আহমেদ ফরিদ (সি.এস.পি)

14

দক্ষিণ চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী লোহাগাড়া চুনতীর সম্ভ্রান্ত পরিবার শুকুর আলী মুন্সেফ বাড়ীর সন্তান জনাব আহমেদ ফরিদ (নওয়াব মিয়া)। ১৯৩৬ সালে ১ ফেব্রæয়ারী তার জন্মগ্রহণ। পিতা মাহবুবুর রহমান তৎকালীন জেলা রেজিস্ট্রার ছিলেন। মাতা ছদিদা খানম একই গ্রামের প্রখ্যাত ডেপুটি পরিবারের কবির উদ্দীন আহমদ খান ডেপুটির বোন। পিতা-মাতা দু’জনই ছিল চুনতির বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তাঁর পূর্বপুরুষদের মধ্যে অবিভক্ত বাংলার বিজ্ঞ বিচারক ও ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিস ছিলেন। জনাব আহমেদ ফরিদের লেখাপড়ার হাতেখড়ি ঐতিহ্যবাহী চুনতি হাকিমিয়া কামিল মাদরাসায়। মাদরাসায় দুই বৎসর জ্ঞান আহরনের পর আবার স্কুলে ভর্তি হন। তিনি ১৯৫০ সালে মেট্রিক ও ১৯৫২ সালে আই.এ পাশ করেন। ছাত্র থাকা অবস্থায় ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ভাষা আন্দোলনে বিশেষ অবদানের জন্য তমদ্দুন মজলিস কর্তৃক তাঁকে ‘মাতৃভাষা পদক-২০০৫’ প্রদান করা হয়। আই.এ. পাশ করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ১৯৫৬ সালে ইংরেজি বিষয়ে বি.এ অনার্স ও ১৯৫৭ সালে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন। ফেনী মহকুমা সরকারি কলেজে ইংরেজি বিভাগের লেকচারার পদে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। কলেজে অধ্যাপনাকালে তিনি সি.এস.এস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে সি.এস.পি হিসেবে নিযুক্তি লাভ করেন। ১৯৬১ সালে সি.এস.পি অফিসার হিসেবে ফেনী মহকুমা কর্মকর্তা (এসডিও) পদে যোগ দেন। পরবর্তীতে ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসকের মত গুরুত্বপূর্ণ পদসহ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৭-৬৮ সালে তিনি যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় হতে উবাবষড়ঢ়সবহঃ অফসরহরংঃৎধঃরড়হ এর উপর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭৫-৮৩ সময়কালে জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান টঘ-ঊঝঈঅচ ব্যাংকক এর উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯৮৩-৮৪ সালে বাংলাদেশ চা-বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। দেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে দশের সবচেয়ে বড় দুর্যোগে বাহিরের দেশ থেকে যে অনুদান এসেছিল তা তাঁরই অবদান। ১৯৯৬-৯৭ সালে ঢাকা ওয়াসার চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি দীর্ঘ সময় সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব হিসেবে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন। অবসর গ্রহণের পর তিনি চট্টগ্রামের ইউ.এস.টিসি বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকার মানারাত আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মানারত বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনি প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্যও ছিলেন। তিনি মুসলিম এনজিও সংস্থা সমিতি অগডঅই এর চেয়ারম্যানের পদও অলংকৃত করেন। বয়সের শেষ সময়ে এসে তিনি ইসলাম ধর্ম ও মুসলিম সম্প্রদায়ের পুনর্জাগরণ বিষয়ে গবেষণায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন। তার নিকটাত্মীয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য ড. নিয়াজ আহমদ খানকে সাথে নিয়ে গত এক দশকে ৩টি গবেষণামূলক বইয়ের কাজ করেন। সেমিনার সিম্পোজিয়াম আয়োজনের মাধ্যমে গবেষণা করে ধর্মীয় বই রচনা করেন। তারমধ্যে দুইটি বই প্রকাশিত হয়। তাঁর রচিত গবেষণামূলক বইগুলোর মধ্যে অহ ঊহপড়ঁহঃবৎ রিঃয ওংষধস ও গঁংষরস টসসধয রহ ঃযব ঈড়হঃবসঢ়ড়ৎধৎু ডড়ৎষফ বিশেষভাবে সমাদৃত। তৃতীয়টির পান্ডুলিপি তিনি রিভিউ করেছিলেন কিন্তু এর মধ্যে তার জীবন অবসান হয়। তাঁর এই গবেষণায় প্রখ্যাত বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. জামাল নজরুল ইসলামসহ দেশের সেরা পন্ডিতরা তার কাজে সহযোগিতা করেন। এগুলো ছাড়াও তার রচিত প্রায় ২০টির মতো বই বের করেন। যারমধ্যে তাঁর পরিবার, গ্রাম ও সমাজের বিভিন্ন গল্পকাহিনী ফুটিয়ে তোলেন।
গ্রামের বাড়ি চুনতি হওয়ায় তাঁর সামাজিক দায়িবদ্ধতা ছিল খুবই আন্তরিক। ঐতিহ্যবাহী চুনতি উচ্চবিদ্যালয় উন্নয়নের জন্য তৎকালীন সরকারের নিকট হতে অনুদানের ব্যবস্থা করেন। মসজিদ মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়ন সংস্কার প্রসারে তাঁর দিক নির্দেশনা ও সহযোগিতা অবিস্মরণীয়। চুনতি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। তিনি ‘ক্যাশ ওয়াক্ফ’ ফান্ডের মাধ্যমে আর্থিক অনুদানের টাকা চুনতি ৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মেধাবী ও গরীব শিক্ষার্থীদের প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য হারে বৃত্তি প্রদান করে থাকেন। এমনকি তাঁর পৈর্তৃক ভিটাও নিকটাত্মীয়দের দান করে যান। বার্ধক্যজনিত কারণে ১১ এপ্রিল ২০১৯ বৃহস্পতিবার রাত ১১.৩০ টায় তাঁর নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর ওছিয়ত অনুযায়ী গ্রামের বাড়িতে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।