বিশ্ব ইজতেমার আখেরি মোনাজাত

আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন ধ্বনিতে মুখর তুরাগ তীর

63

মুসলিম উম্মাহর সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনার মধ্যদিয়ে শেষ হলো ৫৩তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। গতকাল রবিবার সকাল পৌনে ১১টার দিকে আখেরি মোনাজাত শুরু হয়। শেষ হয় সোয়া ১১টায়। প্রায় আধা ঘণ্টাব্যাপী চলা মোনাজাত পরিচালনা করেন বাংলাদেশের মাওলানা হাফেজ মো. জোবায়ের। তিনি বাংলায় মোনাজাত করেন।কয়েক বছর ধরে ভারতের মাওলানা সাদ ইজতেমায় আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করলেও এবার তাঁর পরিবর্তে বাংলাদেশের কাকরাইল মসজিদের ইমাম মাওলানা জোবায়ের হাসান আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করেন। ইজতেমা ময়দানে বিদেশি নিবাসের পূর্বপাশে বিশেষভাবে স্থাপিত মঞ্চ থেকে এ মোনাজাত পরিচালনা করেন তিনি।মোনাজাতে কয়েক লাখ মুসল্লি অংশ নেন। মোনাজাতে আত্মশুদ্ধি ও গুনাহ মাফের পাশাপাশি দুনিয়ার সব বিপদ থেকে হেফাজতের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন তারা। মুসল্লিদের আমিন, আল্লাহুম্মা আমিন ধ্বনিতে তুরাগ তীর এলাকায় অন্যরকম ধর্মীয় পরিবেশের সৃষ্টি হয়। খবর একটি অনলাইন বার্তাসংস্থারমোনাজাতের আগে উপস্থিত মানুষের মাঝে হেদায়েতি বয়ান পেশ করা হয়। এছাড়া ছয় উসুলের পাশাপাশি ঈমান ও আমলের ওপর হেদায়েতি বয়ান পেশ করা হয়। ইসলামের পথে চলার জন্য বিভিন্ন দিক নির্দেশনামূলক বক্তব্যও দেয়া হয়। উপস্থিত মুসল্লিরা আগ্রহ ভরে তার বক্তব্য শোনেন। বয়ান শেষে শুরু হয় মোনাজাত। মোনাজাত শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই লাখো মুসল্লির কলরব থেমে যায়। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা। মানুষ যে যে ছিলেন সেখান থেকেই মোনাজাতে শরিক হন।
এর আগে হিমেল হাওয়া ও কনকনে শীতকে উপেক্ষা করে ইজতেমা ময়দানের দিকে ছুটতে থাকে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসল্লি। মানুষের ভিড়ে রেডিসন, কুড়িল ফ্লাইওভার, খিলক্ষেত, উত্তরা, জসিমউদ্দীন, আবদুল্লাহপুর, চৌরাস্তা, আশুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল শিথিল করা হয়। যানবাহন না পেয়ে অধিকাংশ মুসল্লি পায়ে হেঁটেই রওনা হন।
ভোরের আগেই ইজতেমা ময়দান কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়। মাঠে জায়গা না পেয়ে অনেক মুসল্লি ইজতেমার আশপাশের সড়কে অবস্থান নেয়। তারা চটি, ত্রিপল, পত্রিকা বিছিয়ে রাস্তায় অবস্থান করছে। মানুষের এই ঢল আব্দুল্লাপুর-উত্তরা পেয়ে ছাড়িয়ে যায়। এছাড়া মাঠ, পথ, বাড়ির ছাদ, তুরাগের দুই তীর, নৌকা, যানবাহনসহ যে যেখানে পেরেছেন মোনাজাতে শরিক হয়েছেন।
পুরুষের পাশাপাশি অনেক নারীও মোনাজাতে অংশ নিয়ে চোখের পানি ফেলে আল্লাহার কাছে রহমত প্রত্যাশা করে দোয়া করেছেন। মুসল্লিরা আল্লাহর দরবারে দুহাত তুলে অশ্রæসিক্ত নয়নে আল্লাহর কাছে গোনাহ মাফ চান এবং মুসলিম উম্মার সুখ, শান্তি কামনা করেন।
এর আগে ইবাদত বন্দিগী, তাসকিলে তামিল, ধর্মীয় আলোচনা, তাসবিহ তাহলিল আর তাবলীগের বিভিন্ন বিষয়ের উপর বয়ান শোনার মধ্যদিয়ে টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে ইজতেমার তৃতীয় দিন শুরু হয়।
মোনাজাতে বিপুল মুসল্লির অংশগ্রহণকে কেন্দ্র রেখে বাড়ানো হয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা। নেয়া হয়েছে যানবাহন চলাচলে কড়াকড়ি। তবে দিল্লির মাওলানা সাদের ইজতেমায় অংশ নিতে না দেয়া ও নীরবে চলে যাওয়াটা তার অনুসারীদের মনে গভীর দাগ কেটেছে বলে জানিয়েছেন তার ভক্তরা। কিন্তু ইজতেমার মূল লক্ষ্য মানুষকে আল্লাহমুখী করা।
এর আগে গত দুই দিন ধরে ইজতেমা মাঠে সার্বক্ষণিক ইবাদত-বন্দেগিতে মগ্ন ছিলেন লাখ লাখ দেশি-বিদেশি মুসল্লি। ফজর থেকে এশা পর্যন্ত ইজতেমা মাঠে ঈমান, আমল, আখলাক ও দ্বীনের পথে মেহনতের ওপর বয়ান করেন আলেমরা। দেশ-বিদেশ থেকে আগত মুরুব্বিরা তাবলীগের ছয় ওছুলের মধ্যে দাওয়াতে দ্বীনের মেহনতের ওপর গুরুত্বারোপ করে বয়ান করেন। ইজতেমা শেষে এবার মুসল্লিরা দ্বীনের দাওয়াতি কাজে দেশ বিদেশে বেরিয়ে যাবেন।
আখেরি মোনাজাতে অংশ নিলেন প্রধানমন্ত্রী : বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের আখেরি মোনাজাতে অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল রবিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে আখেরি মোনাজাতে অংশ নেন তিনি।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি ও কৃষি বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলিসহ প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়রা গণভবনে তাঁর সঙ্গে মোনাজাতে অংশ নেন।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান, সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহম্মদ জয়নুল আবেদীন, প্রেস সচিব ইহসানুল করিম, বিশেষ সহকারি ড. আবদুস সোবহান গোলাপ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও গণভবনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ এ সময় সেখানে মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেন।
প্রথম বাংলায় আখেরি মোনাজাত : আখেরি মোনাজাতের মধ্যদিয়ে শেষ হলো টঙ্গীর তুরাগ তীরের বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। ভারতের মাওলানা সাদ কান্ধলভিকে নিয়ে বিতর্ক তৈরির পর বাধার মুখে তিনি এবারের ইজতেমায় অংশ না নিয়ে চলে যাওয়ায় কাকরাইল মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা মো. জোবায়ের বাংলায় মোনাজাত পরিচালনা করেন। আখেরি মোনাজাতের আগে হেদায়তি বয়ানও বাংলায় করা হয়। হেদায়েতি বয়ান করেন বাংলাদেশের মাওলানা আব্দুল মতিন।
জানা গেছে, ইসলামের দাওয়াতি কাজকে ত্বরান্বিত করতে মাওলানা ইলিয়াছ শাহ (র.) দিল্লির নিজামুদ্দিন মসজিদ থেকে তাবলিগের কাজ শুরু করেন। মাওলানা ইলিয়াছের (র.) ছেলে মাওলানা হারুন (র.)। তাঁরই ছেলে হলেন মাওলানা সাদ কান্ধলভী। তাবলিগ জামাতের সূচনা করার পর থেকে মূলত: উর্দূতেই ইজতেমায় বয়ান ও মোনাজাত হয়ে আসছিল। ভারতের মাওলানা জোবায়রুল হাসান মারা যাওয়ার পর ২০১৫ সাল থেকে মাওলানা সাদ আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করে আসছেন। এর আগে তিনি টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে শুধু তাবলিগের বয়ান দিতেন।
বিশ্ব ইজতেমায় উর্দুতে বয়ান করা ছাড়াও মাওলানা সাদ একই ভাষায় আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করতেন। কিন্তু বিতর্কের মুখে এবার মাওলানা সাদ বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নিতে না পারায় বাংলায় মোনাজাত পরিচালনা করা হয়, যা ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়া ৫২ বছরের তাবলিগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমার ইতিহাসে প্রথম। এছাড়া এবারই প্রথম হেদায়াতি বয়ানও হয় বাংলায়।
প্রায় আধা ঘণ্টারও কিছু বেশি সময় ধরে চলা এই মোনাজাতে মুসলিম জাহানের কল্যাণ কামনা করা হয়। মোনাজাত প্রচারের জন্য গণযোগাযোগ অধিদপ্তর ও গাজীপুর জেলা তথ্য অফিস বিশেষ ব্যবস্থা নেয়। মোনাজাতে অংশ নিতে আসা মুসল্লিদের যেন সমস্যা না হয় সেজন্য আজমপুর, উত্তরাসহ আশপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মাইকের বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়।
মোনাজাত বাংলা করায় খুব ভালো হয়েছে জানিয়ে ইজতেমায় আসা ঢাকার মতিঝিলের বাসিন্দা ইমদাদুল হক বলেন, ‘অন্যান্যবার আরবি আর উর্দুতে মোনাজাত করা হতো। তখন কিছুই বুঝতাম না। শুধু আমিন আমিন বলতাম। মোনাজাতে হুজুর কী বলতো তা বুঝতাম না। এবার বাংলায় মোনাজাত করায় ভালো হয়েছে।’আগারগাঁও থেকে আসা সাইফুল ইসলাম জানান, ‘যেহেতু আমরা বাঙালি, আমাদের ভাষা বাংলা। বাংলা ভাষাটা বাংলাদেশের সবাই সহজে বুঝতে পারে। তাই বাংলা ভাষায় মোনাজাত করলে মনের আবেগটা অনুভব করতে পারা যায়। তাই প্রতিবছর বাংলাতে মোনাজাত হলে আমরা খুশি হতাম।’চার দিনের বিরতি শেষে আগামী শুক্রবার ১৯ জানুয়ারি শুরু হবে এবারের বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব। এই পর্ব শেষ হবে আগামী ২১ জানুয়ারি।