ঈমাম গায্যালী (রহ.)’র দর্শন আছে শিক্ষা নেই

মুহম্মদ মাসুম চৌধুরী

10

হুজ্জাতুল ইসলাম ঈমাম গায্যালী (রহ.) একজন ইসলামের সেরা দার্শনিক। বিশ্বের এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ ছিলেন মুসলমানদের জাহেরী ও বাতেনী জগতের একজন মহান শিক্ষক। এমন এককালে তিনি দুনিয়াতে শুভ আগমন করেন যখন মুসলমানরা ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে আখিরাতের কথা প্রায় ভুলতে বসেছিলেন। তাঁর ক্ষুরধার লেখনী দ্বারা পথহারা মুসলমান পেলেন আলোর দিশা।
ঈমাম গায্যালী (রহ.) দর্শন শাস্ত্রকে কোরআন-সুন্নাহর আলোকে যুগপোযুগী বিজ্ঞানভিত্তিক রূপ দিয়েছেন। তাঁর দর্শনের মূল কথা হলো, প্রেমের মাধ্যমে পরিশুদ্ধ আত্মা এবং পরকালের মুক্তি অর্জন করতে অক্ষম হলে হিংস্র পশু আর আশরাফুল মাখলুকাত সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীবের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকে না, আনুষ্ঠানিক বাহ্যিক শিক্ষা মানুষকে মুক্তি দিতে পারে না। মানুষের আসল শত্রু নফ্স বা কুপ্রবৃত্তি। তা হতে মুক্তির জন্য পরিশুদ্ধ নফ্স গঠন করতে হবে। আধ্যাত্মিক শক্তি ছাড়া নফ্সকে পরিশুদ্ধ করা কঠিন।
মানুষ এগিয়ে চলছে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির দিকে। আমরা এখন একুশ শতকে। সভ্যতার শ্রেষ্ঠ সময়ে আমরা বাস করেও ঈমাম গায্যালী (রহ.)’র চিন্তা-দর্শন এখনো আমাদের কাছে নতুন মনে হয়। তাঁর দর্শন যেন একালেরই দর্শন। তিনি কপালের চোখ দিয়ে নয় হৃদয়ের চোখ দিয়ে সত্যকে দর্শন করতে বলেছেন। তিনি লিখেছেন, মানব চক্ষুর অনেক দোষ আছে, যেমন- চোখ ভিতরে দেখে বাইরে দেখে না। চোখ যা দেখে সত্য দেখে না। (যেমন সূর্যের আয়তনের কথা জানতে চাইলে চোখ বলবে থালার সমান), চোখ দূরে দেখে না, আবার কোন বস্তু চোখের এক ইঞ্চি পরিমাণ কাছে নিয়ে আসলে তাও দেখে না। চোখ বাইরে দেখে ভিতরে দেখে না। তাই তিনি হৃদয়ের চক্ষু প্রস্ফুটিত করে সত্য দেখতে বলেছেন।
ইরানের প্রসিদ্ধ একটি প্রদেশের নাম খোরাসন। এই প্রদেশের একটি জেলার নাম তুস। তেহেরান তুসের একটি প্রসিদ্ধ শহর। চারশত পঞ্চাশ হিজরীতে ঈমাম গায্যালী (রহ.) তেহেরানেই জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর প্রকৃত নাম মোহাম্মদ, উপাধি হুজ্জাতুল ইসলাম, পিতার নাম মোহাম্মদ, দাদার নামও মোহাম্মদ, পিতামহের নাম আহমদ। গায্যাল অর্থ সুতা বিক্রেতা। ঈমাম গায্যালী (রহ.)’