আল্লামা সূফী শায়খ ছৈয়্যদ মুহাম্মদ আব্দুল জলিল (রঃ) সাহেব

37

ছৈয়্যদ মুহাম্মদ সারোয়ার আজম

বার আউলিয়ার পুণ্যভূমি খ্যাত চট্টগামের রাউজান থানার অন্তর্গত হালদা নদীর কূলঘেষা কাগতিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রাহনুমায়ে শরীয়ত সুফি আল্লামা শায়খ ছৈয়্যদ মুহাম্মদ আব্দুল জলিল (র.)। তাঁর পিতা হযরত মাওলানা মফিজউল্লা মিঞাজি (র.) ছিলেন বুযুর্গ ব্যক্তি এবং মহিয়সী মাতাও ছিলেন খুবই ফরহেযগার। হুজুর কেবলা দুনিয়াতে ১৩১১ হিজরি ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দ, জুমাবার এ ধরায় তশরীফ আনেন। হুজুর কেবলার পিতৃ বংশ ছিল আরবীয় পুর্বপুরুষ । পৈত্রিক নিবাস রাউজান থানার অন্তর্গত কদলপুর, মিরাপাড়ায়। তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতা এসেছিলেন কাগতিয়ায় দ্বীনি শিক্ষা দেয়ার জন্যে, সম্ভ্রান্ত বংশীয় পরিবারের (প্রকাশ মনু মিঞাজী বর্তমানে বাঁশখালী স্থায়ী নিবাস) মেয়েকে শাদী করে কাগতিয়ায় বসতি স্থাপন করেন। তিনি শিশু বয়স থেকে অন্যান্য শিশুদের থেকে ব্যতিক্রম ছিলেন,অল্প সময়ে প্রাইমারি শিক্ষা ও উনার মহিয়সী আম্মাজান থেকে কোরআন তেলোয়াত শিক্ষা নেন। এরপর ভারতে গিয়ে ইসলামী শিক্ষায় উচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ইবাদত রেয়াজতে হুজুর নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম) এর পূর্ণাঙ্গ অনুসারী ছিলেন। হুজুর নবী করিম (দ.) যেভাবে সাংসারিক জীবন চালিয়েছেন ঠিক তেমনিভাবে হুজুর কেবলার জীবন গড়ে তুলতে সক্ষম হন। পরে সময়ের স্বল্পতার কারনে ব্যবসা বন্ধ করে দ্বী’নি ইসলামের খেদমতে বাকী জীবন ব্যয় করেন। সংসারে অভাব অনডনে পটলেও আল্লাহ ও রাছুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম) সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তে অল্প উপার্জনে সন্তুষ্ট থাকতেন। কখনো নিজের অভাব অনটনের কথা কারো নিকট প্রকাশ করতেননা। বরঞ্চ পরোপকারের জন্য অর্থাৎ গরিব এতিম অনাথ অসহায়দের সাহায্যে হাত প্রসারিত রাখতেন। অভাবের মধ্যে থেকেও অতিথি ব্যতীত একবেলা আহার করেননি। তিনি কোরআন হাদিছ, ফিকাহ ইত্যাদির জ্ঞান অর্জন অর্থাৎ জাহেরী জ্ঞান অর্জন করার পর বাতেনী জ্ঞান তথা সিনা-বা-সিনার জ্ঞান আহরণের জন্য বেতাগী দরবার শরীফের মহান পীরে দস্তগীর গউছে জামান হাফেয হাকীম শাহ্ মুহাম্মদ বজলুর রহমান মহাজেরে মক্বি (রহঃ) ছাহেবের হাতে বায়াত গ্রহণ করে ছূফীবাদের হাতেকড়ি নেন। দুনিয়াবী স্বার্থে কারো সাথে হিংসা বিদ্বেষ অপছন্দ করতেন, দুনীয়াবি লোভ লালসা ত্যাগ করে শুধুম্াত্র আল্লাহ ও তাঁর রাছুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম)এর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কঠিন রেয়াজত করেছেন। যার ফলশ্রæতিতে বেতাগী দরবার থেকে ১৯৪৬ সালে১৩৬৭ হিজরীর ৮ ছফর তার পীরছাহেব কেবলা প্র্রথমে খেলাফত দান করে তাঁর ডান পাশে বসিয়েছিলেন। আপন পীরের প্রতি এতই মহব্বত রাখতেন যে আপন পীর মুর্শিদ যা বলতেন তা পালন করার জন্য কখনো কালক্ষেপন করতেন না । হুজুর সবসময়ে ইবাদত রেয়াজত গোপনে করার চেষ্টা করতেন। যাতে কোন অহংকার প্রকাশ না হয়।তিনি যেভাবে চলতেন ঠিক সেভাবে মুরিদান ও মুহিব্বিনদের বলতেন ’ ওয়া ফরজ নামাজ মছজিদে পড়িবে আর নফল এবাদত গরত (ঘরে) পড়িবে এতেই মঙ্গল’ হুজুর কেবলার যার জন্য দোয়া করতেন আল্লাহপাক তা কবুল করতেন। তিনি চলার পথে সবসময় থলের মধ্যে মিছওয়াক, তছবিহ, দালায়েলুল খায়রাত ও একটি লুঙ্গি রাখতেন। হাটঁতে হাঁটতে তিনি কয়েক খতম খতমে খাজেগান শরীফ পাঠ করতেন অর্থাৎ চলতে ফেরতে ইবাদতে মশগুল থাকতেন যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ক্বোরানুল করিমে বলেন হুজুর নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম)হচ্ছে উত্তম আদর্শ এই উক্তিটি হুজুর কেবলার জীবনে নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম) আদর্শ পরিস্ফুটিত হয় উদাহারণ স্বরূপ বলা যায় যেমন নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম) কম আহারী, কম ঘুমানো, নিজের কাজ নিজে করা, নিজের কাপড় নিজে সেলায় করা , আত্মীয়তা সুদৃঢ় করা যেমন হযরত আলী (রাঃ) কে নিজের মেয়ে সাদী দেয়া, আল্লাহর পথে স্ব-শরীরে জিহাদ করা ইত্যাদি হুজুরকেবলা ও ঠিক এভাবে নিজের জীবনকে প্রিয় নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম) রঙ্গে রাঙ্গিয়েছেন। জিহাদের নবীকরিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম) দাঁত মোবারক শহীদ হওয়ায় কতটুকু কষ্ট অনুভব করেছেন তাও হুজুর কেবলার দিল্লীতে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করাকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ হয় ঐ যুদ্ধে হুজুর কেবলা স্ব-শরীরে যোগদান ও নেতৃত্ব দিয়ে বৃটিশ বাহিনীকে পরাস্ত করে মুসলিম কাফেলা জয়লাভ করে ঐ যুদ্ধে তিনি বৃটিশ বাহিনীর গোলায় আঘাত প্রাপ্ত হন। এছাড়াও হুজুর কেবলা উত্তর রাউজানে রায়দীঘির পাড়ে মুসলমানদের কবরস্থান হিন্দুরা রাস্তা তৈরি করতে চাইলে আশ-পাশের মুসলিম পল্লী থেকে এর প্রতিবাদ করে এক পর্যায়ে এটি যুদ্ধে রূপ নেয় ঐ যুদ্ধে হুজুর কেবলা কাগতিয়া হতে ৮/১০ জনের মুজাহিদ কাফেলা নিয়ে শরীক হন। ঠিক এভাবে প্রতি গর্হিত তথা ইসলামী শরীয়তের বিপরীত কাজকে ঘৃণা করতেন। এবং অন্যায়-জুলুম ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সবসময় স্বেচ্ছার থাকতেন। এভাবে প্রতিটি কর্মে হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লামের আদর্শ তাঁর জীবনে পরিস্ফুটিত হয়েছে। শুধু তাই নয়,শিশু অবস্থায় নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম) পুত্র ইন্তিকালে নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম)এর কি কষ্ট অনুভব করেছেন তাও হুজুর কেবলার নিজ পুত্র (দুইবছর ছয় মাস বয়সি) ইন্তিকাল হওয়াতে সেই কষ্ট ও অনুভব করেছিলেন। এক কথায় বলতে গেলে হুজুর নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াছাল্লাম) এর কদম-বাকদমভাবে চলেছেন।
যুরকানী ৪র্থ খÐে উল্লেখ রয়েছে হুজুর নবীয়ে পাক (দরূদ)বলেন আল্লাহ তা’আলা আমাকে ফরমায়াছেন যদি আপনি চান আমি মক্কার প্রস্তরময় ভূমিকে স্বর্ণময় বানিয়ে দেব। আমি আরজ করলাম, হে আল্লাহ না বরং আমি এটাই চাই যে, একদিন পরিতৃপ্ত থাকব আরেকদিন ভুখা থাকব। যখন ভুখা থাকব, তোমার সমীপে ক্রন্দন ও মিনতি করব এবং মনেপ্রাণে তোমাকে স্মরণ করব আর যখন পরিতৃপ্ত থাকব , তোমার কৃতজ্ঞতা ও প্রশংসা করব। প্রকৃতপক্ষে এটায় হচ্ছে হুজুর নবী (দরূদ) এর ছুন্নত। কথা বলার সময় তিনি কখনো অট্টহাসি করতেন না, কম আহার করতে ভালবাসতেন। তিনি মুযতাহিবিত দাওয়াত (দোয়া করলে আল্লাহ কবুল করতেন) ছিলেন। তিনি ১৯৬৫ খৃষ্টাব্দ সালে হজ্বব্রত পালন করেন এবং ২২শে জিলক্বদ ১৩৮৯ হিজরী ১৯৬৮ খৃষ্টাব্দ রোজ বুধবার বিকাল বেলা অর্থাৎ আছরের সময় ইন্তিকাল করেন ।(ইন্নালিল্লাহে ………রাজেউন) পরের দিন বৃহ¯পতিবার দিনের বেলায় কুতুবে জামান শাহ মুহাম্মদ জিল্লুর রহমান (রহঃ) এর স্বপ্ন অনুযায়ী হুজুর কেবলার দাপন স¤পন্ন করা হয় ।

লেখক : প্রাবন্ধিক