আমাদের মুনতাসীর মামুন স্যার

মোহাম্মদ বেলাল হোসেন

24

ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বড় উৎস ছিল রবীন্দ্রনাথ। এক সময় তাঁকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, লড়াই করে মানুষ রবীন্দ্রনাথকে ‘অর্জন’ করেছেন। মুনতাসীর মামুন রবীন্দ্রনাথের সেই বাঙালি মানসে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সংগ্রাম নিয়ে লিখেছেন ‘রবীন্দ্রনাথ কিভাবে আমাদের হলেন’। আজকের দিনে আমরা দেখব অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন কিভাবে আমাদের হলেন।
অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন দেশের বরেণ্য ইতিহাসবিদ, শিক্ষক, চিন্তক ও প্রগতিশীল চেতনার বটবৃক্ষ। শুধু তাই নয়, তিনি একাধারে কিশোর সাহিত্য রচয়িতা, ছোটগল্পকার, রাজনৈতিক ভাষ্যকার। মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যাবিষয়ক গবেষক, অনুবাদক, প্রবন্ধকার, শিল্প সমালোচক, শিল্প সংগ্রাহকসহ ইতিহাস-ঐতিহ্য চর্চার মতো সৃজনশীল কাজেও তিনি নিয়োজিত। নানান প্রতিকূলতা যেমন মৃত্যুর হুমকি, মুরতাদ ঘোষণার পরেও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। গত চার দশকের বেশি সময় ধরে তিনি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কীর্তিমান শিক্ষক, বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু চেয়ারের বঙ্গবন্ধু অধ্যাপক। শিক্ষক হিসেবে লেখন, পঠন ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রয়োজনে কলমযোদ্ধা হিসেবে রাজপথ থেকে কারাবরণ পর্যন্ত বহুমাত্রিক ভূমিকা তাঁকে এনে দিয়েছে জনসমাজে বিশিষ্টতার আসন। বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে অসাম্প্রদায়িক মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ একটি জনরাষ্ট্রে পরিণত করতে অধ্যাপক মামুনের সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভূমিকা অনন্য।
অধ্যাপক মামুনের পুরো নাম মুনতাসীর উদ্দিন খান আল মামুন। জন্ম পুরান ঢাকার ইসলামপুরের আশেক লেনে নানার বাড়িতে ২৪ মে ১৯৫১ তে। বাবা মিসবাহউদ্দিন খান, মা-জাহানারা খান। গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার গুলবাহার গ্রামে। শৈশবের প্রথম পাঁচ বছর অর্থাৎ ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত তাঁর কেটেছে পুরান ঢাকার নানার বাড়িতে। বাবা ছিলেন চট্টগ্রাম বন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। বাবার চাকরিসূত্রে ১৯৫৬ সালে মামুন চট্টগ্রামে আসেন। চট্টগ্রামের অভয় মিত্র ঘাটের পোর্ট বাংলো, আসকার দিঘির পাড়, জামালখান ও মোমিন রোডের বিভিন্ন বাসায় তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে। ছোট বেলায় বন্দর আবাসিক এলাকার খোলামেলা পরিবেশ, কর্ণফুলী নদী, চট্টগ্রাম শহরের নৈসর্গিকতা, বিদেশি জাহাজের আনাগোনা পরবর্তীতে তাঁর লেখক জীবনে প্রভাব ফেলে। ১৯৬১ সালে ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় তাঁর গল্প কবিতা ছাপানো শুরু হয় বিভিন্ন সাময়িকীতে।
তিনি চট্টগ্রাম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৮৩ সালে অধ্যাপক এ.এফ.এম. সালাউদ্দিন আহমদের তত্ত¡াবধানে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
বাংলাদেশে ইতিহাস চর্চায় রেঁনেসার জন্ম দিয়েছেন অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন। শহর ঢাকার ইতিহাস, পূর্ব বঙ্গের ইতিহাস, সংবাদপত্র ও সাময়িক পত্রের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যাসহ ইতিহাসের নানা শাখায় বিচরণ করেছেন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে। তাঁর ইতিহাস চর্চা দেশের সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে করেছে সমুজ্জ্বল।
শহর ঢাকার ইতিহাস চর্চায় অধ্যাপক মামুন কাজ করেছেন তিন দশক ধরে। তিনি লিখেছেন ঢাকাবিষয়ক ২৭টি গ্রন্থ। ‘ঢাকার স্মৃতি’ নামে সম্পাদনা করেন ১৭টি গ্রন্থ। ঢাকাবিষয়ক তাঁর গুরুত্বপূর্ণ বই হলো
