ইসলামের ইতিহাসে সিদ্দিকে আকবর (রা.)’র অবস্থান ও মুসলিম জাতির শিক্ষা

মুহাম্মদ সোহেল

98

আল্লাহর হাবীবের হেরা গুহার সাথী হযরত সিদ্দিকে আকবর (রা.) ছিলেন সমস্ত সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ট মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। যিনি ইসলাম প্রতিষ্ঠায় রেখেছিলেন সকলের চেয়ে সর্বোচ্চ ভূমিকা। তাঁর ভালোবাসা ও নবীপ্রেমকে কেউ অতিক্রম করতে পারেনি। আমলনামার দিকে কেউ তাঁর সমকক্ষ হতে পারেনি ও পারবে না। যিনি উৎসর্গ করেছিলেন ইসলামের জন্য সমস্ত ধনসম্পদ। যার দানের প্রসঙ্গে আল্লাহ কোরআন মাজিদে এরশাদ করেন। “ঐ সব লোক (আবু বকর) যারা নিজেদের ধনসম্পদ দান করে রাত ও দিনে, গোপনে ও প্রকাশ্যে তাঁদের জন্য পুণ্য ফল রয়েছে তাঁদের প্রতিপালকের নিকট” -আল-কোরআন সূরা বাকারা- ২৭৪ আয়াত।
উল্লিখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয় এ আয়াত নাজিল হয় হযরত আবু বকর ছিদ্দিক (রা.) সম্পর্কে। যখন তিনি আল্লাহর পথে চল্লিশ হাজার (স্বর্ণমুদ্রা) খরচ করেছিলেন- দশ হাজার দিনে, দশ হাজার রাতে, দশ হাজার গোপনে, দশ হাজার প্রকাশ্যে। (কানযুল ঈমান খাযাইনুল ইরফান, তাফসীরে জালালাইন শরীফ)।
উমাইয়া ইবনে খল্ফ তার কৃতদাস হযরত বেলাল (রা.) কে ধর্মচ্যুত করার জন্য বিভিন্নভাবে চরম পর্যায়ে জুলুম অত্যাচার করছিল। ছিদ্দিকে আকবর দেখলেন যে, উমাইয়া ইবনে খল্ফ হযরত বেলালকে উত্তপ্ত মরুভূমির উপর ফেলে প্রস্তর খÐ তার বুকের উপর চাপা দিল। এ অবস্থায়ও হযরত বেলালের মুখে কালিমার আওয়াজ উচ্চারিত হচ্ছিল। সৈয়্যদিনা আবু বকর (রা.) উমাইয়াকে বললেন “হে দুর্ভাগা একজন খোদার ইবাদতকারীর উপর এমন জুলুম” উমাইয়া বললেন তার দুঃখ যদি আপনারে অসহ্য হয় তাহলে তাকে ক্রয় করে নিন। তখন তিনি চড়ামূল্যে ক্রয় করে হযরত বেলাল (রা.) কে আজাদ করে দিলেন। উল্লিখিত ঘটনার পরিশ্রেক্ষিতে আল্লাহতায়ালা কোরআনে পাকে এরশাদ করেন “নিশ্চয় তোমাদের চেষ্টা ভিন্ন ভিন্ন” (সূরা লায়লা-৪ নং আয়াত) অর্থাৎ হযরত আবু বকর (রা.) এর প্রচেষ্টা আল্লাহর সন্তুষ্টি আর উমাইয়া আল্লাহর শত্রæতায় অন্ধ (তাফসীরে কানযুল ঈমান ও খাযাইনুল ইরফান, তাফসীরে জালালাইন শরীফ)।
হযরত ওমর (রা.) হতে বর্ণিত, রোম বাহিনীর মোকাবেলায় প্রস্তুতি গ্রহণের পূর্বে প্রিয়নবী (দ.) সকলের কাছে বলেন, যার যা সমর্থ্য আছে সাধ্যমত দান কর। হযরত ওমর (রা.) বললেন, সৌভাগ্যবশত তখন আমার প্রচুর ধন সম্পদ ছিল। আমি চিন্তা করলাম আজ হয়ত সকলের চেয়ে আমার দান প্রাধান্য পাবে। আমি আমার সম্পদ দুভাগ করে অর্ধেক নিয়ে এলাম এবং সাহাবায়ে কেরামগণ তাদের সাধ্যমত আনল। রাসূল (দ.) আমাকে প্রশ্ন করলেন তোমার পরিবারের জন্য কি রেখে এসেছে?
উত্তরে বললাম অর্ধেক রেখে এসেছি। ইতোমধ্যে হযরত আবু বকর (রা.) ঘরের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীসহ সমুদয় ধনসম্পদ নিয়ে উপস্থিত হলেন। সরকারে দো-আলম (দ.) বললেন পরিবারের জন্য কি রেখে এসেছ? তিনি বললেন, হে রাসুল (দ.) আমার ঘরে আল্লাহ ও তাঁর হাবিব ছাড়া আর কিছুই নাই। একমাত্র নবীর প্রেম ছাড়া দুনিয়ার বুকে আর কে একথা বলতে পারে? নবী করিম (দ.) এর প্রেমে দান দক্ষিণা আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গের ক্ষেত্রে সিদ্দিকে আকবরই ছিলেন অদ্বিতীয়। নবী করিম (দ.) নবুয়ত প্রকাশের আগেই সিদ্দিকে আকবরকে সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করেন।
ইসলাম প্রকাশের পর যত প্রকার জুলুম নির্যাতন হয়েছে সিদ্দিকে আকবর সবার্গ্রে ছিলেন তিনি ছিলেন হিজরতের একমাত্র সাথী। হিজরতের রাত্রে হেরা গুহা ত্যাগের কথা প্রসঙ্গে রাসূল (দ.) এরশাদ করেন “আবু বকর সিদ্দিক এর এক রাত্রের আমল আমার উম্মতের সমস্ত আমলনামা একত্রিত করলেও তাকে কেউ অতিক্রম করতে পারবে না”। হেরা গুহায় সিদ্দিকে আকবরের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে হুজুর (দ.) আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন- “আল্লাহ তোমার প্রতি রহমত বর্ষণ করুক। তুমি আমাকে বিশ্বাস করেছ যখন লোকেরা আমাকে অবিশ্বাস করেছে, তুমি আমাকে সাহায্য করেছে যখন লোকেরা আমার সাহায্য ছেড়ে দিয়াছে। তুমি আমার প্রতি ঈমান এনেছ যখন লোকেরা আমাকে অস্বীকার করেছে। তুমি আমার সান্তনা যুগিয়েছ আমার উদ্বেগ অবস্থায়”। অতঃপর বললেন “হে আল্লাহ বেহেশতে আমার শ্রেণীতে আমার সঙ্গে আবু বকর সিদ্দিককে রাখিও” (জুরকানী আলাল মাওয়াহে ১ম খন্ড-৩৩৫ পৃষ্ঠা)।
সিদ্দিকে আকবর (রা.) এর ত্যাগের প্রতিদান সম্পর্কে হুজুর (দ.) এরশাদ করেন “আমার প্রতি যত মানুষের উপকার রয়েছে প্রত্যেককেই আমি এর প্রতিদান দিয়াছি একমাত্র আবু বকর (রা.) ব্যতীত। আমার প্রতি তার এরূপ উপকার রয়েছে যার প্রতিদান আল্লাহ তায়ালাই কেয়ামতে পূর্ণ করবেন (তিরমিযী শরীফ)। শ্রেষ্ঠ সাহাবী হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এমন ছিলেন যে এতবার নবী পাকের জবানে জান্নাতের খোঁজ-খবর পাওয়ার পরও তিনি এক ওয়াক্ত নামাজ কাজা করেন নি। এশার নামাজের অযু দিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করেছেন। অনেক সময় অধিক দÐায়মান এর কারণে পায়ের মুড়ি ফেটে রক্ত বের হত।
সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন করেন “হে রাসূলের শ্রেষ্ঠ সাহাবী আপনি এতবার জান্নাতের খোশখবর পাওয়ার পরও এতবেশি নফল ইবাদত করছেন? উত্তরে তিনি বলতেন “হে সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহর ইবাদতে যে কত তৃপ্তি তা ইবাদতকারীরাই জানে। আমার বাকি জীবন আল্লাহর ইবাদতে কাটাতে চাই। হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (দ.) একদা জিজ্ঞাসা করলেন তোমাদের মধ্যে কে আজ সকালে রোজাদার হিসেবে উঠেছ? হযরত আবু বকর (রা.) বললেন আমি। অতঃপর রাসুল (দ.) জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমাদের মধ্যে কে আজ কোন জানাযায় শরিক হয়েছ? হযরত আবু বকর (রা.) বললেন আমি। অতঃপর রাসুল (দ.) জিজ্ঞাসা করলেন কে আজ কোন রোগীকে নিঃস্বকে খাবার দিয়েছ? উত্তরে বললেন আমি। অতঃপর রাসুল (দ.) জিজ্ঞাসা করলেন কে আজ কোন রোগীকে নিঃস্বকে খাবার দিয়েছ? উত্তরে বললেন আমি। এবারও জিজ্ঞাসা করলেন তোমাদের মধ্যে কে আজ কোন রোগীকে দেখতে গিয়েছ? এবারও হযরত সিদ্দিক আকবর বললেন আমি ইয়া রাসুল্লাল্লাহ (দ.)। তখন হুজুর (দ.) বললেন, “এসব গুণ যার মধ্যে একত্রিত হবে সেই জান্নাতি” (মুসলিম, মিশকাত শরীফ)।
হযরত আবু বকর (রা.) হুজুর (দ.) এর শুধু দুনিয়ার সাথী ছিলেন না, কবরের সাথী হয়ে আছেন এবং জান্নাতে ও হাশরের সাথী হবেন। ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দে হিজরি ১৩ সালে ২২শে জমাদিউস সানী ৬৩ বছর বয়সে আল্লাহর ডাকে সাড়া দেন। তার ওফাতের কিছুদিন পূর্বে শেরে খোদা আলী (রা.) কে ডেকে বলেন “আমার ওফাতের পর তোমার সেই হাত দ্বারা গোসল দিবে যে হাতে নবী করিম (দ.) কে গোসল দিয়েছিলে। আমার লাশ নবী করিম (দ.) এর রওজা শরীফের দরজায় দিয়ে যাবে এবং সেখান থেকে কোন প্রকার অনুমতি পেলে আমাকে নবীজির পার্শ্বে দাফন করবে নতুবা অন্যস্থানে দাফন করবে।
হযরত সিদ্কি আকবর (রা.) ২২ জমাদিউস সানী তার সৃষ্টিকর্তার সাক্ষাতে চিরবিদায় নিয়ে গেলেন। অসিয়ত মোতাবেক গোসল, কাফন ও জানাজাশেষে সাহাবায়ে কেরাম নবী করিম (দ.) এর রওজা শরীফের দরজায় তাকে বহনের খাটিয়া রাখলেন এবং হযরত আলী (রা.) সালামের সাথে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (দ.) আপনার পরম সাথী সিদ্দিকে আকবর আপনার দরজায়, আপনার পাশে চিরশায়িত করার অনুমতি দিন। কোন প্রকার উত্তর পেলেন না। এরূপ দুবার বলার পর তৃতীয়বার বলতে না বলতেই রওজা মোবারকের দরজা খুলে যায়। আওয়াজ আসে “ফাদখিলাল হাবিবা ইলাল হাবিবে, ফাইন্নাল হাবিবা ইলাল মুশতাকুন। অর্থ- “বন্ধুকে বন্ধুর কাছে দাখিল করে দাও। কেননা বন্ধু (তাঁর) বন্ধুর মিলনের প্রত্যাশী” (তাফসীরে কবীর ৫ম খন্ড-৪৭৮ পৃষ্ঠা, খাসায়েসুল কুবরা- ২য় খন্ড-২৮৯ পৃষ্ঠা)।
সকল সাহাবায়ে কেরামের কানে এ আওয়াজ আসলে সবাই রাসূল (দ.) এর ডান পাশে তার বন্ধু হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর দাফন কাজ সম্পন্ন করেন। মহান আল্লাহ আমাদেরকে সিদ্দিক আকবলের (রা.) আদর্শ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন, ছুম্মা আমিন।
লেখক: সাবেক ইস্পাহানী কর্মকর্তা ও ইসলামী চিন্তাবিদ।