ইউটিউব, ফেসবুক এবং আওয়ামী লীগ ও ভারতবিরোধী অপপ্রচার

25

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

ইউটিউব এক বিচিত্র জগত। ভালো-খারাপ, সৎ-অসৎ, দোস্ত-দুশমন, পুণ্যবান-পাপী, গুণী-নির্গুণ, সব ধরনের মানুষের যেন মেলা বসে গেছে। যার যা ইচ্ছা ভিডিও আপলোড করছেন। কারো কোন নিয়ন্ত্রণ নেই,কারো কাছে কোন জবাবদিহি করতে হয় না।এমন কোন জাগতিক বিষয় নেই , যে ইউটিউবে পাওয়া যাচ্ছে না।এ যেন আরেক “গুগল”। করোনা সংক্রমণের আশংকায় প্রায় তিনমাস গৃহবন্দী অবস্থায় বই পড়ে, লেখালেখি করেও থাকে অঢেল সময়, অফুরন্ত অবসর। এমন অবস্থায় ইউটিউব, ফেসবুকই আমার নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র ও উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের উৎসাহ ও সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় দেশে আইটি খ্যাতে জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। ঘরে ঘরে কম্পিউটার, ইন্টারনেট, জনে জনে ফেসবুক। এতে দেশে যে তথ্য প্রযুক্তিখাতে দেশে বিরাট বিপ্লব সাধিত হয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। মানুষের আয়-রোজগারও বেড়ে গেছে, আউটসোর্সিং খাতকে অনেক তরুণ যুবকের আয়ের একটি উৎস হিসেবে পরিণত হয়েছে। আইটি সেক্টরের এ সব সদর্থক দিক যেমন রয়েছ, তেমনি একটি নঞর্থক প্রভাবও দেখা যাচ্ছে। ফেসবুকের বিপুল কার্যকরি প্রভাব কাজে লাগিয়ে জঙ্গিবাদ ছড়িয়ে দেয়ার প্রয়াসও নিকট অতীতে দেখা গেছে। ফেসবুক দেখে মুক্তচিন্তার বøগারদের বেছে বেছে হত্যা করছিল জঙ্গিরা। ড.হুমায়ুন আজাদের মত মেধাবী শিক্ষক ও বহুপ্রজ লেখক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অজয় রায়ের পুত্র অভিজিৎ রায়, আরোও ক’জন বøগারকে মৌলবাদী জঙ্গিরা কুপিয়ে কুপিয়ে নৃশংস পন্থায় হত্যা করেছে। রামুতে ফেসবুকের মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এবং বাঙালি সভ্যতার হাজার বছরের নিদর্শনকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে মৌলবাদী চক্র।যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর বিচারের সময় সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে বলে গুজব ছড়িয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে ব্যাহত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। আবার ফেসবুকের মাধ্যমে যোগাযোগ ও প্রচার চালিয়ে গণজাগরণ মঞ্চ সৃষ্টির মত সদর্থক কর্মকাÐও জাতি প্রত্যক্ষ করেছে।
ইউটিউবে আমি দেখছি বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের নানা ঘটনা, তার সংগ্রাম,ত্যাগ,সংকল্প এবং সাহসিকতা নিয়ে তৈরি ভিডিও; শেখ হাসিনার প্রশংসা ও আওয়ামীলীগের ইতিহাসও দেখেছি। বঙ্গবন্ধুর খুনি ক্যাপ্টেন মাজেদের গ্রেপ্তার হওয়ার কাহিনী, তার ফাঁসি কার্যকরের সংবাদ নিয়ে যেমন ভিডিও আপলোড করা হয়েছে, তেমনি তাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে চিত্রিত করে মুক্তিযোদ্ধারা কেন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলো-সুকৌশলে এমন প্রশ্নের অবতারণা ও যুক্তিজাল বিস্তার করে বঙ্গবন্ধু হত্যাকে যৌক্তিক প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টাও আমি বিস্ময়বিক্ষুব্ধ চিত্তে লক্ষ্য করেছি এবং ব্যথিত হয়েছি এই ভেবে যে কারা এরা? এসব ছদ্মবেশী শত্রæ কারা? শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সরকার দেশের ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এত সাহস কিভাবে ওরা পায়? আমার ফেসবুকে এমনি ধরনের পোস্ট না দেখলে তথ্য প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যে এমন ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র চলছে তা জানতে পারতাম না। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের উপর আপলোড করা ভিডিও চিত্রে পাকিস্তানের পরাজয়ের কথা উল্লেখ করে সে জন্য পাকিস্তানের গণহত্যা ও নানা অপকর্মকে দোষারোপ করা হয়েছে সত্য, কিন্তু একই ভিডিওতে বর্তমানে কারা বাংলাদেশের শত্রæ, কারা বন্ধু-এসব প্রশ্ন উত্থাপন করে বলা হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধকালো পাকিস্তান বাংলাদেশের শত্রæ ও ভারত বন্ধু হয়ে যায়। কিন্তু সেই বন্ধু বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করছে না। উদাহরণ হিসেবে তিস্তা নদীর জল থেকে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা দিতে ভারত গড়িমসি করছে – এই উদাহরণ দিয়ে ভারতকে বাংলাদেশের শত্রæ হিসেবে চিহ্নিত করার সুচতুর প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়েছে ভিডিওটিতে।
ভারতের এমনই দুর্ভাগ্য যে তাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় স্বাধীনতা লাভকারী বাংলাদেশে স্বাধীনতার পরাজিত শত্রæরা কিছুদিন ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থেকে তারপর ছদ্মবেশ নিয়ে ধীরে ধীরে খোলস থেকে বেরিয়ে এসে মানুষের মধ্যে ভারতের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো শুরু করেছিলো।তারা যে পাকিস্তানপন্থী সেটা তাদের ভারতবিরোধী অপপ্রচার থেকে প্রমাণিত হয়। পাকিস্তানের একমাত্র রাগ ভারতের উপর ; কারণ তারা মনে করে ভারত মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে না থাকলে পাকিস্তান কখনো যুদ্ধে পরাজিত হতো না। তাই তারা প্রচুর টাকাপয়সা ছড়িয়ে ভারতের বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের অপপ্রচার, কুৎসা, মিথ্যা রটনা চালাতে থাকে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান এবং ধর্মভীরু। তাদেরকে বুঝানো হয় ভারত হিন্দু রাষ্ট্র। পাকিস্তান ছিল মুসলমানের রাষ্ট্র। তাই ভারত মুসলমানের রাষ্ট্র পাকিস্তানকে ভেঙ্গে দিয়েছে আওয়ামী লীগের সাহায্যে।এভাবে মানুষের মধ্যে ভারতবিরোধী চেতনা ছড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি আওয়ামীলীগকে ভারতের দালাল হিসেবে প্রতিপন্ন করার সু² ষড়যন্ত্র চালানো হয়। অন্যদিকে বিপ্লবের নামে কিছু দল স্বাধীনতার পর সশস্ত্র তৎপরতা শুরু করলে দেশে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। আর বঙ্গবন্ধু যখন বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনগঠনের চেষ্টা চালিয়ে সফল হতে সক্ষম হয়েছিলেন, তখনই সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা যারা মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের সহযোগি ছিল, তারা বাংলাদেশের জন্য পাঠানো খাদ্যশস্যবাহী জাহাজ মাঝপথ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে গেলে দেশে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ গৃষ্টি হয়। এভাবে সা¤প্রদায়িকতা, ভারতবিরোধী অপপ্রচার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং কৃত্রিম খাদ্য সংকটের ফলে দেশে এক ঘোলাটে পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে।যার সুযোগ নিয়ে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্য বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে ৭৫ এর ১৫ আগষ্ট। বঙ্গবন্ধুকে যেদিন হত্যা করা হয়,সেদিন রাওয়ালপিন্ডির আইএসআই হেডকোয়ার্টারে উল্লাস চলছিলো।
এদেশে ভারত বিরোধিতা নতুন কিছু নয়। গোটা পাকিস্তানি জামানায় শাসকগোষ্ঠী এবং শাসকদল মুসলিম লীগ ভারত বিরোধিতার জিগির তুলে এবং ‘ইসলাম গেল ইসলাম গেল’ বলে তারস্বরে চিৎকার জুড়ে দিয়ে মানুষকে বোকা বানিয়ে রাখতে চেয়েছিলো। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বাঙালীকে শোষণ করা। কিন্তু তাদের সে উদ্দেশ্য সফল হয় নি। কারণ কিছু মানুষকে কিছুদিনের জন্য বোকা বানানো যায়, কিন্তু সব মানুষকে চিরদিন বোকা বানিয়ে রাখা যায় না।পাকিস্তানীদের চাতুরী বাংলার মানুষ একদিন ধরে ফেলে এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে তারা সংগঠিত হয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং মুক্তিযুদ্ধ করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে। পাকিস্তানি বাহিনী ইসলামী হুকুমত রক্ষার নামে হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ,লুটতরাজ ইত্যাদি বর্বরতা চালায়। মুসলিম লীগ,জামাত ও নেজামি ইসলামের নেতারা এসব পাশবিক কর্মকান্ডকে ধর্মের নামে জায়েজ বলে ফতোয়া দেয়।অবশ্য শেষ পর্যন্ত তারা পরাজিত হয়।
এটা খুবই দুঃখজনক যে একই পাকিস্তানি ভূত বাংলাদেশের ঘাড়েও চেপে বসেছে। বাংলাদেশের মানুষের মনোভাব কিভাবে বদলালো তা খুব সুন্দরভাবে চিত্রিত হয়েছে সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায়ের লেখায়। তাঁর এক প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ পর্যন্ত তিনি তিনবার বাংলাদেশ সফর করেছেন, প্রথমবার স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশটি দেখতে গিয়ে তিনি লক্ষ্য করেছেন শেখ মুজিবের জয়ধ্বনিতে বাংলাদেশের আকাশ বাতাস মুখরিত । তিনি যেখানেই গেছেন সেখানেই শুনেছেন শেখ মুজিবের নাম, মানুষের কাছে তিনি একজন মহামানব হিসাবে পুজিত হচ্ছেন।দ্বিতীয়বার ৭৩ সালের শেষের দিকে তিনি যখন বাংলাদেশ আসেন,তখন তিনি দেখেন শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তায় কিছুটা ভাটা পড়েছে। কিছু কিছু মানুষ তার মৃদু সমালোচনা করে তাকে বিতর্কিত করে তোলার চেষ্টা করছে।তৃতীয় দফায় তিনি বাংলাদেশ সফর করেন ১৯৭৪ সালে। তখন তিনি শেখ মুজিবকে মানুষ গালি দিচ্ছে এটা লক্ষ্য করে তিনি ব্যথিত হন। তিনি আরও অবাক হন যখন দেখেন যে সেই মানুষেরা ভুট্টোর প্রশংসা ও পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনি দিচ্ছে। ব্যস্ত তিনবছরের মধ্যে নায়ক হয়ে গেলেন প্রতিনায়ক,যাদের নাম নিশানা বাংলাদেশ থেকে মুছে গিয়েছিল, যাদের ভাবমূর্তির ওপর কলঙ্কের কালি মেখে জনগণ চিরদিনের জন্য বাংলাদেশ থেকে বিদায় দিয়েছিলো, তারা আবার ভোজবাজির মত কিভাবে যেন কবর থেকে উঠে এসে জনচেতনতায় স্থান করে নিতে সক্ষম হলো।তিনি উপর থেকে এই পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলেন, কিন্তু এ হাওয়া বদলাতে ভিতর থেকে যে ষড়যন্ত্রের কলকাঠি নাড়ানো হয়েছিল, সুকৌশলে কুৎসা রটনা করে, মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে শেখ মুজিবের চরিত্র হনন করা হয়েছিল তা বাংলাদেশের বাইরে বসবাসকারী কারো পক্ষে বুঝা সম্ভব ছিল না, অন্নদাশঙ্কর রায়ও বুঝতে পারেন নি। শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা ক্ষুন্ন করার জন্য সুপরিক্ষল্পিত ষড়যন্ত্রের একদিকে ছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো; অন্যদিকে টাকাপয়সা দিয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের সাহায্য করেছিলেন সৌদি আরবের বাদশাহ ও লিবিয়ার কর্ণেল গাদ্দাফি। সবাইকে সংগঠিত করেছিল নাটের গুরু আমেরিকা। দেশের অভ্যন্তরে ষড়যন্ত্রের জাল বুনে ছিলেন খোন্দকার মোশতাক, মাহবুবুল আলম চাষী ও জিয়াউর রহমান। হত্যাকাÐ চলাকালে জিয়া দাঁড়িগোফ কামিয়ে সম্পূর্ণ ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় ঢাকা ক্যান্টেনমেন্টের কমান্ড সেন্টারে বসে ছিলেন। অতঃপর গল্পের ভাষায় বলতে হয় -” দশচক্রে ভগবান ভূত হয়ে গেলেন”।
ভারতীয় কূটনীতিক শশাঙ্ক এস্ ব্যানার্জি তাঁর লেখা একটি পুস্তকে জিয়াউর রহমান সম্পর্কে তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে এমন একটি নতুন তথ্য পরিবেশন করেছেন যা বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়ার সংশ্লিষ্টতা প্রমাণে মূল্যবান উপাদান হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। তিনি লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনীতিক সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্য বঙ্গবন্ধু তাঁর ব্যক্তিগত প্রতিনিধি হিসাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডেপুটি চীফ অব স্টাফ কর্ণেল জিয়াউর রহমানকে ১৯৭৩ সালের শুরুতে ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছিলেন।জিয়া যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীতে দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে অবস্থানকালে পেন্টাগন, সিআইএ এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রধানদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি করেন।
যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর দায়িত্ব পালন শেষে জিয়া ঢাকায় ফেরার পথে লন্ডনে কিছুদিন যাত্রা বিরতি করেন। এই যাত্রা বিরতির সময়েই জিয়াউর রহমান সে সময় লন্ডনে ভারতীয় হাইকমিশনে এ্যাটাশে হিসেবে কর্মরত শশাঙ্ক এস ব্যানার্জির সাথে দেখা করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। লন্ডনে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ আবদুস সুলতানের মাধ্যমে ব্যানার্জি জিয়ার মেসেজটি পান। নটিং হিল গেইটে হাইকমিশন অফিসে জিয়ার সঙ্গে ব্যানার্জির বৈঠকের ব্যবস্থা হয়। তারা দু’দিন ধরে কথা বলেন। প্রথমদিন ব্যানার্জি জিয়াকে মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়িত করেন। দ্বিতীয়দিন জিয়া ব্যানার্জিকে খাওয়ান।ব্যানার্জি লিখছেন, জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর আলোচনার মূল বিষয়বস্তু ছিল কর্ণেল ফারুক রহমান”। কেন যেন তার মনের গভীরে জিয়া সম্পর্কে একটা নোংরা মনোভাব তৈরি হয়েছিলো যে,মুজিব হত্যার জন্য কর্ণেল জিয়াউর রহমান কর্ণেল ফারুক রহমানকে ব্যবহার করে কোন বড় অপারেশনের পরিকল্পনা করছেন। আর কিভাবে তার সে ভয় সত্যি হয়ে যায় ৭৫ এর ১৫ আগষ্ট, যখন তিনি শুনতে পান বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে তার নিকট আত্মীয়সহ নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে। এটাই ছিল জিয়ার বড় অপারেশন যা ব্যানার্জি সন্দেহ করেছিলেন।
জিয়ার সঙ্গে তার সাক্ষাৎকারে বিবরণ দিয়ে ব্যানার্জি লিখেছেন- আমার সাথে মিটিং এর উদ্দেশ্য ছিল ফারুক রহমানের একটি স্যুটকেস ও কর্ণেল ব্যাটন ফেরত নেয়া যা আমার বাসায় ছিল। ফারুক রহমান পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল ছিলেন যিনি সৌদি সামরিক বাহিনীর ট্রেনিং অফিসার হিসেবে সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন। তিনি তখন লন্ডন সফরে ছিলেন যখন ২৫ মার্চ ১৯৭১ পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক গভর্ণর হিসাবে জেনারেল টিক্কা খান বিশ্ববিদ্যালয়ে সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন।
খুব আবেগী মানুষ লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফারুক রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ম্যাসাকারের প্রতিবাদে জোট পরিবর্তন করেন এবং বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে মনোনিবেশ করেন। আমার সাথে তার যখন দেখা হয় তখন আমি তাকে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সাথে দেখা করতে বলি যিনি লন্ডন থেকে মুক্তি সংগ্রাম পরিচালনা করছিলেন। তার সাথে আমার যোগাযোগ ছিল ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত। ফারুক রহমান ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ রাতে আমার বাসায় আমার সাথে দেখা করেন ; যুদ্ধক্ষেত্রে যাবার জন্য আমাকে একটি পাসপোর্টের ব্যবস্থা করে দিতে বলেন। তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাথে মিলে যুদ্ধ করতে চাচ্ছিলেন। আমি সাথে সাথেই আমার চ্যানেল ব্যবহার করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করি এবং কর্ণেল ফারুক রহমানের যুদ্ধ ক্ষেত্রে পৌঁছানোর বিষয়টিতে অনুমোদন চাই। তিনি ভারত-পূর্ব পাকিস্তান সীমান্তে যুদ্ধ ক্ষেত্রে চলে যাবার আগে নিরাপদে রাখার জন্য তার স্যুটকেস ও রেজিমেন্ট ব্যাটনটি আমার কাছে রেখে যান। তিনি বলেন যদি তিনি যুদ্ধে বেঁচে যান তবে ভবিষ্যতে কোন এক সময় এগুলো নিয়ে যাবেন।
এই স্যুটকেসটি জিয়াউর রহমানের সাথে আমার সিরিয়াস একটি আলোচনা শুরু করিয়ে দেয় প্রধানমন্ত্রী মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত ও নিরাপত্তা বিষয়ে। ভারতে চলমান গুজব যে মুজিবুর রহমানকে হত্যার বিষয়টি নিলামে উঠেছে।এই বিষয়টির প্রেক্ষিতে আমাদের আলোচনা হয়েছিল। আলোচনার মাঝখানে আমি নিজে বুঝার তাগিদে কর্ণেল জিয়াউর রহমানের কাছে অনুমতি চাইলাম তাকে একটা বা দুটো অপ্রিয় প্রশ্ন করার। আমি তাকে বললাম যে শেখ মুজিবের জীবন নিয়ে আমার শঙ্কা ব্যক্তিগত,কারণ আমরা বেশ দীর্ঘদিনের পুরনো বন্ধু। তিনি বললেন যে হাইকমিশন বিষয়টি তাকে জানিয়েছেন।
অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে প্রশ্ন করার আগে আমি তাকে বললাম যে প্রশ্নের জবাব দিতে আরাম বোধ না করলে তাকে কিছুই বলতে হবে না। তারপর জানতে চাইলাম ছয় সপ্তাহে ওয়াশিংটন সফরে তিনি কার কার সাথে দেখা করেছেন? তিনি আমাকে বললেন যে তিনি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ডিফেন্স সেক্রেটারি থেকে শুরু করে নীচের দিকের অনেক সিনিয়র অফিশিয়ালের সাথে দেখা করেছেন। আমি আরো জানতে চাইলাম যেহেতু তিনি তার পেশাগত জীবন শুরু করেছিলেন পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে তাই পুরোনোদিনের কথা ভেবে তার নিশ্চয় ইচ্ছা করছিলো ওয়াশিংটনে পাকিস্তান দূতাবাসের মিলিটারি এ্যাটাশের সাথে দেখা করার? প্রথমে কিছুটা দ্বিধা করলেও তিনি সায় জানালেন।
অনেকখানি নার্ভাস থাকলেও আমি সরাসরি আসল বিষয়ে চলে এলাম। আমি তার কাছে জানতে চাইলাম যে উপমহাদেশে রাজনৈতিক আবহাওয়া যখন কালো মেঘে ঢাকা এবং মুজিবকে হত্যার সম্ভাব্য তৎপরতা চলছে তখন ছয় সপ্তাহের জন্য দেশের ডেপুটি চীফ অব আর্মি স্টাফকে দেশের বাইরে পাঠানো কি প্রয়োজনহীনভাবে সমস্যা ডেকে আনা নয়? আমি অবশ্য প্রথমেই তাকে বলে নিয়েছিলাম যে আমি একটি তাত্তি¡ক পরিস্থিতি বিচার করছি, ব্যক্তিগত নয়।আমি যখন দেখলাম তিনি মনক্ষুণœ নন আমি জানতে চাইলাম তার মত একজন মানুষ যদি কোনো ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির অপারেশনাল প্রধান হন তবে কি তিনি এই সম্ভাবনা বিচার করবেন না যে যখন একজন যোগ্য প্রার্থী হাতে আছে তখন ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের বিরক্তি উৎপাদনকারি ঝামেলার ব্যক্তিকে সরিয়ে দেয়া যায়। চিলির সালভাদর আলেন্দেকে হত্যা একটি বিষয় ছিল আর ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের মিলিটারি এ্যাটাশের সাথে দেখা করা ছিল আরেকটি। তিনি একজন পরিণত কূটনীতিকের মতই আমার প্রশ্নের জবাব দিলেন। তিনি বেশ হাসতে হাসতে বললেন এভাবে ভাবতে পারছি কারণ আমার আসলেই একটি উর্বর মস্তিষ্ক আছে। তিনি সাথে সাথে মিটিং শেষ করে দিতে পারতেন কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে তিনি তা করেন নি।
আমি জানতে চাইলাম একজন উচ্চপদস্থ আর্মি অফিসারের জায়গা থেকে ফারুক রহমানের মত অধীনস্থ কর্মচারীর স্যুটকেস নেবার মত তুচ্ছ কাজ কেন করছেন তিনি? আমি মনে মনে ভাবলাম তিনি কোন একটি ভালো সময়ে বিশাল কোন অপারেশনে ব্যবহারের জন্য ফারুক রহমান নামের গুটিটি তৈরি রাখছেন? তবে কি কোন বৃহত্তর পরিকল্পনা আছে? পাকিস্তানি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষিত,সামরিক একনায়কদের ভূমিতে লালিত হওয়ায় খুব বেশি কি কল্পনা করা হয়ে যায় যদি ভাবি যে তার হয়তো গোপন উচ্চাকাক্সক্ষা আছে সামরিক ক্যু’র মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করার? গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একজন নেতাকে হত্যা করার বিষয়টি এমন একজনের মাথায় আসতেই পারে।
পাকিস্তানি মিলিটারি এ্যাটাশের সাথে তার কি কথা হয়েছিলো আমার খুব কৌতুহল হচ্ছিলো। কিন্তু যখন আমি দেখলাম যে সে বিষয়ে কথা বলতে তিনি খুব নার্ভাস হয়ে যাচ্ছেন তখন আমি আর কথা বাড়ালাম না। কথা শেষ করার পরে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ার মতো অবস্থায় চলে গিয়েছিলাম। একটি দেশের একজন ঠওচ আর্মির ডেপুটি চীফ -এর সাথে কথা বলছি। আমি পদে তার চেয়ে বেশ কয়েক দাপ নীচে ছিলাম এবং আমি বিদেশি একটি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি। আমি জানতাম এটি একটি বেসরকারি মিটিং কিন্তু আমি যা করেছিলাম তার জন্য নিজেকে ক্ষমা করতে পারছিলাম না।আমি যা বলেছি তা একজন সিনিয়র সামারিক অফিসারের আমাকে গুলি করে মেরে ফেলার মতো উস্কানিমূলক।
কিন্তু আমাকে ভীষণ অবাক করে দিয়ে মুখোমুখি এই কথোপকথনে জিয়াউর রহমান ভীষণ ঠাÐা ছিলেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ছিল যে তিনি দ্বিতীয় এপয়ন্টমেন্টটি বাতিল করে দেন নি যখন তার ফারুক রহমানের স্যুটকেসটি নেবার কথা। তিনি তার মধ্যহ্নভোজের কথা রেখেছিলেন, ফারুকের স্যুটকেসটি সংগ্রহ করেছিলেন এবং ব্যক্তিগতভাবে তা বহন করে রেস্টুরেন্ট থেকে ঠিক পাশের দালানের হাইকমিশন অফিস পর্যন্ত হেঁটে গিয়েছিলেন। আমার জন্য এই ঘটনাটির গভীর তাৎপর্য ছিল।
আমার খোঁচাখুঁচির জবাবে তিনি একধরনের স্থির নীরবতা এটে রেখে ছিলেন মুখে। একটি মাত্র কথা তিনি নার্ভাস হয়ে বার দুই বলেছিলেন যে “ আপনার ঈশ্বর প্রদত্ত উর্বর কল্পনা শক্তি আছে” এই বিষয়ে তাঁর চূড়ান্ত মন্তব্য ছিল “একটি স্যুটকেস নিয়ে আপনি আমার সাথে রসালো যুদ্ধ খেলা খেললেন, তাই না?” আমি তার কথায় সায় জানালাম, আমি আমার প্রগলভতার জন্য ক্ষমা চাইলাম এবং আমরা বিদায় নিলাম মুখে ঠাÐা হাসি নিয়ে।
এই বিষয়টি উল্লেখযোগ্য যে কর্ণেল জিয়াউর রহমান সেই পরিস্থিতিতে আমার মোটা দাগের প্রশ্ন একেবারের জন্যও থামিয়ে দেবার চেষ্টা করেন নি যদিও সেগুলি খুব ভদ্র ভাষায় করা ছিল।আমি আশা করেছিলাম একজন সামরিক অফিসার বেশ ঋজু এবং আনন্দময়। কিন্তু দু’টি মিটিং এর ফলে জিয়াউর রহমান সম্পর্কে আমার যে ধারণা হয়েছিল তা হলো তিনি চঞ্চল চোখের চতুর একজন মানুষ যা মুজিবের নিরাপত্তা প্রশ্নে আমার মতে চিন্তার কারণ।
বাংলাদেশের ডেপুটি চীফ অব আর্মি স্টাফ কর্ণেল জিয়াউর রহমানের সাথে লন্ডনে আমার সাক্ষাতের বিষয়বস্তু নিয়ে এবং তার সম্পর্কে আমার মতামতসহ একটি রিপোর্ট খুব দ্রæত তৈরি করে আমি দিল্লি পাঠাই। আমি আমার আশংকা নিয়ে কোন শব্দ সাজাই নি। এটি শুধুমাত্র দেখার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে পাঠানো হয়। মুজিব এর জবাবে বলেন, “ জিয়াউর রহমান আর ফারুক রহমানের মত ছেলেরা আমার নিজোর ছেলের মতো।আর ছেলেরা কখনও পিতামাতাকে হত্যা করে না।” অন্যান্য অনেক গোয়েন্দা সংস্থা থেকে মুজিবের জীবন সংক্রান্ত বিষয়ে একই রকম তথ্য আসছিলো কিন্তু তিনি এসব বিষয়ে বিশ্বাস করতে রাজি ছিলেন না এবং তার এবং তার পরিবারের নিরাপত্তা বাড়ানোর পদক্ষেপও গ্রহণ করেন নি।- শশাঙ্ক এস্ ব্যানার্জিঃভারত, মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও পাকিস্তান( অপরাজিতা সাহিত্যভবনঃ তৃতীয় মুদ্রণ অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯), পৃ ১৯১-১৯৫।
বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জিয়ার মনের কোণে বহুদিনের লালিত গোপন উচ্চাভিলাষ পূরণের সুবর্ণ সুযোগ চলে আসে তার সামনে। তারপর সিংহাসনের দিকে কী মসৃণ যাত্রা জিয়ার -তরতর করে একের পর এক সিঁড়ি ভেঙ্গে তিনি যেখানে উপনীত হলেন, সেখানে তিনি একাই সকল ক্ষমতার অধিশ্বর। প্রথমে সেনাপ্রধান, তারপর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক, অবশেষে প্রেসিডেন্ট। অতঃপর দেশটাকে পাকিস্তানি ধারায় নিয়ে যাওয়ার জন্য জিয়া তার এজেন্ডা বাস্তবায়নে উঠেপড়ে লাগলেন। স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার, আলবদর, আল-শামস, শান্তিকমিটি- যাদের বিচার শুরু করেছিলেন বঙ্গবন্ধু, জিয়া তাদের বিচার রদ করতে মুক্ত করে দিলেন। পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা করার অপরাধে মুসলিম লীগ, জামাত ইসালামী,নেজামে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু; জিয়া তাদেরকে রাজনীতি করার সুযোগ দিয়ে পুনর্বাসনই শুধু করলেন না, তাদেরকে ক্ষমতারও অংশীদার করলেন। রাজাকার শাহ আজিজুর রহমানকে ত্রিশলাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, রাজাকার আব্দুল আলীম ও আব্দুল মতিন চৌধুরীকে মন্ত্রী বানিয়ে শহীদের রক্তের সঙ্গে বেঈমানী করলেন জিয়া। তিনি পাকিস্তানি ভাবধারায় দেশ চালাতে লাগলেন এবং পাকিস্তানের মতই ভারত বিরোধী প্রচারণায় হাওয়া দিলেন। সেই থেকে বাংলাদেশে ভারত বিরোধিতার রাজনীতি নতুন করে আরম্ভ হলো।শুধু বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে পাকিস্তান প্রীতি, সা¤প্রদায়িকতা ও ভারতবিরোধী রাজনীতিতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করে দিলেন। তবুও ‘হুজুররা’তো রইলেন। সুতরাং ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের পিঠে সওয়ার হয়ে সুযোগ বুঝে ধর্মের দোহাই দিয়ে ভারতবিরোধী রাজনীতির ধারাটি জিইয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। ফলে ইউটিউব, ফেসবুক, ওয়াজ নসীহতে তারা কচ্ছপের মত গর্তের মুখে মুখ বের করে ভারতের বিরুদ্ধে, হিন্দু-বৌদ্ধের বিরুদ্ধে বিষোদগারের অপচেষ্টা চালান।

লেখক : মুক্তিযুদ্ধা, সিনিয়র সাংবাদিক