ইতিহাস হয়ে থাকবে পবিত্র ভালোবাসা

ইকবাল ভূঁইয়া

12

১৯৫৬ সালে আব্দুল জব্বার খান পরিচালিত মুখ ও মুখোসের মাধ্যমে এদেশে সর্বপ্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবির সূচনা হয়। তাই এদেশের চলচিত্র ইতিহাসে মুখ ও মুখোসের গুরুত্ব অপরিসীম। যেহেতু মুখ ও মুখোশ বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নির্মিত পূর্ণদৈর্ঘ্য বাঙলা ছায়াছবি তাই হাজার বছর পরও এই ছায়াছবির ইতিহাস কখনোই ম্লান হবে না। খায়রুন সুন্দরী খ্যাত তরুণ চলচিত্র নির্মাতা এ কে সোহলের কাহিনী, সংলাপ, চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় নির্মিত পবিত্র ভালোবাসা ঠিক সে রকম একটি ঐতিহাসিক ছায়াছবি। কারণ পবিত্র ভালোবাসা চট্টগ্রাম হতে নির্মিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি। প্রথম নির্মিত বলে চট্টলবাসীর জন্য এই ছায়াছবির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। পবিত্র ভালোবাসা বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি। দুঃখ বেদনা, হাসি আনন্দ, প্রেম বিরহ, অ্যাকশান, কমেডি জীবনের সব অধ্যায় পবিত্র ভালোবাসায় সফলভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের দু’তরুণ-তরুণীর প্রেমঘটিত একটি ভিন্ন ধর্মী মৌলিক গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে পবিত্র ভালোবাসা। পরিবার ও সমাজ কোন অবস্থাতেই মেনে নিতে পারে না। জীবন দিয়ে তারা প্রমাণ করে সমাজ ধর্ম বর্ণ কোন কিছুই ভালবাসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে নাই। উপমহাদেশের মহান নেতা প্রয়াত মহাত্মা গান্ধী তার অমর বাণীতে বলেছিলেন, চট্টগ্রামের মানুষ আজ যা চিন্তা করে সমগ্র ভারতবাসী চিন্তা করে কয়েকদিন পর। ঐতিহাসিকভাবে মহাত্মা গান্ধীর অমৃতবাণীর সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে বারবার। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রের পাঠ, বিজয় মেলার সূচনা থেকে শুরু করে দেশের জন্য যা কিছু ঐতিহাসিক কল্যাণকর তার অনেক কিছুরই সৃষ্টি হয়েছে চট্টগ্রাম হতে। চট্টগ্রাম কোন ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি নেই তারপরও চট্টগ্রাম হতে পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি নির্মিত হয়েছে, মহরত ও চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোটি টাকা বিনিয়োগ করে চট্টগ্রাম হতে চলচ্চিত্র নির্মাণ ছিল আর্থিক ঝুঁকিপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং। এই আর্থিক ঝুঁকি ও কঠিন চালেঞ্জ নিয়েছেন চাটগাঁ ফিল্ম প্রোডাকশন (প্রাঃ) লিমিটেডের চেয়ারম্যান শফিক আহমেদ বড় মিয়া ও এম ডি লায়ন এম শফিউল আলম। চট্টগ্রামের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি পবিত্র ভালোবাসা প্রযোজনা করে তারা দু’জন চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ইতিহাস হয়ে গেছেন। ছায়াছবি মূলত পাহাড়ী জনপদের তাই শুটিংয়ের ক্ষেত্রে পাহাড়ি দৃশ্যপটকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, ছবির ৯০ ভাগ শুটিং চট্টগ্রামে হয়েছে। দেশের শীর্ষ নায়িকা মৌসুমী সাথে আছেন শীর্ষ নায়ক ফেরদৌস। তবে পবিত্র ভালোবাসার মুখ্য চরিত্র অভিনয় করেছেন রোকন উদ্দিন, চট্টগ্রামের সুদর্শন স্মার্ট এই তরুণ দেশের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত নায়িকা মাহিয়া মাহির বিপরীতে অভিনয় করেছেন। পবিত্র ভালোবাসায় মৌসুমী সমাজের হিন্দু পঞ্চায়েত প্রধান মায়াদেবী আর ফেরদৌস মুসলিম পঞ্চায়েত প্রধান দিদার পাশার চরিত্র রূপদান করেছেন। রোকন মায়াদেবীর ছোট ভাই রাহুল মাহিয়া মাহি দিদার পাশার ছোট বোন রোজী চরিত্রে রূপদান করেছেন। মুসলিম পঞ্চায়েত প্রধান দিদার পাশাকে হিন্দু পঞ্চায়েত প্রধান মায়াদেবী মনে মনে ভালোবাসলেও ধর্ম, পরিবার ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে তা প্রকাশ করতে পারে না। অপরদিকে, দিদার পাশা মায়াদেবীকে গভীরভাবে ভালোবাসে, মায়াদেবীর প্রতি দিদার পাশার ভালোবাস এতটা গভীর যে কোর্টে দায়েল করা মায়াদেবীর বিরুদ্ধে জায়গা জমি সংক্রান্ত মামলায় জয়লাভ করার সম্ভাবনা থাকা সত্তে¡ও মামলা হতে দিদার পাশা পিছু হটে যায়। মায়াদেবীর প্রতি দিদার পাশার অকৃত্রিম ভালাবাসা বাধা হয়ে দাড়ায় সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতার কারণে। ধর্ম ও সামাজিকতায় আপোষহীন জেদী তরুণ দিদার পাশা ব্যতিক্রমধর্মী চরিত্রটি দু’বালার জনপ্রিয় নায়ক ফেরদৌস সফলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তার মেধাদীপ্ত অভিনয়ের মাধ্যমে। অপর দিকে অহংকারী দাম্ভিক ধর্ম ও সামাজিকতায় আপোষহীন তরুণীর ভূমিকায় মৌসুমী ছিলেন অনবদ্য, মৌসুমী হিন্দু পঞ্চায়েত প্রধান মায়াদেবী চরিত্র এতটাই প্রাণবন্ত ছিলেন যে কয়েক দশক পর কোন নির্মাতা যদি এ কে সোহেলের পবিত্র ভালোবাসা রিমেক করতে চায় তাহলে মৌসুমী অভিনীত মায়াদেবী চরিত্রটি যে কোন অভিনেত্রীর জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
অতীতে হিন্দু মুসলিম তরুণ-তরুণী প্রেম কাহিনী নিয়ে নির্মিত এদেশের কোন বাংলা ছায়াছবিতে নায়ক-নায়িকার মিলন হয় না। মৃত্যুই যার শেষ পরিণতি। ১৯৯৩ সালে মৌসুমী-ওমর সানি অভিনীত ‘দোলা’ এবং চাঁদনী-আমিন খান অভিনীত ‘অবুঝ দু’টি মন’ ছায়াছবিতে ধর্ম ভিন্ন হবার কারণে নায়ক নায়িকার মিলনের বদলে হয় সন্ত্রাসী কর্তৃক নির্মম মৃত্যু, সেই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রাম হতে প্রথম নির্মিত চলচ্চিত্র পবিত্র ভালোবাসা।
সত্যিকার অর্থে মানুষকে হাসানো অনেক কঠিন কাজ। পবিত্র ভালোবাসায় মাহিয়া মাহি ও আফজাল শরীফের অভিনীত কমেডিগুলো দেখানো হয়েছে স্বাভাবিক নিয়মে জীবনের অংশ হিসাবে যা হল ভর্তি দর্শকদের আনন্দ দিয়ে হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে।
গত ৬ অক্টোবর ঢাকাসহ দেশের ৩০টি সিনেমা হলে পবিত্র ভালোবাসা মুক্তি পায়। পরবর্তীতে চট্টগ্রামসহ আলো ৩৬টি সিনেমা হলে ছায়াছবিটি মুক্তি পায়।
মৌসমী-ফেরদৌস, মাহিয়া-রোকন ছাড়াও পবিত্র ভালোবাসায় অভিনয় করেছেন পংকজ বৈদ্য সুজন, রেবেকা, লায়ন এম শফিউল আলম, আফজাল শরীফ, সজল চৌধুরী, আবছার উদ্দিন অলি, ফারুক হাসান, আলী নেওয়াজ, শিপ্রা চৌধুরী, মুন, টিনা, শিউলি, সুমী, মিজানুর রহমান বাবু, নূপুর, ফরিদুল হক, এস এম সরওয়ার, মার্শাল আর্টলিজেন্ড ইলিয়াছ কোবরা প্রমুখ। পবিত্র ভালোবাসার সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছেন গীতিকার সাংবাদিক আবছার উদ্দিন অলি, এ্যাকশান দৃশ্য পরিচালনা করেছেন জুম্মন ও ইলিয়াছ কোবরা, নৃত্য পরিচালনা করেছেন মাসুম বাবুল, জাকির হোসেন, তোফাজ্জল হোসেন, পবিত্র ভালোবাসা ছায়াছবির জন্য গান লিখেছেন পরিচালক গীতিকার এ কে সোহেল, গীতিকার লিয়াকত হোসেন খোকন। ইমন সাহার সঙ্গীত আয়োজনে পবিত্র ভালোবাসায় নেপথ্যে কণ্ঠ দিয়েছেন রন্টি দাশ, মনির খান, কোনাল, কিশোর, কনা ও পলাশ।