে এই প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করেন না, এত নীতি কথা বলেন, উনি তো সংবিধানের প্রণেতা। সংবিধানের যিনি প্রণেতা, বাহাত্তরের সংবিধানটা তো তিনি তৈরি করেছিলেন, তাই না? বাহাত্তরের সংবিধানের কোনো কোনো অনুচ্ছেদে তিনি এখন আপত্তি করেন কী কারণে? এটা কি তার গণতান্ত্রিক চিন্তা-ভাবনা, তার গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য?
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের এখানে রাজনৈতিক স্বাধীনতা আছে, কথা বলার স্বাধীনতা আছে, সব কিছু মুক্ত। এমনকি আমাদের বিচার বিভাগ স্বাধীন, সবাই স্বাধীন। আদালত বলেন, সাংবাদিক বলেন সবাই যে স্বাধীনতা ভোগ করছে। রাজনীতির ক্ষেত্রে স্বাধীনতা আছে। রাজনীতির ক্ষেত্রে কেউ যদি ঐক্য করেন, তাদের স্বাধীনতা আছে। স্বাগত জানাই।
নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে নতুন ভাবনা : আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এবার মন্ত্রিসভার আকার কমানো নাও হতে পারে বলে ইংগিত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
তিনি বলেছেন, বর্তমান মন্ত্রিসভায় ‘সব দলের’ প্রতিনিধিই আছেন। আর নির্বাচনকালীন সরকারের আকার ছোট করা হলে উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তার এই ভাবনার কথা তুলে ধরেন।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা বলে আসছিলেন, ২০১৩ সালের মত এবারও ভোটের আগে ‘ছোট আকারের নির্বাচনকালীন’ সরকার গঠন করা হবে। চলতি বছরের শুরু জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নিজেও তেমনই আভাস দিয়েছিলেন।
আমাদের নতুন সময়ের সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খান সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, মন্ত্রীসভা ছোট করে নির্বাচনকালীন সরকার এবার কখন হবে এবং তার ধরন কেমন হবে।
উত্তর দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন করেন, ছোট না করলে কোনো অসুবিধা আছে কি না। নাঈমুল ইসলাম খান তখন বলেন, সংবিধান অনুযায়ী কোনো সমস্যা নেই। প্রধানমন্ত্রী তখন বলেন, যুক্তরাজ্যের মত যেসব দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র আছে, কোথাও নির্বাচনের সময় মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনা হয় না।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে মন্ত্রিসভা কেন পুনর্গঠন করা হয়েছিল, সে বিষয়টি ব্যাখ্যা করে শেখ হাসিনা বলেন, সে সময় বিরোধী দলে থাকা বিএনপি নির্বাচনে আসতে রাজি হচ্ছিল না বলে, তখন তাদের নির্বাচনকালীন সরকারে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
“তারা যে মন্ত্রণালয় চায়, সেই মন্ত্রণালয় দেওয়া হবে বলেছিলাম। তারা যখন আসেনি, তখন বিভিন্ন দলগুলো নিয়ে ছোট মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছিল।”
আর এবারের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা (দশম সংসদ নির্বাচনে) মেজরিটি পাওয়া স্বত্ত্বেও প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো থেকে মন্ত্রিসভা গঠন করেছি। এই মন্ত্রিসভায় জনগণের প্রতিনিধি যারা, তারা আছেন। “যেহেতু সব দলের প্রতিনিধি আছে, জানি না এটাকে ছোট করার দরকার আছে কি-না। কাটছাট করা হবে কি-না।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মন্ত্রিসভা ছোট করা হলে একজনকে কয়েকটা মন্ত্রণালয় চালাতে হবে। সেক্ষেত্রে কোনো কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ দুই তিন মাসের জন্য থমকে যেতে পারে। এ বিষয়গুলোও ভাবতে হবে। তিনি বলেন, “যদি ডিমান্ড করে অপজিশন, তাহলে করব। আর না হলে কিছু করার নাই।”