মফস্বলের পরীক্ষার ফল

ইচ্ছাশক্তি এবং একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী রাফির কথা

এমরান চৌধুরী

19

গত সপ্তাহে এইচ.এস.সি. পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায় বরাবরের মতোই শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের চেয়ে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা পাশের হার এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্তির দিক থেকে অনেক পিছিয়ে। বিষয়টি অনেকের কাছে সন্তোষজনক নয় বলে প্রতীয়মান হলেও আমি মনে করি এটাই স্বাভাবিক। এর চেয়ে বেশি কিছু প্রত্যাশা করার মানে হবে ছাগলের কাছে গরুর দুধের প্রত্যাশার সমান। আমাদের প্রত্যাশার দৈর্ঘ্যপ্রস্থ যত বেশি হয় হতাশার পরিধিও হয় তত বেশি বিস্তৃত । তাই প্রতি বছর ফলাফল প্রকাশের আগেই প্রত্যাশার লাগাম টেনে ধরা জরুরি। এ বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রে আরও বেশি জরুরি। কারণ প্রতি বছর ফলাফল প্রকাশের পর অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যায়। অনেক শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত ফল করতে না পারায়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিভাবকের বকাঝকার ভয়ে আত্মহননের মতো চরম পথ বেছে নেয়। একজন শিক্ষার্থীর ভালো ফলাফলের চেয়ে তার বেঁচে থাকাটাই আমাদের কাছে খুব বেশি জরুরি। এ কারণে যাঁদের ঘরে শিক্ষার্থী থাকে ফলাফলের আগে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, পরীক্ষার রেজাল্ট নিয়ে টেনশন না করা এবং ফলাফল যা-ই হোক তাতে তাঁরা খুশি হবেন বলে ছেলেমেয়েদের আগেভাগে আশ্বস্ত করা উচিত। তা যদি না হয় যে কোনো সময় বড়ো ধরনের অঘটন ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।
গত ১৭ জুলাই এ বছরের এইচ.এস.সি. পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়। এ বছর চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ৯৮,৯২৬ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে বিভিন্ন বিভাগ মিলিয়ে সর্বমোট ৬১,৫২৩ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। পাসের হার ৬২.১৯%। জিপিএ-৫ প্রাপ্ত মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২,৮৬০ জন। আবার এসব শিক্ষার্থীর শতকরা ৮৮ জনই চট্টগ্রাম শহরের কোনো না কোনো কলেজের। অবশিষ্ট শতকরা যে ১২ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে গ্রামাঞ্চল বা মফস্বলের কলেজগুলো থেকে তা তাঁদের পরম ইচ্ছাশক্তি এবং কলেজসমূহের সম্মানিত শিক্ষকমন্ডলীর সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।অন্যদিকে শহরের শিক্ষার্থীদের পাসের হার ৭৫.৩২%, যা গত বছরের তুলনায় ০.৬৩ শতাংশ বেশি। বিপরীতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার কলেজসমূহ থেকে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাসের হার ৫৫.৬১%, যেখানে গত বছর পাস করেছিল ৫৯.২৫% শিক্ষার্থী। এ বছর বিভিন্ন উপজেলা থেকে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৪% শিক্ষার্থী কম পাস করেছে। অর্থাৎ গ্রামাঞ্চলের ছাত্র-ছাত্রীদের পাসের হার এক বছরেই নিম্নমুখী হয়েছে প্রতি শতে চার জন।
আমরা সবাই জানি, সব অভিভাবকই ছেলেমেয়েদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত তথা ভালো ফলাফলের জন্যে নিজেদের সর্বস্ব ত্যাগে প্রস্তুত থাকেন। আর তাই ভালো ফলাফলের জন্যে সবাই চেষ্টা করেন তাঁদের ছেলেটি বা মেয়েটিকে শহরের কোনো না কোনো কলেজে ভর্তি করাতে। যাঁরা পারেন না প্রচলিত ভর্তি পদ্ধতির কারণে তাঁরা অনিচ্ছা সত্তে¡ও মাটি কামড়ে পড়ে থাকেন গ্রামে। তাই একথা অকপটে বলতে বাধা নেই অপেক্ষাকৃত অনগ্রসর এবং যাদের আর কোথাও ভর্তি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই সেই সব শিক্ষার্থীরাই গ্রামের কলেজগুলোতে ভর্তি হন।সুতরাং এসব অনগ্রসর শিক্ষার্থীর ফলাফল কি ধরনের হতে পারে এটা বোদ্ধা মহলের কম বেশি জানা ।
গ্রামাঞ্চলের কলেজগুলোতে শতকরা ৪ জন শিক্ষার্থী গত বারের চেয়ে কম পাস করলেও গ্রাম ও শহরের পাসের হারের ব্যবধান মাত্র ১৯.৭১%। মাত্র, এই কারণেই বলতে চাই, শহরে যে সুযোগ সুবিধা বর্তমান এবং যে হারে বেছে বেছে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয় তাতে পাসের হার ৯৯% হওয়াই আসলে দরকার। কিন্ত সেক্ষেত্রে পাসের হার ৭৫% খুব একটা বেশি নয়। শহরের একজন অভিভাবক একজন ছাত্র বা ছাত্রীর পেছনে যে সময় ব্যয় করেন কিংবা একজন শিক্ষার্থীর পেছনে যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেন তার সিকিভাগও যদি গ্রামের ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে করা হতো তাহলে ফলাফলের চিত্র নিঃসন্দেহে পাল্টে যেত। তার ওপর শহরের কলেজগুলোতে রয়েছে পর্যাপ্ত দক্ষ শিক্ষক, উন্নত অবকাঠামো এবং অবাধ কোচি-বাণিজ্যের ছড়াছড়ি। সুতরাং শহরে থেকে কিংবা ছেলেমেয়েদের সুন্দর ভবিষ্যত বিনির্মাণে যে সব শহুরে নাগরিক সার্বক্ষণিক শ্রম দিচ্ছেন, অকাতরে অর্থ ব্যয় করে যাচ্ছেন তাঁদের ছেলেমেয়েদের ভালো ফলাফলের জন্য ধন্যবাদ যদি কাউকে দিতে হয় তা দিতে হবে প্রথমত অভিভাবকদের, তারপর কোচিং-এর শিক্ষকদের, যাঁরা নিজেদের সাধ আহলাদ দূরে রেখে সকাল ৭-০০ টা থেকে অন্যের ছেলেমেয়েদের মানুষ করার জন্য নিরন্তর শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। অবশ্য তিনি তার জন্য একটা সন্তোষজনক অংকের সম্মানি পাচ্ছেন তা বলাই বাহুল্য। তাই ভালো ফলাফলের জন্য শহরাঞ্চলের মেধা সম্পন্ন ছাত্র-ছাত্রীসমৃদ্ধ কলেজ বা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা থাকলেও তা গ্রামাঞ্চলের কলেজগুলোর তুলনায় নিতান্তই কম।
গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের পাসের হার কম হওয়ার কারণ হিসেবে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের প্রধান পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মহোদয় অনুন্নত অবকাঠামো ও দক্ষ শিক্ষকের সংকটের কথা উল্লেখ করেছেন। গত ক’বছর ধরে গ্রাম ও শহরের শিক্ষার্থীরা দুটো অভিন্ন বিষয়ে ( ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি) রেজাল্ট খারাপ করে আসছে। এ দুটো বিষয়ের কোনো না কোনোটায় অকৃতকার্য কিংবা ভালো নম্বর না পাওয়ার কারণে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা যেমন কমে যাচ্ছে, পাশাপাশি বাড়ছে ফেলের হার। তাই মফস্বল কলেজগুলোর দৃষ্টি দিতে হবে কীভাবে পাসের হার বাড়ানো যায় তার ওপর।
প্রথমত, একটি কলেজে যে পরিমাণ সামর্থ্য আছে তার সর্বোচ্চ ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রয়োজন অভিভাবক, কলেজ পরিচালনা কমিটি, স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেম্বার, গণ্যমান্য ব্যক্তি, সংশ্লিষ্ট এলাকার সাংসদ এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সর্বাত্মক সহযোগিতা। তাঁদের সহযোগিতা ছাড়া গ্রামাঞ্চলের কোনো কলেজেরই পাসের হার বাড়ানো মোটের ওপর অসম্ভব। কলেজের টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নেয়া শিক্ষার্থীর রেজাল্ট থেকেই বোঝা যায় উক্ত শিক্ষার্থী সামনের ফাইনাল পরীক্ষায় কেমন ফলাফল করতে পারে। টেস্টের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে সাধারণত এইচ.এস.সি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের চূড়ান্ত তালিকা প্রণিত হয়। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে গ্রামের খুব কম কলেজই স্বাধীনভাবে এ কাজটি করতে পারেন। এ কাজটি করতে গিয়ে তাঁদের মুখোমুখি হতে হয় অনাকাক্সিক্ষত চাপ ও তদবিরের। ফলে নানা কৌশলে অপেক্ষাকৃত দুর্বল ছাত্রদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে হয়। আর এসব দুর্বল শিক্ষার্থীরা খুব কম সংখ্যকই কলেজের পাসের হার বাড়াতে সহায়তা করে।
জিপিএ-৫ নয়, গ্রামাঞ্চলের পাশের হার বাড়াতে প্রথমেই এগিয়ে আসতে হবে অভিভাবকদের। তাঁদের কাজটি হবে তাঁদের কলেজ পড়ুয়া ছেলে বা মেয়েটির কলেজে যাওয়া নিশ্চিত করা। কলেজে যাওয়ার পর সে আদৌ ক্লাসে অংশ নিয়েছে নাকি বন্ধুদের নিয়ে আড্ডায় মেতেছে তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। আপনার ছেলের বা মেয়ের নাড়ির খবর আপনার চেয়ে আর কেউ ভালো জানার কথা নয়। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত এবং সময়মতো ক্লাসে উপস্থিতি শিক্ষকদের ক্লাসের প্রতি মনোযোগী হতে যথেষ্ট অনুপ্রাণিত করে। লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন শ্রোতার সংখ্যা যত বেশি হয় বক্তার বক্তব্য ততবেশি প্রাণবন্ত ও শাণিত হয়। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের এ মর্মে সংকল্পবদ্ধ হতে হবে নিজেদের যতটা সামর্থ্য আছে তা দিয়ে এ বছর পাশের হার শতকরা পাঁচভাগ যাতে বাড়ে সে ব্যাপারে সবাই যত্নশীল হবেন। টেস্ট পরীক্ষার অন্তত পাঁচ মাস আগে থেকে প্রতিটি ক্লাসে ক্লাস নেয়ার ফাঁকে ফাঁকে শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রস্তুতির ওপর জোর দিতে হবে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীই যে একটু চেষ্টা করলে ভালোভাবে পাস করতে পারে সেই বোধ তার ভেতরে জাগিয়ে তুলতে হবে। যার দুটো চোখই অন্ধ, সেই শিক্ষার্থী যদি জিপিএ-৫ পেতে পারে তাহলে তারা কেন পারবে না সকল বিষয়ে পাস করতে। অবশ্যই পারবে। কারণ কবিতো বহুকাল আগেই বলে রেখেছেন, পারিবে না এ কথাটি বলিও না আর।
তাই পাসের জন্যে চাই শুধু একটা জিনিস আর তাহলো ইচ্ছা শক্তি। যে ইচ্ছাশক্তির বলে সাইফুদ্দিন রাফি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও পেয়েছেন জিপিএ-৫। রাফি এ বছর পটিয়া সরকারী কলেজ থেকে মানবিক বিভাগের ছাত্র হিসেবে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছেন। মানবিক বিভাগ থেকে যেখানে এ গ্রেড পাওয়াটাই বড়ো ভাগ্যের ব্যাপার সেখানে রাফি দৃষ্টিহীন চোখে জিপিএ-৫ নিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। তাঁর এ অভাবিত সাফল্য দক্ষিণ চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি মফস্বলের সকল শিক্ষার্থীর বিশেষত যারা চোখ থাকিতে অন্ধ তাদের নিশ্চিত অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে দৃষ্টিহীনতাও যে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না তার জলন্ত প্রমাণ সাইফুদ্দিন রাফি। পটিয়ার জঙ্গলখাইন ইউনিয়নের উজিরপুর গ্রামের মৃত আজহার উদ্দিন মাষ্টারের কনিষ্ঠ সন্তান রাফি। তাঁর ইচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া এবং ইংরেজির লেকচারার হওয়া। আসুন আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের মনে রাফির মতো ছেলেদের প্রবল ইচ্ছাশক্তিটা জাগিয়ে তুলি, গ্রামাঞ্চলে ফেলের সংখ্যা কমাতে এই শক্তিটাই রাখতে পারে অপার ভূমিকা।