উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ  মেডিকেল পারে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পারে না কেন?

মুনির হাসান

78

মেডিকেলের সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার কারণে অনেক ঝামেলা কমেছেমেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য ৬ অক্টোবর ভর্তি পরীক্ষা হওয়ার তিন দিন পর ৯ অক্টোবর এই পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এবারের পরীক্ষায় ৮২ হাজার ৭৮৮ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছেন এবং ৪১ হাজার ১৩২ জন জন ভর্তির জন্য যোগ্য বিবেচিত হয়েছেন। উল্লেখ্য, দেশের ৩১টি সরকারি মেডিকেল কলেজে মোট আসন ৩ হাজার ৩১৮টি এবং ৬৯টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের মোট আসন ৬ হাজার ২২৫টি।

মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার জন্য দেশের এক অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের অন্য অঞ্চলে গিয়ে হোটেলে-আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে থাকতে হয় না। বাবা-চাচাদের রাজি করিয়ে ছাত্রীদের দূরদূরান্তে যেতেও হয় না। দেশের এক অঞ্চলের মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে যেকোনো মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য নির্বাচিত হতে পারেন ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থী। সেই সত্তর দশকের শেষের দিকে যখন দেশে সরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে, তখন থেকেই ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের হয়রানি লাঘবের জন্য এই সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষাপদ্ধতি চালু করা হয়। কয়েক বছর আগে বেসরকারি কলেজগুলোকেও এর আওতায় আনা হয়েছে।

এবার ভাবুন, ৩১টি সরকারি মেডিকেল আর ৬৯টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে আলাদাভাবে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠানের কথা। তাই যদি হতো, তাহলে চিকিৎসক হতে আগ্রহী একজন শিক্ষার্থীর কী হাল হতো? তাঁকে এক শহর থেকে অন্য শহরে দৌড়াতে হতো কেবল ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। হয়তো আজ ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে বিকেলেই রওনা দিতেন ঢাকার উদ্দেশে। ঢাকায় পৌঁছে রাতের ট্রেনে তাঁকে যেতে হতো চট্টগ্রামে। কারণ, কাল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা। এই লিস্ট অনেক বড় করা সম্ভব, তবে তার দরকার নেই। এটি খুবই শান্তির বিষয় যে মেডিকেলে ভর্তি-ইচ্ছুক ছেলেমেয়ে এবং তাঁদের অভিভাবকদের এই হয়রানি পোহাতে হয় না।

এই ছবি যদি আমরা উচ্চশিক্ষার অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে দেখতে পেতাম, তাহলে সেটি ছেলেমেয়েদের ও তাঁদের অভিভাবকদের জন্য কতই না আনন্দের হতো। তবে এটি আমার জীবদ্দশায় দেখার কোনো সুযোগ হবে কি না, তা কেবল সর্বশক্তিমানই বলতে পারেন। বলছিলাম বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কথা। দেশে বর্তমানে ১৩১টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন শতাধিক বিষয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। সেই আশির দশকের শেষ ভাগে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইউনিট হিসেবে ভর্তির ব্যবস্থা চালু হয়। তার আগে সেখানে বিভাগওয়ারি ভর্তির পদ্ধতি ছিল। এখনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ব্যবস্থা চালু আছে। এর ফলে একজন শিক্ষার্থীকে কখনো কখনো বাক্স–পেটরা নিয়ে সপ্তাহ দু-একের জন্য অন্য এক শহরে স্থানান্তর করতে হয়।

অথচ সামান্য উদ্যোগ নিলেই এই পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটানো যায়। এমন সমাধান কিন্তু কিছু নতুন নয়। মেডিকেলের কথা বাদ দিই। কুয়েট, রুয়েট ও চুয়েটের কথা ধরা যাক। প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হওয়ার আগে এগুলো ছিল বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (বিআইটি)। তখন এই বিআইটিগুলোর ভর্তি পরীক্ষা ছিল একসঙ্গে এবং একটি মাত্র পরীক্ষা দিয়ে ছেলেমেয়েরা চট্টগ্রাম, খুলনা কিংবা রাজশাহীতে ভর্তি হতে পারতেন। কিন্তু বিশ্ব যতই এগিয়ে যাচ্ছে, আমরা ততই পেছাতে থাকি। তবে দুই দশক আগের ছেলেমেয়েরা যে সুযোগ পেতেন, এখনকার ছেলেমেয়েরা সেটি পান না। তখনকার তিন বিআইটি এখন বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার পর থেকে আলাদাভাবেই ভর্তি পরীক্ষা নেয়। সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও তা-ই।

ফলে একজন ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীকে এক শহর থেকে অন্য শহরে কেবলই ছুটে বেড়াতে হয়। গত ১১ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. শহিদুজ্জামান একটি হিসাব প্রকাশ করেছেন। সমন্বয়হীনতার উদাহরণ দেখিয়ে তিনি বলেছেন, ‘বিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থীকে ২০ অক্টোবর খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) ভর্তি পরীক্ষা শেষ করে পরদিন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) পরীক্ষা দিতে হলে প্রায় ৪০৩ কিলোমিটার রাস্তা ভ্রমণ করতে হবে। এর পরদিন ২২ অক্টোবর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জীববিজ্ঞান ইউনিটের পরীক্ষা হলে ওই শিক্ষার্থীকে আরও ৫২৫ কিলোমিটার পথ ভ্রমণ করতে হবে। এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) পরীক্ষা দিতে চাইলে আবার চট্টগ্রামে আসতে ৫১৩ কিলোমিটার এবং পরদিন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পাবিপ্রবি) ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে চাইলে আরও ৪৬৮ কিলোমিটার পথ ভ্রমণ করতে হবে।’ ভাবা যায়! এর সঙ্গে আছে ভর্তি পরীক্ষার খরচ। একজন শিক্ষার্থীকে কেবল ভর্তি পরীক্ষার ফরমই কিনতে হচ্ছে না, একই সঙ্গে তাঁকে বিস্তর ছোটাছুটির খরচও বহন করতে হচ্ছে। আর ছাত্রীদের বেলায় খরচের মাত্রা আরও বেশি। কারণ, তাঁকে শহর থেকে শহরে ছুটে বেড়ানোর জন্য অভিভাবকদের কাউকে সঙ্গে নিতে হচ্ছে।

অথচ সামান্য উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি দেওয়া যায়। আর কাজটা শুরু করতে পারে দেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষার পদ্ধতি কমবেশি একই রকম। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নিজেরা বসে এটিকে একটি ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসতে পারবেন সহজে। এ পদ্ধতিতে একই দিনে, একই প্রশ্নপত্রে কুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে মেধাতালিকায় স্থান নিয়ে একজন শিক্ষার্থী সহজে বুয়েটে বা চুয়েটে ভর্তি হতে পারবেন। এর পরের বছরগুলোতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনুষদভিত্তিক পদ্ধতি চালু করে ফেলা সম্ভব হবে। আমার এই প্রস্তাব শুনে যাঁরা হইহই করে আসবেন, তাঁদের জ্ঞাতার্থে শুধু এইটুকু বলি যে আজ প্রায় ৩০ বছর ধরে মেডিকেল কলেজগুলো এই ব্যবস্থায় চলছে।

আর পাশের দেশ ভারতের আইআইটি, এনআইআইটি, আইআইআইটিগুলোর ভর্তি পরীক্ষার এই সমন্বিত ব্যবস্থার বয়স ৫০ পেরিয়েছে অনেক। তবে বাংলাদেশে এই কাজটি সহজে হবে এই আশা করার সুযোগ নেই। কারণ, শিক্ষার্থীদের হয়রানি ও ভোগান্তি থেকে মুক্তি দেওয়ার কথা কেউ ভাবে বলে মনে হয় না।