উৎসব নয়, আমরা বাঁচতে চাই

22

এডভোকেট সালাহ্উদ্দিন আহমদ চৌধুরী লিপু

প্রাণঘাতি করোনা একটি ভয়ংকর অনুজীবের নাম। একটি ছোট্ট জীবাণুর রুদ্ররূপে পরাশক্তি দেশগুলোর মারণাস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র ভয়াল করোনার কাছে বড়ই অসহায় ও নিষ্প্রভ। পৃথিবী আজ নীরব, নিস্তব্ধ, বিপন্ন পৃথিবী। সমগ্র বিশ্ব মৃত্যু উপত্যাকা রূপান্তরিত হয়েছে। প্রতিদিন বিশ্বে লাশের মিছিল দীর্ঘায়িত হচ্ছে। বিশ্বের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও থাবা মেরেছে মরণ ব্যাধিটি। সে ভয়াল থাবায় প্রতিনিয়ত সংক্রমিত হচ্ছে হাজারো আদম সন্তান। আর প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিলে সামিল হচ্ছে তাজা প্রাণ। জানিনা করোনার ছোবলে আর কত প্রাণ সংহার হবে। অধিকাংশ মানুষ সরকারি স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ না করায় দেশে ক্রমাগত করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। দেশ এখন এক মহামারির দিকে ধাবিত হচ্ছে। গতকাল ৮ মে ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে মারা গেছে ৭ জন, আর আক্রান্ত হয়েছে ৭০৯ জন। গত ৭ মে ২৪ ঘন্টায় সারা দেশে মারা গেছে ১৩ জন। যা এ যাবৎকালে সর্বোচ্চ। শুধু চট্টগ্রামে করোনায় ১৯ জন আক্রান্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত করোরায় সর্বমোট মৃত্যুবরণ করেছে ২০৬ জন ও আক্রান্ত হয়েছে ১৩,১৩৪ জন। দেশ এখন মহাসংকটের আবর্তে। দেশের সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী একাই প্রতিনিয়ত লড়ে যাচ্ছেন। করোনা মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী ফোর্বসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় গৃহীত পদক্ষেপের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে মে মাস অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ মাসেই করোনায় আক্রান্ত হতে পারে ৫০ হাজার মানুষ। আর মৃত্যুবরণ করবে ১/২ হাজার মানুষ। তবে সংক্রমণ পরিস্থিতি আরও মারাত্মক হলে আক্রান্তের সংখ্যা লক্ষাধিক হতে পারে। যখন করোনার প্রাদুর্ভাব কম ছিল তখন লকডাউন কঠোর ছিল, কিন্তু এখন প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পেতে থাকলে লকডাউন ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে যাচ্ছে। ইতিপূর্বে পোশাক কারখানা, মিল কারখানা, খুলে দেয়ায় দেশের পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। পোশাক কারখানা খুলে দেয়ার পর প্রতিদিন প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের নতুন রেকর্ড হচ্ছে। দিন দিন আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। তারপরও গত ৪ মে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আগামি ১০ মে থেকে দেশের সকল শপিংমল ও দোকানপাঠ সীমিত আকারে ও শর্ত সাপেক্ষে সকাল ১০টা হতে বিকাল ৪টা পর্যন্ত খুলে দেয়ার ঘোষণা প্রদান করেন। তাৎক্ষণিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন মহল এ সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতি বলে অভিহিত করেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শপিংমলগুলো করোনা সংক্রমণের বড়ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। এই ঈদ শিপিং দেশে মহাবিপদ ডেকে আনতে পারে। অনেকের প্রশ্ন দেশের এই চরম মুহ‚র্তে শপিংমল ও দোকানপাঠ, পোশাক কারখানা খুলে দেয়া কতটুকু যুক্তিস্গংত। এখন সর্বমহলে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা শুরু হয়েছে। সরকার প্রতিটি শপিংমলের প্রবেশের ক্ষেত্রে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার, বাসস্থানের ২ কিঃমিঃ মধ্যে শপিং করা, মলে প্রবেশের সময় ক্রেতাকে পরিচয়পত্র প্রদর্শন করা সহ স্বাস্থ্যবিধি মানার আদেশ প্রদান করেছে সরকার। ঈদের বাজারে ভিড় হওয়া স্বাভাবিক। যখন শপিংমল খুলবে তখন ঈদের বাজারে ক্রেতাগণ শপিং মলে হুমড়ি খেয়ে পড়বে, তখন এত লোকের সমাগমে স্যানিটাইজার ব্যবহার বা শারীরিক দূরত্ব রক্ষা করা বা এত ক্রেতাদের পরিচয়পত্র প্রদর্শন করা আদৌ কি সম্ভব। শপিংমলের পণ্যগুলো সব ক্রেতারা স্পর্শ করবে, সেগুলো জীবাণুমুক্ত করা সম্ভব নয় বিধায় মানুষ সংক্রমিত হবে। একজন কেরোনাা আক্রান্ত ক্রেতার হাঁচিকাশির মাধ্যমে শপিংমলের হাজারো ক্রেতা বা বিক্রেতা আক্রান্ত হতে পারে। তাছাড়া চট্টগ্রামের রেয়াজুদ্দীন বাজার, তাকাকুমন্ডি লেইন, জহুর হকার্স মার্কেট, টেরিবাজারের মার্কেটের গলিগুলো অত্যন্ত সরু। এখানে কোন অবস্থায় স্বাস্থ্যবিধি মানা সম্ভব হবেনা। তাছাড়া ব্যবসায়ী বা কর্মচারীরা কতটুকু নিরাপদ। কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে তাঁরাও কি পরিত্রাণ পাবে। চট্টগ্রামের অধিকাংশ ব্যবসায়ী ও দোকানের কর্মচারী সাতকানিয়া, লোহাগড়ার। চট্টগ্রামে সবচেয়ে করোনার হটস্পট সাতকানিয়া ও লোহাগড়া। সেখানে অনেক লোক আক্রান্ত হয়েছে ও মৃত্যুবরণও করেছে। কর্মচারিরা এখন গ্রামে অবস্থান করছেন। স্বাভাবিকভাবে তারা বাড়ি থেকে শহরে শপিংমল বা দোকানে ব্যবসা বা চাকরির সুবাধে এসে করোনা ভাইরাস ছড়াবে। তাছাড়া মার্কেট খোলার পর ঐ মার্কেটের কোন দোকানের মালিক বা কর্মচারি করোনায় আক্রান্ত হলে, সম্পূর্ণ মার্কেট অবশ্যই লকডাউন করতে হবে। তখন ব্যবসায়ীদের চরমভাবে বিপাকে পড়বে। জানা গেছে, ব্যবসায়ী মহলে শপিংমল খোলা না খোলা নিয়ে দ্বিধা দ্ব›েদ্ব পড়ে গেছে। অধিকাংশ মার্কেটের ৮০ শতাংশ ব্যবসায়ী না খোলাার পক্ষে। সীমিত আকারে মার্কেট খুললে ক্রেতা পাওয়া যাবে কিনা তারা সন্দিহান। তাই তাদের মধ্যে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। অপরদিকে, দেশে করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে সরকার গত ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে, ছয় দফায় এই ছুটি আগামি ১৬ মে পর্যন্ত বর্ধিত করেছে। তা কতদিনে শেষ হবে তা অনিশ্চিত। এখন মানুষ পরিবারিক গÐিতে বন্দি ও কর্মহীন। মানুষের জীবন যাত্রার গতি থমকে গেছে। দেশের এই ক্রান্তিকালে নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্তরা দুঃসহ দৈনন্দিন জীবন অতিক্রান্ত করছে। মানুষের এখন কোন উপার্জন নেই। সাধারণ মানুষের জীবন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। হতদরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। উপাজর্নহীন মানুষ পরিবারের জন্য ঈদের কেনাকেটা কিভাবে করবে। এ পরিস্থিতিতে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের পরিবারের ঈদের আবদার রক্ষা করা খুবই কঠিন হবে। এইদিকে বাজারের দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে মানুষের জীবন আরো নাভিশ্ব^াস হয়ে উঠেছে। তাই হতদরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের জন্য ভাববার বিষয় এসে গেছে।
