আমার চারটিখানি কথা

15

লিটন দাশ গুপ্ত

করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২০২০ ইং সালটির বর্তমান মুমূর্ষু অবস্থা। বিধ্বস্ত পৃথিবী ও প্রাণীক‚ল, বিপর্যস্ত জীবন ও জীবিকা। মানবসভ্যতায় নেমে এসেছে স্থবিরতা। এই অবস্থায় অন্য সবকিছুর মত আমারও থেমে গেছে লেখা। তাই এই বছর পত্রপত্রিকায় আমার লেখা নেই বললেই চলে। মাঝে মধ্যে দুয়েকটা লেখা লিখেছি বটে, তবে কেমন জানি লেখার আগ্রহটা হ্রাস পেয়েছে। আসলে স্বাভাবিক পরিবেশে স্বাধীনভাবে সবার সাথে চলাফেরা করতে না পারলে, ভারাক্রান্ত মনে ঘরে বসে লেখার উপজীব্য পাওয়া যায়না। আবার ভাবনায় যে সব বিষয়বস্তু ঘুরপাক খায়, অলসতার কারণে খাতা কলম নিয়ে লিখতে বসার স্পৃহা জাগেনা। তারপরেও দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর ভাবলাম বাস্তব কিছু প্রত্যক্ষ ঘটনা পাঠকগণের সম্মুখে উপস্থাপন না করলে নয়। কারণ দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, দেশে ইতোমধ্যে অনেক ব্যক্তি চলে গেছেন, চলে যাচ্ছেন, মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এই অবস্থায় হঠাৎ করে দীর্ঘ সময় লেখা না পেলে অনেকে ঐ মিছিলের যাত্রী মনে করতে পারে। তাই লেখার মাধ্যমে শুভাকাক্সক্ষীদের নিকট ‘আমি আছি’ বার্তা প্রেরণের প্রয়োজনীয়তাও বা কম কি!
যাইহোক, এবার মূল কথায় আসি। এখন কথা হচ্ছে চলমান করোনা পরিস্থিতিতে লকডাউন, সামাজিক দূরত্ব, হ্যান্ড সেনিটাইজার সচেতনতা স্বাস্থ্যবিধি ইত্যাদি শব্দগুলো অতি পরিচিতি লাভ পেয়েছে। এই শব্দগুলো নিয়ে প্রত্যক্ষ কয়েকটা ঘটনা থেকে, চারটি ঘটনা নিয়ে ‘আমার চারটি খানি কথা’ আজকের লেখার উপজীব্য করতে চাই।
(১) প্রথমে আসি সামাজিক দূরত্বের কথায়। এখানে সামাজিক দূরত্বের সঠিক কোন সংজ্ঞা আছে কি না আমার জানা নাই। তবে অনেকটা বলা যেতে পারে, পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ‘সামাজিক’ এবং ‘দূরত্ব’ শব্দদ্বয়ের সংযোজন ঘটেছে। সামাজিক দূরত্ব হচ্ছে মূলত শারীরিক দূরত্ব। বিশেষজ্ঞগণ বলে থাকেন, ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির কমপক্ষে ১ মিটার, মানে ২ হাত বা ৩ ফুট দূরত্ব বজায় রাখায় হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব। করোনা থেকে পরিত্রাণ পেতে বা প্রতিরোধ করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দূরত্ব বজায় রাখার জন্যে এই শব্দ যুগলের মিলন ঘটিয়েছে। কিন্তু আমাদের মত জনবহুল দেশে তা কতটা প্রযোজ্য? ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর, অঘোষিত লকডাউনে প্রায় সব কিছু বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২ মে যখন শিল্প কলকারখানা খুলে দেয়া হয়, তখন দেখলাম গাড়িতে বাড়িতে পথে ঘাটে মানুষের ঢল। ঐ সময় বারে বারে সর্তক করা হচ্ছিল মাস্ক আর সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্যে। আমি এই সময় চট্টগ্রাম সিএন্ডবি এলাকা দিয়ে আসার সময় দেখি সীমিত সংখ্যক গাড়ি চলাচল করছে। কিন্তু হঠাৎ একটি গাড়ি এলে কয়েকশ মানুষ একসাথে ধাক্কাধাক্কি করে উঠার প্রতিযোগিতা। এখানে প্রায় সবাই অতি জরুরি প্রয়োজনে এসেছে; কেউ হাসপাতালে কেউ ডাক্তারের কাছে, কেউ রোগী দেখতে বাধ্য হয়ে বের হয়েছে। আবার অধিকাংশ পোশাকশিল্প কলকারখানার শ্রমজীবী কর্মচারী দীর্ঘদিন ঘরে থাকার পর জীবনকে উপেক্ষা করে, জীবিকার জন্যে ও চাকুরী বাঁচাতে বাধ্য হয়ে বের হতে হয়েছে। কিন্তু গণপরিবহন সীমিত থাকায় এই সময় এক মিটার নয় এক ইঞ্চি দূরত্ব বজায় রাখার কথা প্রশ্নই আসেনা। তাই আমার মনে হয়েছে, আমাদের মত জন বহুল দেশে, লকডাউনের ন্যায় সবকিছু বন্ধ রাখার পর, হঠাৎ সবকিছু খুলে দিয়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বলা বা বাধ্য করা মানে, অভিভাবকগণ কর্তৃক জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ে করিয়ে ফুলশয্যা বা বাসরে বর-কনে’কে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশনা দেয়ার সামিল!
(২) এবার আসি সচেতনতা প্রসঙ্গে। ২৬ মার্চ থেকে অঘোষিত লকডাউনের পর, কোভিড-১৯ ভাইরাস নিয়ে জনসাধারণের মনে এক প্রকার ভীতি ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। পরবর্তী ১ জুন থেকে ৬০% বর্ধিতভাড়ায় সীমিত আকারে গাড়ি চলাচল শুরু হলেও মানুষ বা যাত্রী সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য। অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাইরে নাই। এই অবস্থায় একদিন আমাকে বের হতে হয় খুবই জরুরী দরকারী এক কাজে। কাজ সেড়ে আসার সময়, অনেকটা বাধ্য হয়ে ও সুপরিবেশ পেয়ে, কালুরঘাট পশ্চিম প্রান্তে গণপরিবহণের একটি বাসে উঠে দেখি ৫/৬ জন যাত্রী। স্টেশনে দীর্ঘক্ষণ পরপর, একজন একজন করে যাত্রী আসছে। এই সময় দেখলাম অতি সচেতন জনৈক ব্যক্তি গাড়িতে উঠে ডানে বামে তাকাচ্ছিল। তার হাতে গøাভস, মুখে এন-৯৫ মাস্ক, চোখে গগলস, মুখমন্ডলে ফেসশিল্ড, মাথায় টুপি পরনে পিপিই; এছাড়া কাঁধে ছিল একটি ঝুলানো ব্যাগ। অন্যান্য যাত্রীর মত আমারও এই লোকটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষিত হয়। ভাবতে থাকি আদৌ যাত্রী নাকি হকার, ডাকাত নাকি অন্য কিছু! শুধু আমি নয় কেউ বুঝে উঠে পারছেনা। কিছুক্ষণ পর দেখলাম সাথে থাকা ব্যাগ থেকে খপ করে বের করল একটি বোতল ভর্তি স্প্রে। ভাবলাম, স্প্রে বিক্রির জন্যে বিজ্ঞাপন শুরু করবে। কিন্তু না, দুরের একটি সিটে গিয়ে ছিপ ছিপ করে স্প্রে দিয়ে জীবাণুমুক্ত করে ধপ করে বসে পড়ল। তারপরে আসনে হেলান দিয়ে বসে আরামে সঠান হয়ে আছে। গ্রীষ্মের খরায় তীব্র গরমে হেঁটে আসার পর বসতে পেরে সতেজ ও আরাম অনুভব করতে লাগলো। এরপর দেখলাম টুপি চশমা গ্লাভস খুলে, হাতের সাহায্যে ইচ্ছামত কপাল-কপোল থেকে চোখমুখ গলামাথা পর্যন্ত ঘষামাজা করে রিফ্রেশ হবার চেষ্টা করতে থাকে। আবার ঘর্মাক্ত হাতটা দেখলাম গাড়ির সিটে ঘষে মুছে শুষ্ক করে নিচ্ছে আর চোখমুখ মুছে পরিষ্কার করে যাচ্ছে। করোনামুক্ত থাকতে গিয়ে জীবাণুতে যুক্ত হওয়া সেই দিন দেখা এই হচ্ছে অতি সচেতন ব্যক্তির চরম মূর্খতা। এই অবস্থা দেখে মনেপড়ে গেল বিদেশি নাটকের সেই চিত্র, যেখানে অতি রক্ষণশীল চরিত্রের অভিনয় করতে যাওয়া নায়িকার দৃশ্য; যার চোখমুখ মাথা এমনকি হাতমোজা দিয়ে হাতও ঢাকা, কিন্তু উরুর উপর অংশ থেকে পায়ের নিচের পর্যন্ত আনড্রেস!
৩) এবার আসি কিছু দিন আগের অন্য আরেকটি ঘটনায়। দেশে সকল যানবাহন চলছিল স্বাভাবিকভাবে। তবে যাত্রিবাহী বাসগুলো চলছে প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া নিয়ে। সীটের অর্ধেক যাত্রী কমিয়ে নেবার শর্ত থাকলেও যাত্রী কম নেই, শুধু কম আছে সচেতনতা। এরপর ১ সেপ্টেম্বর থেকে সকল যাত্রী বাহী যানবাহন চলাচল পূর্বাস্থায় ফিরিয়ে আনতে, বর্ধিত ভাড়া নেবার নির্দেশনা প্রত্যাহার করে নেয় সরকার। এই অবস্থায় একদিন সুরক্ষা নিয়ে যাচ্ছিলাম ব্যক্তিগত একটি কাজে। গণপরিবহনে সুযোগ ও সুবিধা পেয়ে আবারো উঠলাম। দেখলাম সেখানে ৬/৭ জন যাত্রী মাস্ক পরেছে। তার মধ্যে কয়েক জন রেখেছে নাকমুখ থেকে দুয়েক ইঞ্চি নিচে। সেই হিসাবে মনে মনে সমীক্ষা করতে লাগলাম। বুঝলাম ৮৫% যাত্রী মাস্কবিহীন। এইদিকে বাসের কন্ডাক্টর ভাড়া উঠাচ্ছিল। সুরক্ষিত মাস্কপরা এক যাত্রী থেকে ভাড়া নিতে গিয়ে শুরু হয় বাকবিতন্ডা। বিষয় কোন জায়গায় যাবে তা, যাত্রী মাস্কপরে থাকার কারণে অ্যাসিসটেন্ট বা কন্ডাকটর বুঝতে না পারা, যার ফলে ঝগড়া বিবাদ সৃষ্টি। একপর্যায়ে এসিসটেন্ট যাত্রীটির উদ্দেশ্যে বলে. ‘দেইলে তো শিক্কিত ভদ্র মনেঅর, ফত্রিকা নফরো, টিভি নদেহ হরোনা গিয়েযে বোদ্দিন অইগিয়ে, আইজো মুখত হঁইল দি আছ।’ এরপর দেখলাম করোনা আছে আর নাই, এই নিয়ে সকল যাত্রী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। যাত্রীদের মধ্যে ভালো খারাপ শিক্ষিত অশিক্ষিত বিভিন্ন প্রকৃতি ও শ্রেণির মানুষ রয়েছে। তারা সমান ভাবে পক্ষে বিপক্ষে মতামত দিচ্ছে আর নিচ্ছে। আমি নিরপেক্ষ বা তৃতীয় পক্ষ হয়ে নিরবে শুনছি আর যাত্রীদের কথাবার্তা চিন্তা চেতনা নিয়ে রীতিমত তথ্য বিশ্লেষণ করছি। তাদের মধ্যে থেকে অনেক মজার কথা শোনা গেলেও, শুধু ফলাফলটা প্রকাশ করতে চাই। এখানে দেখলাম প্রায় ৮০% যাত্রী বলেছে এখন আর কোন করোনাভাইরাস নাই। তাই সরকার ধীরে ধীরে সব স্বাভাবিক করে দিয়েছে। একেবারে আত্মবিশ্বাস থেকে বলে বিভিন্ন মিডিয়ায় এই নিয়ে শুনেছে বা দেখেছে তারা। এমনকি এইও বলে, যারা বুঝেনা জানেনা তারাই মাস্ক পড়ে। অন্যদিকে ১৫% বলছে করোনা পুরোপুরি যায়নি, তবে ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে। তাদের মতে মাস্ক পড়লে ভালো আর না পড়লেও তেমন ক্ষতি নাই। চুপ করে থাকা কম কথা বলা মাত্র ৫% যাত্রী বলছে মাস্ক অবশ্যই পড়তে হবে। এখন করোনা একেবারে কমে যাচ্ছে বলা যাবেনা। গাড়ি চলছে যাত্রাপথ শেষের দিকে, গন্তব্য নিউমার্কেট। অবশেষে এই বিবাদ বা বিতর্কে ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখলাম ৮০% যারা করোনা চলে গেছে বলেছে গণতন্ত্রের বিচারে সংখ্যা গরিষ্ঠ মতামত হওয়ায় তারাই বিজয় হয়েছে। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত সচেতন শিক্ষিত যে ৫% বলেছিল করোনা আছে মাস্ক পড়তে হবে, তারা যথাযথ সত্য তথ্য দেবার সত্ত্বেও সংখ্যায় লঘিষ্ঠ হবার দরুন পরাজিত হল। এই থেকে উপলব্ধি করলাম, জ্ঞান বুদ্ধি বিবেক মিশ্রিত মতামতকারী সংখ্যায় কম হলেও বিবেচনা যোগ্য।
(৪) সবশেষে বলব একেবারে ভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে। এক আইনজীবী বন্ধু থেকে লকডাউনে কুশলাদি বিনিময়ের পর জানতে পারি, অন্যান্য সময় ফৌজদারি আদালতে বিভিন্ন ধরণের মামলা হলেও গত কয়েক মাসে পারিবারিক সহিংসতায় বেড়ে যাওয়ায় দাম্পত্য কলহে নারী নির্যাতন মামলা হচ্ছে বেশি। আলোচনা মাধ্যমে যে টুকু বুঝলাম, এখানে দেখা গেছে দরিদ্র বা নিম্নবিত্ত মধ্যবিত্ত পরিবারের একাংশে দরজা দিয়ে অভাব আসার পর ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালিয়েছে। যার প্রেক্ষাপটে, কারণে অকারণে দাম্পত্য কলহ সৃষ্টি। আবার অনেক ধনী বা সচ্ছল পরিবারে কর্মব্যস্ত স্বামী যখন সময় দিতে পারেনি পরিবারে, তখন স্ত্রীকে বলতে শোনা গেছে, তুমি কাছে না এলে বা বাইরে থাকলে আমার একমুহূর্তও কাটেনা। তুমি ঘরে এলে মনেহয় হাজার সূর্যের আলো আসে আমার হৃদ-মন্দিরে। এইদিকে করোনা পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে যখন স্বামীকে সাড়াদিন ঘরে থাকতে হয়েছে, তখন বলছে জীবনটাতে এখন একেবারে ঘোর অমাবস্যার অন্ধকার নেমে এসেছে। এরপর বিভিন্ন ছোট বিষয় নিয়ে দাম্পত্য জীবনে বয়ে যায় বড় ঝড়ঝঞ্ঝাট। অবশেষে দুজনের মাঝে দুজনেই গড়তে থাকে বিবাহ বিচ্ছেদের দেয়াল। আর এই থেকে প্রমাণিত জীবন আবেগ দিয়ে নয় বিবেক দিয়ে; তাত্ত্বিক ও পরোক্ষ কথায় নয়, ব্যবহারিক ও প্রত্যক্ষ বিষয় নিয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।

লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট