ইয়াবার আসক্তির চাইতে স্মার্ট ফোনের আসক্তি কম নয়

আবদুল হাই

11

Addicted এবং Devoted দু’টি পরস্পর বিরোধী শব্দ। Addicted শব্দটার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে আসক্ত হওয়া অর্থাৎ মন্দকাজে অভ্যস্ত হওয়া। যেমন He is addicted to drink অর্থাৎ সে নেশা জাতীয় পানীয়তে আসক্ত। Devoted to এর অর্থ হচ্ছে অনুরক্ত। সোজা বাংলায় ভালো কর্মের প্রতি অভ্যস্থ। তাহলে অভ্যাসের দু’টি ধারা একটি হচ্ছে আসক্ত অন্যটি হচ্ছে অনুরক্ত। কেউ যদি বলে আল্লাহর হুকুম ছাড়া কোন কিছুই হয় না। এটা একটা আন্তঃধারণা। পৃথিবীতে যারা আল্লাহর নির্দেশিত পথে অনুরক্ত তাদের মাধ্যমে ভালো কাজগুলো সম্পন্ন হয়। সেক্ষেত্রে আল্লাহ রহমত বিদ্যমান। শেষ বিচারের দিনে তাঁরা মুক্তাকী বলে বিবেচিত হবে এবং পুণ্য কাজের বিপরীতে পুরস্কৃত হবে। পক্ষান্তরে শয়তানের ইন্দনে প্ররোচিত হয়ে যারা কুকর্মে আসক্ত থাকে যেমন মদ্যপান, নেশা করা, জুয়া খেলা, জেনা-ব্যভিচার করা, আল্লাহর অস্তিত্বকে অবিশ্বাস করা এসব কাজের হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট হচ্ছ শয়তান। তারই প্ররোচনায় খোদ আল্লাহর নির্দেশ উপেক্ষা করে আদম হওয়া নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণ করে বেহেশত থেকে তাড়িত হয়ে দু’জন দু’জায়গায় পৃথিবীতে নিক্ষেপিত হয়, আমরা সেই আদম হওয়ারই উভয় পুরুষ। এ বিশ্বে কেউ কেউ শয়তান প্ররোচিত হয়ে মন্দ কাজে অফফরপঃবফ আবার কেউ কেউ আল্লাহর হেদায়েত পরিপুষ্টি হয়ে ভালো কর্মে উবাড়ঃবফ বা অনুরক্ত। অবশ্য আল্লাহর সুপ্রীম কোর্টে পাপ-পুণ্যের বিচার সংগঠিত হবেই শেষ বিচারের দিনে। একজন ব্যক্তি নিজের জন্য নিজেই উত্তম সাক্ষী। পক্ষান্তরে সে যদি বিবেক বুদ্ধি দ্বারা ভালো মন্দ যাচাই বাছাই করে জীবন অতিবাহিত করে তা হলে নিজের জন্য উত্তম বিচারক। আজকে সে বিষয়ে লেখা শেষ করার কথা ছিলো হঠাৎ করে তা স্থগিত করে এ লেখাটা পাঠকদের জন্য নিবেদন করছি।
গত রাতে আমার তাক পড়েছিলো এক সালিশি মিমাংসার বৈঠকে। ছোট্ট একটি সংসার। এক মা আর দুই ছেলে সন্তান। ওদের বাবা দুবাই। তবে পারিবারিক কষ্ট বা দুঃখ দৈন্যতার কোন খবরপাতি নেই। বড়ো ছেলে চাকুরী করে পোশাক শিল্পে। হাঁড়ভাঙ্গা খাটুনি করে। দু’পয়সা বাড়তি রোজগারের নজ্য ওভার টাইম করে প্রায়। বাড়ি ভাড়া ও পারিবারিক খরচ ছাড়াও ছোট ভাইয়ের পড়ার জন্য খরচাপাতির যোগান দেওয়া কত যে দুর্বিষ। তারপর ও টুনকো বিষয় নিয়ে বড়ো ভাইকে অশ্রদ্ধা এবং আলাপচারিতা বন্ধ রাখা কত যে অমার্জনীয় অপরাধ বলাবহুল্য। যাক বিরোধ মিটিয়ে একটা সৌহার্দ্যরে সেতু নির্মাণে সক্ষম হয়েছি তবে তা কতটুকু টেকসই সময়ের অপেক্ষায় আছি।
পেটে ভাত থাক্ আর না বা থাক এখন প্রত্যেক পরিবারে জনপ্রতি একটা মুঠোফোন চাই। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গর্বচ্ছলে বলেছিলেন আমরা ১৬ কোটি মানুষের হাতে মুঠোয় ১০ কোটি মুঠোফোন তুলে দিতে সক্ষম হয়েছি। মনে হয়, মাতৃকোলের দুধের বাচ্চারা মুঠোফোনে অভ্যস্ত হয়ে পেটের ক্ষুধায় ক্রন্দনের কথা বেমালুম ভুলে গেছে।
ছোট ভাই সামনে মেট্রিক দেবে। পড়ালেখার ধারে পাশে নেই। হাতে মুঠোফোন নিয়ে ছাদে ধ্যানমগ্ন। এ ধন্যানমগ্নতা ভাঙতে বড়ো এই বিরোধিতা করে এতেই বিরোধে সূত্রপাত। ও বেশভুষাতে আপত্তিকর পরিবর্তন লক্ষনীয়। যাক ওসব। রোবারে পূর্বদেশ (১৯ মে ২০১৯) শেষ পৃষ্ঠার এক কোণে একটি সংবাদ শিরোনাম ‘সোশ্যাল মিডিয়ার আসক্তি মাদকের চেয়েও ভয়াবহ’ সবাদটা আমাদের দারুণভাবে উৎসাহিত করেছে আজকের নিবন্ধটা লেখতে। বাংলাদেশের মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, স্যোশাল মিডিয়ার কারণে মানুষের মধ্যে অস্থিরতা বেড়ে গেছে। ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে অল্প বয়সী ছেলেমেয়ে থেকে শুরু করে তাদের অভিভাবকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে মুঠোফোন আসক্তি এবং মানসিক বিপর্যয়। যার জন্য পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় সমস্যা সৃজন হয়েছে। এক সময়ে মনিং শো ইংলিশ চলচ্চিত্রের ব্যানার বা পোস্টারে লখিত থাকতো ONLY FOR ADUIT শুধু মাত্র প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য। জানি না, এ বিজ্ঞপ্তি অত্যাধিক আকর্ষণ বাড়াবার জন্য কিনা বা ব্যবসায়িক টু পাইস ধান্দা করা জন্য কিনা, তবে দৃষ্টিগোচর হতো Adult এর চাইতে Non adult-দের ভিড় বেশি হতো। টিকে কালোবাজারিদের পোয়াবাড়ো অবস্থা। যেকোন খারাপ বিষয়ের ওপর কৌতুহলী প্রবণতা বেশি। এককালে বুড়ো বুড়িদের একটা প্রবাদ ছিলো ‘ঘরে ঘরে সিনেমা বায়োস্কোপ চালু হবে আখেরি জমানায়। এখন ঘরে ঘরে নয়, পকেটে পকেটে হাতের মুঠোয় সিনেমা বায়স্কোপ এবং পর্ণোছবি। শিশু-কিশোরদের গায়ে দক্ষিণা বায়ু প্রবাহিত হবার পূর্বেই তাবাল বা সেয়ানা হয়ে উঠেছে। এখন নববধূকে অজ্ঞাত বিষয়ে তালিম দিতে লক্ষবুড়ি সঙ্গে দিতে হয় না। স্কুল পড়ুয়া কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা স্বীয় পাঠ অভ্যাস শিকায় তুলে, দিনে ও রাতে স্মার্ট ফোনের ধ্যানে নিমগ্ন। এ ধ্যান ভঙ্গ করে চা নাস্তা ও আহার নিদ্রার প্রতি কোন তোয়াক্কাই করে না। এক্ষেত্রে আমার কোন না থাকলেও লেখার জন্য দেখা।
ষাটের দশকে গাঁজা, বা মারিজুয়ানা হাতের মধ্যে মুড়িয়ে মুড়িয়ে গাঁজার কলকি পুড়িয়ে সিদ্ধা টানার প্রচলন ছিলো। কয়েক টানে চক্ষু রক্ত বর্ণ হতো। এটা আলাদা ধরনের নেশা। গাঁজাখোরদের একটা উক্তি সিদ্ধি টানলে বুদ্ধি বাড়ে। এরপর আফিন এবং বাং এর প্রচলন চালু হয়। আমাদের ফিরিঙ্গীবাজার এলাকায় গাঁজা আফিম এবং মদের বিপণন কেন্দ্র ছিলো। পরবর্তীতে গণরোষের শিকার হয়ে এ মাদকদ্রব্য বিপণন কেন্দ্রগুলো উচ্ছেদ হয়।
সত্তর দশকের দিকে ম্যানডেক্স নামক টেবলেট মাদক দ্রব্যের অন্যতম বিকল্প হিসেবে তরুণদেরকে আকর্ষিত করে। পরবর্তীতে কফের সিরাপ ফ্যানসিডেল মাদক সেবিদেরকে আকর্ষিত করে। এরপর চালু হয় প্যাথড্রিন ইঞ্জেকশান, হিরোইন এবং ইয়াবার প্রচলন শুরু হয়। এসব দ্রব্যের বিপণন কারীরা এসবের বিপণন করে রাতারাতি মালধার বনে যায়। সমাজের এলিট শ্রেণীতে পরিণত হয়। এরা খেলাধুলায় এবং বিভিন্ন টুর্ণামেন্টে পৃষ্ঠপোষকতা করে প্রধান অতিথি আসন অলঙ্কৃত করতে ও দৃশ্যমান হয়। বর্তমানে ইয়াবার ব্যবহার ভয়াবহরূপে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার ইয়াবার বিরুদ্ধে অনড় অবস্থানে আছে।
