আমেরিকা ও রাশিয়ার সাথে মোদির মাধুর্যমন্ডিত সম্পর্ক

শাহাবুদ্দীন খালেদ চৌধুরী

2

রাজনৈতিক হউক, অর্থনৈতিক হউক, ঝুঁকি নেওয়ার ব্যাপারে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর তুলনা নেই। বিশে^র বড় বড় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে তাঁর তুলনা তিনি নিজেই। দুর্গম পথ অতিক্রম করার সাহস অতুলনীয় তাঁর। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে বা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেও ঝুঁকি নিতে তিনি সবসময় সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় যোগদানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়েছিলেন। ২০২০ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ছিলেন আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের স্ত্রী হিলারি, যিনি ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিসাবে দুইবার সিনেটের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট ওবামা কর্তৃক নিয়োজিত আমেরিকার সেক্রেটারি অব স্টেট বা পররাষ্ট্র সেক্রেটারি ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের যে কয়জন পররাষ্ট্র সেক্রেটারি হিসাবে বিভিন্ন কারণে ইতিহাসে স্থায়ীভাবে স্থান করে নিয়েছেন তার মধ্যে তিনি একজন। কিন্তু তবুও তিনি গত আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অকল্পনীয়ভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন।

Official portrait of President Donald J. Trump, Friday, October 6, 2017. (Official White House photo by Shealah Craighead)

যাই হউক, আগামী ২০২০ সালের আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বাভাবিকভাবেই একজন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী। বিভিন্ন কারণে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস তাঁর বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব এনেছে যে প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ’ এবং সিনেটে পাশ হলেই ট্রাম্প সাহেবের প্রেসিডেন্টশীপ চলে যাবে এবং বিচারের সম্মুখীন হবেন। এ ছাড়াও তার বিরুদ্ধে অনেক মামলা রুজু করা হয়েছে এবং বর্তমান জনমত জরিপ অনুযায়ী তাঁর প্রতি মাত্র ৩৩ শতাংশ আমেরিকানদের সমর্থন রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে হাবুডুবু খাচ্ছেন ঠিক তখনই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভয়ানক এক ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছেন। তিনি এবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সম্মেলন উপলক্ষে আমেরিকা সফরে যান। এই সফরের সময় প্রায় ৫০০০০ হাজার ভারতীয় আমেরিকান নাগরিকদের টেক্সাসের রাজধানী হস্টনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সংবর্ধনা এবং সমর্থন দেওয়ার জন্য একত্রিত করেন। তিনি নিজেই এই সভায় বক্তৃতা করেছেন এবং ভারতীয়দের ট্রাম্পের পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য অনুরোধও করেছেন। ভারতে এই ব্যাপার নিয়ে মুদিজী যথেষ্ট সমালোচিত হয়েছেন। তবে একথা অবশই স্বীকার করতে হবে এই দুঃসাহসিক উদ্যোগ নেওয়ার লোক বিশ্বে খুব একটা নেই। সভায় সমবেত লোকগুলি ভারতীয় হলেও কিন্তু তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রেরই নাগরিক, কাজেই ভোটাধিকার প্রয়োগে তাঁরা কতটুকু ভারতীয় স্বার্থের কথা চিন্তা করতে পারে তা অবশ্যই সীমাবদ্ধতা থাকবে। যাই হউক, ভারতীয় আমেরিকানদের এই সভার আয়োজন করে একটা চমকের সৃষ্টি করলেও ইহা কতটুকু রাষ্ট্রনায়কসুলভ কাজ হয়েছে তা ভাববার বিষয়।
যাই হউক, আমেরিকার সৈন্যদের একটি যুদ্ধ কৌশলের নাম হলো (ঝযড়পশ ধহফ অবি) বা প্রচÐ ধাক্কায় পীড়িত করা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় মুদিজিও ইহা অনুসরণ করেন। এই জাতীয় কৌশলের বশবর্তী হয়ে তিনি ভারতের হাজার টাকার নোট বাতিল করেছিলেন তাতে কিন্তু নিঃসন্দেহে ভারতীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
যাই হউক বর্তমানে রাশিয়ার সাথে যৌথভাবে যে কাজে হাত দিয়েছেন তা যদি সফলতা লাভ করে নরেন্দ্রমোদী ভারতীয় ইতিহাসে স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকবেন। মোদী ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের আমন্ত্রণে গত সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে রাশিয়ার দূর-প্রাচ্যের প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধশালী অঞ্চল সফর করেছেন। এই সফরের ফলে ভারতের সাথে সামরিক সম্পর্ক ছাড়াও যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠতে যাচ্ছে তা বিশ্বের বিস্ময় হিসাবে দেখা দেওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। নরেন্দ্রমোদী ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি রাশিয়ার দূর প্রাচ্যের প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধশালী এই অঞ্চল সফর করেছেন। ভারতের আর কোন প্রধানমন্ত্রী এই অঞ্চল সফর করেন নাই। এই সফরের ফলে ভারতের সাথে সামরিক সম্পর্ক ছাড়াও রাশিয়ার যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠতে যাচ্ছে তা বিশ্বের বিস্ময় হিসাবে দেখা দিবে বলে মনে হচ্ছে। রাশিয়ার এই এলাকায় যে এত সম্পদ মজুত রয়েছে তা গত সাত দশক ধরে ভারত আঁচও করতে পারেন নাই। এই এলাকার উন্নয়নের জন্য তৎক্ষণাৎ প্রাথমিকভাবে নরেন্দ্র মোদী ১ বিলিয়ন ডলারের ঋণ রাশিয়াকে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। রাশিয়াকে এই প্রথমবারের মতো ভারত ঋণ দিলো। ১৯৫৬ থেকে ১৯৯০ এর দশক পর্যন্ত রাশিয়া শুধু ভারতকেই ঋণ দিয়েছে। ‘রাশিয়ার যে অঞ্চলের জন্য এই ঋণ ঘোষণা করা হয়েছে তা ভারতের দ্বিগুণ হবে।’ এই অঞ্চলের জনসংখ্যা মাত্র ৬ থেকে ৭ মিলিয়ন। এই অঞ্চলে খনিজ সম্পদের মধ্যে রয়েছে প্রচুর তেল এবং গ্যাস। ইহা ছাড়াও রয়েছে ডায়মন্ড ও কয়লা ইত্যাদি। যেহেতু জনসংখ্যার ঘাটতি এই অঞ্চলে এত বেশি, সেজন্য ভারত থেকে জনসংখ্যা আমদানি করা ছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই।
মোদীর সফরের সময় ভারতের চেন্নাই এবং রাশিয়ার ভøাডিভস্টকের সাথে জাহাজ চলাচলের চুক্তি হয়েছে। এই চুক্তির আগেই ভারতের ডায়মন্ড ব্যবসায়ীরা রাশিয়ার ডায়মন্ড শিল্পে অল্প পুঁজি বিনিয়োগ করার প্রস্তাব ইতিমধ্যেই দিয়েছেন। যা সাথেই সাথেই গ্রহণ করা হয়েছে। গ্যাস এবং তেল অনুসন্ধান, উত্তোলন এবং ক্রয়ের ব্যাপারে ২০১৯-২০২৪ সালে পর্যন্ত পাঁচ বৎসরের জন্য ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে যাতে পারস্য উপসাগরের উপর ভারতকে গ্যাস এবং তেলের জন্য আর সম্পূর্ণ নির্ভর করতে না হয়। কারণ আমেরিকা আর ইরানের মধ্যে উত্তেজনা পারস্য উপসাগরকে সার্বক্ষণিক উত্তেজনাকর অঞ্চলে পরিণত করেছে। ভারতে কয়লা রপ্তানির জন্য আরেকটা সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ‘কোল ইন্ডিয়া’ এবং রাশিয়া সরকারের অনুরূপ সংস্থার সাথে। ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে তেলের পাইপলাইন বসানোর ব্যাপারে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে কিন্তু বাস্তবায়িত করতে গেলে অনেক দেশের সংশ্লিষ্টতার প্রশ্ন রয়েছে, বিশেষ করে ইরানের উপর যুক্তরাষ্ট্রের বিধিনিষেধ এবং ভারতের সাথে পাকিস্তানের তিক্ত সম্পর্কের কারণে পাইপ লাইন স্থাপনের পরিকল্পনা প্রায় অসাধ্য হওয়ার সম্ভাবনা থাকায়, আপাতত পাইপ লাইন স্থাপনের পরিকল্পনা বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গত নির্বাচনে ভারতকে পাঁচ ট্রিলয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নতি করার যে ঘোষণা এবং প্রতিশ্রæতি দিয়েছেন তা বাস্তবায়ন করতে হলে ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়নের হার হতে হবে ৭ থেকে ৮ শতাংশ। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ আগেও ভারতের অর্থনীতিবিদরা সমস্বরে বলেছেন বর্তমান ভারতে ৫ শতাংশের বেশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছেনা। অথচ সরকার এর বেশি হারে উন্নয়ন হচ্ছে বলে হিসাব দিয়েছিলেন। কিন্তু ভারতের অর্থনীতিবিদরা বিশ্লেষণমূলক হিসাব দিয়ে বললেন কোন অবস্থাতেই অর্থনীতির উন্নয়ন ৫ শতাংশের বেশি হচ্ছেনা। তখন থেকে ভারত সরকার আর কোন উচ্চ বাক্য করেন নাই।
যাই হউক, ভøাডিভস্টকে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, উপরোল্লিখিত অর্থনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্যই তিনি রাশিয়ার ইউরোপিয়ান অংশ ছেড়ে রাশিয়ার এশিয়ান অংশে মনোযোগ দিয়েছেন। কারণ রাশিয়ার এই অংশ হলো ইউরো এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গম। বিশ্বের এই ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন চীনকে সংযত করতে হলে এই সঙ্গম অপরিহার্য। বিশ্বের ঠাÐা যুদ্ধকালীন যুগে রাশিয়া ভারতবর্ষের সবচাইতে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী ছিল কিন্তু বর্তমানে সে হারে ভারত রাশিয়া থেকে অস্ত্র ক্রয় করেনা।
আগের মত রাশিয়া থেকে অস্ত্র ক্রয় করলে ভারত অবশ্যই আমেরিকার বাধার সম্মুখীন হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের সম্পর্ক তিক্ত হতে বাধ্য। রাশিয়া এবং ভারত এই পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল রয়েছে। ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে একটি পথই খোলা রয়েছে তা হলো পারস্পরিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা। যদি ভারত এবং রাশিয়ার অর্থনৈতিক এই সহযোগিতা সাফল্যের সহিত বাস্তবায়িত হয় তা হলে উভয়ই অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিস্ময়কর ফল লাভ করার সম্ভাবনা রয়েছে।
লেখক : কলামিস্ট