উচিত শিক্ষা নয় চাই মানসম্মত শিক্ষা

চিররঞ্জন সরকার

66

বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বড়ভাই ফোন দিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য একবারই পরীক্ষা দেওয়া যাবে, এই নিয়ম কেন করা হয়েছে জানে? আমি আমতা আমতা করাতে তিনি ঝাঁজ মিশিয়ে বললেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গরিব শিক্ষার্থীরা যেন পড়তে না পারে সে জন্য। কেননা এখনও দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গরিব ঘরের সন্তানরাই বেশি চান্স পায়। প্রথমবার চান্স না পেলে দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় বেশিরভাগই চান্স পায়। এই সুযোগটা বন্ধ করার জন্যই এই সিদ্ধান্ত।
ব্যাপারটা এত সরল না হলেও এই কথাগুলোর মধ্যে যে যুক্তি আছে তা অস্বীকার করা যাবে কি?
আমাদের শিক্ষায় বর্তমানে যা চলছে, যে ধরনের মনমতলবি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হচ্ছে তাতে শিক্ষার কতটুকু কী উপকার হচ্ছে, সেটা গভীরভাবে ভেবে দেখার বিষয়।
২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য একবারই পরীক্ষা দেওয়া যাবে। স¤প্রতি বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দ্বিতীয় দফায় ভর্তিপরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ বাতিল করেছে। এই সিদ্ধান্তটি অনেক গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীর জন্যই দুঃসংবাদ। প্রত্যেক মানুষ একটা সুন্দর জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখে। সেই স্বপ্ন অকালেই ভেঙে দেবে এই সিদ্ধান্ত।
বিভিন্ন কারণে একজন ভালো ছাত্র দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে, প্রথম বছর মিস হলেও সে এক বুক আশা নিয়ে পরের বছর পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নেয়। তাদের অনেকে দ্বিতীয় দফায় ভর্তিও হয়। অনেক মেধাবী ছাত্রছাত্রী আছে যারা টাকার অভাবে কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করতে পারে না। তাদের জন্য দ্বিতীয়বার ভর্তিপরীক্ষার সুযোগ রাখা খুবই যৌক্তিক দাবি। তারা যদি উচ্চশিক্ষার সুযোগ না পায়, লেখাপড়া করতে না পারে তাহলে কে তাদের চাকরি দেবে?তাদের দায়িত্বই বা কে নেবে? দেখা গেছে দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় অংশ নিয়ে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। গ্রামের একজন ছাত্রের প্রথমবার ভর্তিপরীক্ষা সম্বন্ধে তেমন ধারণা থাকে না। তাই তারা প্রথমবার চান্স না পেলেও পরেরবার খুব ভালো করে।
দ্বিতীয়বার ভর্তিপরীক্ষার সুযোগ না রাখার পক্ষে নিশ্চয়ই অনেক যুক্তি আছে। কিন্তু উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে গরিব শ্রেণির সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় সুযোগ পাবার যুক্তিটি অন্য যে কোনো যুক্তির চেয়ে অবশ্যই গ্রহণযোগ্য, নয় কী?
বিরাজমান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিপরীক্ষা পদ্ধতিতে অনেক গলদ আছে। এ নিয়ে নানা মুনির নানা মতও রয়েছে। কয়েক মাস আগে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদনও জমা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য একপ্রকার যুদ্ধ করতে হয়। কেউ কেউ ১০টি বা তার অধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়েও চান্স পান না। কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিতে হয়। তাতেও চান্স না পেলে দু’টি বছর পিছিয়ে যেতে হয়। এছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়। এ ক্ষেত্রে অর্থ ও শ্রম দুটোই যায়। স¤প্রতি গুচ্ছভিত্তিক ভর্তিপরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনায় এলেও বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরোধিতার কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি।
ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের জন্য চলমান প্রক্রিয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ভর্তিপরীক্ষাসমূহ কেবলমাত্র বোর্ড পরীক্ষার একটি অতি সংক্ষিপ্ত রূপ এবং এ পরীক্ষার গুণগতমান বর্তমানে প্রশ্নবিদ্ধ। একাধিক ক্ষেত্রে ভর্তিপরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ভুল ধরা পড়েছে। এছাড়া প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বোর্ড পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীরা এক ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত পরীক্ষায় কোনো কারণে ব্যর্থ হলে তারা কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে ব্যর্থ হয়। যা তাদের প্রতি অবিচার বলে কমিশন মনে করে।
এছাড়া বর্তমান পদ্ধতিতে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীকে ৬-১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিপরীক্ষায় অংশ নিতে হয় এবং দীর্ঘ সময় তাদের কোচিং সেন্টারের শরণাপন্ন হতে হয়। মানসিক চাপ ও একই বিষয়বস্তু নিয়ে দীর্ঘকাল অধ্যয়নরত থাকার ফলে তাদের সৃজনশীলতা বহুলাংশে হ্রাস পায়। ভর্তিপরীক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের যে সময় ব্যয় হয় তার পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। এই সময়টুকু শিক্ষকরা বিভিন্ন শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারেন।
ভর্তিপরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠাসমূহের এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অতিরিক্ত আয়ের একটি সুযোগ সৃষ্টি হয় বটে, তবে এই আয়ের নৈতিক বৈধতা প্রশ্নসাপেক্ষ। এসব সমস্যা কীভাবে সমাধান করা যায়-সে বিষয়ে যথাসম্ভব সর্বজনগ্রাহ্য ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা দরকার। কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে কবে কী করবেন?
পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ মানবসম্পদ। এই সম্পদ রক্ষা করা ও তার উন্নয়নের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নের ভ্রূণ রক্ষিত আছে, একজন মানুষকে কতদূর লেখাপড়া শেখানো হচ্ছে, মানসম্পন্ন শিক্ষায় শিক্ষিত বানানো হচ্ছে, তার ওপর। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা প্রসারের ওপর। আজকের দুনিয়ার প্রায় সব দেশেই শিক্ষা প্রসারের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। আমাদের দেশও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু এই উদ্যোগ-আয়োজনে কোন সরকারের কতটা ও কী ধরনের ভূমিকা হবে তা নির্ভর করে সরকারটি বিত্তবান বা বিত্তহীন কাদের পক্ষের সরকার তার ওপর। যে পক্ষ অবলম্বন করে সেই অর্থনৈতিক নীতি তার ওপরেই নির্ভর করে দেশের শিক্ষানীতি। ভারতের বিখ্যাত রাজনীতিক গোপালকৃষ্ণ গোখলের কথায়, ‘‘একটি সরকার ভালো কী মন্দ তা তার শিক্ষানীতি দিয়েই বিচার করা যায়।’’
উচ্চশিক্ষা প্রসারের পূর্ণাঙ্গ রূপ পেতে হলে আসে সচেতনতা ও সক্ষমতার প্রশ্ন দুটি। কাজেই উচ্চশিক্ষার প্রসারে গৃহীত বিধিব্যবস্থা একটি জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটা একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া পরিচালিত করতে হবে দেশের মানুষের রোজকার জীবনের উদ্ভূত সমস্যাবলি থেকে সমস্যার কারণ ও তার উত্তরণের পথপদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হয়েই।
আমাদের মনে রাখা দরকার, সমাজ বিকাশের যে ধারা ধরে মানুষে মানুষে শোষণের সৃষ্টি, সেই ধারার সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই শিক্ষার ক্ষেত্রেও বৈষম্য চলে আসছে। মানসম্মত শিক্ষা প্রসার আন্দোলনের যথার্থতা নিহিত আছে এইখানেই। মনে রাখা প্রয়োজন, আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি নিরক্ষর মানুষ। নিরক্ষরতা সবচাইতে বেশি শ্রমিক, কৃষক খেটে খাওয়া মানুষের ঘরে। দেশের সরকারের মধ্যে যথাযথ অর্থে খেটে খাওয়া মানুষের সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধি না থাকায় নিরক্ষরতা দূর করা বা গরিব মানুষের সন্তানদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির জন্য কোনো সরকারেরই যথার্থ সদর্থক ভূমিকা আমরা দেখতে পাই না।
রাজনৈতিক স্বাধীনতার তেতাল্লিশ বছর পরেও আমাদের দেশে শিক্ষার বা মানসম্মত শিক্ষার আন্দোলন আর একটি দ্বিতীয় স্বাধীনতার লড়াই। শিক্ষার অধিকারকে ভাগ্যফল বা কর্মফলের ফসল বলে মনে করেন যারা তাদের দলে ভিড়লে জাতির সমূহ সর্বনাশ!
দেশের সকল স্তরের মানুষকে এগিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার নিয়ে আমাদের শিক্ষাবিষয়ক ভাবনা-পরিকল্পনা করতে হবে। শিক্ষার সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক ইস্যু যুক্ত করতে হবে। বুঝতে হবে, মানবসম্পদ উন্নয়নের অন্যতম কাজ শিক্ষার প্রসার আন্দোলন হলেও, এই আন্দোলন কেবল অক্ষরকেন্দ্রিক নয়। এই আন্দোলনের একটি বহুমাত্রিক দিক আছে। শিক্ষার আন্দোলন নতুন মানুষ চাষের আন্দোলন বলেই এই মানুষকে সচেতন ও সক্ষম করে গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে উন্নত মানবসম্পদকে সংরক্ষিত ও বিকশিত করা সম্ভবপর। এই শিক্ষার মধ্য দিয়ে মানুষসহ দেশ কাল ও সমাজকে আরও উন্নত করা সম্ভব হবে।
এখানেও মনে রাখা দরকার, বিত্তবানেরা যারা রাষ্ট্রের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত তারা সহজে এই কাজ করতে দেবে না। দেশের নাগরিক সমাজ, প্রগতিশীল সংগঠন ও দলকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। মানসম্পন্ন শিক্ষার জন্য ধারাবাহিক ও কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
শিক্ষার আন্দোলন মানে কেবলমাত্র অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ তৈরি নয়। মানুষ একটি সমাজবদ্ধ জীব, সামাজিক মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা পদ্ধতির পরিচালনা ও তার দৈনন্দিন অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের দানাবাঁধা রূপ হলো প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান। এই প্রাকৃতিক ও সমাজবিজ্ঞানের বহুগ্রাহী সংক্ষিপ্তসার হল দর্শন। শিক্ষা ও জ্ঞান এই দুটি শব্দের আভিধানিক অর্থ যাই হোক না কেন, এ ক্ষেত্রে দুটিকে সমার্থক বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। ভারতের অন্যতম জাতীয়তাবাদী নেতা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর এ প্রসঙ্গে অভিজ্ঞতা, ‘‘স্বাস্থ্যতত্ত¡, সাফাই ও রাজনীতি– একমাত্র এই তিনটি বিষয় সবাইকে সমানভাবে শেখানো যেতে পারে। আমি ধরে নিয়েছি, রাজনীতির ভিতর অর্থশাস্ত্রের জ্ঞানও অন্তর্নিহিত।’’
শিক্ষা আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হল সাক্ষরতাযুক্ত ও বিযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত অংশের মানুষের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি করা। অর্থাৎ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা, স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং সংস্কৃতি চেতনা বাড়ানোর প্রশ্নটি। প্রতিটি মানুষ তার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও পরিবেশের দ্বারা প্রভাবিত হয়। যেমন, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক পরিবেশ-পরিস্থিতি ইত্যাদি।
শিক্ষা প্রসারের আন্দোলন একটি বহুমাত্রিক আন্দোলন, তাই সচেতনতার প্রশ্নে নতুন মানুষ গড়ার চাষের আন্দোলনে যুক্ত হয় জনস্বাস্থ্য ও জনবিজ্ঞানের প্রসঙ্গ।
এক সময় আমাদের দেশে বলা হতে ‘সাক্ষর মায়ের সন্তান নিরক্ষর হয় না’। এই ঘোষণার বাস্তবায়ন দেশে প্রাথমিক শিক্ষায় এক বিরাট সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছিল। সম্ভাবনা সৃষ্টি হলেই আসে সমস্যা। খেটে খাওয়ার দল যখন আরও সম্ভাবনা তৈরি না করতে পারার জন্য আক্ষেপের সমস্যায় জর্জরিত, লুটে ও চেটেপুটে খাওয়ার দলের তাতেই হয় আনন্দ।
এই আনন্দ নিরানন্দে পরিণত করতে হলে সমস্যার গভীরে প্রবেশ করতে হবে। পরিকল্পনামাফিক আমাদের নজর দিতে হবে, কোনো পরিবারের কোনো শিশু প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্রে কেন যায় না। সব শিশু পালস পোলিও খেল কি? মা কি তার সদ্যোজাত থেকে ছ’বছরের শিশুকে রোগ প্রতিষেধক টিকা সময়মতো খাওয়াচ্ছেন? বাল্যবিবাহ আটকানো যাচ্ছে কি? কন্যাভ্রূণহত্যা বন্ধ করা গেল কি?
মনে রাখা দরকার, এই সব কাজে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন সমাজের নারীরা। সমাজে নারী ও পুরুষ এই দুই অংশের ভূমিকা থাকলেও সব থেকে বেশি মানসিক ও কায়িক শ্রম দিতে হয় নারীদের। আজকের সমাজ চায় বস্তুনিষ্ঠ শাসন ও স্নেহ। নারীরা এই দুই ক্ষেতেই হতে পারে অনুকরণীয়। এই প্রসঙ্গে বিদ্যাসাগর মহোদয়ের ‘বাল্যবিবাহের দোষ’ প্রবন্ধটি আজও মনে হয় সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁর মৃত্যুর একশো চব্বিশ বছর পরেও তাঁর নির্দেশিত পথই আমাদের আলোকবর্তিকা।
মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রসার আন্দোলনে, এই সমাজের যারা গরিষ্ঠ অংশ, সেই খেটে খাওয়াদের উন্নয়নের কথা ভাবতে হবে। সেই উন্নয়নের কাজ করবে যে সমাজ, তার ভরকেন্দ্রে নারীদের অবস্থান। এই কাজ আত্মস্থ করে বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারলে কেবলমাত্র নারীদের উপকার হবে না, বরং তা সমাজকে ভেতর থেকে উপকৃত করবে।
বিদ্যাসাগর মহোদয় দেখেছিলেন :
ক) বাল্যবিবাহের মূলে প্রধান কারণ ‘কুসংস্কার’;
খ) বাল্যবিবাহের ফল অশিক্ষা, অস্বাস্থ্য ও দারিদ্র্য, প্রসূতিমৃত্যু, শিশুমৃত্যু, অকালবৈধব্য, ভীরুতা, দুর্বলচিত্ততা এবং চিররুগ্ণতা;
গ) প্রতিবিধান: তাঁর কথায় ‘এতদ্দেশে যদ্যপি স্ত্রীজাতির বিদ্যাশিক্ষার প্রথা প্রচলিত থাকিত, তবে অস্মদ্দেশীয় বালক-বালিকা মাতৃসন্নিধান হইতেও সদুপদেশ পাইয়া অল্পবয়সেই কৃতবিদ্য হইতে পারিত।’
কাজেই জনস্বাস্থ্য, জনবিজ্ঞান ও জনশিক্ষা শব্দগুলিকে ব্যবহার না করেও কী করলে সমাজের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব তার বীজের সন্ধান পাই বাংলার এই নির্ভীক সন্তানের কাছ থেকে। আমরা তো জানি যে, শিক্ষা, বিজ্ঞানচেতনা কুসংস্কার দূরীকরণের অন্যতম হাতিয়ার। শুধু জানা নয়, দরকার হাতে কলমে তার প্রয়োগ।
নিরক্ষর মানুষকে যেমন লিখতে, পড়তে ও অঙ্ক কষতে শেখাতে হবে এর পাশাপাশি করে তুলতে হবে স্বাস্থ্যসচেতন, বিজ্ঞানমনস্ক। তাদের বোঝাতে হবে দৈনন্দিন স্বাস্থ্যবিধি, পুষ্টি সংক্রান্ত হাতে কলমে শিক্ষা, জলের সঠিক ব্যবহার, টিকাকরণ কর্মসূচি। এসব কোনো বক্তৃতা বা উপন্যাসের বিষয় নয়, দরকার ব্যবহারিক জীবনের প্রয়োগ ও হাতে কলমে শেখা। এসবের প্রয়োগ করতে হবে পারিপার্শ্বিক ও আর্থিক সঙ্গতির মধ্যে সংহতি বজায় রেখে। সাক্ষর ও সচেতন মানুষকে করে তুলতে হবে যথার্থ অর্থে সক্ষম।
রোগের উপশমের জন্য দরকার চিকিৎসার। রোগ হলে চিকিৎসার প্রয়োজন। কোনো গুণীন, ঝাড়ফুঁক, ওঝা, মাদুলি, জলপড়া, তাগা তাবিজ রোগাক্রান্ত মানুষকে সুস্থ করতে পারে না, পারে না মানুষের আর্থিক বা মানসিক অবস্থার পরিবর্তন করতে। রোগ হলে যেমন দরকার চিকিৎসা, ঠিক তেমনই রোগাক্রান্ত না হবার জন্য কতকগুলি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। কোন রোগ কেন হয়, কীভাবে রোগ প্রতিরোধ করা যেতে পারে, সে সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়ানো দরকার। রোগ প্রতিরোধ শুধু নয়, সচেতন হতে হবে রোগ প্রতিষেধক ব্যবস্থা সম্পর্কেও।
উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, বাড়ি ও তার আশেপাশে পানি জমতে দেওয়া উচিত নয়, চেষ্টা কর মশারি ব্যবহার করতে, রাস্তায় কাটা ফল খেও না, জল ফুটিয়ে খাও, যে কোনো খাবার খাওয়ার আগে হাত ধুয়ে নাও, যেখানে সেখানে থুতু ফেল না– এসব কাজ কোনো রোগের চিকিৎসা নয়, রোগ যাতে না হয় তার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ। প্রিভেনসন ইজ বেটার দ্যান কিউর অর্থাৎ রোগ হলে চিকিৎসা নয়, রোগ না হওয়ার জন্য মানুষকে সচেতন ও সক্ষম করে তোলা।
একটা কথা এ প্রসঙ্গে মনে রাখা প্রয়োজন, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা শব্দ দুটি সম অর্থ বহন করে না। স্বাস্থ্য আমার, আপনার সুস্থ জীবনযাপনের অধিকারকে বোঝায়। ফলে জনস্বাস্থ্য গড়ে তোলা মানে চিকিৎসক, বদ্যি, ডাক্তারখানা, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, হাসপাতাল শুধু নয়। দরকার বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ গড়ে তোলা। বিজ্ঞানমনস্কতা মানে মোটা মোটা বিজ্ঞানের বই পড়া ও সূত্র মুখস্থ করা নয়। বিজ্ঞানমনস্কতা মানে যুক্তিবাদী, অনুসন্ধিৎসু মন গড়ে তোলা। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনাবলী ব্যাখ্যার চেষ্টা করা। এর মধ্য দিয়ে গড়ে উঠবে আত্মনির্ভরতা, নিজের ওপর আস্থা, কাটবে দুর্বলচিত্ততা ও ভীরুতা। একই সঙ্গে গড়ে তুলতে হবে স্বনির্ভর দল ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্পর্কে আগ্রহ।
গড়ে তুলতে হবে মানসম্পন্ন শিক্ষা প্রসার আন্দোলন, যার মাধ্যমে সচেতন, সক্ষম মানুষ গড়ে উঠবে। মানব সম্পদের উন্নয়নের সার্থক প্রয়াস লুকিয়ে আছে এই আন্দোলনের মধ্যে। তেতাল্লিশ বছর পেরিয়ে আজও দেশের মানুষ দু’বেলা দু’মুটো ভরপেট খেতে পায় না, এখন দেশের বহু জায়গায় নেই পরিগ্রুত পানীয় জলের ব্যবস্থা, অবহেলিত স্বাস্থ্য রক্ষার ব্যবস্থা, শিক্ষা, কাজ পাওয়ার অধিকার এখনও কেন এবং কাদের জন্য সর্বজনীন অধিকারের স্বীকৃতি পেল না। এজন্য কারা দায়ী এসব কথা মানুষকে বোঝানোও মানসম্মত শিক্ষা আন্দোলনের অন্যতম দায়িত্ব।
দেশের সর্বোৎকৃষ্ট সম্পদ মানবসম্পদের মানোন্নয়নের কাজ শিক্ষা প্রসার আন্দোলনের ওপরে বর্তেছে। একে যথাযথভাবে পালন করে এক সুখী মানবসমাজ গড়ে তোলার কাজে যোগ্য হয়ে উঠতে হবে আমাদের সকলকে। চূর্ণ করতে হবে সকল প্রকার ধর্মীয় মতান্ধতা, কুসংস্কারকে। আন্দোলনের যোগসূত্র স্থাপিত হোক বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে। অশিক্ষা, কুশিক্ষা বা যেন তেন শিক্ষা নয়, এমনকি গরিবের জন্য ‘উচিত শিক্ষা’ও নয়, মানসম্মত শিক্ষার জন্য দেশের নীতিনির্ধারক ও চিন্তাশীল মানুষের হৃদয়-মন একটু কাঁদুক, দ্রবীভূত হোক!

লেখক : কলামিস্ট।