পত্রিকা সূত্রে জানা যায়, গত ০৫ মে করোনা সংক্রান্ত বৈঠকে স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, যদি শপিংমল ও দোকানপাঠ খুলে দেয় হয় তবে দেশের পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেবে। করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় সরকার গঠিত জাতীয় কারিগরি কমিটির আহবায়ক অধ্যাপক ডা. মোঃ শহীদুল্লাহ বলেছেন, যত বেশি জীবনযাত্রা শিথিল করা হবে ততই সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়বে। তার মধ্যে আবার ঈদ উপলক্ষে শপিংমল খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি করেছে। ১০ তারিখ শপিংমল খোলার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে পূর্বে থেকে তিনি জানেন না। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুলাহ বলেছেন, শপিংমল খুলে দেয়া, আসলে ভুল সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঈদের শপিং করা জরুরি কোনো কাজ নয়। আরও কিছুদিন সরকারকে কঠোর হওয়া প্রয়োজন ছিল। প্রয়োজনে কারফিউ দিয়ে হলেও মানুষকে ঘর থেকে আবদ্ধ রাখতে হবে। আইডিসিআর এর উপদেষ্ঠা ডাঃ মোশতাক হেসেন বলেছেন, এরকম ঢালাওভাবে দোকানপাঠ খুলে দেয়ায় সংক্রমণ আরো তীব্রতর হবে। ঈদের কেনাকেটার জন্য মার্কেট খুলে দেয়া মানেই জনসমাগমে উৎসাহিত করা। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে সবকিছু চালু করলে সংক্রমণ আরো ঘণীভূত হবে। এ অবস্থায় লকডাউন শিথিল করার প্রশ্ন আসে না, কিন্তু আমরা উল্টো পথে হাঁটছি। দেশে বড় ধরনের বিপর্যয় হলে তা সামাল দেয়া কঠিন হবে।
উৎসবের মাধ্যমে ঈদ পালন করা ফরজ নয়, শুধু ঈদের নামাজ পড়া ওয়াজিব, অপরদিকে জীবন বাঁচা ফরজ। জীবন আগে জীবিকা পরে। ঈদে ব্যবসায়ীদের ব্যবসা করতে না পারলে যেমন ক্ষতি হবে, তেমনি ব্যবসা করতে গিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে তা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হবে। মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বিবেচনা করে ইতিমধ্যে দেশের বৃহত্তম শপিংমল বসুন্ধরা সিটি, যমুনা ফিউচার পার্ক, ঢাকার নিউমার্কেট, বায়তুল মোকাররম মার্কেট, চট্টগ্রামের খুলশী কনকর্ড টাউন, পুলিশ প্লাজা এবং কুমিল্লা, ব্রাক্ষণবাড়িয়ার ব্যবসায়ী সমিতি স্বেচ্ছায় মার্কেট বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। তাই তাদেরকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। মৃত্যুর দুয়ারে বাংলাদেশ। দেশের এই ক্রান্তিকালে সাধারণ জনগণ উৎসব চায় না, তাঁরা বাঁচতে চাই। শপিংমল ও দোকানপাঠ খোলার সিদ্ধান্তে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এমন স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত সরকারের সকল সফলতা ও অর্জনম্লান হয়ে যাবে। যতদিন দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত লকডাউন আরো জোরদার করা এবং শপিংমল, দোকানপাঠ, পোশাক কারখানা খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার জন্য সরকারের কাছে সনির্বন্ধ আবেদন জানাই।
লেখক: কলামিস্ট, রাজনীতিক