মোহাম্মদ আলী চৌধুরীর

আমার গোপন দহন

মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন

16

যে কবিতা শুনতে জানে না/ সে ঝড়ের আর্তনাদ শুনবে/ যে কবিতা শুনতে জানে না/ সে দিগন্তের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে/…………জিহŸায় উচ্চারিত প্রতিটি মুক্ত শব্দ কবিতা/ রক্তজবার মতো প্রতিরোধের উচ্চারণ কবিতা।
(আমি কিংবদন্তির কথা বলছি, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ্)
হ্যাঁ, কবিতার কথা বলছি, কাব্যগ্রন্থের কথা বলছি। কাব্যগ্রন্থটির নাম ‘আমার গোপন দহন’, কবি: মোহাম্মদ আলী চৌধুরী। চকরিয়া উপজেলার মফস্বলেরই একজন কবি, একনিষ্ঠ ও কর্মনিপূণ এক প্রেমিকসত্তা। মফস্বল থেকে তিনি প্রকাশ করেছেন উক্ত কাব্যগ্রন্থটি। কবির কর্মটি দুঃসাধ্যই বটে। সেটিরই আলোচনায় আজকের এ আয়োজন।
কবিতা কবির নিরীক্ষিত জীবনের অনুগামী। কবি সহজ, সরল পঙক্তিতে জীবনবোধ থেকে অকপটে ফুটিয়ে তুলেন গভীর ব্যঞ্জনা। কবিতার ভাব, ভাষা, শিল্পবোধ ও মননশীলতা তখন প্রাঞ্জলতা পায়। কবির চিন্তনে থাকে সুস্পষ্ট কল্পচিত্র। আর সেই চিত্রটি কথামালায় ফুটিয়ে তোলার নিপূণ দক্ষতা কবিকে করে আরো ঋদ্ধ। ‘আমার গোপন দহন’ কাব্যগ্রন্থটিতে কবি মোহাম্মদ আলী চৌধুরীর কবিতা পেয়েছে ঋদ্ধতার সংস্পর্শ। তিপ্পান্নটি কবিতায় সুসজ্জিত হয়েছে তাঁর ‘আমার গোপন দহন’ কাব্যগ্রন্থটি। কবিতার শিরোনামেও রয়েছে সহজ ও সরলতার নান্দনিক শিল্প প্রয়াস। কবির ‘আমার গোপন দহন’ কাব্যগ্রন্থের তিপ্পাটি কবিতাই যেন ‘ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা, ছোট ছোট দুঃখ কথা’র কাব্যিক বিন্যাস। ‘আমার গোপন দহন’ গ্রন্থটির নাম কবিতা। এ গ্রন্থের নামকরণ ও কাব্যরস আস্বাদনে গ্রন্থভুক্ত ‘কবি’ শিরোনামের কবিতাটিই পাঠকের জিজ্ঞাসার জবাব হবে বলে আমার মনে হয়। পাঠকের কৌত‚হল নিবৃত্তে কবিতাটি নিচে উদ্ধৃত করলাম:
কবিদেরও কষ্ট আছে
কবিরাও কষ্টবাদী
একেবারে ফুলেল শৃঙ্খলে
বাঁধা তাদের জীবন নয়;
কষ্টনদী তাদেরও দীঘল হয়
কোনো কোনো সময়
নির্ঘুম রাতের দীঘলতার মতো।

[কবি, আমার গোপন দহন]
উল্লেখিত কবিতাটি থেকে বুঝা যায় কবি মোহাম্মদ আলী চৌধুরী একজন দুঃখবাদী কবি। কিন্তু দুঃখবাদী কবি হলেও অনেক কবিতায় তিনি আশার আলোও দেখেছেন। তবে কবি এ কবিতায় নিজের ভেতরে শৈল্পিক দহনকে আড়াল করতে চেয়েও আড়াল করতে পারেন নি। অবচেতন মনে সে দহনের লাভাস্রোত নেমে এসেছে দুটি সাগর-চোখে। এ যেন তেজস্ক্রিয় পদার্থের ফিশন বা অন্তর্দহনেরই বহিঃপ্রকাশ। যে দহনের প্রহারে কবি হয়েছেন শিল্পী সত্তায় ঋদ্ধ। কবি আবার কখনো পরম আশার দারুচিনি দ্বীপের মতো এক চিলতে রোদের ঝলসানিও দেখতে পান। কিন্তু পৃথিবীর নশ্বরতার মতো ক্ষণিকেই সে রোদ আবার মিলিয়ে যায় মেঘময় অন্ধকারে। কবি এতে আন্দেলিত হন তীব্রভাবে। তখন দুঃখের প্রলয়থাবায় সুখের বিলাসের যেন পরিসমাপ্তি ঘটে। তাই কবি বিস্মিত চিত্তে স্বগতোক্তি করেনÑ ‘এই কি জীবন! জীবনের খেলাঘর!!’ কবি এখানে সহজ শব্দের মাধুরী মিশিয়ে টেনে এনেছেন দুঃখবোধ তাড়িত যাপিত জীবনের কিছু পঙ্ক্তিমালা। কবির কবিতায় উচ্চারিত হয়:
আমার গোপন দহন যতই আড়াল করে রাখি
কেন যে চোখের জল সে-কথা ফাঁস করে দেয়।
আমার সুখের একচিলতে রোদ যখন মেলে ধরে পাখনা
কেন যে ক্ষণিকের তরে মিলে যায় মেঘময় অন্ধকারে?
আমার স্বপ্নের তিথিরা হামাগুড়ি খেলে কখনো
দুঃস্বপ্নের প্রলয়থাবা আলিঙ্গন করে সুখের বিলাস
এই কি জীবন! জীবনের খেলাঘর!!
[আমার গোপন দহন]
এ কবিতায় কবি ট্র্যাজেডির মাধ্যমেই যেন পাঠকের কাছে কাব্যরস বিলানোর চেষ্টা করেছেন। তখন পাঠক-হৃদয়ে শতই সঞ্চারিত হয় এক আবেগীয় শোক।
কাব্যগ্রন্থটির কিছু কবিতার উল্লেখযোগ্য শিরোনাম এখন তুলে ধরছি: ‘আমার গোপন দহন’, ‘ভালো আছি’, ‘যদি যেতে হয়’, ‘শিয়রে অন্য পিদিম’, ‘আমার স্বদেশ’, ‘তুমি আছো তাই’, ‘মোহমুক্তি’, ‘অবাঞ্ছিত’, ‘তুমি নেই বলে’, ‘ভালোবাসা’, ‘একাত্তর’, ‘নীল আকাশ’, ‘যত দূরে থাকো’, ‘সজল প্রার্থনা’ প্রভৃতি।
‘ভালো আছি’ কবিতাটি বর্তমান সময়ে মধ্যবিত্ত শিক্ষক সমাজের জীবন-জীবিকার বিড়ম্বনার এক সুনির্দিষ্ট আখ্যান। এখানে কবি অবলীলায় চিত্রিত করেছেন আধুনিক জীবনে নিত্যদিনের আর্থিক সীমাবদ্ধতায় প্রহৃত করুণ কাব্যচিত্র। এখানে আমরা কবির সাথে সাদৃশ্য খুঁজে পাই রবীন্দ্রনাথের ‘বাঁশি’ কবিতার দরিদ্র হরিপদ কেরানির সাথে, নজরুলের ‘দারিদ্র্য’ কবিতার ভাবার্থের সাথে এবং কবি আশরাফ সিদ্দিকীর ‘তালেব মাস্টার’ কবিতার তালেব মাস্টারের সাথে।
মোহাম্মদ আলী চৌধুরী তাঁর কবিতায় অত্যন্ত সহজ-সরল ভাষায় চিত্রিত করেছেন নিজের দৈনন্দিন জীবনের ঘটনাপ্রবাহের ইতিবৃত্ত। কবি হৃদয়ের শত আক্ষেপ ও বেদনা লুকিয়ে রেখে ভদ্র সমাজে উচ্চারণ করেন ‘ভালো আছি’ শব্দমালায় নিজের অন্তর্দহন:
বুকেতে তুষের আগুন
মুখেতে কৃত্রিম হাসি
কতটুকু ভালো আছি?
ছেলেদের কোচিং ফি, স্কুলের বেতন,
মেয়েটার যৌতুকের দাবি
গৃহিনীর সংসারের বায়না
কোনটা ফেলে কোনটা রাখি?
প্রত্যুত্তরে বলি, ‘ভালো আছি’।
[ভালো আছি]
আসলে কবি নিজের জীবনে ‘ভালো’ থাকার কথা নয় বরং ‘ভ্যালা’ থাকার কথাই এ কবিতায় পাঠক চিত্তে সঞ্চারিত করার প্রয়াস পেয়েছেন।
বহমান স্রোতের মতো এগিয়ে চলছে সময়। তার গতিপথে নিজেকে খাপখাওয়ানোর মধ্যেই যাপিত জীবন স্পষ্ট হয়ে উঠে। কখনো হিসেবের খেরোখাতায় সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠে জীবন। কখনও-বা মলিন। কখনো একাকিত্বে বিমর্ষ কাতরতায় স্থবির করে দেয় সময়। তখন সঙ্গত কারণেই পরম প্রিয়জনকেও বলতে ইচ্ছে করেÑ ‘তোমার যদি যেতেই হয়, চলে যেও।’ এ উপলব্ধি কবির হৃদয়পটে ধরা দেয় অনিবার্যরূপে:
তোমার যদি যেতেই হয়, চলে যেও
আমি রয়ে যাবো, অগণিত দুঃস্বপ্নের
প্রলয়ী থাবা নগ্নমুখে যেখানে
লীন হয়ে আছে সবুজাভ সভ্যতা;
যেখানে দুর্বিসহ হয়ে আছে অগণন
মানুষের অন্তঃসারক‚ন্য পঙ্কিলতার
যাপিত জীবনের ভয়াল মূর্তি;
*** *** *** ***
আমি হাজারো বেদনার লোনাজলে
ডুব-সাঁতার দিয়ে দিয়ে
তোমার কাছে এসেছি
আমার অতীতের কষ্টে ভরা
যাপিত জীবনের দিনগুলো
আমাকে টানে বোধের সীমানায়
আমি সেখানে উড়াবো শান্তির সুখদ নিশান
আমি এখানে আছি, এখানে থাকবো,
তোমার যদি যেতেই হয়, চলে যেও। [যদি যেতে হয়]
কবির পঙক্তিমালায় অধিকারধন্য প্রিয়জনের প্রতি পরম ভালোবাসার আকুতি এ কবিতাকে করেছে প্রোজ্জ্বল ও বাক্সময়।
ফাগুনের আগমনে প্রকৃতি হয়ে ওঠে কাকলি-মুখর। প্রকৃতি সৌন্দের্যের ডালি দিয়ে নিজেকে সাজায় অপরূপ সাজে। স্বভাবতই মানুষের মনেও তখন এর আবেশ ছড়িয়ে পড়ে। যদি সে মানুষ দুটি হয় পরস্পর আপনজন; তাহলে সুন্দরের অনুভবের আঙিনা হয় আরও বিস্তৃত, জোছনাস্নাত রাত হয় আরও মনোহর। তখন অ-কবিও কবিতার সেতারে সুর তুলতে প্রয়াসী হয়। কিন্তু কোনো অনিবার্য কারণে যদি প্রিয়জন দূরে চলে যায় তখন স্বভাবতই হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটে। ‘শিয়রে অন্য পিদিম’ কবিতায়ও কবির এমন মনোভাব ব্যক্ত হয়েছেÑ যা পাঠকের হৃদয়কে ছুঁয়ে যায়।
এমন ফাগুনের যায়-যায় শীতে
তোমার কি চলে যাওয়ার কথা ছিল?
*** *** *** ***
যদি যেতেই চাও, তোমার-আমার
গলিত জোছনার কফিনে দিও হাত
শিয়রে পিদিম জ্বলা স্মৃতিতে।

আমাকে খুঁজে পাবে অগণন
ব্যথাতুর মানুষের বুকের ঝালরে,
জীবনের রূঢ় অঙ্গীকারের কাছ থেকে
আমাকে ফিরিয়ে দিও না
এই যে আমার অহঙ্কারী মরণ। [শিয়রে অন্য পিদিম]
‘গলিত জোছনার কফিনে দিও হাত’ এবং ‘এই যে আমার অহঙ্কারী মরণ’ পঙক্তিমালা সৃজন করে কবি আধুনিক কবিতার শরীরে সংযোজন করেছেন চমৎকার এক রঙিন পালক। যে পালক দ্যুতি ছড়াবে প্রেমিক হৃদয়ে বহুকাল ধরে।
আমাদের প্রিয় দেশটি বারংবার দেশি-বিদেশি শত্রæ দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু এ দেশের দামাল সন্তানেরা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে স্বদেশকে রক্ষা করেছেন। ‘আমার স্বদেশ’ কবিতায় কবি স্বদেশ প্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মানুষ মাত্রই স্বদেশ-প্রেমিক। যারা স্বদেশকে ভালোবাসে না তারা আসলেই দুর্ভাগা। এক্ষেত্রে কবি মোহাম্মদ আলী চৌধুরী কাব্যের মাধ্যমে সত্যিকার অর্থে দেশ প্রেমের পরিচয় দিয়েছেন। বলিষ্ঠ কণ্ঠে তিনি স্বদেশ প্রেমের পঙক্তিমালা উচ্চারণ করেছেন। শত বৈরিতা সত্তে¡ও দেশকে ভালোবেসে যাবেনÑ এই তাঁর দৃঢ় অঙ্গীকার। তিনি বলেনÑ
কারো শকুনদৃষ্টি গ্রাস করে যদি
আমার স্বপ্নের সবতবাড়ি,
হে আমার দুঃখিনী স্বদেশ,
আমি আছি, আমি আছি
তোমার সবটুকু বৈরিতায়।
*** *** *** ***
একটি ভ‚মিকম্প যদি লÐভÐ করে দেয়
সমস্ত পৃথিবী, সমস্ত লোকালয়,
আমি মানচিত্রের খতিয়ান খুঁজে
বের করে নেবো আমার বসতবাড়ি,
আমার আজন্ম স্বপ্নের আবাসভ‚মি
আমার স্বদেশ। [আমার স্বদেশ]
কবি শত বৈরিতা আর দুঃখের মাঝেও মানস প্রিয়াকে ভুলেন নি। প্রিয়ার উপস্থিতি কবির দোদুল্যমান আত্মাকে প্রশান্ত করেছে। তখন তিনি আকাশের উদারতায়, কৃষ্ণচূড়ার ডালে, পলাশডাঙার ক‚লে কিংবা আকাশ দরিয়ায় পরম প্রিয়জনের উপস্থিতি টের পান। মন তার শান্ত হয় প্রিয় মানুষটি কাছে আছে বলে। অবশেষে প্রিয়জনকে কাছে পেয়ে তিনি উচ্চারণ করেন ‘এত সুখ কি সইবে আমার জনম জনম ধরিয়া’। ‘তুমি আছো তাই’ কবিতাটি সে অনুভ‚তিরই আখ্যান। কবি উচ্চারণ করেছেন-

জোছনার প্লাবন নেমেছে লোকালয়ে, সারা আঙিনায়
আজকে কি বিভোর হবে স্নানে, অজানা পুলকতায়

উদাসী বাউল তুলেছে যে সুর মরমে এসে লাগে
উতলা হয়েছে পেখম তুলি অবুঝ হৃদের মোহন বাগে

[তুমি আছো তাই]
কৃতজ্ঞতা শব্দটি শুধু তাঁরই জন্যে, যার অপার করুণা বিছানো রয়েছে জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে। মানুষকে বিন¤্র করে তোলে প্রতিটি শ্বাসে কেবল তাঁর ইচ্ছাশক্তি অবলোকন করতে। তখন বিনয় থেকে একাগ্র শ্রদ্ধাবোধ ও ভক্তি জেনে ওঠে অন্তরাত্মায়, শব্দমালার অপরূপ গাঁথুনিতে ঋদ্ধ হয় কবি-হৃদয়। ‘আপন সাঁই’ বলতে মরমিবাদীরা যাকে বুঝাচ্ছেন তার কাছে নিজ সত্তাকে বিলীন করে দেওয়ার উদগ্র কামনা উপলব্ধি করেন ভাবুক কবিরা। ‘মোহমুক্তি’ কবি মোহাম্মদ আলী চৌধুরীর সেই বোধেরই একটি কবিতা। যাতে ঝংকৃত হয়েছে পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার বিলীন হওয়ার বাসনা। তাই কবি উচ্চারণ করেন-
আমার ভেতরে কুরে কুরে খায় আমার যাপিত জীবনের
জমানো পাপ-পুণ্যের দীঘল পাথার,
নুয়ে আসে আমার উন্নত শির
একমেবাদ্বিতীয়মের পদতলে,
আমি দিশেহারা হয়ে যাই
বেদনার আপ্লুত হয়ে উঠে আমার সমগ্র তনু-মন

হঠাৎ চৌদিকে শোনা যায় সালাতের আহŸান
আমার অস্থির চিত্তে আসে স্বস্তির অমিয় ধারা। [মোহমুক্তি]
কবিরা সামাজিক জীব। তবে কবির দেখা যেখান থেকে শুরু, সাধারণের দেখা সেখানেই শেষ। তাই কবিরা হয় স্বপ্নদ্রষ্টা। লক্ষ্যভেদি দূরদৃষ্টি কবিকে করে শাণিত। সামাজিক অসঙ্গতি সবার আগে কবিরা বুঝতে পারেন বলেই তাঁরা সাবধান করে দেন কবিতার পঙক্তিমালার ঝংকারে। ‘অবাঞ্ছিত’ এ গ্রন্থের সমাজ-চিন্তামূলক একটি কবিতা। এ কবিতায় ধ্বনিত হয়েছে বর্তমান সমাজের কদর্যতা, কলুষতা ও বিপদগামিতার কুফল। ইশারার মাধ্যমে কবি এ কবিতায় সমাজকে সচেতন হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। কবি বলেনÑ
সেদিন ভিখারিনী এক
হাত পেতে বলে-
‘বাবা, দুদিন ধরে খাইনি কিছু
ভিক্ষা দেন আমারে’
ছিন্নবস্ত্র গায়ে, কোলেপিঠে একপাল বাচ্চা
অনাহারে পাÐুর মুখখানা, শুধাই তারে-
‘স্বামী খেতে দেয়না তোমারে?’
[অবাঞ্ছিত]
‘তুমি নেই বলে’ কবিতাটি কবির হৃদয়ছোঁয়া বিরহের এক কাব্যগাথা। যেকোনো বিরহি পাঠককে সহসাই এ কাবিতাটি আপ্লুত করবে। স্মৃতিতর্পণমূলক এ কবিতার চরণগুলোতে বিধৃত হয়েছে কবি মানসের এক অনবদ্য বাণী বিন্যাস। কবি নিজে স্মৃতির জাবর কেটে অতীত রোমন্থন করার প্রয়াস পেয়েছেন এ কবিতার প্রতিটি চরণে। কবির সত্যিকারের এক প্রেমিক-হৃদয়ের পরিচয় মিলে এ কবিতায়। কবি তাঁর আপনজনের অনুপস্থিতিতে তাকে খোঁজেছেন সোনালি দিনের জ্যোতির্ময় আভায়, সাজানো বাগানে, জায়নামাজের বিস্তৃর্ণ জমিনে, জোছনায় প্লাবিত সংসারে। অবশেষে নিজের মনকে প্রবোধ দেওয়ার জন্য তিনি প্রিয়জনের অনুপস্থিতিকে অক্ষয় বলে মেনে নিয়েছেন সে প্রিয়জনেরই সৃজিত ফুলের জলসায়। কবির রিক্ত বেদনের করুণ উচ্চারণ-
তুমি নেই বলে-
অনেক কাজ আমাদের অসমাপ্ত থেকে যায়
সাজানো হৃদয়ের অনেক ভাবনা
এলোমেলো হয়ে যায়
শুধু তোমার নিদারুণ অনুপস্থিতিতে।
তুমি নেই বলে-
তোমার বুকের উষ্ণতা আর পাই না
অকৃত্রিম উষ্ণতায় বেড়ে ওঠা
আমাদের সোনালি দিনের জ্যোতির্ময় আভায়।
*** *** *** *** ***
শালবনে হারিয়ে যাওয়ার মতো
তোমাকে খুঁজি জায়নামাজের বিস্তৃর্ণ জমিনে,
আপনজনের মধুর আড্ডায়,
সাজানো বাগানের ফুলের বন্যায়,
তোমাকে খুঁজি, কেবল তোমাকে খুঁজি
ভালোবাসার জোছনায় প্লাবিত সংসারে।
*** *** *** *** ***
তুমি অক্ষয় হয়ে আছোÑ
তোমার সাজানো বাগানের ফুলের জলসায়।
[তুমি নেই বলে]
‘ভালোবাসা’ শব্দটি আদি-অনন্তকাল ধরে উচ্চারিত রোমাঞ্চ-জাগানিয়া এক শব্দ-ব্যঞ্জনা। পৃথিবীর নানা মণীষী-দার্শনিক, কবি-সাহিত্যিক-বিজ্ঞানী ভালোবাসার নানান সংজ্ঞা নির্ধারণ করলেও ভালোবাসা শব্দটি চির আধুনিক রয়ে গেছে। এটি এক আপেক্ষিক শব্দবন্ধ। পৃথিবীর বোদ্ধারা এ শব্দটির অর্থ-মাহাত্ম্য যে যেরূপ উপলব্ধি করেছেন তিনি সেরূপেই তার ব্যাখ্যা করেছেন। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার মাঝে ভালোবাসা চির অমর। কবিরা সুন্দর ও ভালোবাসার পূজারি বলে তাঁদের চিত্তে ভালোবাসার যে রকম বাক্সময় প্রকাশ ঘটেছে, অন্য কারো চিত্তে সে রকম ঘটেছে বলে মনে হয় না। কবি মোহাম্মদ আলী চৌধুরীর ‘ভালোবাসা’ কবিতাটিকে কবি-হৃদয়ের চির যৌবনের পরম আবেগ মথিত একটি প্রেরণাদায়ী কবিতা বলে চিহ্নিত করা যায়। এটি যেন যুবা বয়সের প্রেম-ভালোবাসার এক ফেনিল উচ্ছাস। কবি তার দয়িতাকে কবিতার পরতে পরতে নানান উপলদ্ধিতে প্রকাশ করেছেন। কবির কাছে তার দয়িতা একেবারে নিখাদ, টানটান অনুভ‚তিময়। কখনো কাব্যময় দ্যোতনার উচ্চারণ। আবার কখনো মনোলোভা আকিঞ্চন। কবির কাছে তার ভালোবাসার মানুষটির আগমনে হৃদয়ের পুষ্পমঞ্জরি দূর আকাশে আবার ডানা মেলতে চায়। কবি ‘ভালোবাসা’ শীর্ষক কবিতায় এক কালোত্তীর্ণ পঙক্তিমালার সমাবেশ ঘটিয়েছেন। ইতোপূর্বে বাংলা কবিতায় এরূপ শব্দবন্ধ কদাচ ব্যবহৃত হয়েছে বলে আমার মনে হয়। কবি বলেন-
ভালোবাসায় মেয়াদ উত্তীর্ণতা থাকে না,
থাকার কথা নয়;
ভালোবাসা আমৃত্যুকালীন এক স্বর্গীয় অনুভ‚তি। [ভালোবাসা]
‘ভালোবাসা’ নামক কবিতায় এই শেষ চরণগুলোই কেবল কবি ও কবিতাকে বিশ্বজননীন করবে বলে আমার বিশ্বাস। কবি ও কবিতার চির অমরত্ব লাভের জন্যে এটি একটি সোনালি সোপান।
কবি মোহাম্মদ আলী চৌধুরী বয়সে যখন তরুণ তখন আমাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়। পরে তা দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। ‘একাত্তর’ শীর্ষক কবিতায় কবি অবলীলায় সে সময়কার বিভীষিকাময় মুুহূর্তের বাণীচিত্র অঙ্কন করেছেন। কবি স্বীকার করেছেন, বায়ান্ন তিনি দেখেন নি; কিন্তু ঊনসত্তর থেকে একাত্তরের তিনি জীবন্ত সাক্ষী। তিনি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করলেও তাঁকে আমরা চেতনার মুক্তিযোদ্ধা বলতে পারি। তাঁর অন্তরে ছিলো দেশ স্বাধীন হওয়ার ব্যাকুল আকাক্সক্ষা। তাই এ কবিতায় কবি একাত্তরের আনুপূর্বিক ঘটনাপ্রবাহ ও বিভীষিকাময় দিনের কথা চিত্রিত করেছেন। বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা, স্বাধীনতার ঘোষণা ও ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের জ্বালাময়ী আহŸান, নারীর বিভীষিকাময় জীবনের আর্তচিৎকার, শ্মশানপুরীর সুনসান নীরবতা, হানাদারের লুটপাট, নারকীয় হত্যাযজ্ঞ, লাখো লাশের নীরব মিছিল ইত্যাদি কবিতার প্রতিটি চরণে দেদীপ্যমান হয়ে ফুটে উঠেছে। কবি এ পর্যায়ে দীপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করেন-
আমি বায়ান্ন দেখিনি, ঊনসত্তর দেখেছি
হাঁটি হাঁটি পায়ে,
একাত্তর দেখেছি তারুণ্যদীপ্ত বয়সেÑ
টগবগ করা রক্তের ফালি-ফালি উন্মাদনায়
শিরা-উপশিলায় স্বাজাত্যবোধের উন্মাতাল
রক্ত কণিকার ভেতর লাল-সবুজের পতাকা।
[একাত্তর]
এতো ত্যাগের বিনিময়ে পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ আজ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেদীপ্যমান নাম। এখন স্বাধীন বাংলাদেশের কাক্ষিত চেহারা কীরূপ হওয়ার কথা ছিলো, কিন্তু কীরূপ হয়েছেÑ সেটিই এখন কবির জিজ্ঞাস্য।
আমাকে এখনো ভাবায়, ভাবিয়ে তোলেÑ
এত রক্তের বন্যার সুফল আমরা কতটুকু পেলাম?
কতদূরে আমাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতার স্বাদ?
শুধু কি অন্তরেই রয়ে যাবে
ধুকে ধুকে জ্বলা এই ব্যথাতুর বিষাদ? [একাত্তর]
কবির সে জিজ্ঞাসার জবাব হয়তো মহাকালই দেবে। আমরাও সে শুভক্ষণের অপেক্ষায়।
মানুষের জীবনে প্রেম আসে। তা কখনো সরবে আবার কখনো নীরবে। কবির জীবনেও একদা প্রেম হানা দিয়েছিলো। কিন্তু সে প্রেম অব্যক্ত প্রেম। হৃদয়ের সবকিছু উজাড় করে কবির প্রেমাস্পদ মুখ খুলে বলতে পারেনি ‘ভালোবাসি’ শব্দবন্ধটি। অথচ সে রকম বলায় কী দোষের ছিলো? কবি তাই এখনো ‘জীবন মধ্যাহ্নে’ তার ছলছল আঁখির তীব্র কটাক্ষে উতলা হয়ে পড়েন; এবং তা বেশ তীব্রভাবে। কবি তার মনোভাব ব্যক্ত করেছেন এভাবেÑ
আমি কি তখন কলেজ-করিডোরে?
হয়তো-বা।
হয়তো-বা আমি দাঁড়িয়ে আছি
একঝাঁক উজ্জ্বল রঙিন প্রজাপতির
হিরণ-পয়েন্টের দোরগোড়ায়।
এ কোন প্রজাপতির প্রজাপতি
উচ্ছল বন্যার স্রোতে চেয়ে আছে অপলক নেত্রে?
ডাগর দুটো পদ্মচোখে কিসের আকুতি?
[নীল আকাশ]
কবি মধ্য বয়সের অলস দুপুরে এখনো মগ্ন চৈতন্যে খুঁজে ফেরেন তাঁর অব্যক্ত প্রেমকে। সে প্রেমের কথা ভেবে ভেবে তিনি রোমাঞ্চিত হন, শিউরে উঠেন বারংবার।
যত দূরেই থাকো- তোমার হৃদয়টা
আমার কাছে জমা রেখো।
মুক্তোকে যেভাবে জড়িয়ে রাখে
কোনো ঝিনুক তার বুকের ঝালরে
সেভাবে আমিও রাখবোÑ পরম মমতায়।
[যত দূরে থাকো]
এ কবিতায় কবি যেন প্রেম-সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছেন। ‘আমার গোপন দহন’ কাব্যগ্রন্থের উল্লেখিত শ্রেষ্ঠ কটি পঙক্তির মধ্যে এটি অন্যতম। প্রেমিকের কাছে তার প্রেমাস্পদ সুদূর অন্তরীক্ষের মতো মূল্যবান। মানুষ যেরূপ মূল্যবান হিরে-জহরত ব্যাংকের লকারে জমা রাখে, তেমনি কবির প্রেমিক-হৃদয় হচ্ছে সে রকম মূল্যবান লকার। এ লকারে কোনো চোর-তস্করের যাতায়াত নেই, এটি একান্তই প্রেমিকের নিজস্ব মালিকানা। আর সে হৃদয়-লকারেই স্থান পায় কবির আরাধ্য প্রেমিকার সত্তা।
‘যত দূরে থাকো’ কবিতায় কবি প্রেমে হেরে যাওয়ার আকুতি জানান। তাই কবি প্রেমিক-হৃদয়েই পরম প্রশান্তির সুখ অন্বেষণ করেন।
তোমার সোহাগমাখা কম্পিত হৃদয়
আমাকে ছুঁয়ে যাবে অহর্নিশ;
আমি তোমার কাছে বেড়ে উঠবো
প্রতিদিন …… প্রতিক্ষণ

তারপর তোমার কাছে আমি
হেরে গেলেও সুখ,
আছে পরম প্রশান্তি। [যত দূরে থাকো]
‘সজল প্রার্থনা’ এ কাব্যগ্রন্থের সর্বশেষ কবিতা। মানুষের অন্তিম সময়ে যেমন মানুষ ‘জীবন’ নামের খেরোখাতার রিভিউ করতে উদ্যোগী হয়, ঠিক তেমনি কবিও তাঁর জীবনের রিভিউ করেছেন এ কবিতায়। সৃষ্টিকর্তার কাছে সজল চোখে তিনি নিজেকে অন্তর্লীন করেছেন চূড়ান্ত কৃতজ্ঞতায়। প্রভুর দয়ার সাগরে ডুবসাঁতার কেটেছেন কবি বারংবার। সৃষ্টিকর্তার দয়ার কৃতজ্ঞতায় কবি যেভাবে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন, এ রকম দৃষ্টান্ত বাংলা কাব্য সাহিত্যে বড্ড বিরল। এ ক্ষেত্রে কবি মোহাম্মদ আলী চৌধুরী একক ও অনন্য। পাঠকের কাব্যরস নিরসনে পুরো কবিতাটি নিম্নে উদ্ধৃত করা হলো:
আমি মহা সাগরের গভীরতা দেখেছি
বিশালতা দেখেছিÑ যতদূর দৃষ্টি যায়
আকাশের উদারতা দেখেছি দিব্যচোখে,
উপত্যকা থেকে নেমে আসা
কলকল হাসির বহমান স্রোতধারা দেখেছিÑ
কী পবিত্র স্বচ্ছতার নির্মল আশীর্বাদ
[সজল প্রার্থনা]

আলোচ্য নিবন্ধে কবি মোহাম্মদ আলী চৌধুরী রচিত তিপ্পান্নটি কবিতা সম্বলিত ৬৪ পৃষ্ঠার ‘আমার গোপন দহন’ শীর্ষক কাব্যগ্রন্থের বাছাই করা ১৪টি কবিতার আলোচনা পেশ করা হলো। নিবন্ধের কলেবর বৃদ্ধির আশংকায় আরো ৩৯টি কবিতা আলোচনা করা হয়নি। আলোচিত না হলেও উক্ত কবিতাগুলো স্ব-মহিমায় সমুজ্জ্বল। কাব্যগ্রন্থের সূচি পাতায় মোট ৫৫টি কবিতার সূচি ছাপানো থাকলেও ‘যোজন যোজন’ এবং ‘শোধ’ শীরোনামের দুটি কবিতা মূলগ্রন্থে লিপিবদ্ধ নেই। এটা হয়তো মুদ্রণ বিভ্রাট। এ জন্যে লেখক ও প্রকাশকের অনুসন্ধানী দৃষ্টি প্রত্যাশিত। এখন আমরা ‘আমার গোপন দহন’ কাব্যগ্রন্থের কবিতায় ব্যবহৃত কিছু সাড়া জাগানো পঙক্তিমালার উল্লেখ করার প্রয়াস পাবো।
১.আমার স্বপ্নের তিথিরা হামাগুড়ি খেলে কখনো
দুঃস্বপ্নের প্রলয়গাথা আলিঙ্গন করে সুখের বিলাস
এই কি জীবন! জীবনের খেলাঘর!! [আমার গোপন দহন, পৃ: ১১]
২.যদি যেতে চাও, তোমার-আমার
গলিত জোছনার কফিনে দিও হাত
শিয়রে পিদিম জ্বলা স্মৃতিতে। [শিয়রে অন্য পিদিম, পৃ: ২৩]
৩.ঘোমটা খোলা নববধূর সাজে সেজেছে আকাশদরিয়া
এত সুখ কি সইবে আমার জনম জনম ধরিয়া। [তুমি আছো তাই, পৃ: ২৯]
৪.আমার ভেতরে কুরে কুরে খায় আমার যাপিত জীবনের
জমানো পাপ-পুণ্যের দীঘল পাথার,
নুয়ে আসে আমার উন্নত শির
একমেবাদ্বিতীয়মের পদতলে। [মোহমুক্তি, পৃ: ৩৪]
৫. দুজনে ভিজবো ঝুম বৃষ্টির অঝোর ধারায়
ধুয়ে ফেলবো নীল দরিয়ার সবটুকু নীল।
[শ্রাবণ পদাবলি, পৃ: ৩৯]
৬. ভালোবাসায় মেয়াদ উত্তীর্ণতা থাকে না,
থাকার কথা নয়;
ভালোবাসা আমৃত্যুকালীন এক স্বর্গীয় অনুভ‚তি। [ভালোবাসা, পৃ: ৪৮]
৭. কবিদেরও কষ্ট আছে
কবিরাও কষ্টবাদী
[কবি, পৃ: ৪৯]
৮. ভালোবাসা মরে নাÑ
ভালোবাসা জয় করে হাজারো কষ্টনদী। [অনুরাগ, পৃ: ৫৪]
৯. যত দূরেই থাকোÑ তোমার হৃদয়টা
আমার কাছে জমা রেখো।
মুক্তোকে যেভাবে জড়িয়ে রাখে
কোনো ঝিনুক তার বুকের ঝালরে
সেভাবে আমিও রাখবোÑ পরম মমতায়। [যত দূরে থাকো, পৃ: ৬৩]
এ নিবন্ধে কাব্যগ্রন্থটির আলোচিত-অনালোচিত কবিতার এ রকম শ্রেণি বিন্যাস করা যেতে পারে:
(ক) নিকটজনের মৃত্যুতে শোক কবিতা- ৩টি।
১. মহাযাত্রা (বন্ধুপ্রতিম অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন-এর অকাল প্রয়াণে)
২. ঝরা ফুল (থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ভাগনি রীমার স্মরণে)
৩. যোজন যোজন দূরে (প্রিয় বন্ধু মুজিবুল হক চৌধুরীর অকাল প্রয়াণে)
(খ) সনেট- ১টি (স্বপ্নলোকে একা)
(গ) ত্রয়ী কবিতা- ১টি (বেদনাময় গান)
(ঘ) পয়ার ছন্দে রচিত কবিতা- ৫টি
১. তুমি আছো তাই, ২. বৈশাখী হালখাতা, ৩. আলো-আঁধার, ৪. তোমার হাসি, ৫. আহŸান
(ঙ) গদ্য ছন্দের কবিতা: উপরে বর্ণিত শ্রেণিভুক্ত কবিতাগুলো ছাড়া এ নিবন্ধে আলোচিত ও অনালোচিত অবশিষ্ট কবিতাগুলো সব আধুনিক গদ্যছন্দে রচিত।
‘স্বপ্নলোকে একা’ শীর্ষক সনেটটি একটি চতুর্দশপদী কবিতা মাত্র। কবিতাটি সনেটের গঠনরীতির আলোকে অষ্টক-ষটকে বিভক্ত হলেও অষ্টকের ভাবের ব্যঞ্জনা ষটকে তেমন হৃদয়গ্রাহী নয়। কবিতাটির ৫টি চরণ ছাড়া অবশিষ্ট ৯টি চরণের মাত্রা-বিন্যাসও অসম। তাই সনেটধর্মী কবিতাটি পাঠকের কাছে রসোত্তীর্ণ হয় কিনা সেটা বিচার্য বিষয়। এ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতে উপমা ও চিত্রকল্পের স্বল্পতা বেশ লক্ষণীয়। তবু কবির প্রথম প্রয়াস হিসেবে ‘আমার গোপন দহন’ কাব্যের কবিতাগুলো আরো মানোত্তীর্ণ ও রসোত্তীর্ণ হওয়ার জন্যে কবির আন্তরিক প্রচেষ্টার দাবি রাখে। কবির এ কাব্যগ্রন্থটি কবি-জীবনে একটি মাইল ফলক হয়ে থাকবে বলে আমার বিশ্বাস।
কাব্যগ্রন্থের আলোচনা আপাতত শেষ হলেও এক্ষণে কবির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি পাঠক-সমাজে তুলে ধরা সমীচীন বলে মনে করছি। কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদের তৃতীয় পৃষ্ঠার ঋষধঢ় (মোড়ক/বেষ্টনী) থেকে কবির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি আমরা জানতে পারি। কবি মোহাম্মদ আলী চৌধুরী কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার কাকারা গ্রামে ৩০শে জুন ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমান বাসস্থান চকরিয়া পৌরসভার চিরিঙ্গা উপশহরের হাসপাতাল পাড়ায়।
শৈশব-কৈশোরের দিনগুলো থেকেই সাহিত্য আর লেখালেখির দিকে তাঁর প্রবল ঝোঁক। কবির রচিত প্রচুর গল্প কবিতা প্রবন্ধ নাটক প্রকাশিত হয়েছে দেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়।
পড়াশোনা করেছেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে। ১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাভ করেছেন এম এ ডিগ্রি। পেশা অধ্যাপনা। বিগত ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে চকরিয়া উপজেলাস্থ বরইতলী ইউনিয়নের পহরচাঁদা ফাযিল (ডিগ্রি) মাদরাসায় অধ্যাপনা করেছেন।
বর্তমানে তিনি অবসর জীবন-যাপন করছেন। ‘আমার গোপন দহন’ মোহাম্মদ আলী চৌধুরীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ হলেও স¤প্রতি ‘ছোট ছোট দীর্ঘশ্বাস’ নামে তাঁর আরেকটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।