ঈমানদার চোর

সুজন আহসান

24

আজ সারাদিন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। কোথাও রোদের ছিটেফোঁটা নেই। থেমে থেমে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি হচ্ছে। আসরের আজান হয়েছে কিছুক্ষণ হয়। একটু পরেই অন্ধকার ঘনিয়ে আসবে। মাগরিবের আগেই ইফতারের সাইরেন বাজাবে মুয়াজ্জিন। তার আগেই প্রস্তুতি নিতে হবে। দেরি হলেই ঝামেলা। সময়ের কাজ সময়ে করতে হয়। জায়গাটা একবার দেখে এসেছে মনু। পুরো নাম মনু মিয়া। লিকলিকে লম্বা আর পাতলা গড়নের। চুলগুলো একটা আরেকটা থেকে আলাদা। আগে মাংসপেশী বেশ মজবুত ছিল। বিয়ের পর থেকেই শরীর খারাপ হয়ে আসছে। মনুর স্ত্রী রহিমা বানু ইফতারের আয়োজন করছে।

কী হইছে আফনের? এমন মনমরা হয়ে কী ভাবেন?
কিছু ভাবি না। তর কাজ তুই কর।

ঘরের এক কোণে পাটের বস্তায় খেলা করছে চার বছরের ছোট শিশু শামীম। মনুর পালিত ছেলে। ছেলেপিলে নেই বলে কম মার খায়নি রহিমা। কোনো সন্তান নেই বলে মনুর মন খারাপ হতো। ভালো কিছু বললেও তা তার কাছে খারাপ মনে হতো। দিন দিন খিটখিটে মেজাজের হয়ে যাচ্ছিল। মেজাজ খারাপ হলেই সে রহিমার উপর চড়া হয়। বাছবিচারহীন মারে। মেরে মেরে ঘাম দিলেই সে ক্ষান্ত হয়। তাই বুদ্ধি করে রহিমার মা তার মেয়েকে একটা সন্তান দত্তক নিতে বলে। কিন্তু, বললে তো আর হয় না! সন্তান দত্তক পাবে কোথায়? এই দিনে কি আর কেউ সন্তান দত্তক দিবে? নিরাশ হয়নি রহিমা বানু। খোদার দরবারে প্রার্থনা করেছে, মাজারে শিরনী দিয়েছে। বৈদ্য আর গণকের কাছে হাত গুণেছে। হস্তরেখা আর আকাশের তারকা গুনে গণক বলে দিয়েছে দত্তক সন্তান সে পাবে। বাচ্চাও তার হবে। সেই আশায় গলায় মোটা দড়ি দিয়ে তাবিজ পরেছে। একটা বাচ্চা যেন মিলে। অবশেষে একদিন খোদা চোখ তুলে তাকায় রহিমার দিকে। পাশের গ্রামে একজনের বউ মারা যায়। কোলে তার দুধের শিশু। বউ মারা যাওয়ার পর স্বামী বেচারা পড়ে গিয়েছে মহা বিপাকে। এই দুধের শিশু নিয়ে সে যাবে কোথায়? কে তার সন্তানের লালন-পালনের দায়িত্ব নিবে? এই সব চিন্তায় যখন তার চুল ছিঁড়ি ছিঁড়ি অবস্থা তখন মধ্যস্ততায় আসে গ্রামের মাতব্বর। বলে-

শুনো, আমি একটা কথা বলি। এই ছেলের কপালের দুঃখ তুমি-আমি কেউ মুছতে পারব না। সে খোদার কাছ থেকে জনম দুঃখী হয়ে এসেছে। এখন তার ব্যপারে আমার একটা পরামর্শ আছে। তুমি যদি শুনতে চাও তবে বলতে পারি।

টাকা চাইবেন না তো আবার? আপনার তো কাউকে বুদ্ধি দিলেই টাকা চাওয়া অভ্যাস।
আরে, না বাপু। এই দুধের শিশুর জীবন বাঁচানোর জন্য পরামর্শ দিব তাতে কী আর টাকা চাইব? তুমি যদি খুশি হয়ে কিছু দাও আমার নিতে আপত্তি নাই।
থাক, আপনাকে আর পরামর্শ দেয়া লাগবে না।

রেগে যাও কেন? টাকা না দিলে দিও না। বাচ্চার মুখের দিকে চেয়ে টাকা মাফ। শুনো, পাশের গ্রামের একজনের বউয়ের বাচ্চা হয় না। ডাক্তার, বৈদ্য যথেষ্ট দেখিয়েছে। কিছুতেই কাজ হয় না। সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাচ্চা দত্তক নিবে। আমি আমার ছেলের মায়ের কাছে শুনেছি। তার বাপের বাড়ি তো ঐগ্রামে। এখন তুমি যদি ছেলে দত্তক দিয়ে দাও, তারা একটা সন্তান পাবে। তোমার ছেলেও প্রাণে বেঁচে যাবে। তোমার মন জ্বললে সময় করে মাঝে মাঝে গিয়ে দেখে আসবে।
কথাটা মন্দ বলেননি। কিন্তু পতি করে কী? আমার ছেলেরে খাওয়াবে কী?

এই বিষয়ে মিথ্যা বলতে চাই না। কাজ বলতে তেমন কিছু করে না। কিন্তু না খেয়ে উপোসও থাকে না। আল্লাহ কোনো না কোনোভাবে চালিয়ে নিচ্ছে। তুমি রাজি থাকলে আমি তাদের সাথে কথা বলে দেখতে পারি।
রাজি, তবে সেভাবে না।
কীভাবে?

আমার ছেলেকে তারা বড় করবে, খাওয়াবে-পরাবে; সব ঠিক আছে। আমি তাদের বেতন দিব। ছেলের বয়স সাত-আট হলেই আমি নিয়ে আসব।
দেখি আমি তাদের সাথে আলাপ করে। রাজি হলে তোমাকে জানাবো।

সেই থেকে শামীম মনুর ঘরে মানুষ হচ্ছে। মনুর মনে শামীমকে নিয়ে কুমতলব আছে। এই কুমতলবটা ফেঁদেছে রহিমা নিজে। ছেলে সাত-আট বছর বয়স হওয়ার আগেই কাজটা করতে হবে। গোপনে ভিটে বিক্রি করে দিয়ে অন্য কোথাও চলে যেতে হবে। যেন কেউ খোঁজে না পায়। বাচ্চা যেন ফেরত দিতে না হয়।

শামীম একটা বাঁশের কাটিতে কিছু খেজুরের দানা পরপর সাজিয়েছে। কিছু দূর থেকে অন্যদানা ছুঁড়ে মারছে। লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারলে নিজে নিজে তালি দিচ্ছে। কয়টা খেজুর দানা পড়েছে তা গুণে গুণে বাবাকে দেখাচ্ছে। মনু শামীমের চিবুকে চুমু এঁকে দিয়ে আবার খেলতে পাঠাচ্ছে। বলছে, ব্যর্থ হইস না বাপ। আমি কিন্তু কোথাও ব্যর্থ হই না। যেখানেই হাত দিই সোনা হয়ে যায়।

হ, আফনে যেখানেই হাত দেন সোনা হয়ে যায়। মাঝে মাঝে গরুও হয়ে যায়।
চুপ কর হারামজাদি। আমি যা করি সব তোদের জন্যই করি।
আমরা কি আফনেরে বলছি এসব করতে?

কথা কম বল, আমার সময় হয়ে এসেছে। বোতলে করে পানি দে। ইফতার ক্বাযা করতে চাই না।
যাচ্ছেন গরু চুরি করতে। সেখানে আবার ইফতার কী? গরু চোরের আবার ইফতার আছে নাকি।
তরে বললাম চুপ থাইকতে। মেজাজ খারাপ করস ক্যান? ইফতারের টাইমেই কি মাইর খাবিনি?
এই নেন, আফনের ইফতারের পানি।

শামীম তার বাবার মেজাজ খারাপ করে চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। বাবা-মা কী নিয়ে ঝগড়া করল কিছুই বুঝল না। শুধু এটুকু বুঝল মায়ের চেয়ে বাবার শক্তি বেশি। বাবার ধমক খেলে মাকে চুপ হয়ে যেতে হয়। বাবা মাকে মারতে পারে। মা পারে না। একটু পরেই খেজুর দানায় মনযোগ ফেরায়।

রাস্তায় বের হয়েই মনুর মনে চিন্তার দানা বাসা বাঁধে। কাজে বের হতেই ঘরের ল²ীর বাধা। এটা অসফলতার লক্ষণ। কাজে হাত দিবে কিনা বুঝতে পারছে না। ধরা খেলে আস্ত ঘাড় থাকবে না। জান নিয়ে ফিরতে পারবে কিনা তারও সন্দেহ আছে। না, বউটাকে আর মানুষ করা গেল না। এত করে বলে, কাজে যাওয়ার সময় যেন বাধা না দেয়। কে শুনে কার কথা! এরকম হলে সংসার করবে কী করে? মনু সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগছে। কী করবে বুঝতে পারছে না। কাজ করবে কি করবে না? বুঝতে পারছে না। কিন্তু তাদেরকে তো সে কথা দিয়ে রেখেছে। ইফতারের সময় যেন পানের বরজের আড়ালে থাকে। সে কোনো রকম পানের বরজ পর্যন্ত নিয়ে আসবে। বাকিটা তারা সামলে নিবে। জায়গা মতো নিয়া যাওয়া, বিক্রি, বিক্রি করতে না পারলে জবাই করে মাংস বিক্রি সবই তাদের কাজ। মনু শুধু ৩০ শতাংশ ভাগ পাবে। ধরা পড়ে মার খেলেও তারা এর সাথে জড়িত নয়। মনু তাদেরকে এই বিষয়ে চেনে না। তারাও মনুকে এ বিষয়ে জানে না। মার খেলে মনু একাই খাবে। এতে অন্যদের জড়ানো যাবে না। সামনে এগুবে কি এগুবে না বুঝতে পারছে না। এসব সাতপাঁচ ভাবলেও পা কিন্তু ঠিকই সামনের দিকে চলছে। হাতে ইফতারের পানির বোতল। জিহব্বায় আল্লাহ, আল্লাহ জিকির। যেন এবারে ধরা না পড়ে। এটাই জীবনের শেষ চুরি। আর জীবনেও করবে না। আল্লাহ যেন মালিকের হাত থেকে রক্ষা করে। যেন কেউ টের না পায়। যেন সহি সালামতে চুরিটা করতে পারে। মনু ধীর লয়ে এগিয়ে যাচ্ছে আর সমানে জিকির করছে। এরকম সে প্রায়ই করে। প্রতিটি চুরিই তার জীবনের শেষ চুরি। প্রতিবারের সেই মহান আল্লাহর সাহায্য কামনা করে। মালিকের চোখের আড়ালে যেন কাজ সারতে পারে সেজন্য মাজারে সিন্দি মানত করে। অবশ্য মাজারের পীর-আউলিয়ার সাথে সে কখনও বিয়াদবি করে নাই। যখন যা মানত করে, কাজ শেষে তা পূরণ করে।

ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে। বৃষ্টিতে চুরি করতে সুবিধা। কেউ বাইরে বের হয় না। গরুকে কোনো রকম গোয়ালের বাইরে আনতে পারলেই হয়। গায়ে বৃষ্টির ফোঁটা পড়লেই গরু বাধ্য হয়ে যায়। যেদিকে নির্দেশনা দেয় সেদিকেই চলতে শুরু করে। দ্রæত হাঁটে। ঝামেলা করে না। ছাগল হলে সমস্যা হয়। মাঝেমাঝে ম্যা ম্যা ডাক ছাড়ে। এটা বিরক্তকর। মনু জায়গামত এসে দাঁড়িয়েছে। মানুষের আনাগোনা কমে এসেছে। মসজিদ থেকে সাইরেন ভেসে আসছে। সম্মানিত রোজাদ্বারগণ, ইফতারের সময় হয়েছে। আপনারা ইফতার করে নেন। সাইরেন বাজতেই মনু মালিকের গোয়ালঘরে ঢুকে পড়ে। গরু লেজ নেড়ে নেড়ে মশা তাড়াচ্ছে। মনু গরুর গায়ে হাত রাখে। আলতো করে হাত বুলায়। কোমর থেকে ইফতারের পানির বোতলটি বের করে আনে। বোতলের চিপি খুলে মুখের কাছে ধরে। মসজিদের মুয়াজ্জিনের সাথে সাথে ইফতারের দোয়া পাঠ করে। আল্লা হুম্মা লাকা সামতু…। গরুর রশি খুলে গোয়ালঘর থেকে মাথা বের করে। এদিক সেদিক দুয়েকবার তাকায়। যেন কেউ টের না পায়। গরুর মালিক বউ বাচ্চা নিয়ে ইফতার করতে বসেছে। তাদের গলার স্বর ভেসে আসছে। কেউ কেউ লেবুর শরবত চাচ্ছে, আর কেউ ট্যাং। মনুর বাম হাতে গরুর দড়ি ধরে আছে। ডান হাতে গরুর পিঠে হাত বুলাচ্ছে পরম মমতায়। যেন বশ্যতা স্বীকার করে। নির্দেশনা অনুযায়ী পায়ে হাঁটে। বৃষ্টির ফোঁটা ক্রমশ বাড়ছে। গেরস্ত ইফতারে মনযোগ দিয়েছে। বাড়ির আশেপাশের অন্যান্যরাও নিশ্চয় ইফতার করতে বসে গিয়েছে। এখনই সুযোগ সামনে এগিয়ে যাওয়ার। কথায় বলে সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়। না, আর দেরি করা ঠিক হবে না। এসব কাজে দেরি করতে নেই। মনুর জিহব্বা ক্রমশ জিকির করছে। যেন কেউ দেখতে না পায়। যেন সবার চোখ ফাঁকি দেয়া যায়।

রহিমা বানু শামীমকে নিয়ে ইফতার করতে বসেছে। ছেলের প্লেটে ছোলা তুলে দিচ্ছে। আরেকটা প্লেট ধুয়ে রেখেছে। রহিমার ইফতার শেষ হওয়ার পথে। মনু এখনও আসেনি। যেই কাজে গিয়েছে, আসতে হয়তো সময় লাগতে পারে। না এলে মেম্বারের বাড়িতে যেতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের হাত থেকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। মুভ ক্রিম বাসায় আনা আছে। গরম করে গায়ে মালিশ করে দিতে হবে। গতবারের মতো যেন কেউ না মারে। মনে মনে প্রার্থনা করছে রহিমা। সেবারের মার খেয়ে টানা তিনদিন জ্বর ছিল। নড়াচড়া করতে পারেনি। বাজারে যেতে পারেনি, বাজার করতে পারেনি। ধরা খেলে লজ্জায় জান যায় অবস্থা হয়।

মা, আমারে আরও দাও।
আর নাই বাবা। যা আছে তা তোর বাবার জন্য। তোর বাবা এলে খোঁজ করবে। তখন দিতে হবে। প্লেট দে, আমি কিছু মুড়ি দিচ্ছি।
আচ্ছা, তাই দাও। মা, বাবা কোথায় গেছে?

শামীমের প্রশ্নের কোনো উত্তর রহিমার নেই। চুপ করে থাকে। কী উত্তর দিবে বুঝতে পারে না। একটা বাচ্চা ছেলের কাছে চুরির বিষয়ে সরাসরি বলা যায় না। সে বাইরে গেলে মুখ দিয়ে বলে দিবে। চুরি কী জিনিস সে জানে না। জানলে বাবা হিসেবে লোকটাকে ঘৃণা করবে। আর না হয় সেও চুরি বিদ্যা মাথায় নিবে।

তোর বাবা এলে তাকে জিজ্ঞেস করিস। আমি জানি না কোথায় গেছে।
আচ্ছা, মা বাবা কখন আসবে?
একটু পরেই আসবে। অপেক্ষা কর।

বাইরে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। মনেহয় লোকটা এসেছে। এত তাড়াতাড়ি কাজ সারে কেমনে আল্লাহ জানে। লোকটার হাতে জাদু আছে। চুরি করতে বেশ পটু।

অই দেখ তোর বাবা এসেছে।
কই আমার বাবা কই? আমার সোনা কই?

আহ্লাদী ডাক ছেড়ে ছেড়ে মনু ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে। দরজায় টোকা দিয়ে খুলতে বলে।

এত তাড়াতাড়ি ক্যামনে সম্ভব করলেন?
বলছিলাম না, আমি ধরলেই সোনা হয়ে যায়।
হ্যাঁ, তা তো আপনার পেছনের মানুষগুলো দেখেই বুঝতে পারছি।