র পিতা সুতার ব্যবসা করতেন বলে তিনি গায্যালী নামে পরিচিত হন। ঈমাম গায্যালী (রহ.) জন্মস্থানে আহমদ ইবনে মুহাম্মদ রাযেকানীর নিকট ফেকাহ শাস্ত্রের প্রাথমিক জ্ঞান অর্জনের পর জুরজান শহরে ঈমাম আবু নসর ইসমাইল (রহ.)’র কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি শিক্ষকের নিকট হতে শোনা জ্ঞানগুলো ডায়েরীতে লিপিবদ্ধ করতেন এবং তা মনে রাখার জন্য ডায়েরীগুলো খুলে বারবার পড়তেন। জুরজান শহর হতে জন্মস্থানে প্রত্যাবর্তনের পথে সকল মালামালের সাথে ডায়েরীগুলোও ডাকাত কর্তৃক লুণ্ঠিত হয়। তাতে তিনি মর্মাহত হয়ে ডাকাত সর্দারের নিকট গিয়ে বললেন, আমার পকেটের ভিতর কয়েকটি সোনার মোহর আছে যা তোমরা দেখতে পাওনি, মোহরগুলো নিয়ে যাও আমার ডায়েরীগুলো দিয়ে দাও। ডাকাত সর্দার জিজ্ঞেস করলেন, তোমার ডায়েরীতে কি আছে ? জবাবে তিনি বললেন, আমার জ্ঞান! ডাকাত সর্দার মোহরগুলো নিয়ে ডায়েরী ফেরত দিল না এবং ঈমাম গায্যালী (রহ.) কে উদ্দেশ্য করে বললেন, ডাকাতে নিয়ে যেতে পারে, চোরে নিয়ে যেতে পারে এ কেমন জ্ঞান! ডাকাত সর্দারের কথায় তিনি লজ্জিত হয়ে কঠোর পরিশ্রমে জ্ঞান মনে রাখার শিক্ষা শুরু করলেন এবং অর্জন করলেন আধ্যাত্মিক শক্তি।
ঈমাম গায্যালী (রহ.) বহু মতবাদের মানুষের সাথে মিশে বহু ধরনের শিক্ষার সাথে পরিচিত হয়েও সঠিক ও নির্ভুল মতবাদের সন্ধান পেলেন না। তৃপ্ত হলো না তাঁর মন। কোন মতবাদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে না পেরে অবশেষে তিনি গেলেন সুফিবাদ বা তাসাউফ পন্থীদের কাছে এবং পড়তে থাকেন এ মতবাদের ঈমাম জুনায়েদ বাগদাদী (রহ.), শিবলী (রহ.), বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.) প্রমুখ আধ্যাত্মিক মনীষীদের কিতাবসমূহ। এতে তিনি দেখতে পেলেন আলোর পথ। অর্জিত হলো আত্মার মুক্তি।
তাসাউফের গ্রন্থরাজি পাঠের পর তাঁর মনে হলো গ্রন্থগত বিদ্যা আত্মার জন্য যথেষ্ট নয়; মানুষের প্রয়োজন একজন কামিল মোরশেদের হাতে হাত রেখে বায়াত গ্রহণ করা। জগতের বিখ্যাত একজন দার্শনিক হয়ে কেন দুনিয়ার লেখাপড়া না জানা আধ্যাত্মিক জগতের মোরশেদ হযরত আবু আলী ফরমাদী (রহ.)’র কাছে মুরিদ হতে গেলেন তা এক বড় প্রশ্ন। ফরমাদী (রহ.) ঈমাম গায্যালী (রহ.)’র কলবে জ্ঞানের নিক্ষেপ করে বললেন, ‘তোমার কাছে দেখছি আধ্যাত্মিক জ্ঞানের লেশমাত্র নেই। ঈমাম সাহেব বললেন, ‘আমি তো ধর্ম দর্শনের প্রচুর রচনা করেছি’। একথা শুনে ফরমাদী (রহ.) বললেন, ‘তুমি কলমের কালো কালি দ্বারা ঘষে ঘষে সাদা কাগজকে কালো করেছো। আমি আল্লাহ-রাসূল (দ.) এর প্রেম দিয়ে ঘষে ঘষে আমার কালো হৃদয়কে সাদা করেছি’। এই আধ্যাত্মিক গুরুর কাছে বায়াত হয়ে ঈমাম গায্যালী (রহ.) শুরু করলেন কঠোর আধ্যাত্মিক সাধনা। পেয়ে গেলেন মহাসত্যের সন্ধান। তিনি বর্ণনা করেছেন, ‘অক্লান্ত আধ্যাত্মিক সাধনার ফলে আমার আত্মা এমন নিষ্কলুষ হয়ে গেল যে, আমার সকল মনের দ্ব›দ্ব সংশয়ের প্রাচীর ভেঙে খান খান হয়ে গেল’।
বাগদাদের নিজামিয়া মাদ্রাসা পৃথিবীর প্রথম প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা। এই মাদ্রাসাটি ছিল মুসলিম দেশসমূহের জ্ঞান-বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই মাদ্রাসায় ঈমাম গায্যালী (রহ.) মত দার্শনিক পন্ডিত শিক্ষাবিদের প্রয়োজন। নিজামুল মুলকের জ্যেষ্ঠ ছেলে ফখরুল মুলকের অনুরোধে তিনি নিজামিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষের পদ গ্রহণ করেন। বাত্বেনিয়া সম্প্রদায়ের গুপ্ত ঘাতকের হাতে প্রধানমন্ত্রী ফখরুল মুলক নির্মমভাবে শহীদ হলে তিনি অধ্যক্ষের পদ ইস্তফা দিয়ে জন্মস্থান তুসে চলে যান এবং স্বীয় গৃহে খানকা ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে মানুষকে জাহেরী বাত্বেনী শিক্ষাদানে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি যেখানেই থাকতেন মানুষের কাছে জ্ঞান বিতরণের কারণে সেখানে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যেত। কোন মাদ্রাসা হতে তিনি বেতন বা আর্থিক কোন সুবিধা গ্রহণ করতেন না।
ঈমাম সাহেব শেষ বয়সে যখন ইবাদত বন্দেগী, মোরাকাবা মোশাহেদা ও ধ্যানে মগ্ন থাকতেন তখনও অবসর সময় গ্রন্থ রচনায় ব্যস্ত থাকতেন। বহু গ্রন্থের প্রণেতা ক্ষণজন্মা প্রতিভাবান এই ব্যক্তিত্বের আশিটি গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গেছে। হারিয়ে গেছে অনেক গ্রন্থের পান্ডুলিপি। একশত খন্ডে তাঁর লিখিত কোরআনের তাফসিরের পান্ডুলিপি হারিয়ে গেল, না বিরুদ্ধ বা দীরা তাঁর ইন্তেকালের পর জ্বালিয়ে ফেললো তা রহস্যই থেকে গেল।
ঈমাম গায্যালী (রহ.)’র এহ্ইয়াউ উলুমিদ্দীন গ্রন্থটি তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা। মুসলিম জাহানের অমূল্য সম্পদ। শায়খ আবু মোহাম্মদ জুরজানী বলেছেন, ‘পৃথিবীর সব জ্ঞানের গ্রন্থ যদি হারিয়ে যায়, এহইয়াউ উলুমিদ্দীন’ গ্রন্থটি যদি আমাদের কাছে থাকে, তাহলে ইসলাম ধর্ম আবার পুনর্জ্জীবিত হবে’।
মুসলিম বিশ্বের ক্ষণজন্মা পুরুষ ঈমাম গায্যালী (রহ.)’র হায়াতে জিন্দেগী দীর্ঘায়িত হয়নি। মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সে জগতবাসীকে শোক সাগরে ভাসিয়ে মওলায়ে হাকিকীর সান্নিধ্যে গমন করেন।

লেখক : কলাম লেখক ও রাজনীতিক