ইসলামের সঠিক পথ ও মত অবলম্বনে পীরের আবশ্যকতা

128

ছৈয়দ জাফর ছাদেক শাহ

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন ‘হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় কর, তাঁর দিকে উছিলাহ (পীর) তালাশ কর আর তাঁর পথে প্রাণপণ যুদ্ধ কর যাতে তোমরা সফলতা লাভ কর।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত ৩৫)।
উছিলাহ শব্দের সঠিক কোনো অর্থ বাংলাতে পাওয়া যায় না। এখানে উছিলাহ অর্থ পীর নেওয়া হয়েছে। কারণ বেশির ভাগ মোফাচ্ছেরে কোরআন পীর অর্থে একমত। উক্ত অর্থ তাফসীরে কবিরী, তফসীরে রুহুল বয়ান ও তাফসীরে রুহুল মাআনি, তিরমিজি শরীফ হেদায়া আউয়ালাইন ও আকাইদেও নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া উক্ত অর্থ ইমাম আবু হানিফা (র.), ইমাম মালেক (র.), ইমাম গাজ্জালি (র.), মাওলানা রুমী (র.) প্রমুখ মহাজ্ঞানীগণ নিয়েছেন। আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য পীরের একান্ত প্রয়োজন। একজন ইনসানে কামেল তথা আল্লাহ পরিচয় জ্ঞাত পীরই আপনাকে আল্লাহর সাথে পরিচয় করে দিবেন। হে জ্ঞানী মানবজাতি, পরম করণাময় আল্লাহতায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করত লালন-পালন করছেন। তাঁকে চেনা, তাঁর পরিচয় লাভ করা একান্ত কর্তব্য। সমস্ত জগৎ তাঁকে চেনার জন্য সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ জাল্লাশানুহু ফরমালেন, ‘আমি একটি গুপ্ত ধনাগার ছিলাম, নিজেকে পরিচিত করতেই ভালোবেসে (প্রকাশ হলাম) এবং আমাকে চেনার জন্য জগৎ সৃষ্টি করলাম।’ আল্লাহকে চেনা, তাঁকে ভালোবাসা ও তাঁর প্রেমে মত্ত হওয়া একান্ত জরুরি কর্তব্য। এবং এ জরুরি পরিচয় লাভ করার জন্য পীর আবশ্যক। আল্লাহতায়ালাকে চিনতে হলে প্রথমেই চিনতে হবে নিজেকে বা নিজ নফস্কে। যেমন হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে ‘মান আরাফা নফসাহু ফাক্বাদ আরাফা রব্বাহু’ অর্থ- ‘যিনি নিজের পরিচয় লাভ করেছেন, তিনি নিজের রবের পরিচয় লাভ করেছেন।’ এখন আপনাকে চিন্তা করতে হবে আপনি কি নিজেকে চিনেছেন? যদি চিনেই থাকেন পবিত্র হাদিছ শরীফ মোতাবেক আল্লাহপাক এর পরিচয় পেয়েছেন। যদি আল্লাহপাককে আপনি না দেখেন, না চিনেন তাহলে আপনি নিজেকেই চিনেন নি বা নিজের পরিচয় জ্ঞাত নন। নিজের পরিচয় তথা আল্লাহর পরিচয় লাভ করতে হলে আপনাকে অবশ্যই একজন ইনসানে কামেল যিনি নিজের পরিচয় এবং আল্লাহর পরিচয় লাভ করেছেন এমন উছিলা বা মাধ্যম তথা পীরের আনুগত্যতা ও বশ্যতা স্বীকার করে নিতে হবে। আমার জানা মতে উপরোক্ত পীর ছাড়া অন্য কেউ অথবা নিজেই নিজের পরিচয় লাভ করতে সক্ষম নয়।
আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত ফরমায়েছেন ‘এবং নিশ্চয়ই আমি আদমের বংশধরকে শ্রেষ্ঠ করেছি।’ (সুরা বনী-ইসরাঈল, আয়াত ৭০)। আমি মানুষ আমার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে অবশ্যই আমাকে পীরের শরণাপন্ন হতে হবে। না হয় আমি এবং অন্যান্য জীব-জন্তুর মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা দুঃসাধ্য হবে। যেমন ক্ষুধার্ত হলে আমি আহার করি, অন্যান্য জীব-জন্তু তাই করে। আমি বংশ বিস্তারে বিপরীত লিঙ্গের সাথে সহবাস করি, জীব-জন্তুও তাই করে ইত্যাদি, ইত্যাদি। হয়ত শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে আমি বলতে পারি আল্লাহর ইবাদত করি, এখানে কিন্তু যার যার এবাদত তথা পশু-পাখি সৃষ্টি জগতে এমন কিছুই নেই যারা আল্লাহর এবাদত করে না। যেমন ‘তুমি দেখনা যে আসমান ও জমিনের মধ্যে যা কিছু আছে সকলেই আল্লাহপাকের তস্বিহ পাঠ করছেন এবং উড়ন্ত পাখিও প্রত্যেকেই নিজ নিজ ছালাত ও তস্বিহ শিখে নিয়েছে। এবং তারা যা করছে তা আল্লাহ জানেন।’ (সুরা নূর, আয়াত ৪১)। এ আয়াতে করিমায় পরিষ্কারভাবে বুঝা যায়, এবাদত দ্বারা মানবকূলের শ্রেষ্ঠত্ব বুঝা যায় না। নিজ শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে মানুষের জন্য একজন দক্ষ মুর্শিদ বা পীরের প্রয়োজন। পীরই আপনাকে আপনার নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের শিক্ষা দান করবেন। এখানে আমার প্রিয় নবীজীও মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের কথা ঘোষণা করেছেন। যেমন ‘হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (র.) হতে ইব্রানি ও খতিব রেওয়াত করেছেন, রাসূলুল্লাহ (দ.) ফরমালেন, আল্লাহতায়ালার নিকট মানব হতে অন্য কোন বস্তুই শ্রেষ্ঠ নয়। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, হে রাসূলুল্লাহ (দ.) ফেরেস্তারাও কি শ্রেষ্ঠ নয়? তিনি বললেন, তাঁরাও নয়। যেহেতু তাঁরা সূর্য ও চন্দ্রের ন্যায় পরায়ত্ত।’ ফেরেস্তা হতে মানব শ্রেষ্ঠ কিভাবে তা জানতে পীরের প্রয়োজন। পীরই আপনাকে শিক্ষা দিবেন মানুষই শ্রেষ্ঠ, আল্লাহ পাক এবং আল্লাহর রাসূল (দ.) সকল জাতি হতে আদম সন্তানই শ্রেষ্ঠ। ইবাদত বন্দেগীতে মানুষ শ্রেষ্ঠ হতে পারে না। কারণ সব মানুষ কিন্তু আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী করে না বা আল্লাহকে চিনে না। পক্ষান্তরে বাকি সৃষ্টি জগৎ আল্লাহর ছালাত ও তছবীহরত। মানুষ সৃষ্টি সম্পর্কে আল্লাহ ঘোষণা দিয়েছেন ‘তোমরা নির্জীব ছিলে, পরে তিনি তোমাদিগকে সজীব করলেন, পুনরায় তোমাদের নির্জীব করবেন। অতঃপর তোমাদিগকে জীবিত করিবেন। অবশেষে তোমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করবে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ২৯)।
এ আয়াতের দ্বারা মরা ও জিন্দা করার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। মৃত হওয়া বা জীবিত হওয়ার পর পুনরায় আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। প্রত্যাবর্তনকালে আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের দরবারে কি নিয়ে প্রত্যাবর্তন করবেন তা একমাত্র পীরই ঠিক করে দিবেন। আল্লাহপাকের নিকট যে ধন নিয়ে যাবেন তা পীর কর্তৃক দান করা সম্পদ তথা ঈমান সাথে নিয়ে যেতে হবে। ঈমান সাথে নেওয়ার অর্থ হল নিজ পরিচয় তথা আল্লাহ এবং আল্লাহ রাসুলের পরিচিত চিনে, জেনে, দেখে দুনিয়া হতে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। এভাবে যারা আল্লাহর পরিচয় জ্ঞাত হন তারাই মুত্ত¡াকীন। আপনার মনে ধারণা জন্মাতে পারে কিভাবে আল্লাহর পরিচয় লাভ হবে। নিজেকে দেখা, নিজেকে জানা এসকল কর্ম পীর ছাড়া কেউ নিজে নিজে করতে পারে না। হাদিসে পাকের ঘোষণা, ‘আল্লাহ আদমকে তাঁর (আল্লাহ) নিজ ছুরতে সৃষ্টি করেছে।’ আদমের ভিতর আল্লাহর ছুরত কি? কিভাবে তাঁর অবস্থান? নিশ্চয়ই তা কেউ নিজে নিজে অবগত হতে পারে না। আল্লাহর ছুরত আদমের মধ্যে খুঁজে বের করা দুঃসাধ্য ব্যাপার। এ জটিল ব্যাপার আপনাকে সমাধান দিবেন যিনি তিনিই আপনার প্রকৃত পীর। অবশ্য পীরের সকল আদেশ উপদেশ মেনেই তা আপনাকে অর্জন করতে হবে।
মুরিদ পীরের নিকট হতে জানা দরকার যা মুরিদ জানে না, চেনা দরকার যা মুরিদ নিজে চেনে না, বুঝা দরকার যা তিনি বুঝেন না ইত্যাদি। আমি আমাকে চেনার জন্য পীরের দরকার সর্বাগ্রে। পবিত্র কোরআন শরীফে আছে, ‘আমি আকাশ পৃথিবী ও পর্বতমালার সামনে এই আমানত পেশ করেছিলাম, অতঃপর তারা একে বহন করতে অস্বীকার করল এবং এতে ভীত হল; কিন্তু মানুষ তা বহন করল। বস্তুত মানুষ অনাচারী এবং অতিশয় অজ্ঞ।’ (সুরা আল আহযাব, আয়াত ৭২)।
আমার অজ্ঞতাই বা কি? মানুষ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর নিকট হতে কি আমানতই বা গ্রহণ করল? এসব অজানা বিষয়ে জ্ঞান লাভ করার জন্য পীরের দ্বারস্থ হওয়া দরকার। এসব অজ্ঞাত বিষয় পীর নিজে অবগত হয়ে মুরিদকে জ্ঞাত করবেন। তা হাতে কলমে শিক্ষা দিবেন। মুরিদ উক্ত আমানত সম্পর্কে অবগত হয়ে দুনিয়া হতে প্রত্যাবর্তনকালে স্রষ্টার নিকট হিসাব-নিকাশে নিজেকে সঁপে দেবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক