আল্লামা ইকবালের ‘আসরারে খুদি’

মুহাম্মদ ইয়াকুব

137

প্রকৃত পক্ষে আল্লামা ইকবাল কবি নাকি দার্শনিক এ নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। প্রাচ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ও দার্শনিক আল্লামা ইকবাল কবি হিসেবে বেশি পরিচিত হলেও তিনি মূলত বড়মাপের একজন দার্শনিক। জার্মানির মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয় হতে দর্শন বিষয়ক গবেষণায় পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি তাঁর কবিতায়ও দর্শন-ভাবনার প্রকাশ সুস্পষ্ট। এমনকি ড. ইকবালকে ইসলামি দর্শনের প্রথম সার্থক ব্যাখ্যাকারী হিসেবে গণ্য করা হয়। বিশ্বের প্রায় ডজন খানেক ভাষায় অনূদিত ‘আসরারে খুদি’ আল্লামা ইকবালের একটি বিখ্যাত দর্শন নির্ভর কাব্যগ্রন্থ। এই কাব্যগ্রন্থের জন্য বৃটিশ সরকার ইকবালকে ‘নাইট’ উপাধিতে ভ‚ষিত করে।
৯ নভেম্বর ১৮৭৭ সালে অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের শিয়ালকোট শহরে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে স্যার ড. মুহাম্মদ ইকবাল জন্মগ্রহণ করেন এবং ২১ এপ্রিল ১৯৩৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন। ধনাঢ্য পিুার সন্তান ইকবাল ১৮৯৭ সালে আরবী ও ইংরেজিতে সমগ্র পাঞ্জাবে প্রথম স্থান ও দু’টি স্বর্ণপদক লাভ করে বিএ এবং ১৮৯৯ সালে দর্শন শাস্ত্রে স্বর্ণপদক লাভ করে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় হতে দর্শন শাস্ত্রে এমএ এবং জার্মানীর মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে ১৯০৭ সালে “ঞযব উবাবষড়ঢ়সবহঃ ড়ভ গবঃধঢ়যুংরপং রহ চবৎংরধ” বিষয়ের উপর গবেষণা করে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। ড. ইকবাল লন্ডন হতে ডিস্টিং সান সহকারে ব্যারিস্টারি পাস করেন। সূফি কবি রুমী ছিলেন ইকবালের কাব্যপথের সর্বশ্রেষ্ঠ আলোকবর্তিকা। আল্লামা ইকবাল “আসরারে খুদি” কাব্যগ্রন্থে তাঁর উপর রুমীর আধ্যাত্মিক প্রভাবের বিবরণ দিয়ে রুমীর স্তুতি বর্ণণা করে লিখেছেন,-‘রুমীর প্রতিভায় অনুপ্রাণিত আমি / আবৃত্তি করে যাই গোপন রহস্যের মহাগ্রন্থ /আত্মা তাঁর জ্বলন্ত অগ্নিকুÐ / আমি শুধু স্ফুলিঙ্গ / যা জ্বলে ওঠে মুহূর্তের জন্য।’
ড. ইকবালের কবিতায় আল্লাহর প্রকৃতি, ভাগ্য-জীবন, আত্মাতত্ত¡, রাজনীতি, শিক্ষা, ধর্মতত্ত¡, নীতিবিদ্যা, সুফীতত্ত¡, দেশ ও জাতি, প্রেম প্রভৃতি বিষয়াবলী শক্তিশালী ভাষায় উৎকৃষ্ট শিল্পরূপে প্রকাশিত হয়েছে। সাধনা মুখর একজন জীবন দার্শনিক ইকবাল নিজের ক্ষুরধার কলমের সাহায্যে কাব্য কথায় সেগুলো প্রকাশ করেছেন সাবলিলভাবে। তাঁর প্রতিটি কবিতায় স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে দর্শন ফুটে উঠেছে। স্যার ড. ইকবালের দর্শন আবর্তিত হয়েছে আত্মাকে কেন্দ্র করে। মানবজীবনের বিকাশে আত্মার শক্তিশালী প্রভাব নিয়ে নিরলস গবেষণা করেছেন আল্লামা ইকবাল। ‘আসরায়ে খুদি’ কাব্যগ্রন্থ ইকবালের দার্শনিক ভিত্তি ‘আত্মা’ কেন্দ্রীক কালোত্তীর্ণ অসাধারণ একটি কাব্যগ্রন্থ। ‘আসরারে খুদি’ ১৯১৫ সালে লাহোর হতে ফার্সি ভাষায় প্রকাশিত হয়। ১৯২০ সালে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সির অধ্যাপক ড. আরএ নিকলসন স্বপ্রণোদিত হয়ে গ্রন্থটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন। ১৯৪৫ সালে সৈয়দ আব্দুল মান্নান গ্রন্থটির বাংলা অনুবাদ করেন। বাংলা অনুবাদের কাব্য ভ‚মিকায় মুসলিম রেঁনেসার কবি ফররুখ আহমদ গ্রন্থটি সম্পর্কে মূল্যায়ন করেন এভাবে,-‘আসরারে খুদী, রমুজে বেখুদী মাতাল করেছে দিল।’
কবি ফররুখ আহমদ ‘আসরারে খুদী’র কাব্যানুবাদের ভ‚মিকায় আরো লিখেন,- ‘দেরী শুধু তার জিঞ্জির খোল্বার/ দেরী শুধু তার নীল নেশা ভোল্বার / তবু তোলপাড় শুনে সে তারার /উধাও বহ্নি-¯্রােতে /দুর্মর বেগে পয়ামের সুরে ওঠে কোথা রণরণী /ফারানের বুকে বহুদূর পর্বতে/ নতুন দিনের বিশাল পক্ষধ্বনি।’
‘আসরারে খুদী’ কাব্যগ্রন্থটি যে কোন পাঠককে তৃষ্ণাকাতর করে তুলবে। ড. ইকবাল নিজের সাহিত্য ও দর্শন কর্মের স্বাদ গ্রহণের আহŸান জানিয়ে পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন,-‘দোষ দিও না আমার সুরাপাত্র দেখে / গ্রহণ করো অন্তর দিয়ে/ এই সুরার স্বাদ।’
পরক্ষণে সমকালীন সম্ভাবনা নাকচ করে সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন। একজন প্রকৃত কবি কখনো শুধুমাত্র বর্তমান নির্ভর হন না। আমাদের জাতীয় কবিও বর্তমানের চেয়ে ভবিষ্যৎকে প্রাধান্য দিয়ে লিখেছেন, ‘আজটা সত্য নয়, কটা দিন তাহা/ ইতিহাস আছে আছে ভবিষ্যৎ’। ড. ইকবালও সমকালীন মূল্যায়ন বা গুরুত্বের চেয়ে চিরকালীন ভাবনায় বিভোর ছিলেন। সর্বজনীন ভবিষ্যৎ চেতনা প্রকাশিত হয়েছে ইকবালের কবিতায়, -‘প্রয়োজন নেই আমার আজকের মানুষের কর্ণের/ আমিবাণী/ অনাগত যুগের কবির।’
প্রকৃতপক্ষে একজন স্বভাব কবির বৈশিষ্ট্য সমকালে সীমাবদ্ধ থাকে না। কবির ভাবনার গন্তব্য দূর হতে বহুদূর বিস্তৃত হয়। সার্বিক বিবেচনায় এতে কোন সন্দেহ নাই যে, ইকবালের উল্লেখিত পংক্তি শতভাগ সফল ও সার্থক।
ইকবালের দর্শন মোতাবেক মানুষ যে কোন কাজের প্রেরণাপায় স্বীয় আত্মা থেকে। আত্মার শক্তিই মানুষকে মহৎ কাজের দিকে ধাবিত করে। আত্মার শক্তি এবং স্বরূপ উপস্থাপন করে ইকবাল লিখেছেন,- ‘জীবন যখন শক্তি সঞ্চয় করে /আত্মা হতে/ জীবন-তটিনী বিস্তার লাভ করে/ সমুদ্রের মহত্বে।’
আবার আত্মার শক্তি কীভাবে আসে তার বিবরণ দিয়ে বলেছেন,- ‘নির্যাসে তার শতবিশ্ব লুকায়িত / আত্ম- অনুভ‚তি আনয়ন করে বে-খুদিকে /প্রকাশ আলোকে।’
আত্মানির্গত সুদূ চেতনা শক্তি এমন যেন,- ‘তৃণ যখন পেলো তার আত্মার ভিতরে/ বর্ধনের শক্তি/ তার আকাক্সক্ষা বিদীর্ণ করে দিল বাগিচার বুক।’
প্রতিটি আত্মায় বাস করে শক্তি ও সাহসের ভাÐার। আত্মার জাগরণে মানুষ জেগে ওঠে, ঘুরে দাঁড়ায়। আত্মার অলসতায় মানুষ ঘুমের ঘোরে নির্জীব ঘুমন্ত থাকে। ‘আসরারে খুদী’ কাব্যগ্রন্থে আত্মাকে জাগিয়ে তোলার তাগদা দিয়ে আল্লামা ইকবাল লিখেন,-‘বিদ্যুৎ ঝলক তন্দ্রাবিভ‚ত হয়ে আছে / আমার আত্মার ভিতর’
আত্মার ভিতরে বসবাস করা তন্দ্রাবিভ‚ত বিদ্যুৎ ঝলকের রশ্মী প্রকাশিত না হলে কোন লাভ নেই। প্রতিটি ঘুমন্ত আত্মার তন্দ্রাচ্ছন্ন অস্তিত্ব প্রকাশ করা আবশ্যক। প্রয়োজন এই রশ্মী কার্যকর ভাবে ছড়িয়ে দেয়া,- ‘যদি কুঁড়ি প্রস্ফুটিত হয়ে /না হয় গোলাপের আস্তরণ/ কোনমূল্য নেই/ আমার বসন্ত- মেঘের করুণার।’
প্রত্যেক মানুষের জন্ম হয় সম্ভাবনাময় আত্মার সাথে, সূর্যের মতো আলোকরশ্মী নিয়ে,-‘জন্ম নিয়েছি আমি ধরিত্রীর বুকে/ নবীন সূর্যের মতো।’
উদিু সূর্যের আলোকরশ্মী প্রকাশিত হবার জন্য, ছড়িয়ে পড়ার জন্য, আলোকিত করবার জন্য। আত্মার শক্তি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নই বিধায়, আমাদের আলো ছড়িয়ে পড়ে না, আঁধার দূর হয় না। ড. ইকবাল আত্মার অদম্য শক্তিকে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দেবার তাগদা অনুভব করেছেন,- ‘আমার নৃত্যপর আলোকরশ্মী/ আজো স্পর্শ করেনি সমুদ্রের বুক/ আমার রক্তিম আভা/ আজো স্পর্শ করেনি পর্বতের শিখর।’
মূলতঃ আত্মায় চালিত হয় মানবজীবন বা মানবগতি। মানুষের গতি- স্থিতি আত্মার গতি-স্থিতির উপর নির্ভর। আত্মাকে শক্তিশালী করতে পারলে আত্মার গতি প্রবল হয়, না পারলে আত্মার গতি ¤্রয়িমান হয়ে পড়ে। আত্মার বহুমুখী চরিত্রের বিবরণ দিয়ে ড. ইকবালের কবিতা আত্মাময় হয়ে ওঠে,- ‘আত্মা হয় জাগ্রত, প্রোজ্জ্বল, পুনশীল/ আবার হয় বিভাময়, জীবন্ত/ সে হয় দগ্ধ আলোময়, চলমান ও উড়ন্ত।’
আল্লামা ইকবালের দর্শননিটশে ও বার্গস এর কাছাকাছি। তাঁর কবিতায় শেলীর ভাব ব্যঞ্জনা লক্ষণীয়। তবে তাঁর দর্শনে ইসলাম, কুরআন বারবার ওঠে এসেছে। > ৪র্থ পৃষ্ঠায় দেখুন
> ৩য় পৃষ্ঠার পর
তিনি তাঁর দর্শনের ভিত্তি নির্ধারণ করেছেন ইসলামের মাপকাঠিতে। ড. ইকবাল সব ধরণের রচনা একজন মুসলমানের দৃষ্টিভঙ্গিতে সৃষ্টি করেছেন। হতে পারে পবিত্র কুরআনের ‘হে প্রশান্ত আত্মা! ফিরে এসো…’ হতে ইকবালের আত্মাতত্তে¡র উদ্ভাবন। আত্মার অদম্য শক্তির উৎস সম্পর্কে ড. ইকবাল লেখেছেন, ‘জমজম হতে বয়ে আসে/ যে উজ্জ্বল সুরা/ যদি ভিখারীও করে তার পূজা/ সে হয়ে উঠবে রাজ্যেশ্বর।’
প্রশান্ত আত্মা আর অবাধ্য আত্মার উৎসস্থল পবিত্র আলকুর আন। মহাগ্রন্থ পবিত্র কুরআনকে উদ্দেশ্য করে ‘আসরারে খুদি’ কাব্যগ্রন্থে লেখেছেন,- ‘তুমি অগ্নিঃ/ পরিপূর্ণ করো সারাবিশ্ব/ তোমার আলোয়।’
আবার নিজের আবস্থানের কথা সুস্পষ্ট করে ইসলামের প্রতি বিনয়াবনত হয়ে লিখেছেন,-‘আমি শুধু ধুলিকতার মতো ভক্তি-বিনত/ সত্য ধর্মের কাছে।’
ড. ইকবাল ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ইরান এবং আন্তর্জাতিক পরিমÐলের সাহিত্যিক ও দার্শনিকদের উপর ব্যাপক প্রভাব রাখেন। ১৯৩৮ সালের ২১ এপ্রিল পর্যন্ত মানবাত্মাকে নিয়ে আমৃত্যু চিন্তা ও গবেষণা করেছেন ড. আল্লামা ইকবাল। তাঁর আত্মাকেন্দ্রীক কাব্যগ্রন্থ ‘আসরারে খুদী’ পৃথিবীর দর্শনপ্রিয় কাব্যপ্রেমিকদের মনের খোরাক যোগানোর পাশাপাশি প্রেরণার শক্ত ভিত সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছে।