ইসলামে অজুর ফজিলত

195

অজুর আবিধানিক অর্থ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং পবিত্রতা অর্জন করা। পানি দ্বারা পবিত্রতা অর্জনকে শরীয়তের দৃষ্টিতে অজু বলা হয়। শরীয়তের পরিভাষায় পাক পবিত্র পানি দ্বারা শরীরের মুখমণ্ডল, হাত, পা এবং মাথা মাসেহ্কে অজু বলে। অজু নামাজের জন্য কর্তব্য। অজু ছাড়া নামাজ হয় না। মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! যখন তোমরা নামাজের জন্য প্রস্তুত হবে তখন তোমরা তোমাদের মুখমন্ডল ও হাত কনুইসহ ধৌত কর এবং নিজেদের মাথা মাসেহ কর এবং নিজেদের পা সমূহ টাখনু পর্যন্ত ধৌত কর’। (সূরা মায়েদা)।
অজু মুসলমানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। হাদিসে পাকে অজুকে বলা হয়েছে ঈমানের অংশ। নামাজের জন্য অজু ফরজ এব্যাপারে চার মাজহাবের ঐক্যমত রয়েছে।
বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আমার উম্মত কিয়ামতের এ অবস্থায় আহ্বান করা হবে যে, তাঁর হাত, পাও চেহেরাসমূহ অজুর পানি দ্বারা ধোয়ার কারণে উজ্জ্বল হবে। যে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন উজ্জ্বলতা বাড়াতে চায় সে যেন তা বৃদ্ধি করে নেয়। (সহীহ বোখারী)
কেউ যদি অজুর মাধ্যমে কিয়ামতের দিন উজ্জ্বলতা বাড়াতে চায় সে যেন যতœসহকারে উত্তম রূপে অজু করে। কারণ অজু না হলে নামাজ হবে না এবং কিয়ামতের দিন চেহেরাও মলিন থাকবে।
অজুকারীকে আল্লাহ পাক ভালোবাসেন এবং তাদের পাপ মার্জনা করেন। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যখন অজু করার সময় কোন মুসলমান কুলি করে তখন তাঁর মুখের সকল (সগীরা) গুণাহ কুলির পানির সাথে বেরিয়ে যায়। নাকের গুণাহ নাকের পানির সাথে বেরিয়ে যায়। চেহেরা ধোয়ার সময় তাঁর চেহেরা হতে এমনকি চোখের পাতার নিচ থেকে পর্যন্ত গুণাহ ঝরে পড়ে। যখন তাঁর দু’হাত ধোয় তখন উভয় হতে এমনকি হাতের নাখের নিচ হতেও গুণাহ বেরিয়ে যায়। আর যখন মাথা মাসেহ করে তখন মাথার ও কান হাত পর্যন্ত গুণাহ ঝরে পড়ে যায়। পা ধোয়ার সময় পাও পায়ের নীচ হতে গুণাহ বেরিয়ে যায়। তারপর সে যখন মসজিদে পৌঁছে নামাজ আদায় করে তা তাঁর জন্য অতিরিক্ত পুণ্য হিসেবে গণ্য হয়। (নাসায়ী শরীফ ও ইবনে মাজা)
অজুর মাধ্যমে যে ব্যক্তি গুণাহ মাপ করাতে চায় সে যেন অজুর সুন্নাত ও মোস্তাহাবকে যেন সম্মান করে। আমরা জানি তাওবা ব্যতীত কবিরা গুণাহ মাফ হয় না কিন্তু সগীরা গুণাহ মার্জনা হয়। তাই মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সগীরা গুণাহ মাফ করাতে ইরশাদ করেছেন, যে অজু করে এবং ভালোভাবে করে, অর্থাৎ সুন্নাত ও মুস্তাহাবসহকারে করে তার গুণাহসমূহ শরীর হতে বের হয়ে যায়। এমন কি তাঁর নখের নিচ হতেও বের হয়ে যায়।
অজু গুণাহ মাফ করে দেয় না, মানুষের মর্যাদাও বৃদ্ধি করে দেয়। হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘ আমি কী তোমাদের এমন একটি বিষয় বর্ণনা করেবো যেটি তোমাদের গুণাহ মার্জনা করবে এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেব ?
সাহাবায়ে কেরাম বললেন, হে আ আল্লাহর রাসুল! হ্যাঁ। কষ্টকরে হলেও পরিপূর্ণভাবে অজু কর, মসজিদে অধিক যাও এবং এক ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের পর পরবর্তী নামাজের জন্য অপেক্ষা কর। এটি হলে ‘রাবাত’ ‘রাবাত’ ‘রাবাত’ অর্থাৎ দেশের সীমানা পাহারা দেওয়ার সমতুল্য। (মুসলিম শরীফ, তিরমিজী ও ইবনে মাজাহ শরীফ)।
প্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) হতে বর্ণিত, প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি অজুর মধ্যে অঙ্গ একবার ধৌত করলে সে ফরজ আদায় করলো। যে দুই বার ধৌত করলো সে দ্বিগুণ পুণ্য পেলো আর যে তিনবার করে ধৌত করলো তা আমার এবং আমার পূর্বের নবীদের অজু করলো। (মুসনাদে আহমদ)
প্রত্যেক ইবাদতের পূর্বে অজু করা উত্তম ও পুণ্যের কাজ। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)’র বর্ণিত আরেক হাদিসে আল্লাহর নবী (দ.)’র ইরশাদ আছে, যে ব্যক্তির অজু থাকার পরও নতুনভাবে অজু করে নেয় সে যেন দশটি পুণ্য অর্জন করে। (আবু দাউদ)
ফিফাহ শাস্ত্রে অজুকে চার প্রকার বলে উল্লেখ করেছেন-
(১) ফরজ : নামাজের জন্য এবং তেলওয়াতে সিজদা, পবিত্র কোরআন স্পর্শ করতে অজু করা ফরজ।
(২) ওয়াজিব : খানায়ে কাবার তাওয়াফ করা জন অজু করা ওয়াজিব।
(৩) মোস্তাহাব : অজু থাকা সত্তে¡ও প্রত্যেক নামাজের জন্য নতুন অজু করা মোস্তাহাব। মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আমার উম্মতের জন্য যদি কষ্ট না হতো তাহলে আমি প্রতি নামাজের সময় অজুর নির্দেশ দিতাম এবং প্রতিবার অজুর সাথে মিসওয়াক করার হুকুম প্রদান করতাম। (মমনদে আহমদ)
(৪) মকরূহ : অজু করে সে অজু দ্বারা কোন ইবাদত না করে পুনরায় অজু করা মাকরূহ। (আল ফিকহুল ইসলাম)
(৫) হারাম : কারো মালিকানাধীন পানি জোরপূর্বক নিয়ে অথবা কোন এতিমের পানি জোর করে নিয়ে অজু করা হারাম বা নিষিদ্ধ।

লেখক : কলাম লেখক ও রাজনীতিক