ইসলামের দৃষ্টিতে নামাজের গুরুত্ব

মুহম্মদ মাসুম চৌধুরী

16

নামাজ বেহেস্তের চাবি। কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম মহান আল্লাহ পাক হিসেব নিবেন নামাজের। অথচ এই নামাজের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে অনেক মুসলমান ব্যর্থ।
মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বললেন, তোমাদের কারো বাড়ির সামনে পানির নহর আছে, তোমরা কেউ সে নহরে দৈনিক পাঁচ বার গোসল করলে তার দেহে একটু ময়লাও থাকবে কি ? সাহাবায়ে কেরামগণ বললেন, ‘না’। প্রিয়নবী (দ.) বললেন, নামাজ এমনভাবে পাপ মোছন করে যেভাবে পানি দেহের ময়লা আবর্জনা দূর করে।
দায়লামী শরীফে বর্ণনা আছে, ‘নামাজ শয়তানের চেহরা কালো করে দেয়, দান-খয়রাত তার পৃষ্ঠ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়, আল্লাহ পাকের কারণে এবং জ্ঞানের উসিলায় শয়তান দূরে সরে যায়, যত দূরত্ব রয়েছে পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের মাঝে’।
বোখারী ও মুসলিম শরীফের হাদিসে উল্লেখ, ‘মহান আল্লাহ পাকের নিকট সর্বাপেক্ষা প্রিয় কাজ হলো নামাজ, পিতা-মাতার সাথে ভালো আচরণ এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করা’। হযরত ওমর ফারুক (রা.) বলেছেন, ‘যার নামাজ নেই, তাঁর অংশ নেই ইসলাম ধর্মে। তাঁর ইন্তেকালের পূর্বে যখন মারাত্মক আহত হয়ে শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল তখনও তিনি নামাজ পড়েছিলেন।
আল্লাহর ওপর ঈমান আনার পর সবচেয়ে প্রিয় ইবাদত হলো নামাজ। নামাজের থেকে অন্য কোন গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত যদি থাকতো তাহলে ফেরেস্তারা সে ইবাদতে নিয়োজিত থাকতো। কোন কোন ফেরেস্তা দাঁড়ানো অবস্থায়, কোন ফেরেস্তা রুকু অবস্থায়, কোন ফেরেস্তা সেজদারত, কোন ফেরেস্তা বসা অবস্থায় ইবাদতে রয়েছে।
বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, ‘যিনি ভালো করে ওজু করে নামাজের জন্য স্বীয় ঘর থেকে বের হয়, যতক্ষণ তাঁর হৃদয়ে নামাজের ইচ্ছে থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত তার প্রতি কদমে একটি নেকী লিপিবদ্ধ করা হয় এবং একটি পাপ মোচন করা হয়। নামাজের ইকামতের শব্দ শোনার পর কেউ নামাজের দিকে অগ্রসর না হয়ে পশ্চাদে যাওয়া ঠিক নয়। যার ঘর বেশি দূরে, আল্লাহর পক্ষ হতে তিনি পুরস্কারও অধিক পান। কারণ মসজিদ পর্যন্ত পৌঁছাতে তাঁকে অধিক কদমে হেঁটে যেতে হবে।’
বান্দার সেজদার মাধ্যমে আল্লাহর অধিক নৈকট্য লাভ করা যায়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন, ‘আপনি সেজদা করুন এবং নৈকট্য অর্জন করুন’। (সূরা আলাক- ১৯)
মহানবী হযরত মোহাম্মদ (দ.) ইরশাদ করেছেন, ‘পবিত্র কোরআনে সেজদার আয়াত তেলাওয়াত করার পর মুসলমান যখন সেজদায় যায়, তখন ইবলিশ দূরে বসে কান্না করতে থাকে এবং বলে আফসোস! আদমকে সেজদার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি সাথে সাথে পালন করেন। আমাকেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল অথচ আমি অস্বীকার করি। ফলে আমার জন্য জাহান্নাম নির্ধারিত।
প্রিয়নবী (দ.)’র সাহাবী হযরত সাঈদ ইবনে জোবায়ের (রা.) বর্ণনা করেছেন, দুনিয়ার কোন বস্তু বা বিষয়ের জন্য আমার অনুশোচনা নেই, কিন্তু আমার একটি সেজদা কম হলে অনুশোচনার সীমা থাকে না। হযরত ওক্বা ইবনে মুসলিম (রা.) বলেছেন, আল্লাহর দর্শনের জন্য ইচ্ছা পোষণ করা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। মানুষ আল্লাহর সবচেয়ে কাছে পৌঁছে যখন সে সেজদারত থাকে।
মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘কিসে তোমাদের জাহান্নামে প্রবেশ করাল ? জাহান্নামী বলবে, আমরা না নামাজ পড়তাম, না দরিদ্রদের আহার করাতাম’। (সূরা মুদ্দাসির, আয়াত : ৪২-৪৩)
নামাজ মানুষের শরীর মনকে পবিত্র করে। যে নামাজ আদায় করে না সে পূর্ণরূপ ইসলামের ওপর প্রতিষ্ঠিত নেই। বিখ্যাত হাদিস গ্রন্থ তাবারানী শরীফে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তির আমানতদারী নেই তার পূর্ণাঙ্গ ঈমান নেই এবং যার কাছে নামাজ নেই তার দ্বীন নেই। শরীরের জন্য মাথার যেমন গুরুত্ব দ্বীনের জন্য নামাজের তেমন গুরুত্ব।
এক হাদিসে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (দ.) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ ত্যাগ করবে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইজ্জত তার নাম দোজখের দরজায় লিখে দিবেন, যে দরজা দিয়ে তাঁর প্রবেশের নির্দেশ থাকবে।
যারা দুনিয়ার ধন-সম্পদের মোহে ব্যস্ত থাকে এবং নামাজকে অবহেলা করে তাদের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হবে। তাই আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ, তোমাদের ছেলে-মেয়ে যেন আল্লাহর স্মরণ থেকে তোমাদের উদাসীন করতে না পারে; যারা তা করবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে’। (সূরা মোনাফেকুন, আয়াত : ৯)
যারা নামাজ পড়বে না তারা রোজ কিয়ামতে ফেরাউন, কারুন, হামাম এবং উবাই ইবনে খালফের সাথে থাকবে। কারণ তাদের ধন-সম্পদ নামাজ থেকে দূরে রেখেছে। যে রাজত্বের মোহে নামাজ থেকে দূরে থেকেছে ফেরাউনের সাথে তার হাসর হবে। মন্ত্রিত্ব ও চাকরির মোহে যারা নামাজ থেকে দূরে থেকেছে তাদের হাসর হবে হামামের সাথে। অনুরূপভাবে ব্যবসা ও কৃষ্টি কাজের কারণে যাদের নামাজ হতে দূরে রেখেছে তাদের হাসর হবে উবাই ইবনে খালফের সাথে।
কেয়ামতের দিন বেনামাজির মুখমÐলে তিনটি বাক্য লেখা থাকবে ১) হে আল্লাহর হক ধ্বংসকারী ২) হে আল্লাহর ক্রোধে পতিত ৩) তুমি দুনিয়াতে আল্লাহর হক নষ্ট করেছ আখেরে তুমি আল্লাহর রহমত হতে বঞ্চিত। মহানবী হযরত মোহাম্মদ (দ.) ইরশাদ করেছেন, কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বেনামাজির চেহরা কালো হবে। দোজখে ‘লামলাম’ নামক পাহাড়ে প্রচুর সাপ রয়েছে। সাপগুলো উটের ঘাড়ের মতা মোটা এক মাসের গুরুত্ব পরিমাণ লম্বা। এগুলো বেনামাজি মানুষকে দংশন করবে। সাপের বিষক্রিয়া সত্তর বছর পর্যন্ত থাকবে। বিষের কারণে তাদের দেহের রং পরিবর্তন হয়ে যাবে। আল্লাহ পাক আমাদেরকে যেন নামাজিদের অন্তর্ভুক্ত করে, বেনামাজি হতে হেফাজত করেন এবং পরকালের শাস্তি হতে মুক্ত রাখে।

লেখক : কলাম লেখক, রাজনীতিক