বর্তমানে ইয়াবার যে Addiction বা আসক্তি এর চাইতেও স্যোশ্যাল মিডিয়ার আসক্তি কোন অংশে কম না। স্মার্ট ফোনের স্কীনে এক নাগারে দৃষ্টি রাখা কিশোর-কিশোরি, তরুণ-তরুণী এবং বয়স্ক দম্পতিদের মধ্যে বাহুল্যে পরিণত হচ্ছে। কিভাবে মূল্যবান সময়গুলো অনর্থক ক্ষেপণ হচ্ছে কিভাবে আপত্তিকর দৃশ্যাবলী অবলোকন করছে এব্যাপারে কারো ডাক দোহাই নেই। শিক্ষার্থীরা তাদের পাঠ অভ্যাসকে গৌণভেবে দু’চোখ খোলা রেখে রাত জেগে শুধু স্মার্টফোনের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখে ঐ ফোনে ছোট একটা মেমোরি কার্ড লাগিয়ে পর্ণছবি দর্শনে কিশোর কিশোরীরা ব্যস্ত থাকে। ONLY FOR ADUIT টা ONLY FOR TIN AGE এ রূপান্তরিত হয়েছে। এ ব্যাপারে তারা এতো Addiction বা আসক্তি এবং বেপরোয়া এজন্য তারা ধরাকে সরাজ্ঞান করেনা। চক্ষু লজ্জা ভয়ভীতি বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই।
Face book status এর মাধ্যমে তরুণ-তরুণীর মধ্যে এমন ধরনের আপত্তিকর সংলাপ চলে যেন লজ্জা শরমের বলাই নেই। স্বামীকে অধিকার বঞ্চিত করে একাধিক পর পুরুষের সংগে বিশ্রী বাক্যালাপ যেন মুদ্রাদোষে রূপান্তরিত হয়েছে। বিয়ের পূর্বে আগাম অবৈধ সম্পর্ক গড়ে তোলার যে প্রবণতা। এতে করে দাম্পত্য জীবন দরুণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্বামীর প্রতি স্ত্রীর আনুগত্যতা এবং ভালোবাসা উচ্ছাস নেই, আদর যতেœর যেনভাটা পড়েছে। ছেলেকে বিয়ে করাতে দারুণ ভয় হচ্ছে। ছেলের জন্য মেয়ে দেখতে আগে আগে খোঁজখবর দিতে হবে মেয়ে মুটে ফোনে আসক্ত কিনা ? আড়াই বছরের দাম্পত্য জীবন স্রেফ লোক দেখানো জীবন। ওদের দীর্ঘ জীবনে কোন সন্তান আসেনি। কেন আসেনি তা নাইবা বল্লাম নিহর স্বামীটা স্মার্ট ফোনের কঠিন শিকার স্ত্রীর Face book status এর কারণে। স্বামী মান সম্মানের চিন্তা করে বদহ্জমের বিষয়টা খুব কষ্টে হজম করেছে। স্বামী শেষ পর্যন্ত স্ত্রীকে ডিভোর্স করেনি। শুধরাতে প্রাণপণ চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়।। যাকে দেখরে মনে হবে ও ভাজা মাছটা যেন উল্টিয়ে খেতে জানেনা। নিয়তির লিখন বলা নেই কওয়া নেই সবার দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে মেয়েটি চলে গেলো পৈত্রিক নিবাসে। এমন অনেক উদাহরণ আরো বিদ্যমান দুই ভাইয়ে বিরোধ মেটাতে সক্ষমতার কথা উল্লেখ করলে ও শেষমেশ আমার সে উদ্যোগটাও ব্যর্থতা নিমজ্জিত হয়। ছোট ভাই তার মা’কে সাফ জানিয়ে দেয় ঐ ‘স্মার্ট ফোন ফেরত না দিলে আমি আগের মতোই চলবো। এ ফোন ফেরতে ইস্যুটা আবার পত্রিকার দুর্ঘটনার কোন শিরোনামে যাতে রূপ না নেয় এবং স্বামী হওয়ার চাইতে নিজেকে রক্ষা করতে অন্যায় আবদারের কাছে নতি স্বীকার করলাম। আসলে অবস্থাদৃষ্টে এটুকু ভাববার সময় এসেছে ‘চাচা আপন জান বাঁচা’।

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট