কক্সবাজার জেলায় তোলপাড়

আ.লীগের সম্মেলনের দায়িত্ব পেল রোহিঙ্গা নেতার ছেলে!

শফিক আজাদ, উখিয়া

59

মিয়ানমারের আরাকানের স্বাধীনতাকামী রোহিঙ্গা নেতা কাশিম রাজার ছেলে রোহিঙ্গা নেতা শাহ আলম প্রকাশ রাজা শাহ আলম। তাকে উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগ। তারও আগে রাজা শাহ আলম ছিলেন কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি।
রোহিঙ্গা নেতার ছেলে আরেক রোহিঙ্গা নেতা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বড় পদপ্রাপ্তির খবরে ক্যাম্পগুলোতে খুশির জোয়ার বইছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মসজিদে মসজিদে খতমে কোরআন ও দোয়া মাহ্ফিল করা হচ্ছে তার জন্য। এ নিয়ে জেলাব্যাপী তোলপাড় চলছে।
গত ৯ সেপ্টেম্বর রাজা শাহ আলম চৌধুরীকে আহবায়ক ও আরও ৬ জনকে যুগ্ম আহব্বায়ক করে ৩৩ সদস্যের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠন করে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগ। সেদিন সন্ধ্যা ৭ টায় সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির অনুমোদিত তালিকা আহব্বায়ক শাহ আলম চৌধুরী রাজার হাতে হস্তান্তর করেন জেলা সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান।
এই উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার রাত থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মসজিদে মসজিদে দোয়া মাহ্ফিলের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে মৌলভীকে বলতে শোনা যায়- ‘অহ আল্লাহ আঁরার বার্মার কাশেম রাজার পুঁয়া রাজা শাহ আলম আওয়ামী লীগ’র ডর উগ্গা নেতা বইন্যে। অহ আল্লাহ তুঁই তারে আরও ডঅর নেতা ও আল্লাহ প্রধানমন্ত্রী বানাই দে মওলা’। অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ আমাদের বার্মার কাশেম রাজার ছেলে রাজা শাহ আলম আওয়ামী লীগের বড় নেতা হয়েছেন। তুমি তাকে আরও বড় নেতা ও প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে দাও’।
উখিয়া আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিক কারণে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছেন। বাস্তচ্যুত রোহিঙ্গারা আশ্রিত হিসেবে থাকবে। এখন তারা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মতো রাজনৈতিক দলের বিষয় নিয়ে নাক গলাতে শুরু করেছে ক্যাম্পে। দলে গুরুত্বপূর্ণ পদ পাচ্ছে- এগুলো কিভাবে সম্ভব হচ্ছে? তারা বলেন, তারাতো বাংলাদেশের নাগরিক না, তারা আশ্রিত শরণার্থী। কিভাবে তারা বাংলাদেশে ব্যবসা করছে? কিভাবে তারা আওয়ামী লীগের মতো একটি বিশাল দলের জেলা পর্যায়ের বড় নেতা হিসেবে পদ পায়?
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রফেসর ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ মিয়ানমারের আরাকানের স্বাধীনতাকামী রোহিঙ্গা নেতা কাশিম রাজাকে তাঁর লিখিত গ্রন্থ ‘আরাকানের মুসলমানদের ইতিহাসে’ তুলে ধরেছেন, তুলে ধরেছেন কাশিম রাজার ছেলে রাজা শাহ আলমের তথ্যও। বইটির একটি অংশে লেখক লিখেছেন- ‘আরকান ন্যাশনাল মুসলিম অর্গানাইজেশন (সুবহান উকিলের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তিনি ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি)। আরকানের মুসলিম যুব সমাজকে ইসলামি মূল্যবোধের ভিত্তিতে নৈতিকতা গঠনের নিমিত্তে মোহাম্মদ কাশিম (রাজা শাহ আলমের পিতা) ও মং মং গিয়াই এর নেতৃত্বে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। রোহিঙ্গা ছাত্রদের মাঝে দ্বীনি চেতনা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৯৫৫ সালে শাহ আলম (রাজা শাহ আলম) ও শাহ লতিফের নেতৃত্বে রেঙ্গুনেও এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। উক্ত সংগঠনগুলো ১৯৬৪ সালে নে উইন কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়।
গতকালের ভাইরালও হওয়া ভিডিও’র সূত্র ধরে স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজা শাহ আলম রোহিঙ্গাদের বিপ্লবী নেতা কাশেম রাজার ছেলে। ষাটের দশকে মিয়ানমার (তখনকার বার্মা) সরকারের চাপের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন কাশিম রাজা। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাহাড়ি এলাকায় সপরিবারে আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে সেই এলাকাতেই বসতি স্থাপন শুরু করেন রোহিঙ্গাদের বিপ্লবী এই নেতা। সেখানে জন্ম হয় কাশিম রাজার তিন ছেলে ও দুই মেয়ের। কাশিম রাজার প্রথম ছেলে হলেন শাহ আলম চৌধুরী প্রকাশ রাজা শাহ আলম। সত্তরের দশকে মিয়ানমারের গুপ্তচরেরা উখিয়ার ইনানীর পাহাড়ি এলাকায় কাশেম রাজাকে হত্যা করে।
কে এই রাজা শাহ আলম :
রাজা শাহ আলম চৌধুরী প্রথমদিকে কক্সবাজারে মাছের ব্যবসা করতেন। এক সময় তিনি কক্সবাজারের লাবণী পয়েন্টে হোটেল মিডিয়া নামের একটি হোটেল নির্মাণ করেন। হোটেল ব্যবসার সূত্রে ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগ নেতাদের সংস্পর্শে চলে আসেন তিনি। জড়িয়ে পড়েন জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। একপর্যায়ে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতিও হন তিনি। তারই ছেলে ইমরান আলম চৌধুরী চিকিৎসকদের সংগঠন বিএমএ’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং চট্টগ্রামের ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের রেজিস্ট্রার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৫৬ সালে মিয়ানমার সরকারের চাপের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন আবুল কাশেম ওরফে কাশেম রাজা। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে উখিয়ার ইনানীর পাহাড়ি এলাকায় স্বপরিবারে আশ্রয় নেন কাছিম রাজা। কাশিম রাজার ৩ ছেলে ও ২ মেয়ের মধ্যে প্রথম ছেলে হলেন কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের নেতা ও উখিয়া আওয়ামী লীগের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহŸায়ক শাহ আলম চৌধুরী প্রকাশ রাজা শাহ আলম। পাকিস্তান সরকার রাজা শাহ আলমের বাবা কাশেম রাজাকে ব্যবহার করে আরাকান রাজ্যের তথা পাকিস্তান-বার্মা সীমান্ত পরিস্থিতি শান্ত রাখতেন বলে জানা গেছে।
মিয়ানমারের গুপ্তচরেরা ১৯৬৬ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর উখিয়ার ইনানী পাহাড়ি এলাকায় কাশেম রাজাকে হত্যা করে। রাজা শাহ আলম কক্সবাজারে বিভিন্ন ব্যবসার সূত্রে ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগ বড় নেতাদের সংস্পর্শে চলে আসেন। এভাবে ২০০৮ সালে কক্সাবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাথে জড়িত হন। এক সময় জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতিও হয়ে যান। কক্সবাজারের লাবণী পেয়েন্টের হোটেল মিডিয়া ইন্টারন্যাশনালের মালিকও এই রাজা শাহ আলম।
কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ সেপ্টেম্বর উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে আহবায়ক করা হয় জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি রাজা শাহ আলম চৌধুরীকে। স্থানীয় সূত্র মতে, এই ঘটনায় উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পজুড়ে শুকরিয়া আদায়ে মসজিদে মসজিদে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল এবং বিশেষ মোনাজাত করা হয়। ফলে চরম অসন্তোষ শুরু হয় আওয়ামী রাজনীতিতে। এমনকি রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকার বাসিন্দারাও রোহিঙ্গা জঙ্গিদের মোনাজাতের ভাষা শুনে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে রাজা শাহ আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মোনাজাতের ভিডিওটি কে বা কারা আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য সুক্ষ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। মূলত: আমি একজন বাংলাদেশি নাগরিক। বাংলাদেশেই আমার জন্ম। যারা ষড়যন্ত্র শুরু করেছে তাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল আইনে মামলা করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।