ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটি সমাবর্তনে নতুন ধারার সূচনা

তানভীর জাকারিয়া

33

সকাল ৯.৩০। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই গাউন-হ্যাট পরিহিত গ্র্যাজুয়েটরা সঙ্গে দুজন অভিভাবককে নিয়ে একে একে প্রবেশ করছে ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটি (ইডিইউ) ক্যাম্পাসে। সকাল থেকেই আনন্দ-উচ্ছ্বাসের আবহে মেতে আছে সাড়ে ৬শ গ্র্যাজুয়েট। এ দৃশ্য ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির প্রথম সমাবর্তনের। যেন পরিবার-বন্ধু পরিবেষ্টিত এক মিলনমেলা! আর তা হবে না-ই বা কেন! এ যে গ্র্যাজুয়েটদের জীবনের স্বপ্ন পূরণের সেই মহার্ঘ দিন!
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য সমাবর্তন নতুন কিছু না হলেও বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক নতুনের সমাহার ঘটিয়ে ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটি (ইডিইউ) আয়োজন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়টির ‘১ম সমাবর্তন ২০১৯’। বলা যায়, ইডিইউর হাত ধরে সমাবর্তনে নতুন যুগের শুরু হলো এদেশে। ২৮ ফেব্রæয়ারি প্রাক সমাবর্তন সমাবেশের মধ্য দিয়ে শুরু হয় চার দিনের কর্মসূচি। ১০ মার্চ রবিবার অনুষ্ঠিত হয় প্রধান আয়োজন। ১১ মার্চ গালা নাইটের মধ্য দিয়ে শেষ হয় জাঁকজমকপূর্ণ এ উৎসবের।
সমাবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু হলো গ্র্যাজুয়েটরা। তাদের অর্জনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতেই এ আয়োজন। ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির প্রথম সমাবর্তনে তাই গ্র্যাজুয়েটদের সুযোগ-সুবিধা ও চাহিদার কথাই সবচেয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সন্তানের সাফল্যে গর্বিত পিতা-মাতা দুজনকেই অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়ার মাধ্যমে যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শনই ছিলো ইডিইউর প্রধানতম লক্ষ্য। অনুষ্ঠানের ভিড়ের মধ্যেও কোনো প্রকার বিঘœ ছাড়াই যেন তারা সন্তানের বিশেষ মুহূর্তটির সাক্ষী হতে পারেন, তাই সমাবর্তনের অনুষ্ঠানস্থল বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে গড়ে তোলা হয় উঁচু বেদী।
প্রথম সমাবর্তনে নতুনত্ব আনয়নে কোনো কমতি রাখেনি বিশ্ববিদ্যালয়টি। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটরা ইডিইউর ফ্যাকাল্টি ও অ্যাডমিনস্ট্রেশনে রয়েছেন। তাদের সমাবর্তনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ইডিইউ আয়োজন করেছে এই সমাবর্তন। ইওরোপ-আমেরিকা ও বাংলাদেশের সমাবর্তনের ধারার সমন্বয়ে এক মৌলিক আয়োজনের সাক্ষী হয়েছে চট্টগ্রাম।
১০ মার্চের মূল অনুষ্ঠান সকাল ১০টায় জাতীয় সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সিকান্দার খানের স্বাগত বক্তব্যে অনুষ্ঠানটি মূল পর্বে প্রবেশ করে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য ও মহামান্য রাষ্ট্রপতির পক্ষে প্রধান অতিথি ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি।
গ্র্যাজুয়েটদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, শিক্ষাজীবনের এই পর্যায়ে এসে তোমরা যে ডিগ্রি অর্জন করেছো, তাতে তোমাদের পরিশ্রমের পাশাপাশি রয়েছে তোমাদের অভিভাবক, শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় সর্বোপরি রাষ্ট্রের সীমাহীন ত্যাগ। গ্র্যাজুয়েটরা গভীর কর্তব্যবোধের সাথে একজন নাগরিকের যথাযথ ভূমিকা পালন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন মন্ত্রী।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অভিভাবক সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বাংলাদেশে চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল মান্নান ছিলেন বিশেষ অতিথি। তিনি বলেন, অনেকে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাকলে চাকরি পাওয়া যায়। এটা ভ্রান্ত ধারণা। আমাদের শিক্ষা সার্টিফিকেটধারী হয়ে গেছে, কর্মধারী নয়। কিন্তু সকলের মনে রাখা প্রয়োজন, যার দক্ষতা আছে, চাকরি তারই পিছু নেয়।
সমাবর্তন বক্তা হিসেবে অনুষ্ঠানে যোগ দেন একুশে পদকপ্রাপ্ত জননন্দিত কথাসাহিত্যিক ও কালের কণ্ঠের সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন। প্রিয় এই লেখককে কাছে পেয়ে সেলফি-অটোগ্রাফ নিতে তাই বিন্দুমাত্র ভুল করেনি ইডিইউভিয়ানরা। নিজের লেখালেখি, বিভিন্ন গল্প-উপন্যাস নিয়ে তার পাঠকদের নানা প্রশ্নেরও উত্তর দেন তিনি। অনুষ্ঠানে সমাবর্তন বক্তব্যে তরুণ গ্র্যাজুয়েটদের উদ্দীপিত করতে তিনি বলেন, মানুষ বড় হলে দেশ বড় হয়। আর দেশ আলোকিত হয় মানুষ আলোকিত হলে। জন্মে যে বাংলাদেশকে দেখেছ, মৃত্যুর সময় যেন তার চেয়ে বড় বাংলাদেশকে দেখে যেতে পারো, সেই স্বপ্ন দেখতে হবে তোমাদের।
নিজের প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সবসময় নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যান, সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমান এই মহার্ঘ আয়োজনে না এসে পারেননি। তিনি বলেন, দেশের জন্য, মানুষের জন্য এই প্রতিষ্ঠানে অনেক ভালো ভালো গবেষণাধর্মী কাজ হোক, সেটাই সকলের কাম্য এবং আমারও কাম্য। সকলের সহযোগিতা ছাড়া কোনো ভালো বড় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সেটির প্রয়োজন আরো বেশি বলে আমার মনে হয়।
তিনি আরো বলেন, অতীতের দিকে যখন তাকাই, তখন মনে পড়ে আমার ছেলে সাঈদ আল নোমান এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব নিয়ে আসে, যা চট্টগ্রামসহ সারাদেশে উন্নত মানবসম্পদ গড়ে তুলবে। আজ অত্যন্ত গৌরবের সাথে আমি বলতে পারি, আমাদের সমস্ত পরিশ্রম এবং সাধনা সার্থক হয়েছে।
ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির উপাচার্য সিকান্দার খান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় তার দালান-কোঠার মাধ্যমে পরিচিত হয় না। পরিচিত হয় তার শিক্ষকমন্ডলী ও শিক্ষার্থীদের দ্বারা। তাই প্রতিষ্ঠানের সুনাম যাতে ক্ষুণ্ণ না হয়, সেভাবে নিজেদের পরিচালিত করার অনুরোধ জানান তিনি।
ইডিইউর প্রতিষ্ঠাতা ভাইস চেয়ারম্যান সাঈদ আল নোমান তার বক্তব্যে অভিভাবকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ইডিইউর উপর আস্থা রাখায় আমরা কৃতজ্ঞ। অভিভাবকদের সম্মান জানানোই ছিলো এই সমাবর্তনের অন্যতম লক্ষ্য। সম্মানিত করতেই আর সবার চেয়ে একটু উপরে স্থান দিতে চেয়েছি আপনাদের। তাই আপনাদের বসার জায়গাটি একটু উঁচু করে নির্মাণ করেছি। আপনাদের সম্মানিত করতে পেরে ইডিইউ আজ গর্বিত।
বক্তব্য শেষে তার নেতৃত্বে সমাবর্তনের প্রথানুযায়ী গ্র্যাজুয়েশন ক্যাপ উপরে ছুঁড়ে মারার মাধ্যমে শিক্ষাজীবনের ইতি টানে গ্রাজুয়েটরা।
তিন সহস্রাধিক মানুষের এই আয়োজনে গ্র্যাজুয়েট ও তাদের অভিভাবকসহ অতিথিদের আপ্যায়নের কোনো ত্রুটি রাখেনি ইডিইউ কর্তৃপক্ষ। সকালে ক্যাম্পাসে প্রবেশের পর নাশতা এবং মধ্যাহ্ন বিরতিতে দুপুরের খাবার দেয়া হয় সবাইকেই।
ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির এ সমাবর্তনের অন্যতম আকর্ষণ ছিলো এর মেডেল। আমেরিকায় গ্র্যাজুয়েটদের মেডেল দেয়া হলেও উচ্চশিক্ষার জন্য প্রসিদ্ধ ইওরোপে এমনকি বাংলাদেশেও সমাবর্তনে মেডেল দেয়ার প্রচলন খুবই কম। কিন্তু ইডিইউ ডিস্টিংকশনসহ পাশ করা ১শ ২০জন গ্র্যাজুয়েটকে মেডেল দিয়েছে। যার মধ্যে ছিলো সুম্মা কাম লডে, মেগনা কাম লডে ও কাম লডে- আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সর্বোচ্চ এই তিনটি গ্রেডে উত্তীর্ণ হওয়া গ্র্যাজুয়েটরা। স্থায়িত্বের কথা মাথায় রেখে গোল্ড, নিকেল ও ব্রাস এর মিশ্রণে আন্তর্জাতিক মানে প্রস্তুতকৃত তিন ধরণের মেডেলের বর্তমান অধিকারী ৩.৫০ বা তদুর্ধ্ব গ্রেড পেয়ে স্নাতক শেষ করা ইডিইউভিয়ানরা।
ইডিইউ তাদের সর্বোচ্চ গ্রেড অর্জনকারীদের স্বীকৃতিস্বরূপ স্যুভেনির হিসেবে দিয়েছে একটি বিশেষ মেডেল। শুধু তাই নয়, এই মেডেল ও সার্টিফিকেটগুলো রাখার জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে কাঠের ফ্রেম। এছাড়া, সমাবর্তনের আগের দিনই রিহার্সাল প্রোগ্রামে অংশগ্রহণকারী সবাইকে দিয়ে দেয়া হয় গাউন। এই গাউনগুলো নিজেদের কাছে রেখে দেওয়ারও সুযোগ পেয়েছে অংশগ্রহণকারীরা।
মৌলিকত্ব, নতুনত্ব ও স্থায়িত্ব- এই থিমের উপর ভিত্তি করেই সাজানো হয় ইডিইউর সমাবর্তনের সব আয়োজন। মূল ক্যাম্পাসের পাশে খোলা মাঠের এক পাশে থাকা পাহাড়কে অবিকৃত রেখে গড়ে তোলা হয়েছে গ্রিক-রোমান কলোসিয়ামের ধাঁচে নতুন স্থাপনা, যেন নতুন ক্যাম্পাস!
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এই সমাবর্তনের অংশ হিসেবে ইডিইউ ক্যাম্পাসে আয়োজিত হয় প্রাক-সমাবর্তন সমাবেশ। এশিয়ার নোবেল খ্যাত রামোন ম্যাগসেসে পুরস্কারপ্রাপ্ত, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এতে অতিথি হয়ে আসেন। জনপ্রিয় এ ব্যক্তিত্ব তার মনোমুগ্ধকর বাচনশৈলীতে জীবনের গভীরতম উপলব্ধী ও শিক্ষার কথা শোনান এদিন, ইডিইউ গ্র্যাজুয়েটদের। তিনি বলেন, বেশিদিন বাঁচার কোন অর্থ নেই। আমি সম্পূর্ণভাবে বাঁচলাম কি না, সেটিই মুখ্য। জীবন একটাই। এই সময়ের মধ্যেই কেউ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ, কেউ অতি সাধারণ মানুষ। অর্থাৎ, সময় মুখ্য নয়, সময়ের ব্যবহারটাই মূল্যবান। আমরা আমাদের জীবনকে যতো ব্যবহার করবো, নিজের ভেতরে লুকায়িত ধূপে জ্ঞানের আগুন জ্বালিয়ে দিবো, ততোই তা অর্থবহ হয়ে উঠবে।
তিনি আরো বলেন, মানুষ স্বপ্ন দেখবে, উচ্চাকাক্সক্ষা নয়। কেননা, উচ্চাকাক্সক্ষার উপাদান হলো লোভ, প্রতিযোগিতা। মানুষ এগিয়ে যাবে অন্যকে ভালোবেসে, কাউকে পরাজিত করে নয়।
বলা যায়, এই প্রাক-সমাবর্তনের দিন থেকেই সমাবর্তনের আনুষ্ঠানিকতার শুরু। যার সমাপ্তি ঘটে ১১ মার্চ রাতে, গালা নাইটের মাধ্যমে। চট্টগ্রামের রেডিসন ব্লু’র মেজবান হলে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনের শুরুতেই নাভিদ মাহবুবের স্ট্যান্ড-আপ কমেডি। এরপর শোভন দাসের বাঁশিতে রাগ কৌশিকধ্বনী ও হংসধ্বনীর আমেজ যেন আচ্ছন্ন করে দেয় পুরো হল। পরে মঞ্চ কাঁপাতে ওঠে ওয়ারফেজ। যেন কেবল হেভি মেটালের এই উন্মাদনাই বাকি ছিলো গ্র্যাজুয়েটদের যাবতীয় অর্জনের উদ্যাপনে। কয়েক দশক ধরে বিখ্যাত ওয়ারফেজের গানগুলো ফ্যাকাল্টি-গ্র্যাজুয়েট-অ্যাডমিন, উপভোগে বাদ যায়নি কেউই। গানের তালে তালে কখন যে সমাবর্তনের একেবারে অন্তিম মুহূর্ত চলে আসে, কারো সেই খেয়ালই ছিলো না। কিন্তু রাতের শেষেই তো নতুন দিন। সেই দিনের জন্য রাতকে তো সমাপ্ত হতেই হয়!
সমাবর্তনকে ঘিরে বাংলাদেশে এ ধরণের আয়োজনের নজির আর দ্বিতীয়টি নেই। ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির কাছ থেকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের যে প্রত্যাশা, তা পূরণ করতে চেয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয়। শুধু মেডেল ও সার্টিফিকেট দেয়াই শেষ কথা ছিলো না, বরং গ্র্যাজুয়েটদের অর্জনের মাহাত্ম্য উপলব্ধী করানোই ছিলো সমস্ত আয়োজনের মূল লক্ষ্য। চার দিনের এ উৎসবে অংশগ্রহণ মূলত গ্র্যাজুয়েট ও অভিভাবকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা।