নগর চট্টগ্রামের উনিশ বিশ শতকের

ইতিবৃত্ত

মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান

54

বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত জেলা শহর চট্টগ্রাম। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অনুপম আধার। পাহাড়-পর্বত, নদী-সাগর ও সবুজের সমারোহে পরিবেষ্টিত চট্টগ্রাম নানা বিশেষণে বিশেষায়িত। চট্টগ্রামের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের খ্যাতি বিশ্বজুড়ে। বৃটিশদের কাছে চট্টগ্রাম প্রাচ্যের রাণী নামে পরিচিত। সুলতান নাসির উদ্দীন শাহের আমলে (১৫১৯-১৫৩২) চট্টগ্রামের নাম ছিলো ফতেয়াবাদ। বিদেশী পরিব্রাজকরা চট্টগ্রামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁদের স্মৃতিকথায় চট্টগ্রামের বন্দনা করে গেছেন। সৃষ্টিকর্তা যেন সৌন্দর্যের সবটুকু দিয়ে চট্টগ্রামকে সাজিয়েছেন। ইতিহাসবিদ আর ভ্রমণ পিপাসুরা কত নামে চট্টগ্রামকে অভিহিত করেছেন তার সঠিক তথ্য বের করা খুবই দুষ্কর। প্রকৃতি প্রদত্ত বন্দর এবং ভৌগলিক কারণে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে শাসকগোষ্ঠীর নজর ছিলো বাংলাদেশের প্রান্তসীমায় অবস্থিত চট্টগ্রাম।আজ পর্যন্ত ‘চট্টগ্রাম’ নামকরণ নিয়ে সহমত প্রকাশ করতে পারেন নি ইতিহাসবিদরা। এমনি অবস্থায় বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগ থেকে মধ্যভাগ (১৯০১-১৯৫০) পর্যন্ত চট্টগ্রামের চালচিত্রের নির্ভুল দালিলিক তথ্য বের করা কঠিন বৈকি। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং চট্টগ্রামের পাঁচ বিশিষ্টজনের স্মৃাতিকথায় তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে বিংশ শতাব্দীর চট্টগ্রামের ক্রমবিকাশ।
বিংশ শতাব্দীর প্রথম পাঁচ দশকে (১৯০১ থেকে ১৯৫০) পর্যন্ত চট্টগ্রামে অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধিত হয়। শহর ক্রমান্বয়ে আধুনিক যুগে প্রবেশ করে। উনিশ শতকের শেষ দশকে পরীর পাহাড়ে (ইংরেজ শাসনামলে এটি ফেয়ারী হিল নামে খ্যাত ছিলো) কোর্ট বিল্ডিং নির্মিত হওয়ার পর শহরে ক্রমে উত্তর প্রান্ত থেকে দক্ষিণ প্রান্তে সরে আসতে থাকে। এর পূর্বে শহরের কেন্দ্রস্থল ছিলো চকবাজারকেন্দ্রিক। ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে মোঘলরা চট্টগ্রাম বিজয়ের পর প্রথম মোঘল ফৌজদার নওয়াব বুজুর্গ উম্মেদ খাঁন আন্দরকিল্লা জামে মসজিদ নির্মাণ করেন। আন্দরকিল্লা জামে মসজিদ প্রার্থণালয় হিসেবে গড়ে ওঠার কারণে আন্দরকিল্লা ক্রমান্বয়ে জনঅধ্যুষিত এলাকা হিসেবে গড়ে উঠতে থাকে। তথাপি মোঘল আমলে চট্টগ্রাম শহরের কেন্দ্রভাগ মাদ্রাসা পাহাড় (হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ) থেকে চকবাজার পর্যন্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিলো বলে মনে হয়।
চন্দনপুরায় রাউজানের ডাবুয়ার জমিদার ধরদের বিশাল ব্যবসা কেন্দ্র ছিলো (দৈনিক আজাদীর সাবেক বার্তা সম্পাদক প্রয়াত সাধন ধরের বংশ)।
বৃটিশরা চট্টগ্রামের শাসনভার (বৃটিশ শাসনামল:১৭৬১-১৯৪৭) গ্রহণ করার পর উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে কোর্ট বিল্ডিং নির্মিত হলে শহরের কেন্দ্রভাগ হিসেবে লালদিঘীর পাড় গড়ে উঠে। ফলশ্রুতিতে শহরের কেন্দ্রভাগ আন্দরকিল্লা থেকে লালদিঘীর পাড় এলাকায় গড়ে উঠতে থাকে। ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম পৌরসভা স্থাপিত হয়। চট্টগ্রাম পৌরসভা ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত লালদিঘীর পাড়ে (বর্তমানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন পাবলিক লাইব্রেরি) ছিলো। এর থেকে বোঝা যায়, চট্টগ্রাম শহরের প্রশাসনিক ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র ছিলো লালদিঘী এলাকা। বর্তমানে যেখানে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা দপ্তর সেখানে ভূমি রেকর্ড অফিস ছিলো। যেটা এন্তেকালী অফিস হিসেবে পরিচিত ছিলো। সিএমপির সদর দপ্তরকে এন্তেকালীন পাহাড় বলা হতো। এন্তেকালী অফিসে ভূমির পুরনো দলিল-দস্তাবেজ ও রেকর্ড সংরক্ষণ করা হতো।
নগরীর কোতোয়ালী থানা কত খ্রিস্টাব্দে হয়েছে তার কোনো সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায় না। তবে কোতোয়াল থেকে কোতোয়ালী হয়েছে। কোতোয়াল মানে নগরপাল। কোতোয়ালী মুসলিম শাসনাকালের পদ, সেজন্য এটি মোঘল আমলে হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে যেখানে কোতোয়ালী থানা রয়েছে সেখানে কোতোয়ালী ছিলো কিনা তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে বক্সিরহাট পুলিশ বক্স, যেটা বর্তমানে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে সেটা সম্ভবত কোতোয়ালীর চেয়ে প্রাচীন। হয়তো সেটি ছিলো আদি কোতোয়ালী থানা। বক্সি মানে দারোগা বা প্রহারাদার। তার থেকে বক্সিরহাটের নামকরণ হয়েছে। কেউ কেউ অনুমান করেন, বাঁশখালীর ইলিশ্যার জমিদার বক্সি হামিদের নামে হয়তো বক্সিরহাটের নামকরণ হয়ে থাকতে পারে।
বৃটিশ আমলে নতুন কোর্ট বিল্ডিং নির্মিত হওয়ার পর সেখানে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিষ্ট্রেট বসতেন। কোর্ট বিল্ডিংয়ের উত্তর পার্শ্বে একসময় ছিলো সিভিল সার্জনের অফিস। বর্তমানে স্বাস্থ্য উপপরিচালকের দপ্তর। কোর্ট বিল্ডিংয়ের উত্তর পার্শ্বে অবস্থিত এ পাহাড়ে তখন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটের বাসভবন ছিলো। সেখানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট অন্নদা শংকর রায় বসবাস করতেন। তাঁর স্মৃতিকথায় এর বর্ণনা পাওয়া যায়।
খাতুনগঞ্জ দেশের বৃহত্তম পাইকারী বাণিজ্য কেন্দ্র। কিন্তু খাতুনগঞ্জের পত্তন কখন হয় তার লিখিত কোনো সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায় না। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত ঘাটফরহাদবেগ এবং পাথরঘাটা এসব এলাকা জলমগ্ন ছিলো-এমন বিবরণ কোনো কোনো পুস্তকে পাওয়া যায়। ঘাটফরহাদ বেগ, পাথরঘাটা যদি জলমগ্ন হয়ে থাকে তাহলে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জও জলমগ্ন থাকার কথা। আবার চট্টগ্রামের কৃতি পুরুষ ঐতিহাসিক হামিদুল্লাহ খাঁন যখন ডেপুটি কালেক্টর ছিলেন তখন তাঁর নামে খাতুনগঞ্জে একটি মসজিদ এবং বাজারের অস্তিত্ব এখনো বিদ্যমান। হামিদুল্লাহ খাঁন জামে মসজিদ এবং হামিদুল্লাহ খাঁর বাজার তাঁরই নামানুসারে কালের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। বৃটিশরা চট্টগ্রাম দখল করার পর যখন আন্দরকিল্লা জামে মসজিদকে অস্ত্রাগারে পরিণত করে তখন হামিদুল্লাহ খাঁন একটি প্রবল আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর দাবী ছিলো এটি মুসলমানদের নামাজের জায়গা, মুসলমানদের ফিরিয়ে দেয়া হোক। তাঁর আন্দোলনের ফলে মুক্ত হয় আন্দরকিল্লাহ জামে মসজিদ। খাতুনগঞ্জে হামিদুল্লাহ খাঁন জামে মসজিদ, হামিদুল্লাহ খাঁন বাজার এবং তাঁর জামে মসজিদ উদ্ধার আন্দোলন এসব কিছু বিবেচনার মধ্যে নিলে মনে হয় ঊনবিংশ শতাব্দীতে খাতুনগঞ্জ গড়ে উঠে।
খাতুনগঞ্জে বেশ কিছু গঞ্জ আছে। গঞ্জ মানে খালপাড়ে পণ্য বিপণন স্থান; হাট বা বাজার। খাতুনগঞ্জ তো আছেই, এছাড়া আছদগঞ্জ, বিটলীগঞ্জ এবং কোরবানীগঞ্জ এখনো তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। আবার চাক্তাই খাল প্রবাহিত হয়েছে খাতুনগঞ্জের পাশ দিয়ে। এটি কর্ণফুলীর মুখ থেকে প্রবাহিত হয়ে খাতুনগঞ্জের পাশ দিয়ে একদিকে বহরদ্দার হাট এবং অন্যদিকে সম্ভবত মির্জারপুল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। চাক্তাই খাল আজকের মতো শ্রীহীন ছিলো না। তখন চাক্তাই খালে নাব্যতা ছিলো, স্রোত ছিলো। ক‚লে ঢেউ আছড়ে পড়তো। পণ্যবাহী সাম্পান চাক্তাই খাল দিয়ে বহরদার হাট পর্যন্ত চলাচল করতো। এদিকে চকবাজার ধুপির পুল এবং অন্যদিকে মির্জার পুল পর্যন্ত পণ্যবাহী সাম্পান আসা-যাওয়া করতো। বহরদার হাট, ধুপির পুল এবং মির্জারপুল এসব স্থান পণ্য বেচা-কেনার স্থান হিসেবে জমজমাট ছিলো। কর্ণফুলী নদীতে পণ্যবাহী বড় বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করে নৌকা-সাম্পানে করে চাক্তাই খাল দিয়ে প্রবেশ করে এসব স্থানে পণ্য খালাস করতো। আবার নবীন সেনের আত্মজীবনীতে পাওয়া যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বক্সিরহাট পর্যন্ত পানিতে নিমজ্জিত ছিলো এবং নৌকা-সাম্পান চলাচল করতো। এসব অনুমান থেকে যেটা আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্ররোচিত করে তাহলো ঊনবিংশ শতাব্দীতে খাতুনগঞ্জ গড়ে উঠেছিলো, চাক্তাই হয়তো আরো একটু পরে। কারণ হামিদুল্লাহ খান উনবিংশ শতাব্দির মানুষ।
তবে অষ্টাদশ শতাব্দির শেষভাগে খাতুনগঞ্জ ব্যবসা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, চাক্তাই খাল দিয়ে বহরদার হাট পর্যন্ত নৌকা-সাম্পানে করে মালামাল পরিবহন হতো। তাই ধারণা করা হচ্ছে, বহরদার হাটে একটি বাণিজ্য কেন্দ্র ছিলো। বহরদার (জাহাজের অধিপতি) হাট যাদের নামে নামকরণ হয়েছে তারা ধনবান ছিলেন। তাদের প্রচুর পাল তোলা জাহাজ ছিলো। বহরদার হাটে শুধু নৌকা-সাম্পান নয়, জাহাজ চলাচলও করতো। একবার বহরদার বাড়ির একটি পুকুর খননের সময় পুরনো জাহাজের ভগ্নাংশ পাওয়া যায়। তাতে মনে হয় বহরদার হাটের দিকে জাহাজও আসতো। হয়তো বহরদার হাটের পূর্বে কর্ণফুলী ওই পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো।
১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলা স্কুল (বর্তমানে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল নামে পরিচিত) স্থাপিত হলে চট্টগ্রামে একটি শিক্ষিত শ্রেণি গড়ে ওঠার পথ সুগম হয়। চট্টগ্রাম জেলা স্কুল প্রথম দিকে চট্টগ্রাম কলেজের পুরাতন ভবনে পরিচালিত হতো। বহু পরে মাদারবাড়ির নিজস্ব স্থানে স্থানান্তরিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম কলেজকে বৃটিশরা অস্ত্রাগারে পরিণত করলে চট্টগ্রাম কলেজের কার্যক্রম পরিচালিত হতো বর্তমান গুলজার বেগম স্কুলের পেছনে খান বাহাদুর ফজলুল কাদেরের বাসভবনে। অন্যদিকে মুসলিম হাইস্কুলের কার্যক্রম চলে বাকলিয়া চাঁন মিঞা সওদাগরের বিল্ডিংয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অনেক জমিদার ও ধনবান ব্যক্তির পাকা বাসগৃহ বৃটিশ সৈন্যরা দখল করে অস্থায়ী ঘাঁটি এবং অস্ত্রাগারে পরিণত করেছিলো। ওই সময় সাময়িকভাবে এ সমস্ত পরিবারের ঠাঁই হয় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, পাঠানটুলী খান পরিবারের কথা। পাঠানটুলী আমানত খানের বাসভবন বৃটিশরা দখল করলে তারা চট্টগ্রাম কলেজের লাল ভবনে কিছু দিন বসবাস করেন।
বিংশ শতাব্দীর দিকে ফিরে আসছি। বিংশ শাতাব্দীর শুরুতে চট্টগ্রামে স্বদেশী আন্দোলন দানা বেঁধে উঠে। চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, চট্টগ্রামের ধনী ব্যবহারজীবী রাউজানের নোয়াপাড়া নিবাসী কমলাকান্ত সেনের পুত্র নলিনীকান্ত সেন স্বদেশী আন্দোলনের সূত্রপাত করেন। নলিনীকান্ত সেনকে মহাকবি নবীন সেন দেবশিশুর সাথে তুলনা করেছেন। এসময় ঋষি অরবিন্দ চট্টগ্রামে আসা-যাওয়া করতেন। তাঁর প্রভাবে চট্টগ্রামে বিপ্লবী ভাবধারা বিস্তার ঘটতে থাকে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয়, চট্টগ্রামে ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের মধ্যে একটা নবজাগরণ সৃষ্টি হয়। তাঁরা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতৃত্বে এগিয়ে এলেন। যার একটা বড় প্রমাণ হচ্ছে ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় চিটাগাং অ্যাসোসিয়েশন গড়ে ওঠার তিন বছর পূর্বে চট্টগ্রামে ‘চিটাগাং অ্যাসোসিয়েশন’ গঠিত হয়।
১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে কাজেম আলী স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রামের প্রখ্যাত জননেতা শেখ-এ চাটগাম কাজেম আলী মাস্টার তাঁর ভাইদের নিয়ে এ স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। কাজেম আলী মাস্টার ভারতীয় কেন্দ্রীয় আইন সভার সদস্য ছিলেন। আইন সভার অধিবেশনে যোগদানের জন্য তিনি দিল্লী গেলে সেখানে তিনি পরলোকগমন করেন। দিল্লীর মাটিতে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। তারও আগে ১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান নিউমার্কেটের উত্তর পাশে মিউনিসিপাল মডেল হাইস্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে ডা.খাস্তগীর স্কুল স্থাপিত হয়। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম হাইস্কুল। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামে শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটতে থাকে এবং জাগরণের ঢেউ লাগে।
১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বৃটিশরা বাংলাকে ভাগ করে আসাম ও পূর্ববঙ্গকে নিয়ে একটি আলাদা প্রদেশ গঠন করলে সমগ্র বাংলা জুড়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে উঠে। চট্টগ্রামও বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের অগ্রভাগে সামিল হয়। এ সময় অনেক সংগঠন, ক্লাব, সমিতি, ব্যায়ামাগার গড়ে উঠতে থাকে। পাশাপাশি অসংখ্য সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জুন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চট্টগ্রামে আসলেন। পূর্বোক্ত কমলাকান্ত সেনের বাড়িতে তিনি আতিথ্য গ্রহণ করেন। সদরঘাটের লায়ন সিনেমা হলের (বর্তমানে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে) মালিক ছিলেন কমলাকান্ত সেন। এটি ওই সময় কমলাবাবুর থিয়েটার নামে পরিচিত ছিলো। কমলাবাবু থিয়েটারে কবিগুরুকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। কবিগুরুর আগমনে চট্টগ্রামে বুদ্ধিভিত্তিক জাগরণ আরো এক ধাপ এগিয়ে যায়। ওদিকে ছাত্র-যুবকদের মধ্যে যখন শরীরচর্চা, শক্তি ও সাহসের প্রতি প্রবল আগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছিলো সে পটভূমিতে ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে বদরপতির আবদুল জব্বার সওদাগর লালদিঘীতে আয়োজন করলেন বলী খেলার। যা শতবর্ষ ধরে আবদুল জব্বারের বলী খেলা হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। চট্টগ্রামে স্বদেশব্রতের সঙ্গে আবদুল জব্বাবের বলী খেলার পরোক্ষ যোগসূত্র থাকা বিচিত্র নয়। চুরুলিয়ার কাজী নজরুল ইসলাম যিনি পরবর্তীতে বিদ্রোহী কবি এবং জাতীয় কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন তিনি এবং ফতেয়াবাদ নিবাসী মাহাবুবুল আলম যিনি পরে সাংবাদিক ও সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন তঁরা বাঙালি পল্টনে যোগ দিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
১৯১১ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে যায়। ১৯০৫ থেকে ১৯১১ পর্যন্ত চট্টগ্রাম ছিলো আসাম ও পূর্ব বাংলা প্রদেশের অধীনে। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের পর চট্টগ্রাম আবার বাংলার অংশ হয়ে যায়। ১৯১৪ থেকে ১৯২১ পর্যন্ত চট্টগ্রামের ইতিহাসে বেশ ঘটনাবহুল সময়। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। এ সময়ে তুর্কী খেলাফতকে বিভক্ত করা হলে মুসলমানদের মধ্যে প্রবল উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। মাওলানা শওকত আলী, মাওলানা মোহাম্মদ আলী, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী এঁদের নেতৃত্বে খেলাফত আন্দোলন শুরু হয়। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে মহাত্মা গান্ধীর ডাকে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। বর্তমানে যেখানে জেমিসন রেডক্রিসেন্ট হসপিটাল অবস্থিত সেখানে একটি মাঠ ছিলো। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে অসহযোগ আন্দোলনের সময় সে মাঠে গান্ধী বক্তৃতা করেছিলেন। মহান্ধা গান্ধী ওই মাঠে বক্তৃতা করে যাওয়ার পর এটি গান্ধী ময়দান হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। গান্ধী ময়দানে ভারতনন্দিত অনেক নেতা বক্তৃতা করেন। তাঁর মধ্যে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, অধ্যাপক হেমন্ত কুমার সরকার, মাওলানা মোহাম্মদ আলীসহ অনেকে বক্তৃতা করেন। বর্তমান মুসলিম হল তখন ওই জায়গায় ছিলো। পাকিস্তান হওয়ার পর মুসলিম হল বর্তমান জায়গায় স্থানান্তরিত হয়।
তার আগে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম পৌরসভার প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আনোয়ারার ভিংরোল নিবাসী চট্টগ্রাম জেলা বারের প্রখ্যাত আইনজীবী ও পাবলিক প্রসিকিউটর খান বাহাদুর আবদুস সাত্তার চট্টগ্রাম পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তার আগে চট্টগ্রাম পৌরসভার প্রথম বাঙালি অনির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন খান বাহাদুর আমান আলী। চট্টগ্রাম পৌরসভা লালদিঘী থেকে আন্দরকিল্লায় স্থানান্তরিত হলে আন্দরকিল্লা আবার চট্টগ্রাম শহরের কেন্দ্রন্দিুতে পরিণত হয়। আন্দরকিল্লায় শহরের একমাত্র হাসপাতাল জেনারেল হাসপাতাল, প্রসিদ্ধ ডিপার্টমেন্টাল স্টোর কোরবান আলী সওদাগর, আবদুল গণি সওদাগরের দোকানসহ কয়েকটি কবিরাজী ওষুধের দোকান নিয়ে বস্তুত আন্দরকিল্লা ব্যস্ততম বাণিজ্যিক কেন্দ্রে রূপ ধারণ করে।
১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ১৮ এপ্রিল মাস্টার দা সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে যুব বিদ্রোহ সংগঠিত হয়। বিপ্লবীরা বৃটিশদের অস্ত্রাগার দখল করে চট্টগ্রামকে স্বাধীন ঘোষণা করেন এবং ২২ এপ্রিল জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধ পর্যন্ত চারদিন চট্টগ্রামের স্বাধীনতা অক্ষুন্ন ছিলো। এ আন্দোলনে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হলেও বৃটিশ শাসকের ভিত কেঁপে ওঠে। ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারিতে প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে কারাগারে সূর্যসেনকে ফাঁসি দেয়া হয়। বৃটিশ শাসকরা সূর্য সেনের বিপ্লবী জীবনের উপর যবনিকা না টানা পর্যন্ত সমগ্র বাংলা বিপ্লবের তরঙ্গে কেঁপে কেঁপে উঠছিলো। চট্টগ্রামের পটিয়ার ধলঘাট, কালারপুল এবং আনোয়ারার গহিরা থেকে ফেনী, লাকসাম, কলকাতা, চন্দননগরের বিভিন্ন স্থানে বৃটিশ বাহিনীর সাথে মাস্টারদার যুব বিদ্রোহীদের অসংখ্য খন্ড যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে ভারত শাসন আইনের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে বাঁশখালীর খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরী বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ওদিকে বৃটিশের বিভিন্ন কারাগার ও আন্দামানে নির্বাসিতরা কমিউনিজমে দীক্ষিত হতে থাকেন। তাঁরা ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে একে একে জেল থেকে বেরিয়ে আসেন, প্রত্যেকে তখন রূপান্তারিত মানুষ। তাঁদের চোখে মুখে নতুন চেতনার দীপ্তি। তাঁদের প্রায় সকলে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ গ্রহণ করেন। সম্ভবত বিপ্লবীদের মধ্যে অনন্ত সিং, অম্বিকা চক্রবর্তী, লোকনাথ বল প্রমুখ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। বোয়ালখালীর উত্তর ভূর্ষি নিবাসী বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী কংগ্রেসে যোগ দেন। পটিয়ার ধলঘাটের বিপ্লবী অধ্যাপক পুলিন দে রাম মনোহর লুহিয়ার স্যোসালিষ্ট পার্টিতে যোগদান করেন। নগরের ফিরিঙ্গীবাজারের খান সাহেব আবদুল হক দোভাষ তাঁর বাসভবনে কারামুক্ত বিপ্লবীদের সংবর্ধনা প্রদান করেন। জেলা মুসলিম লীগের তৎকালীন সেক্রেটারী ছগীর আহমদও তাঁর মালিকানাধীন খুরশিদ মহলে বিপ্লবীদের সংবর্ধনা দেন।
১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় এবং ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত যুদ্ধ চলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইষ্টার্ণ ফ্রন্টে জাপানের অগ্রাভিযান বার্মা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। নাফ নদীর পূর্ব দিকে আকিয়াবে চলে আসে জাপানী বাহিনী। সেখান থেকে জাপানীরা চট্টগ্রামে ডেখ্রস্টাব্দ া বর্ষণ করে। তখন গোটা চট্টগ্রাম জুড়ে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। যে কোনো সময় জাপানী বাহিনী চট্টগ্রাম দখল করে ফেলবে এমন আশংকা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। জাপানীরা যাতে চট্টগ্রামে প্রবেশ করতে না পারে তখন বৃটিশ বাহিনী এক কৌশল আঁটে। বৃটিশ বাহিনী নদীপথে চলাচলরত সব ধরণের নৌকা-সাম্পান ধ্বংস করে দিয়েছিলো। আরাকান রোডের দুই পাশে এবং শহরেও অসংখ্য পরিখা খনন করা হয়। পরিখা খননের উদ্দেশ্য ছিলো জাপানী বোমার আক্রমণ থেকে নিজেদের এবং সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা। যখন তখন জাপানী বিমান চট্টগ্রামের আকাশে এসে বোমা নিক্ষেপ করতো। বিমানের সাইরেন বেজে উঠলে মানুষ হুড়াহুড়ি করে রাস্তার দুই ধারে খননকৃত পরিখায় ঢুকে পড়তে। রাতে চলতো নিষ্প্রদ্বীপ মহড়া। যুদ্ধের সময় বৃটিশরা পতেঙ্গায় চট্টগ্রাম বিমান বন্দরের নির্মাণ কাজ শুরু করলে ওই সময় চার/পাঁচশো শ্রমিক জাপানীদের বোমা বর্ষণে মারা যায়। তাদেরকে গাদাগাদি করে নগরীর পাঁচলাইশ থানার সামনে সমাধিস্থ করা হয়।
১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে মহাত্মা গান্ধীর ডাকে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে চট্টগ্রামও সম্মিলিত হয়। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে সমগ্র বাংলা জুড়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়। এ দুর্ভিক্ষে কয়েক লাখ মানুষ মারা যায়। চট্টগ্রামেও দুর্ভিক্ষের প্রভাব পড়ে। ফলশ্রæতিতে বহু লোক মারা যায়। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে দুর্ভিক্ষের সময় মুসলিম হলে কমিউনিস্ট পার্র্টির উদ্যোগে একটি চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। প্রখ্যাত শিল্পী চিত্ত প্রসাদ এ ছবিগুলো এঁকেছিলেন। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির জেনারেল সেক্রেটারী পি. সি. যোশী, যিনি পরে চট্টগ্রামের বিপ্লবী কন্যা কল্পনা দত্তের পানি গ্রহণ করে চট্টগ্রামের জামাতা হয়েছিলেন, তিনি চিত্ত প্রসাদের চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করতে চট্টগ্রামে এসেছিলেন।
১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান ইস্যুতে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় সিলেট পাকিস্তান না ভারতের সাথে সংযুক্ত থাকবে তা নিয়ে একটি রেফারেনম হয়। সেই রেফারেন্ডেম ভোট প্রদানের জন্য চট্টগ্রাম থেকে হাজার হাজার মানুষ পাঠানটুলীর শেখ মোজাফ্ফর আহমদের নেতৃত্বে সিলেটে গিয়েছিলো। পাকিস্তান আন্দোলনের এক পর্যায়ে মুসলিম লীগ ন্যাশনাল গার্ড গঠন করেন। ওই ন্যাশনাল গার্ডের জেলা কমান্ডারকে বলা হতো খ্রিস্টাব্দ ারে জিলা। শেখ মোজাফ্ফর আহমদ খ্রিস্টাব্দ ারে জিলা নিযুক্ত হন। ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হলে তিনি চট্টগ্রাম জেলা মুসলিম লীগর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্যও কলংকিত হয়ে থাকবে। মুসলিম লীগের একাংশ সাম্প্রদায়িক উস্কানী দিয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করে। হিন্দুদের হত্যা, নির্যাতন, তাদের বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটতরাজ চালায়। এ সময় অনেক হিন্দু বাধ্য হয়ে সাত পুরুষের ভিটে-মাটি ছেড়ে স্ত্রী-পুত্র ও কন্যার হাত ধরে এক বস্ত্রে ওপার বাংলায় চলে যায়।
আগেই বলেছি ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন খান বাহাদুর আবদুস সাত্তার। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি পৌর চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় নির্বাচন হলে উদীয়মান রাজনীতিবিদ ও ব্যবহারজীবী নূর আহমদ চট্টগ্রাম পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি এক নাগাড়ে ৩৩ বছর চেয়ারম্যান পদে অলংকৃত করে ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে বয়সজনিত কারণে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন। নূর আহমদের আমলে মূলত চট্টগ্রাম শহরের অবকাঠামো এবং উন্নয়নের সূচনা হয়। চট্টগ্রাম শহরের বর্তমান যে অবয়ব তা নূর আহমদ চেয়ারম্যানের আমল থেকে শুরু হয়। পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি যে খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তা পরিমাপ করার কোনো ব্যারোমিটার নেই। তাঁর নেতৃত্বকে কেউ কখনো চ্যালেঞ্জ করেন নি, করতেও চান নি। নূর আহমদ আইনসভা এবং পাকিস্তান গণপরিষদেরও সদস্য ছিলেন। তিনিই প্রথম সংসদে চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে হাটহাজারীর মাদার্শায় হালদার টেককাটা নিয়ে একটি কৃষক বিদ্রোহ সংঘঠিত হয়। বিদ্রোহ দমনের জন্য তদানিন্তন এস. ডি. ও. হাম্মাদ আলীর নির্দেশে কৃষকদের উপর গুলি বর্ষণ করা হলে কয়েকজন কৃষক শহীদ হন। এ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে চট্টগ্রামে হরতাল পালিত হয়। কবি আবদুস খ্রিস্টাব্দ প্রথম তাঁর সম্পাদিত দৈনিক পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলনের সংবাদ ফলাও করে প্রচার করলে পত্রিকাটি বাজেয়াপ্ত করা হয়।
বিংশ শতাব্দীর ত্রিশ-চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে চট্টগ্রাম ছিলো একটি ক্ষুদ্র শহর। যার পরিধি সাড়ে চার বর্গমাইলের বেশি ছিলো না। পৌরসভার ওয়ার্ড প্রথমে এ, বি ও সি- এ তিনটি ছিলো। পরবর্তীতে ই এবং ডি নামে আরো দুটি ওয়ার্ড বর্ধিত করা হয়। ত্রিশের দশকে জনসংখ্যা বিশ হাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো। তখন রাস্তাঘাট ও বাড়িঘর তেমন কিছুই ছিলো না। মূলত চট্টগ্রাম ছিলো নির্জন, শান্ত সবুজ-শ্যামল পাহাড়ী শহর। বিপ্লবীদের কর্মকান্ড ও রাজনৈতিক সংগ্রাম বাদ দিলে চট্টগ্রাম ছিলো নিরাপদ শহর। সাধারণ মানুষ রাজনীতিতে অভ্যস্ত না হলেও বিপ্লবীদের শ্রদ্ধা করতেন।
১৯৪৮ এর ৪ জানুয়ারি ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠিত হলে তার প্রথম আহবায়ক কমিটিতে রাউজান নিবাসী বিচারপতি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী অন্যতম সদস্য ছিলেন। তারও আগে কলকাতায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ছাত্রলীগের কর্মকান্ড পরিলক্ষিত হয়। সেখানে অন্যতম নেতা হিসেবে বাঁশখালীর পুকুরিয়া ইউনিয়নের নাটমুড়া নিবাসী মাহবুব আনোয়ারকে দেখা গেছে। ১৯৪৯ এর ২৩ জুন পুরনো ঢাকার টিকাটুলীতে ঢাকা পৌরসভার ভাইস-চেয়ারম্যান কাজী বশির হুমায়ুনের মালিকানাধীন রোজ গার্ডেন হলরুমে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়। সে সম্মেলনে চট্টগ্রাম থেকে ১১ জন অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা হলেন এম. এ. আজিজ, জহুর আহমদ চৌধুরী, (সম্ভবত) নুরুল ইসলাম জেহাদী, আনোয়ারার রায়পুর নিবাসী মাওলানা এ. আর. চৌধুরী, আনোয়ারা নিবাসী মাওলানা ছালেহ জহুর, নগরীর চান্দগাঁও নিবাসী ইউনুছ খান (এম. এ. আজিজের খালাতো ভাই), শেখ মোজাফ্ফর আহমদ ও আমির হোসেন দোভাষ প্রমূখ।
১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে ভাষা আন্দোলনে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করে মাস্টারদা সূর্যসেনের চট্টগ্রাম। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় গুলি বর্ষণে বহু ছাত্র হতাহতের সংবাদ চট্টগ্রামে ছড়িয়ে পড়লে এনায়েত বাজারে তাঁর মামা মুসলিম লীগ নেতা আহমদ ছগীরের (শাহেদ আজগর, রাশেদ আজগর ও ওয়াহেদ আজগরের পিতা) বাসভবন ছগীর ম্যানশনে জলবসন্তে শয্যাশায়ী ছিলেন যুবনেতা মাহবুব উল আলম চৌধুরী। তিনি প্রচন্ড ক্রোধ আর ক্ষোভে জ্বলে উঠেন। রোগ শয্যায় কোনো মতে বিছানা থেকে উঠে বসে একটি বোমা তৈরী করে ফেলেন। সে বোমার নাম ‘কাঁদতে আসেনি ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’ শীর্ষক কবিতা। কবিতাটি ২৩ ফেব্রুয়ারি লালদিঘী ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় যুবনেতা চৌধুরী হারুন উর রশিদ পাঠ করে শোনান। এ কবিতাটি ২২ফেব্রুয়ারি আন্দরকিল্লা কোহিনুর ইলেকট্রনিক প্রেস থেকে রাতারাতি ছাপিয়ে বিতরণ করা হয়। প্রকাশক ছিলেন পাথরঘাটা নিবাসী প্রয়াত অ্যাডভোকেট কামাল উদ্দিন আহমদ খান। কবিতাটি ছাপানোর অপরাধে কোহিনুর প্রেসে পুলিশ হামলে পড়ে এবং প্রেসের ম্যানেজার দবির উদ্দীনকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। শাসক গোষ্ঠী প্রেসটিও বাজেয়াপ্ত করে। ঢাকায় গুলি বর্ষণের প্রতিবাদে ২১ ফেব্রæয়ারি বিকেলে লালদিঘী মাঠে একটি প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। রাতে লালদিঘী মাঠের পশ্চিম পাশে ভিক্টোরিয়া গার্ডেনে (বর্তমানে ওই জায়গায় পেট্রোল পাম্প রয়েছে) একটি শহীদ মিনার তৈরী করা হয়। তবে পরের দিন পুলিশ এসে শহীদ মিনারটি ভেঙ্গে দেয়। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তানে ঐতিহাসিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যে নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের কাছে ধরাশায়ী হয়ে মুসলিম লীগের অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়।
ঊনবিংশ শতাব্দীর আটের দশকের মাঝামাাঝি সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরকে পরিচালনার জন্য ‘পোর্ট কমিশনারস’ গঠিত হয়। চট্টগ্রামে বন্দর আদিকাল থেকে ছিলো। চট্টগ্রাম বন্দর বিশেষজ্ঞ মেসবাহ উদ্দীন খান বন্দরের ইতিহাস লিখতে গিয়ে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরকে তিনটি পর্বে বিভাজন করেছেন। আদিকাল থেকে পোর্ট কমিশনারস গঠনের পূর্ব পর্যন্ত পোতাশ্রয় যুগ, পোর্ট কমিশনারস থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে এক, দুই ও তিন নম্বর জেটি নির্মাণ পর্যন্ত দ্বিতীয় যুগ এবং পরবর্তীকাল থেকে আজ পর্যন্ত তৃতীয় যুগ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিন নম্বর জেটির পরে প্রথম ও দ্বিতীয় জেটি হয়। এ দুটি জেটির নাম ডবলমুরিং। জেটির নাম থেকে পরবর্তীকালে একটি থানার নাম হয় ডবলমুরিং। চট্টগ্রাম বন্দরের প্রকৃত উন্নয়ন এবং আধুনিক যুগে প্রবেশ করে ষাটের দশকে। ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে চট্টগ্রামে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে স্থাপিত হয়। বর্তমানে সি.আর.বি. (সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং) ভবন ছিলো আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের সদর দপ্তর। মূলত চা রফতানির প্রয়োজনে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বন্দরের এক, দুই ও তিন নম্বর জেটি পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ করে। আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পানি সরবরাহের জন্য ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে ফয়’স লেক খনন করা হয়। এটি একটি কৃত্রিম হ্রদ। এ হ্রদ থেকে রেলওয়ে এবং বন্দর এলাকায় নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হতো। এ দুই এলাকা ছাড়া শহরের অন্যত্র পানি সরবরাহ ছিল না। ফয়’স লেক থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা রেলওয়ে এবং বন্দর এলাকায় সরবরাহ করা হতো। বন্দর এলাকার রাস্তাঘাটও ভালো ছিলো।
১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে দামপাড়ায় ওয়াটার প্ল্যান্ট (পরে ওয়াসা হয়) প্রতিষ্ঠিত হলে বাংলার বড় লাট গভর্ণর লর্ড কারমাইকেল তা উদ্বোধন করেন। প্রথমদিকে শহরের মানুষ দীঘি, পুকুর ও ঝর্ণার পানি পান করতেন, নলকূপ খুব একটা ছিলো না। পরে কিছু কিছু নলকূপ স্থাপিত হয়। নগরীতে প্রচুর ঝর্ণা ছিলো। ষাটের দশকে এসে ওয়াসা রাস্তায় পানির কল স্থাপন করে। যার ফলে নগরবাসীর মধ্যে সুপেয় পানির প্রাপ্তি অনেকটা সুগম হয়।
বিংশ শতাব্দীর চার কিংবা পাঁচ দশকে চট্টগ্রামের প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী কে. কে. সেন চিটাগাং ইলেকট্রিক সাপ্লাই প্রতিষ্ঠা করেন। এ উদ্যোগের সাথে রেয়াজুদ্দীন বাজারের মালিক রফিউদ্দীন সিদ্দিকীও যুক্ত ছিলেন। রেয়াজুদ্দীন বাজার চৈতন্য গলিতে বানিয়া টিলা নামে একটি জায়গা আছে। সে জায়গায় চিটাগাং ইলেকট্রিক সাপ্লাইয়ের দপ্তর ছিলো।
এখনো পর্যন্ত শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পর্কে কিছুই বলা হয় নি। চট্টগ্রামে একটিমাত্র রাস্তা ছিলো। এ রাস্তাটি হাটহাজারীর ফতেয়াবাদ থেকে চকবাজার, চন্দনপুরা, আন্দরকিল্লা থেকে সদরঘাট পর্যন্ত সংযুক্ত হয়। সদরঘাট, মাঝিরঘাট এবং স্ট্র্যান্ড রোডে বাণিজ্য কেন্দ্র ছিলো। ঊনবিংশ শতাব্দীতে এ এলাকায় ব্যাপক বাণিজ্যিক তৎপরতা পরিচালিত হতো। কর্ণফুলী নদীর পাশে ঘাট ছিলো। মাঝি-মাল্লারা পণ্যবাহী নৌকা-সাম্পান নিয়ে সদরঘাটে ভিড়তো। সে সব পণ্য সদরঘাট ও মাঝিরঘাটের গুদামে রাখা হতো। কর্ণফুলীর নদীর তীরবর্তী ব্যস্ততম এ জায়গাটি ছিলো কোলাহলমুখর আর জমজমাট বাণিজ্য কেন্দ্র। মাঝিরঘাটে প্রচুর লবন আর তুলার গুদাম এবং লবণ মিল ছিলো। লবণের গুদাম এখনো রয়েছে। বিখ্যাত র‌্যালী ব্রাদার্সের শো-রুম এবং গোডাউন ছিলো মাঝিরঘাটে। উল্লেখ্য, পোর্ট কমিশনারসের অফিস ছিলো সদরঘাটে।
বিশ শতকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে মুসলমানদের মধ্যে প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী ছিলেন নজু মিয়া সওদাগর। তাঁর এক পুত্র হাবিবুল্লাহ মিয়ার নামে এখন একটি শিল্প গ্রুপ হয়েছে, যা চট্টগ্রামের মানুষের কাছে হাবিব গ্রæপ নামে পরিচিত। তাঁর আরেক পুত্র ইব্রাহীম মিয়া একজন বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। অন্য দুই পুত্র ইসহাক মিয়া ও ইউনুছ মিয়া সমাজসেবী ছিলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যও করেছেন। ইসহাক মিয়ার নওজোয়ান অয়েল মিল নামে একটি মিল ছিলো। খন্দকিয়া থেকে আগত এ পরিবারটি চট্টগ্রামে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সমাজজীবনে বিশেষ স্থানের অধিকারী হয়। আরো একজন বড় ব্যবসায়ী ছিলেন যার নাম হলো পি. কে. সেন। যিনি চট্টগ্রামের সদরঘাটে প্রথম সাততলা ভবন তৈরী করেন। তাঁর মিল-কারখানা ছিলো। ছবি থেকে দেখা যায় তাঁর নিজস্ব গাড়ি ছিলো। তিনি চালমুগরা নামে একটি তেল উৎপাদন করতেন। এটি বেশ জনপ্রিয় ছিলো। ফিরিঙ্গীবাজারের আবদুর রহমান দোভাষও প্রতিপত্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন। পি. কে. সেন প্রথমজীবনে আবদুর রহমান দোভাষের অফিসে চাকুরি করতেন। আবদুর রহমান দোভাষ একাধিক জাহাজের মালিক ছিলেন।
সাহিত্যিক শামসুন্নাহার মাহমুদের স্মৃতিকথায় পাওয়া যায়, আবদুর রহমান দোভাষের আমেনা ও জামেনা নামে দুটি মেয়ে ছিলো। দুজনে ডা. খাস্তগীর স্কুলে পড়তেন। তাঁদের স্কুলে আনা-নেয়ার জন্য আবদুর রহমান দোভাষ একটি গাড়ি কিনেছিলেন। আমেনা, জামেনা নামে দুটি জাহাজও তিনি তৈরি করেছিলেন। আবার রাস্তা প্রসঙ্গে ফিরে যাই। ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে কালুরঘাট রেলওয়ে সেতু নির্মিত হয়। পর্যন্ত রেললাইন নির্মিত হওয়ার পর সেতুটি নির্মিত হয়। আরাকান সড়ক প্রাচীন একটি সড়ক। মোঘল শাহজাদা শাহ সুজা মূলত এটি নির্মাণ করেন। আরাকান সড়ক শাহ সুজা সড়ক নামেও পরিচিত। তাজমহলের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ শাহজাহানের পুত্র সুজা। শাহ সুজা ছিলেন পিতা কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত বাংলার সুবেদার। বাদশাহ শাহজাহানের আরেক পুত্র আওরঙ্গজেব ক্ষমতার দ্বন্দে শাহ সুজার সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। সুজা যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে চট্টগ্রাম দিয়ে বার্মায় পালিয়ে গিয়েছিলেন। ওই দিকে কোনো রাস্তা ছিলো না। রাস্তা তৈরী করে সুজা ও তাঁর সৈন্যবাহিনীকে বার্মায় পালিয়ে যেতে হয়েছে। চট্টগ্রাম শহরে তিনি অবশ্যই এসেছিলেন। শহর থেকে তাঁকে কর্ণফুলী পাড়ি দিতে হয়েছিলো। সম্ভবত যেখানে অভয়মিত্র ঘাট রয়েছে সেখানে সুজা কাঠগড় নামে একটি জায়গা রয়েছে সেদিক দিয়ে তিনি কর্ণফুলী পাড়ি দিয়েছিলেন। নদীর দক্ষিণ পাড়ে চরকানাই মুন্সিরহাট তিনি অবতরণ করেন। সেখান থেকে তিনি আবার রাস্তা নির্মাণ করে পাঁচরিয়ার উপর দিয়ে ছালেহ নূর কলেজের সামনে দিয়ে রামু চলে যান। রামু হয়ে গর্জনিয়া দিয়ে সম্ভবত তিনি বার্মায় প্রবেশ করেন। নগরীতে আরো একটি প্রাচীন সড়ক রয়েছে, যেটি ঢাকা ট্র্যাঙ্ক রোড নামে পরিচিত। শেরশাহ সূরী এটি নির্মাণ করেন বলে মনে করা হয়। তবে ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডের গতিপথ বর্তমান সময়ের মতো ছিলো না। চাঁদপুরে একটি কেন্দ্র ছিলো। শাহ সুজা মেঘনা পাড়ি দিয়ে সম্ভবত চাঁদপুর হয়ে মীরসরাই শুভপুর ব্রীজ হয়ে চট্টগ্রামে প্রবেশ করেছিলেন।
নগরীতে রাস্তা ছিলো দুটি-এক নম্বর ও দুই নম্বর সড়ক। কালুরঘাট থেকে চকবাজার হয়ে যে রোডটি আন্দরকিল্লা অতিক্রম করেছে সেটি এক নম্বর সড়ক। কালুরঘাট থেকে বহরদারহাট-২নং গেইট সড়কটি দুই নম্বর রোড নামে পরিচিত। নগরীতে পরিকল্পিত কোনো বাস টার্মিনাল ছিলো না। প্রথমে লালদিঘীর পাড়ে বাস টার্মিানাল ছিলো। পরবর্তীতে আন্দরকিল্লা এবং জেলখানা গেইটে টার্মিনাল ছিলো। বৃটিশ জামানার শেষদিকে ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু হলে সভা-সমাবেশের জন্য লালদিঘীর আকর্ষণ বাড়তে থাকে। লালদিঘীকেন্দ্রিক আবার ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দোকান-পাট গড়ে উঠতে থাকে।
১৯২০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে চট্টগ্রামে বেশ কিছু সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের আগস্টে প্রকাশিত হয় দৈনিক জৌাতি। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে পত্রিকাটি প্রকাশিত হতো। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে বৃটিশ সরকার জ্যোতির প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়। জেলা কংগ্রেসের পৃষ্ঠপোষকতায় জেলা কংগ্রেসের সভাপতি মহিম চন্দ্র দাসের সম্পাদনায় সাপ্তাহিক পাঞ্চজন্য (১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে এটি অম্বিকাচরণের সম্পাদনায় দৈনিক পত্রিকায় আত্মপ্রকাশ করে), খান বাহাদুর আমান আলী প্রতিষ্ঠিত অর্ধসাপ্তাহিক বা সাপ্তাহিক সুনীতি (যেখানে নিলাম ইশতেহার ছাপা হতো), ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে লোকমান খান শেরোয়ানী সম্পাদিত রাষ্ট্রবার্তা, ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে স্বনামধন্য চিকিৎসক বিএনপি নেতা ও সাবেক রাষ্ট্রদূত ডা. এ.এফ. এম ইউসুফের পিতা ডা. এম এ. ওমর প্রতিষ্ঠিত সত্যবার্ত্তা, আহমদ ছগীর চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত আওয়াজ, দেশপ্রিয় জে.এম. সেনগুপ্ত প্রতিষ্ঠিত দেশপ্রিয়, মাওলানা আবদুল হক দোভাষের অর্থানুকূল্যে মাওলানা মনিরুজ্জমান ইসলামাবাদী প্রতিষ্ঠিত সাপ্তাহিক িেখ্রস্টাব্দ তান (সম্ভবত ১৯০৩)। পরে এ পত্রিকার প্রকাশনা অব্যাহত রাখতে কাট্টলী নিবাসী ছিদ্দিক আহমদ চৌধুরী সম্ভবত অর্থায়ন করেন। কবি ওহীদুল আলম প্রতিষ্ঠিত সাপ্তাহিক পূরবী, ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে কবি আবদুস খ্রিস্টাব্দ াম প্রতিষ্ঠিত দৈনিক পূর্ব পাকিস্তান, আয়েশা খানম প্রতিষ্ঠিত আন্বেষা, ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে কবি মাহবুবুল আলম চৌধুরী ও সুচরিত চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত সীমান্ত পত্রিকা, ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে বেগম মায়মুন আলী খান প্রতিষ্ঠিত ইংরেজি দৈনিক ইষ্টার্ণ এক্সামিনার, ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক প্রতিষ্ঠিত মাসিক কোহিনুর ইত্যাদি।
পাঁচ বিশিষ্টজনের স্মৃতিকথায় চট্টগ্রাম
শহুরে সভ্যতা গড়ে উঠেনি

ড. মঈন উদ্দীন আহমদ খান

ড. মঈন উদ্দীন আহমদ খান। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রথম মহাপরিচালক। সনদ অনুযায়ী জন্ম ১৯২৬ এর ১৪ এপ্রিল। সে হিসেবে বয়স ৯২ অতিক্রম করেছে। সাতকানিয়া গ্রামের পাঠশালায় ৬ষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করে ১৯৪০ সালে শহরে চলে আসেন। প্রথম ছয়বছর গ্রামে কাটালেও বাবার সাথে অনেকবার চট্টগ্রাম শহরে এসেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রী শেষে ১৯৬০ সালে করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনিয়র লেকচারার হিসেবে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ সচিবালয়ে রিসার্চ অফিসার হিসেবেও কাজ করেন। চল্লিশ/পঞ্চাশের দশকের চট্টগ্রামকে অবলোকন করেছেন খুব কাছ থেকে। তাঁর স্মৃতিপটে তুলে আনার চেষ্টা করেছেন চট্টগ্রামের সে আমলের হালচিত্র।
১৯৪০ সালে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে সম্মিলিত পরীক্ষা হয়েছে চট্টগ্রাম শহরে। সাতকানিয়া বাহিরের মুখ নামক স্থান থেকে নৌকাযোগে শহরে এসে পরীক্ষা দিই। ১৯৪১ সালে আমি সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হই মোহসোনিয়া মাদ্রাসায় (পরবর্তীতে ইসলামিয়া ইন্টারমিডিয়েট কলেজ, বর্তমান নাম হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ) এবং ১৯৪২ সালে অস্টম শ্রেণিতে। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। জাপানিরা চট্টগ্রাম পর্যন্ত এসে যায়। ১৯৪২ সালের নভেম্বরের শেষের দিকে অষ্টম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। যেদিন আমার পরীক্ষা শেষ হয় সেদিন দেখলাম চট্টগ্রামের আকাশে যুদ্ধ বিমানের আনাগোনা। জাপানিরা এ্যারোপ্লেন নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে বৃটিশ সৈন্যরা এন্টি এয়ার ক্রাফট গান ছুঁড়ে জাপানিদের তাড়াচ্ছে। এন্টি এয়ার ক্রাফট গান উপরে উঠতে উঠতে এক পর্যায়ে বাস্ট হতো। আকাশের দিকে তাকিয়ে এসব তামাশা দেথতাম। তখন অবশ্য আমরা বুঝে উঠতে পারি নি এটা তামাশা নাকি কোনো যুদ্ধ। আমরা পরীক্ষা শেষে যখন চলে আসলাম তখন বুঝতে পারলাম জাপানিরা চট্টগ্রাম পর্যন্ত যুদ্ধের অন্তর্ভুক্ত করেছে। জাপানিরা বৃটিশ সৈন্যদের বিতাড়িত করে চট্টগ্রামকে নিয়ন্ত্রণের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।
দুই শক্তির সমর যুদ্ধের কারণে সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলো। পরের বছরের জানুয়ারি-মার্চ তিন মাস চলে গেলো কিন্তু স্কুল খুললো না। আমার বাবা আমার লেখাপড়া নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়লেন। আমার বাবারা চার ভাই। বাবার নাম তাহের উদ্দীন আহমদ খান। বাবা ছিলেন পরিবারের মেজো ছেলে। আমার জ্যাঠার নাম কবির উদ্দীন আহমদ খান। অন্য দুই চাচা হলেন কামাল উদ্দীন আহমদ খান (কবি সুফিয়া কামাল কামালের স্বামী ও সুলতানা কামালের বাবা) এবং জামাল উদ্দীন আহমদ খান। দুই চাচা তখন কলকাতা থাকতেন। তাঁরা মূলত বাস করতেন কলকাতা থেকে ৩২ মাইল দূরে হুগলীতে। হাজী মুহাম্মদ মহসিনের বাড়ি হলো হুগলীতে। হাজী মুহাম্মদ মহসিনের টাকা দিয়ে তৈরি হয় চট্টগ্রামের মোহসেনিয়া মাদ্রাসা। তাঁর বাড়িতে আরেকটি মোহসেনিয়া মাদ্রাসা ছিলো। আমি ১৯৪৩ এর মার্চ-এপ্রিলের দিকে নবম শ্রেণিতে ওখানে ভর্তি হই। নবম ও দশম শ্রেণি ওই স্কুলে পড়ি। ১৯৪৫ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিই। সে সময় চট্টগ্রামে তুমুল যুদ্ধ। থেমে থেমে জাপানিরা বোমার বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে। অন্যদিকে বৃটিশ সৈন্যরা পাল্টা জবাব দিচ্ছে। একবার জাপানিরা পতেঙ্গা বিমানবন্দর আক্রমণ করে। জাপানিদের আক্রমণে ওই সময় (১৯৪২-১৯৪৩) প্রায় ছয়শত মানুষ মারা যায়। চট্টগ্রাম শহরের ভিতরে মাঝে-মধ্যে জাপানিরা বোমা নিক্ষেপ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সবচেয়ে বৃটিশরা ব্যাপক সংখ্যক আফ্রিকান নিগ্রো সৈন্য নিয়ে আসে। বৃটিশরা এসময় ইসলামিয়া ইন্টারমিডিয়েট কলেজ (হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ) দখল করে নেয়। ওই সময় থেকে মোহসেনিয়া মাদ্রাসা চকবাজার অলি খাঁ মসজিদের পূর্ব পাশে একটি প্রাইমারি স্কুলে স্থানান্তরিত হয়। প্রাইমারি স্কুলটি এখনো বিদ্যমান। মোহসেনিয়া মাদ্রাসা প্রথমে পর্তুগীজ দুর্গ ছিল। মোহসেনিয়া মাদ্রাসা যখন ইসলামিয়া ইন্টারমিডিয়েট কলেজ হলো তখন এক শ্রেণির মওলানা মনে করলেন মাদ্রাসাটি নষ্ট করে ফেলা হলো। তখন সবাই দারুল উলুম মাদ্রাসার দিকে ঝুঁকে পড়লেন। মূলত মোহসেনিয়া মাদ্রাসাটি থেকে ইসলামিয়া ইন্টারমিডিয়েট কলেজ হয়ে যাওয়ার পর আরবি পড়ালেখার জন্য দারুল উলুম মাদ্রাসার গুরত্ব বেড়ে যায়।
যুদ্ধের সময় বৃটিশরা পাহাড়ের ভিতর দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত আরাকান সড়ক করলো। আগে থেকে আরাকান রোডের অস্তিত্ব ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আরাকান রোড সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন হয়। ওই সময় পাহাড়ে গর্জন গাছে ভরপুর ছিল। বৃটিশরা গর্জন গাছ কেটে রাস্তা তৈরি করলো। বৃটিশ সৈন্যদের পাশাপাশি প্রচুর দিনমজুর রাস্তা তৈরির কাজ করে। প্রতিদিন অনবরত মিলিটারির গাড়ি চলতে শুরু করলো। মানুষের যাতায়াত বেড়ে গেলো। ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম ফিরে আসি। ফিরে এসে দেখি কলকাতার এক হিন্দু ভদ্রলোক চট্টগ্রাম শহর থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বাস সার্ভিস চালু করেছেন। তখন চট্টগ্রামে দূরপাল্লার বাস সার্ভিস চালু করার মতো বিত্তশালী পরিবহন ব্যবসায়ী ছিলেন না। সরকারের অনুমতি নিয়ে কলকাতার এক লোক চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে এই বাস সার্ভিস চালু করে সীমিত পরিসরে।

১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আমরা হেঁটে বটতলী আর ষোলশহর রেল স্টেশনে যেতাম। তখন দোহাজারি পর্যন্ত রেল লাইন ছিল। এর পর রেল লাইন ছিলো না। এখনো নেই। দোহাজারি থেকে আমার গ্রামের বাড়ি চুনতি প্রায় ১৬ মাইল। অনেক সময় এই ষোল মাইল পথ হেঁটে যেতাম। বিশ্বযুদ্ধের পর ওই রুটে জিপ সার্ভিস চালু হয় ক্ষুদ্র পরিসরে। বিশ্বযুদ্ধের সময় বৃটিশরা অনেক পুরনো জীপ রেখে গিয়েছিলো। এসব গাড়ি পরবর্তীতে গণপরিবহন হিসেবে ভিতরের রাস্তাগুলোতে মাঝে-মধ্যে চলতে দেখা গেছে। দোহাজারি থেকে রাজঘাটা (লোহাগাড়া) পর্যন্ত দশ মাইল পর্যন্ত কাঁচা রাস্তায় এসব জিপ চলতো। মাঝে-মধ্যে এসব জিপে করে রাজঘাটা পর্যন্ত যেতাম। এরপর বাকী ছয় মাইল পায়ে হেঁটে বাড়ি যেতাম। কিন্তু শহর থেকে ওই সময় কোন গণপরিবহন চলাচল করে নি। সদরঘাট থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত লঞ্চ সার্ভিস চালু ছিলো। লঞ্চে করে কক্সবাজার গিয়েছি ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের পরে।
চল্লিশের দশকে শহর ছিল আন্দরকিল্লা, চকবাজার, চন্দনপুরাকেন্দ্রিক। শহর ছিল ছোট, শহরতলী ছিলো বেশি। শহরতলীতে থাকতো শহুরেরা। তাদেরকে খোট্টা বলা হতো। ভাষা ছিল মিশ্রিত। সম্ভবত এরা প্রথমদিকে মোগল সৈন্যবাহিনীতে ছিলো। তখন শহুরে সভ্যতা এতো ব্যাপ্তি লাভ করেনি। মানুষের সভ্যতা ছিলো গ্রামকেন্দ্রিক। পরিবারভিত্তিক সভ্যতা ছিল। শহরে এসবের কালচার ছিলো না। মানুষ কাজের জন্য শহরে আসতো। কাজ শেষে মানুষ গ্রামে চলে যেতো। তখন রোববার সরকারি ছুটি ছিলো। শনিবার সন্ধ্যায় মানুষ কাজ শেষে বাড়ি চলে যেতেন আবার সোমবার সকালে শহরে ফিরতেন। শহরে থাকার মতো পরিবেশ তখন ছিলো না।
শহরের ভিতরে যাতায়াতের মাধ্যম ছিলো মূলত হাঁটাহাঁটি। তিন/চার মাইল হাঁটতাম। ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন ছিলো। সৌখিন মানুষ কিংবা চার/পাঁচজন মিলে ঘোড়ার গাড়ি করে বটতলী স্টেশন থেকে আন্দরকিল্লা পর্যন্ত আসতাম। দুই ঘোড়ায় চালিত গাড়ি করে যাত্রীরা যাতায়াত করতেন। পয়সাওয়ালারা এক ঘোড়াচালিত গাড়িতে চলাফেরা করতেন। আমার যতটুকু মনে পড়ে হাতি কোম্পানী (আবদুল গণি চৌধুরী) এক ঘোড়ার গাড়ি করে যাতায়াত করতেন। হাতি কোম্পানীরা বার্মায় ব্যবসা করতেন। আন্দরকিল্লাহ জুমা মসজিদের উত্তর পাশের কমপ্লেক্সটা হাতি কোম্পানিদের ছিলো। আন্দরকিল্লায় তাদের একটি বড় কাপড়ের দোকান ছিলো। রাস্তায় গরুর গাড়ি চলতো। তবে এসব গরুর গাড়িতে পণ্য পরিবহন হতো। হাতে টানা রিক্সা ১৯৪৫ সালের পরে চলাচল করতে দেখা গেছে।
দু’য়েকটা মোটর গাড়ি (ব্যক্তিগত) রাস্তায় চলাফেরা করতে দেখা গেছে। আমাদের বংশের মোস্তফিজুর রহমান খানের একটি গাড়ি ছিলো। তিনি ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট। ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট হলেও এ গাড়িটি ছিলো তাঁর নিজস্ব। ১৯৩৮-১৯৩৯ সালের দিকে আমি এই গাড়ি দেখেছি। তাঁর ছেলে এখন চট্টগ্রাম শহরের রুমঘাটায় বসবাস করছেন। রেয়াজুদ্দীন বাজারের নামকরা ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ রফিউদ্দীন সিদ্দিকীর প্রাইভেট গাড়ি ছিলো। তখন তো রাস্তাঘাট এত পাকা ছিলো না। মূল রাস্তাগুলো ছিলো কংকরের। ওই সময় জোয়ার হলে পানি ওঠতো। পুরো জায়গা খালি ছিলো। চারিদিকে ডোবা আর জলাশয়। কিন্তু বাড়ি-ঘরে পানি উঠতো না। বৃষ্টির পানির জন্য জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় নি। বেড়ানোর অভ্যাস তখন মানুষের ছিলো না। সরকারি উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার পরিবার ছাড়া অন্যরা শহরে পরিবার নিয়ে থাকতো না। স্থানীয়রা খুব একটা শিক্ষিত ছিলো না। জমি-জমা বিক্রি করে তারা চলে যেতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে রাস্তায় খুব একটা বিদ্যুত ছিলো না। মাঝে-মধ্যে কেরোসিনের লাইট জ্বলতো। বড় বড় খাম্বা করে সেখানে কূপ বেঁধে লাইট জ্বালানো হতো। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আমি এসব দেখেছি। ঘরে ঘরে বিদ্যুত ছিলো। তবে তা ক্ষুদ্র পরিসরে। সবার ঘরে বিদ্যুৎ ছিলো না। মিউনিসিপ্যালিটি তা সরবরাহ করতো। খোলা ল্যাট্রিন ছিলো। মেথররা খোলা ল্যাট্রিন পরিষ্কার করতো এবং নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলতো। মানুষের সুপেয় পানির ব্যবস্থা হতো পকুর এবং ঝর্ণা থেকে। লালদিঘী এবং আসকার দিঘীর পানি মানুষ পান করেছে। কিছু কিছু চাপাকল ছিলো। মিউনিসিপ্যালিটি পরে ঘরে ঘরে পানি সরবরাহ করে। মানুষের চা খাওয়ার অভ্যাস ছিলো বেশি। চল্লিশের দশকে রোগব্যাধির মধ্যে বেশি হতো ম্যালেরিয়া। ম্যালেরিয়া প্রতিরোধের জন্য বৃটিশ সরকার পোস্ট অফিসের মাধ্যমে কুইনাইন বিক্রি করতো। একটি কুইনাইন ওষুধের ফাইল ছয় আনা করে বিক্রি করা হতো। তখন যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিলো পোস্ট অফিস।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত দেশে আমূল পরিবর্তন হয়। বৃটিশরা চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ করে কলকাতায় নিয়ে যায়। বৃটিশ আমলে এই বন্দর অনেকটা অকেজো হয়ে পড়ে। সদরঘাট দিয়ে লঞ্চ চলতো। বন্দর দিয়ে মূলত হজ্ব যাত্রী পরিবহন হতো। ১৯৫০ এর পর থেকে ষাট পর্যন্ত শহরে যোগাযোগ ব্যবস্থার কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। ষাটের দশক থেকে রাস্তায় কিছু রিক্সা দেখা গে