উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা প্রদান করে বহু ভাষায় সাক্ষরতা

লিটন দাশগুপ্ত

7

গত ৮ সেপ্টেম্বর অর্থাৎ গত পরশু রবিবার পালিত হল আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। বিভিন্ন দেশের সাথে সমন্বয় রেখে বাংলাদেশেও পালিত হল এই দিবস। এই দিবসে এবারের অর্থাৎ ‘১৯ সালের প্রতিপাদ্য বিষয়- ‘বহু ভাষায় সাক্ষরতা, উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা।’ আমরা সবাই জানি এই দিবসের লক্ষ্য হচ্ছে বিভিন্ন ব্যক্তি, জাতি, গোষ্ঠী, সমাজে তথা বিশ্বের প্রতিটি দেশের নাগরিকের মধ্যে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও তাৎপর্য তুলে ধরা। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম এই দিবস পালিত হয় ১৯৭২ সালে। সেই থেকে আজকের এই দিন পর্যন্ত বাংলাদেশে সাক্ষরতা দিবস দীর্ঘ পরিক্রমায় অনেক অনেক পথ এগিয়ে এসেছে এতে কোন সন্দেহ নেই।
এখানে বলে রাখা ভালো ‘স্বাক্ষর’ ও ‘সাক্ষর’ শব্দ দুটি একই নয়। ‘সাক্ষর’ এবং ‘স্বাক্ষর’ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে স্বাক্ষর হচ্ছে নিজ অক্ষর; অর্থাৎ নিজের নামের দুই-চারটি বা কয়েকটি বর্ণমালা সঠিক মাত্রা প্রবাহ আকৃতি গৌণ রেখে নিজের ইচ্ছামত স্বাধীনভাবে লিখিত উপস্থাপনই হচ্ছে স্বাক্ষর; যা সই, সাইন, সিগনেচার, দস্তখত, সহি ইত্যাদি হিসাবে পরিচিত। অন্যদিকে সাক্ষর হচ্ছে অক্ষর জ্ঞান। অর্থাৎ কোন বর্ণমালা বা অক্ষর জ্ঞান সম্পর্কে ধারণা থাকাই হচ্ছে সাক্ষর। সাধারণত অক্ষর জ্ঞান সম্পন্নতাকেই বলা হয় সাক্ষরতা। তবে বর্তমানে অক্ষর জ্ঞান থাকলেই কেবল সাক্ষর হয়না। আরো কিছু জানা প্রয়োজন। এজন্যেই এবারের সাক্ষরতার প্রতিপাদ্যে নিজদেশের নিজ ভাষার অক্ষর ছাড়া ও বহু ভাষার সাক্ষরতার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে। এছাড়া বর্তমান পর্যায়ে একজন অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তি সমাজের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে বুঝবে, দায়িত¦ ও কর্তব্য পালনে সচেষ্ট হবে। সমাজে বেকার সমস্যার সঠিক পথ খুঁজে নিজেই আত্মনির্ভরশীল হবে, অন্যকেও বেকারত্ব থেকে মুক্তির পথ খুঁজে দিবে। চুরি, ডাকাতি, অন্যায়, অত্যাচার, সন্ত্রাস বন্ধে সচেষ্ট হবে। সে কোন একটি বিষয় পড়ে অনুধাবন করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। একজন সাক্ষর ব্যক্তি স্বাক্ষর করে ক্রয়-বিক্রয়, ব্যাংক-ব্যালেন্স হিসাব নিকাশসহ যাবতীয় কার্যক্রম সম্পাদন করতে পারবে। চিঠি-পত্র-পত্রিকা পড়ে বুঝবে এবং লিখে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারবে। গণনার দক্ষতা অর্জন করতে পারবে, দৈনন্দীন জীবনে নিজকে এবং নিজ পরিবারকে পরিচালনার দক্ষতা অর্জন করতে পারবে। মাতৃভাষায় যে কোন তথ্য দলিলপত্র, পড়তে পারবে এবং পড়ে বুঝতে পারবে, দৈনন্দীন জীবন পরিচালনার জন্যে ও হিসাব নিকাশের দক্ষতা অর্জন ও প্রয়োগ করতে পারবে। এককথায় বলা যায়, দৈনন্দীন জীবনধারনের জন্যে ন্যূনতম মৌলিক শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিই হচ্ছে সাক্ষরতা সম্পন্ন ব্যক্তি। তারায় সমাজে বা দেশে উন্নয়নের আলোকবর্তিকা হিসাবে কাজ করবে। তাই সাক্ষরতা যে কোন একটি দেশের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাক্ষরতার সাথে শিক্ষা সাহিত্য সংস্কৃতি অর্থনীতি সমাজ দেশ বা রাষ্ট্র জড়িত। আবার সাক্ষরতার সাথে সর্বপ্রথম যে শব্দটি মাধ্যম হিসাবে জড়িত, সেটি হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা। আর এই প্রাথমিক শিক্ষা স্তরের প্রথম কয়েকটি শ্রেণি, সাক্ষরতার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদিও আনুষ্ঠানিক অনানুষ্ঠানিক উপানুষ্ঠানিক এই তিন উপায়ে সাক্ষরতা অর্জিত হয়।
যাহোক এবার আসি সাক্ষরতা দিবস শুরুর কথায়। ১৯৬৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ইরানের রাজধানী তেহরানে ইউনেস্কো শিক্ষা প্রসারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শান্তি ও সংহতি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ১২ দিনব্যাপী এক দীর্ঘ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ৮৯ টি দেশের শিক্ষামন্ত্রী সহ বহু শিক্ষাবিধ বিশেষজ্ঞ এই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। এই সম্মেলনের বিভিন্ন প্রস্তাব গ্রহণের পাশাপাশি ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। এর পরবর্তী বছর অর্থাৎ ১৯৬৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর থেকে নিরক্ষর মুক্ত সমাজ ব্যবস্থার লক্ষ্যে পৃথিবীর সকল দেশই আনন্দ উৎসাহ উচ্ছ¦াসের সাথে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালন করে আসছে। সেই ১৯৬৬ সাল থেকে এই ২০১৯ সাল পর্যন্ত সাক্ষরতা দিবস পালনের বহু বছর পেরিয়ে গেছে। সেই থেকে বিভিন্ন দেশ অনেকটা প্রতিদ্ব›িদ্বতার মধ্যদিয়ে সাক্ষরতার ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে এসেছে। আমাদের দেশেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে সাক্ষরতা। যে দেশ যত বেশী সাক্ষরতা অর্জন করেছে সেই দেশ তত বেশী অর্থনৈতিক ভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে। বর্তমানে দেশে স্বাক্ষরতার হার ৭৩.৯ শতাংশ। এই হার আরো বাড়াতে বর্তমান সরকার বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ ও বাস্তবায়নের করে চলেছেন। যেমন- নানা ধরনের বৃত্তি, উপবৃত্তি, প্রতিবন্ধী ভাতা, বিনা মূল্যে বই বিতরণ ইত্যাদি। এই সবের কারনে সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পাচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মিড ডে মিল চালু করা হয়েছে, যার প্রেক্ষিতে পুরো সময় শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। উপবৃত্তির কারনে ঝরে পড়া হার কমে গেছে একই সাথে শতভাগ শিশু বিদ্যালয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। সাক্ষরতা বৃদ্ধির ফলে বাল্য বিবাহ রোধ হয়েছে, জনসাধারনের মাঝে বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। সত্যিকার অর্থে সরকারের এইসব উদ্যেগের পাশাপশি প্রত্যেক শিক্ষিত মানুষ সাক্ষরতা অর্জনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করলে, প্রত্যেক ব্যক্তি, প্রত্যেক পরিবার, প্রত্যেক সমাজ, নিরক্ষর মুক্ত হবে। আর এতে করে সমগ্র দেশ অর্থাৎ শতভাগ নাগরিক সাক্ষর হবে। সাক্ষরতার প্রভাবে দেশ ২০২১ সালের মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি সবদিক দিয়ে আরো এগিয়ে যাবে, এবং সরকার ঘোষিত রূপকল্প স্বপ্নের উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে। যদিও এতসব উন্নয়ন বা অর্জন সম্পুর্ণ ভাবে শুধু সাক্ষরতার উপর নির্ভর করে না, এরপরেও এইসব ক্ষেত্রে সাক্ষরতা হচ্ছে পূর্বশর্ত।