‘আমি মানি না কো কোন আইন’ -৩

মছিউদ্দৌলা জাহাঙ্গীর

131

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চাচা, বড়ই আজব ক্যারেক্টার। মাশাল্লাহ্ কথাবার্তার যে ধরণ কারো ধারই ধারেন না। গেল ৮ নভেম্বর সম্ভবত জাতীয় এক দৈনিকে একটি ফিচার পড়লাম ‘ট্রাম্প আইনের ঊর্ধ্বে’। ভেতরে যা আছে তার সারমর্ম হলো প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন তাঁর বিচার করা যাবেনা। মার্কিন সংবিধানই তাঁকে এ নিরাপত্তা দিয়েছে তাই ট্রাম্প চাচা নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে মনে করেন। ফিচারটি পড়ে নিজের ভেতর কিছু প্রফুল্লতা অনুভব করলাম। কারণ লিখার খোরাক পেয়ে গেলাম, ‘আমি মানি না কো কোন আইন’, ক’দিন ধরে যেহেতু এই ক্যাপশনই চালিয়ে যাচ্ছি। তাই এ না চাইতেই জল যখন পেয়ে গেলাম কপ করে লুফে নিলাম। তারপর লিখতে যখন শুরু করলাম দেখতে পেলাম ট্রাম্প চাচা একা না, পৃথিবীর কোন দেশের প্রেসিডেন্টই আইনের অধঃ নয় সবাই ঊর্ধ্ব। মনে হয় কাউকেই মেয়াদকালীন সময়ে আদালতের তলব করার শক্তি নাই। সেই পয়েন্ট অব ভিউতে ট্রাম্প চাচা অনেকটা আইনের আওতার ভেতরই আছেন, কারণ সেখানে অভিশংসনের একটি ব্যবস্থা রয়েছে। তাছাড়া বিগত কিছুদিন যাবত ট্যাক্স ও অভিসংশন সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে চাচার উপর দিয়ে বড়ই ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সে জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে চাচাকে নিজের মহব্বতের মাতৃভূমি ছেড়ে ফ্লোরিডায় গিয়ে অভিবাসন গ্রহণের কথা পর্যন্ত চিন্তা করতে হচ্ছে। খবরটি জানার পর চাচার জন্য অন্তরে বড় মায়া জন্মেছিল, কারণ জন্মভূমি ত্যাগ করা কষ্টের বিষয়। তবে মায়াআরো বেশী লেগেছিল জাস্টিন ট্রুডো চাচার সাথে জি-৭ সম্মেলনে মেলানিয়া চাচীর কুশল বিনিময়ে ট্রাম্প চাচার মুখের কৌশল দেখে।
বছর কয় আগে বলিউড সুপারস্টার আমির খানের একটি মুভি এসেছিল, নাম পিকে। ছবিটিতে যদিও ধর্মীয় অসংগতিই সবিশেষ তুলে ধরা হয়েছে কিন্তু আরেকটি বিষয়ের প্রতিও বড় গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তা হলো একজন অসহায় মানুষের বাড়ি ফেরার আকুতি। শতকিছুর পরও সে বাড়ি ফিরতে চায়, তার নিজের বাড়িই তার আসল ঠিকানা তার সকল শান্তির মূল। তাই একজন লোক টাকার জন্য যখন বাড়ি যেতে পারছিল না পিকে তখন তাকে নিজের টাকা সব দিয়ে দিল। কারণ বাড়ি ফেরা যে কি আকাঙ্ক্ষার বিষয় একমাত্র সে’ই তা উপলব্ধি করতে পারছে। যেহেতু পৃথিবীতে এসে সে আটকে গেছে আর কখনো বাড়ি ফিরতে পারবে কিনা জানে না। সুতরাং বাড়ির অভাব তার চাইতেও বেশী আর কে অনুভব করতে পারবে? ফাঁসির আসামীর চাইতে জীবনকে অধিক আর উপলব্ধি করবে কে? ঠিক তেমন প্রবাসীর চাইতে বাড়িকে বেশী আর অনুভব করবে কে?তাই ট্রাম্পের নিজভূমি ছেড়ে অভিবাসন গ্রহণের কথা শুনে দিলে বড়চোট লেগেছিল। অথচ সে ট্রাম্পই অবৈধ ইহুদী বসতিকে একের পর এক সমর্থন দিয়েযাচ্ছেন। হায়রে ফিলিস্তিনীরা নিজভূমে পরবাসী আর ইসরাইলীরা পরভূমে অধিবাসী। আন্তর্জাতিক আইনে ইসরাইলের বসতি স্থাপনকর্ম নাকি অবৈধ, কিন্তু ট্রাম্পের সব বৈধ। অতএব ট্রাম্প মানে নাকো কোন আইন, বুঝে শুধু নিজের লাইন। ফলে আইন আর ফাইন = জরিমানা সব দুর্বলের জন্য এবং শাইন আর ফাইন = উত্তম সব সবলের জন্য।
বলেছিলাম রাষ্ট্রপ্রধানদের ফৌজদারী অপরাধের কথা, যার বিচার এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও করার আইন নাই। সুলতান গিয়াসউদ্দিন আযম শাহ ১৩৮৯ হতে ১৪১০ খ্রিঃ বাংলার সুলতান ছিলেন। মধ্যযুগের সেই অন্ধকার সময়ে সুলতান হয়েও তিনি ফৌজদারী অপরাধের কারণে কাজীর দরবারে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং জরিমানাও দিয়েছিলেন। বস্তুত যে অপরাধ তখন সংঘটিত হয়েছিল তার জন্য সুলতান দায়ী নন। তিনি গিয়েছেন শিকারে, তখন অবশ্যই শিকার সম্পূর্ণ বৈধ এক বিধান ছিল। সুলতান শিকারের উদ্দেশে তীর ছুঁড়লেন, লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তা আঘাত করল বিধবার ছেলেকে, সে আহত হল। বিধবা কাজীর দরবারে বিচার দিল, কাজী সুলতানকে জরিমানা করলেন! অথচ সুলতান সে ছেলেকে দেখেননি, যা ঘটেছে সম্পূর্ণ তাঁর অজান্তে। কিন্তু তিনি সুলতান, তাই পূর্ণ নিশ্চিত ও অবগত হয়েই তাঁকে কর্ম সম্পাদন করতে হবে।কার্যে ন্যূনতম অবহেলাও তাঁর জন্য গুরুতর অপরাধ, সেই পয়েন্ট অব ভিউ থেকে কাজী সুলতানকে দোষী সাব্যস্ত করলেন। সুলতান বিচার মেনে নিয়েছেন এবং ধার্যকৃত জরিমানা প্রদান করেছেন। একটি ইতিহাস, একটি উদাহরণ, একটি নজিরÑ সরকার প্রধানেরও বিচার করা চলে তাঁর ক্ষমতা পূর্ণ বহাল থাকাকালীন। ভাবতে গর্ব হয় এক সময় বাংলা ন্যায় বিচারে সমৃদ্ধ ছিল,এখানে রাজারও বিচার হত। এখন ‘পয়েন্ট অব ভিউ’ ফ্রেজটি মনে আসলে আমার বীমার দালালদের কথা মনে পড়ে যায়। কারণ তারা ইনভেস্টমেন্ট পয়েন্ট অব ভিউতে শিকার ধরে।
কখনো জীবনবীমার দালালের খপ্পরে যদি পড়েন, দেখবেন সে আপনাকে ‘ইনভেস্টমেন্ট পয়েন্ট অব ভিউ’তেই লেকচার মারতে থাকবে। আইনের ঘরে মতলব ঢুকছে আরকি। এমন করে বুঝাবে মনে হবে সব খাস, হিসাব করলে আধা নাশ। অনেক সময় পুরা নাশ, কারণ হারামজাদা প্রিমিয়ামের টাকা অফিসে জমা না করে নিজের পকেটেই জমা করে। খবরদার ভুলেও কখনো সে ফাঁদে পড়বেননা, তাহলে সিধা চেঁছে ফেলবে। আচ্ছা সে বাটপার তাই না হয় পরকে চাঁছে, অবশ্য বাইন্যা = স্বর্ণকার মাকেও ছাড়ে না। ঠিক আছে এ নাহয় মানলাম, কিন্তু মন্ত্রী বউয়ের গায়ে মুতে দেনÑ এটি কেমনে মানি। আমি মানি না কো কোন আইন- ৩, আশ্চর্য কি ঘটছে এসব দিন দিন! ভারতে উত্তর প্রদেশের এক মন্ত্রী চাচা, নাম তাঁর বাবুরাম নিষাদ। মাশাল্লাহ্ মানুষ একদম নিখাদ, কোন খাদ নাই মুখে খালি উন্নয়নের বুলি, বউকে মারতে চান শুধু বন্দুকের গুলি। কিন্তু মারেননাভয় দেখান, তবে যা মারেন তা অতি ডেঞ্জেরাস। কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে চাচা নাকি চাচীর গায়ে প্রস্রাব করে দেন! ওমা এটি আবার কোন রকম ব্যারাম আল্লাহ্ই জানেন। কারণ এখন ব্যারামেরও মতিগতি নাই,শুনেছি ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শ্রী মোরারজি দেশাই প্রতিদিন সকালে প্র¯্রাব খেতেন। রোগের কারণে তা নাকি ছিল তাঁর পথ্য, নিজপ্রস্রাব নিজে খাওয়া। ডাক্তারের নির্দেষ প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেনিজের ত্যাগ করা টাটকা একবাটি মূত্র নিয়মিত সেবন করতে হবে। তাই দেশাই দাদু নিয়মিত সেই অনুশাসন নাকি দৃঢ়ভাবে পালন করতেন এবং কঠিন চীবর দানের মতো কঠিন মূত্র পান করতেন।
অতএব মূত্রের কথা যখন এসেই গেল,তার কারিশমা তো অবশ্যই উছলাতে থাকবে। সুতরাং তার গুণগান যদি কিছু গাওয়া না হয় তাহলে নিশ্চিত তার প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করা হয়। এই মূত্রকে নিয়েই তো গোটা ভারত জুড়ে গুণকীর্তনের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে গো-মূত্র, এই মূত্র নাকি অতি পবিত্র জল, গঙ্গাজলের চাইতেও বেশী। কারণ গরু দেবতা তাই তার মূত্র পবিত্র, এমন কি সেটি অতি উত্তম মেডিসিন, ৩৬০টি রোগের প্রতিষেধক এই মুতের মধ্যে রয়েছে। আমি নয়, ভারতের এক প্রখ্যাত ধর্মীয় গুরু গরুর মুতের অন্তর্নিহিত এই শক্তিকে উদ্ঘাটন করেছেন। যা রীতিমত স্যোশাল মিডিয়ায় ঝড় তুলেছে। গো-মূত্রে নিহিত এই শক্তির কথা জানতে পেরে আমাদের বুদ্ধি সোজা নিহত হয়েছে! মূত্রের এত গুণ, তাই তো দেশাই দাদু মুত খেতেন। এখন কথা হচ্ছে মুতে রোগ সারে, গো-মূত্র পবিত্র কারণ গরু দেবতা। তাহলে পতিও তো দেবতা, অতএব তাঁর মুতও পবিত্র এবং রোগের প্রতিষেধক। কাজেই বাবুরাম চাচার মুত তাঁর স্ত্রী নিতু চাচীর জন্য অবশ্যই রোগের প্রতিকার ও পবিত্র। ফলে চাচা তো খারাপ কিছু করেন নাই, তাহলে চাচী কেন এত চেতলেন? চাচা মন্ত্রী মানুষ, সুতরাং নেতা হয়ে তিনি জনসেবা যেমন করছেন ভর্তা হয়ে ঠিক ভার্যাসেবাও তেমন করছেন। চাচী নিশ্চয় অসুস্থ, চাচী তা জানেন না, চাচা জানেন। তাই মনে হয় চাচা ডাক্তারের পরামর্শক্রমে চাচীকে মূত্রজলে সিক্ত করে শক্ত বানাচ্ছেন। কিন্তু চাচী চাচার সে আত্মত্যাগ বুঝলেন না, চাচার অবদানের স্বীকৃতি দিলেন না। উল্টা উপকারে লাঠির গুঁতা মেরে চাচাকে সমাজের কাছে হেয় প্রতিপন্ন করলেন।ফেসবুক, মিডিয়ায় চাচার নামে অপবাদ রটালেন।ভার্যা হয়ে তিনি ভর্তাকে আলুভর্তা বানালেন, চাচী বড়ই কৃতঘ্ন, হাহাহাহা। ইসলামে মলমূত্র চরম ঘৃণিত বস্তু, হারাম- ইসলামী আইন। মানলে মানুন না মানলে না মানুন, আমি করবনা কোন ফাইন।

লেখক : কলামিস্ট