ইয়াবা ব্যবসায় নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ

রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার প্রতিযোগিতা

নিজস্ব প্রতিবেদক

20

বাকলিয়া থানার এসআই খন্দকার সাইফুদ্দিন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা ব্যবসা করে আসছেন। এ ব্যবসা করার জন্য বাসাও ভাড়া নিয়েছেন। ওই বাসা থেকে ১৪ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে র‌্যাব। এসময় ইয়াবা বিক্রির ২ লাখ ৩১ হাজার টাকাও উদ্ধার করা হয়। এছাড়া গত শুক্রবার স্টেশন রোড থেকে মো. বেলাল নামে মসজিদের এক মুয়াজ্জিন ও আবুল বশর নামে হেফজখানার এক শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এভাবেই নানা শ্রেণি-পেশার লোকেরা ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে। রাতারাতি কোটিপতি বনে যাওয়ার লোভেই এ ব্যবসায় নেমেছেন তারা। ছাত্র, শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, পুলিশ, ধর্মীয় নেতা, গৃহবধূ, গাড়ি চালক, হেলপার, সরকারি কর্মচারি- কেউ বাদ নেই। ধরাও পড়ছেন তারপরও কমছে না। এ ব্যবসা করে দিন মজুর থেকে শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন অনেকে। সরকারের কঠোর অবস্থান, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান- কিছুতেই যেন কিছু হচ্ছে না। ব্যবসা চলছে তার গতিতেই!
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইয়াবা বিকিকিনি একটি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। অন্য কোনো পণ্য যেমন বিক্রি করে টাকা আয় করে ইয়াবাও যেন তেমন একটি ব্যবসা। টাকার লোভে উঠতি বয়সী যুবক-কিশোরও এ ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছে। জানা যায়, সর্বশেষ গত শুক্রবার রাতে স্টেশন রোডে গ্রেপ্তার করা হয় রামু এলাকার কাউয়ারকুপ জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন মো. বেলাল ও রামু হেদায়েতুল উলুম হেফজখানার শিক্ষক আবুল বশরকে। গত সোমবার কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় গৃহবধূ মাহমুদা খাতুন ও ১৮ বছরের তরুণ নুরুল আলমকে। সূত্র জানায়, র‌্যাব, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে পুলিশের এসআই, এএসআই, কনস্টেবল, সাংবাদিক, আইনজীবী, গাড়ি চালক, হেলপারসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষকে ইয়াবাসহ আটক করেছে। ইয়াবা ব্যবসায় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ব্যাপকভাবে জড়িয়ে পড়েছে। তারা লেখাপড়ার পাশাপাশি ইয়াবা ব্যবসা করে অর্থ আয়ে মত্ত। পাইকারি বিক্রেতাদের কাছ থেকে ইয়াবা কিনে তা বিক্রি করে অনেকেই তরুণ বয়সেই বনে গেছে কোটিপতি। তারা তাদের সহপাঠিসহ এলাকার পরিচিত ক্রেতাদের নিকট বিক্রি করে এসব ইয়াবা।
বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীও নেমেছে ইয়াবা ব্যবসায়। তারা বড় ভাইদের সঙ্গে মিলে এ ব্যবসা করছে। এসব নেতা-কর্মী হাজার হাজার ইয়াবা বিকিকিনি করছে। নগরীতে এরকম হাজারখানেক নেতা-কর্মী রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। কিন্তু নানান কারণে তাদের আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় লোক হওয়ার মানসিকতা রয়েছে অনেকের। ইয়াবা ব্যবসা করে সহজে বড় লোক হওয়া যায় বলে তাদের ধারণা। এই ধারণা থেকেই অনেকে ইয়াবা ব্যবসায় নেমেছে। কিন্তু এ ব্যবসা যে একদিন তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে এটা তাদের জানা নেই। টাকার মোহে পড়ে এ ব্যবসা করলেও একদিন তারা নিজেরাই শেষ হয়ে যাবে।
সূত্র জানায়, পরিবহন ব্যবসার আড়ালেও ইয়াবা ব্যবসার সম্প্রসারণ ঘটেছে। পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা এই ব্যবসা কররে- বিভিন্ন সময় সংবাদ মাধ্যমের কল্যাণে জানা যাচ্ছে এসব ভয়াবহ তথ্য। সম্প্রতি শ্যামলী পরিবহন ও গ্রীণ লাইন চেয়ারকোচ থেকে কয়েক দফায় ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। আটক করা হয়েছে চালক-হেলপারকে। কাভার্ডভ্যান, ট্রাকেও বিশেষ কায়দায় ইয়াবা পাচারের ঘটনা ধরা পড়েছে একাধিকবার।
ইয়াবা কারবারের দায়ে ধরা পড়ছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও। সম্প্রতি সীতাকুন্ড থেকে প্রাইভেট কারসহ আটক হয়েছেন চকরিয়া থানার এক এসআই। তার কাছ থেকে দুই লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। পরবর্তীতে কক্সবাজার ডিবি পুলিশের এক এসআইয়ের বাসা থেকে ৭ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। ইয়াবাসহ অন্তত ২৫ থেকে ৩০ জন পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছেন এ পর্যন্ত।
এই তালিকা থেকে বাদ যায়নি সাংবাদিকও। মাইক্রোযোগে ইয়াবা নিয়ে ঢাকা যাওয়ার সময় চট্টগ্রামে ৪০ হাজার পিস ইয়াবাসহ ধরা পড়েন এক সাংবাদিক ও তার স্ত্রী। এনিয়ে ৫ জন সাংবাদিক ধরা পড়েছেন।
সূত্র জানায়, দু’ধরনের ব্যবসা করেন তারা। কেউ সরাসরি ব্যবসায় জড়িত আর কেউ বহন করে। বহনের বিনিময়ে মোটা অংকের টাকা পায় বলে ঝুঁকির কথা জেনেও কাজ করে অনেকে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে এই ইয়াবা ব্যবসা। মিয়ানমারের ৬০ টাকার এই ট্যাবলেট পাচার হয়ে এসে রাজধানী ঢাকায় বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায়। চট্টগ্রামেও একই দরে বিক্রি হচ্ছে। সরবরাহ কম ও চাহিদা বাড়লে মাঝে মাঝে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।
র‌্যাবের পরিচালক লে. কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ইয়াবা জাতিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এ ব্যবসা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। জেনেশুনেও কিভাবে তাতে ঝুঁকে পড়ে তা আমাদের বোধগম্য নয়। মাদকের এই বিস্তার রোধে পরিবার থেকে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। সন্তানরা কোথায় যায় কি করে খবর নেয়া দরকার মা-বাবার। তিনি বলেন, মাদক কারবারিরা শান্তিতে আর এই ব্যবসা করতে পারবে না। মাদকের আগ্রাসন রোধে আমরা বদ্ধপরিকর। আইনের আওতায় আনা হবে ইয়াবাসহ মাদক কারবারীদের।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক তপন কান্তি শর্মা বলেন, ইয়াবা সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। ছোট ছোট কিশোররা পর্যন্ত ইয়াবা ব্যবসা করছে। তাদের মধ্যে কোটিপতি হওয়ার প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। এ প্রতিযোগিতা থেকে সরে আসতে হবে। তিনি বলেন, মাদক নিয়ে কোনো ধরনের ছাড় নয়। মাদকের প্রতিটি স্পটেই অভিযান চালাই আমরা। এধরনের অনেকে ধরাও পড়েছে।