উচিত শিক্ষা 

লিটন দাশ গুপ্ত

24

এই লেখাটির বিষয়বস্তু নিয়ে চিন্তা করেছিলাম গত কয়দিন আগে। তখন সময় রাত সাড়ে এগারটা, ছিলাম আমি একটি ডায়াগোনোসিস সেন্টারে। লেখার বিষয়বস্তু হচ্ছে আমার মেয়ের হঠাৎ জ্বর হওয়ার প্রেক্ষাপটে ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রদত্ত শিক্ষা ও পরামর্শ! তার আগে ‘উচিত শিক্ষা’ শিরোনামের ব্যাখ্যা না দিলে নয়। আমাদের দেশে আমরা জানি স্তরভিত্তিতে শিক্ষা প্রধানত তিন প্রকার। যেমন- প্রাথমিকশিক্ষা, মাধ্যমিকশিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা। আবার শিক্ষাক্রমের বিষয়বস্তু অনুযায়ী রয়েছে বিভিন্ন রকম বিশেষায়িত শিক্ষা। যেমন- কারিগরি শিক্ষা, সাধারণ শিক্ষা, চিকিৎসাবিষয়ক শিক্ষা, প্রকৌশল শিক্ষা ইত্যাদি। এই ছাড়া বিষয় ভিত্তিতে গণিতশিক্ষা ইংরেজীশিক্ষা, বাংলাশিক্ষা তো আছেই। আর তাই যদি হয়, তবে উচিত শিক্ষা মানে কি? এই উচিত শিক্ষা সম্পর্কে জানতে হলে পড়তে হবে নিচের বাস্তব ঘটনার প্রেক্ষাপট।
বিষয় হচ্ছে আমার মেয়ের ছোটটার হঠাৎ জ্বর হয়েছে গত কয়দিন আগে। মেয়ের বয়স সাড়ে ছয় বছর। নামও ৫/৬ টার মত, আদর করে যে যেইটা ডাকতে পারে। সে নিজেও নিজের নাম দিয়েছে দুয়েকটা। তার দেয়া নাম দিয়ে তাকে না ডাকলে সে রাগ করে, কান্নাকাটিও করে। স্বভাবে সে অত্যন্ত দুরন্তপনা চঞ্চল সদা হাস্যমুখ ও পাকা পাকা কথা তার অন্যতম অভ্যাস। সেদিন গ্রামের বাড়িতে একটি অনুষ্ঠানে বেড়াতে গিয়ে সন্ধ্যায় শহরের বাসায় ফিরে এলাম। মেয়ে রাতে খারাপ লাগছে বলেছিল, সকালে দেখি জ্বর ১০২ ডিগ্রী ফারেনহাইট। বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে মেয়ের মা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কারণ দেশে সরকারি হিসাবে প্রায় আশি হাজার ডেঙ্গু রোগী সনাক্ত হয়েছে, অনেকে মারাও গিয়েছে। তাই আতঙ্কিত হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। ভয় পেয়ে একটু বাড়তি বা অতি সচেতন হয়ে জনৈক শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক চিকিৎসকের সিরিয়াল নিয়ে নেয়। আমিও মেয়ের অসুখের ব্যবস্থার চেয়ে, মেয়ের মা’র আতঙ্কিত হবার অবস্থা দেখে অনুমতি দিয়ে দিলাম ডাক্তারের টিকিট নিতে। সিরিয়াল নম্বর ২১, যেতে বলেছে সন্ধ্যা ৭ টায়। আমরা সময়ের ব্যাপারে আবারো বাড়তি সচেতন হয়ে সাড়ে ৬ টার আগেই পৌঁছে গেলাম। প্রায় ৩ ঘন্টারও বেশী সময় অপেক্ষা করে রাত সাড়ে নয়টায় চেম্বারে ডাক্তারের ডাক পড়ল। প্রবেশ করে দেখলাম ডাক্তারের নিজের চিকিৎসা সম্পর্কিত নানা রকম বিজ্ঞাপন। যেমন পুরুষ্কার পেয়েছে বই লিখেছে সংবর্ধনা নিয়েছে ইত্যাদি। এইদিকে সামনে নির্ধারিত আসনে বসে মেয়ের জ্বর সম্পর্কে বর্ণনা করতে গেলে ডাক্তার বাবু থামিয়ে দিয়ে বলে আগে আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর দেন।
প্রশ্ন ছিল মেয়ের জন্মের তারিখ কত, জন্ম দিনে না রাতে, নরম্যাল না সিজারিয়ান, জন্মের পর কান্না করেছিল কিনা, কেন সিজার করা হয়েছিল, সবগুলো টিকা দেয়া হয়েছিল কিনা ইত্যাদি কত রকম প্রশ্ন। সুযোগ বুঝে বললাম জ্বরের জন্যে এসেছি। সে অনেকটা নিশ্চুম থেকে বলে আগে আমার কথা শুনেন, তারপর তার মত বলেই যাচ্ছে আর প্রেসক্রিপশনে লিখে যাচ্ছে। টিকা প্রসঙ্গ এলে, টিকা সব দেয়া হয়েছে বলাতে সে বলে, এই গুলো ছাড়াও তার কাছে আরো বেশ কিছু বিশেষ টিকা আছে এইগুলোও দিতে হবে। এরপর দেখলাম টিকা নিয়ে একপ্রকার বিজ্ঞাপন শুরু করে দিল। তারপর দেখলাম প্রেসক্রিপশনে ৮টি ঔষধ লিখে আলট্রাসনোগ্রাম সহ অনেকগুলো রক্ত পরীক্ষা, ইউরিন, স্টুল টেস্ট এবং ডেঙ্গুর জন্যে এনএস ওয়ান পরীক্ষাও লিখে প্রেসক্রিপশনের সাথে মেট্রো ডায়াগনেস্টিক সেন্টারের একটি লিফলেট সংযুক্ত করে দেয়। আমার যাতায়তের সুবিধা মত অন্য কোথাও করতে পারবো কিনা জানতে চাইলে বলে, না অন্য কোথাও করা যাবেনা, এখানে নির্ভরযোগ্য সঠিক রির্পোট পাওয়া যায়। উল্লেখ্য এখানে অর্থাৎ মেট্রোতে গত কয়েক মাস আগে আমার স্ত্রী’র সিরাম টিএসএইচ পরীক্ষা করেছিলাম। দুই সপ্তাহের মধ্যে রির্পোট একশ বিশ গুন পার্থক্যের ভুল রির্পোট পাওয়া যায়, পরে ৩য় বার বাধ্য হয়ে ফ্রি পরীক্ষা করে সঠিক রিপোর্ট দেয়। ঐ সময় মেডিসিন বিভাগের অন্য এক অধ্যাপক তথা চিকিৎসকের অনুরোধে পত্রিকায় কিছু লিখতে পারিনি, তবে ফেসবুকে বিষয়টি উল্লেখ করেছিলাম।
যাহোক, ডাক্তারের সাথে কিছু জানতে চেয়েছি, অসুখের বর্ণনা দিতে চেয়েছি কোন সুযোগ হলনা। এই দিকে পরবর্তী রোগী এসে হাজির। নিরুপায় হয়ে চেম্বার থেকে চলে এলাম। পরের দিন আমার সময় না থাকায় রাতেই নির্দেশিত ডায়াগোনোসিস সেন্টারে টেস্টের জন্যে নিয়ে যায় এবং টেস্ট করিয়ে নিই।
এবার সামান্য জ্বরের কত ধরনের সমস্যা, সেই প্রসঙ্গে আসি। তার নির্দেশনা মত পরীক্ষা নিরীক্ষা বাবদ ফি আসে ৫২০০ টাকা। তার অর্থাৎ ডাক্তারের ভিজিট ফি ১০০০ টাকা, এখানে ওখানে বাসা চেম্বার ডায়াগোনোসিস সেন্টার মোট ছয় বার টেক্সির ভাড়া হল ৮৫০ টাকা। পকেটে আর পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় স্ইে রাতে আর ঔষধ কেনা হলনা। এই হচ্ছে খরচের হিসাব। এরপর রাত অনেক করে অর্থাৎ মধ্য রাতে বাসায় ফিরতে হলো। ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে অন্যকোন যানবাহন না থাকায়, টেক্সি চালক বিমান গতিতে টেক্সি চালিয়ে নিয়ে আসে। ধীরে চালাতে বলা হলেও কে শুনে কার কথা। যেখানে দূর্ঘটনার সম্ভাবনা ছিল, সেটাও একটা সমস্যা। রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকাতে সন্ত্রাসীর হামলার ভয় ছিল সেটাও একটা সমস্যা। রাত ১২টা ৩৫ মিনিট সময়ে বাসায় পৌঁছে দেখলাম বাসার গেইট বন্ধ, অনেক কষ্ট করে নমনীয় হয়ে জমিদার বা বাড়িওয়ালা থেকে চাবি নিতে হল, সেটা একটা সমস্যা। এই দিকে মেয়ে যতটা অসুস্থ ছিল তার চেয়ে বেশী জার্নি ও রক্ত নেয়া আল্ট্রসনোগ্রাম ইত্যাদিতে ভয়ে ও সমস্যায় ঝিমিয়ে পড়ল, গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়ল। গাড়ি থেকে কোলে করে বাসায় আনতে হল, সবই সমস্যা। খাওয়া দাওয়া শেষ করে ঘুমিয়ে পড়লাম। রাত পোহালে সকালে দেখি মেয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ। এই দিকে সন্ধ্যার পরে রিপোর্ট এনে দেখলাম রিপোর্ট ভালো, সবগুলো নরম্যাল রেঞ্জে আছে। রিপোর্ট দেখাতে গেলে সব দেখে শুনে বলে মোটামুটি আছে, তিন সপ্তাহ পর মেয়েকে আবার নিয়ে যেতে। এই হচ্ছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অবস্থা।
অথচ এখানে এত সব পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়োজন ছিলনা। ডেঙ্গুর ভয়ে বা সন্দেহে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলাম। মনে করেছিলাম বড় ডাক্তার (!) সে প্রাথমিকভাবে দেখেই বলতে পারবে কোন সমস্যা নেই। আমরা আশ্বস্ত হয়ে মানসিকভাবে দৃঢ়তা অর্জন করতে পারতাম। অথবা ডেঙ্গুর জন্যে কেবল এনএস ওয়ান টেস্ট দিয়ে নিশ্চিত হতে পারত। এখানে সামান্য জ্বরের জন্যে শারীরিক মানসিক আর্থিক ক্ষতিগ্রস্থ হলাম এছাড়া সময় শ্রম বিপদ আপদ দূর্ঘটনার ভয়সহ বিভিন্ন সমস্যা ইত্যাদি তো ছিলই।
এবার আসি উচিত শিক্ষা সম্পর্কে। এখানে ১ম কথা হচ্ছে, বেড়াতে যাওয়াতে জার্নি হওয়াতে সামান্য জ্বর এসেছে, সেটা আমিও জানি বুঝি। কিন্তু কেন ধৈর্য হারা হয়ে ঐ ডাক্তারের কাছে গেলাম।
২য় কথা হচ্ছে আমার ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসা বিষয়ক ইনভেস্টিগেশনের এক্সপিরিয়েন্স থাকার সত্তে¡ও কেন তার দেয়া অযৌক্তিক এতসব পরীক্ষা নিরীক্ষা গুলো করতে গেলাম।
৩য় কথা হচ্ছে অতি’ শব্দটি সকলক্ষেত্রে বর্জন করার জন্যে আমার মা উপদেশ দিয়েছিল। যেমন অতি ভয়, অতি চালাক, অতি কাজ, অতি উৎসাহ ইত্যাদি। তারপরেও কেন যে অতি সচেতন হতে গেলাম!
আর এই সবের মানে হচ্ছে আমার প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক শিক্ষা, উচ্চ শিক্ষা গ্রহন হলেও উচিত শিক্ষার অভাব ছিল। তাই আক্কেল সেলামী হিসাবে তথাকথিত মানবসেবায় নিয়োজিত ঐ সকল ডাক্তার সম্পর্কে অতীত অভিজ্ঞতা থাকার সত্তে¡ও (সকল চিকিৎসক একই রকম নয়) চিকিৎসা নিতে গিয়ে আমার উচিত শিক্ষাই হল।