ঢাকা : স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী (১ম ও ২য় খন্ড ), ঢাকার সেই সব বিখ্যাত মানুষ, দেয়ালের শহর ঢাকা, ঊনিশ শতকের ঢাকার মুদ্রণ ও প্রকাশনা, ঢাকার হারিয়ে যাওয়া বইয়ের খোঁজে, সংবাদ সাময়িকপত্রে ঢাকার নওয়াব পরিবার, উনিশ শতকে ঢাকার থিয়েটার, ঢাকার হারিয়ে যাওয়া কামান, ঢাকা : ক্লের ডায়েরী, ঢাকার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের উপাদান, ঢাকা : ১৯৭১ ইত্যাদি। তাঁর বইয়ের নাম দেখেই বুঝা যায় ঢাকাকে তিনি দেখেছেন নানা ভঙ্গিতে নানা মহিমায়।
ঢাকার পরে অধ্যাপক মামুন গবেষণার বিষয় হিসেবে বেচে নেন পূর্ববঙ্গ ও আজকের বাংলাদেশকে। লিখেছেন পূর্ববঙ্গ সমাজব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দলিল উনিশ শতকে পূর্ববঙ্গের সমাজ। ২০১৫ সালে পূর্ববঙ্গ নিয়ে গবেষণার জন্য তিনি, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পুরস্কারে ভূষিত হন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা, নির্যাতন ও বধ্যভূমি নিয়ে গবেষণার কথা বলতে উঠে আসে অধ্যাপক মামুনের নাম। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে তাঁর হাত পড়েনি। অত্যন্ত দুঃসময়ে সামরিক স্বৈরাচার সরকারের রোষানলে পড়েও তিনি মুক্তিযুদ্ধ গবেষণায় পিছপা হননি। তিনি লিখেছেন শান্তি কমিটি ১৯৭১, রাজাকার সমগ্র, আলবদর ১৯৭১, পাকিস্তানি জেনারেলদের মন, রাজাকারের মন (১ম ও ২য় খÐ), সেই সব পাকিস্তানি, পাকিস্তানিদের দৃষ্টিতে ১৯৭১, বীরাঙ্গনা ১৯৭১, মুক্তিযুদ্ধে ১৩নং সেক্টর, গণমাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ (২২ খÐ), মুক্তিযুদ্ধ কোষ (১২ খÐ)।
গণহত্যা ও বধ্যভূমি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে অধ্যাপক মামুন খুলনার সাউথ সেন্ট্রাল রোডে ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশের একমাত্র গণহত্যা-নির্যাতন যাদুঘর। এই জাদুঘরের উদ্যোগে বর্তমানে দেশের প্রতিটি জেলায় বধ্যভূমি ও নির্যাতনকেন্দ্র চিহ্নিতকরণ এবং নাম ফলক স্থাপনের কাজ চলছে। এই জাদুঘরের উদ্যোগে প্রকাশিত ৪০টি বইয়ের মধ্যে দামের খন্ড গণহত্যা, লালমাটিয়া জৈনপুর ও খাজাঞ্চিবাড়ি গণহত্যা, মুজাফফরাবাদ গণহত্যা, উনসত্তরপাড়া গণহত্যা, চুকনগর গণহত্যা, বেলতলী গণহত্যা, কালীগঞ্জ গণহত্যা, রমনাথপুর গণহত্যা উল্লেখযোগ্য।
এছাড়াও তিনি কাজ করেছেন শিশু সাহিত্য, ভ্রমণ কাহিনী ও অনুবাদ সাহিত্য নিয়ে। মুনতাসীর মামুন স্যারকে আমি শিক্ষক হিসেবে ক্লাস রুমে পাইনি। তবে সংগঠক মামুন স্যারের সাথে কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছে। আমার মনে হয়েছে শিক্ষক ও লেখক মুনতাসীর মামুন সংগঠক হিসেবেও সমান জনপ্রিয়। তিনি ইতিহাস বিষয়টিকে একাডেমিক ডিসিপ্লিনের পর্যায় থেকে নিয়ে এসে আমাদের জীবন-যাপনের সাথে যুক্ত করেছেন। রস-কষহীন গুরু-গম্ভীর ভাষায় লেখা দুর্বোধ্য ইতিহাসকে তিনি সাধারণ মানুষের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন ‘বিষয় যার যার ইতিহাস সবার’। এই বিশ্বাস তাঁর কাজের ভিত্তিমূল। তাঁর এই বিশ্বাসকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে তিনি ইতিহাস অনুরাগীদের নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনী’।
২০১২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর থেকে এটি বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক ও গণমুখী ইতিহাস চর্চার জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে। স্যারের প্রচেষ্টায় বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক শিক্ষাবর্ষের সকল বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তরুণ প্রজন্ম যাতে বিকৃত ইতিহাস পাঠ করে বিভ্রান্ত না হয় সেই লক্ষ্যে এই কোর্সটি ভ্যানগার্ড হিসেবে কাজ করছে।
সাধারণত বুদ্ধিজীবী বলতে আমরা দেখি এমন ব্যক্তিত্ব যিনি নানা ভারি ভারি বিষয়ে লেখেন, পর্যবেক্ষণ করেন। কিন্তু সংকটে-সংগ্রামে তাঁদের পাওয়া যায় না। কিন্তু মুনতাসীর মামুন এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। গত চার দশক ধরে তিনি রাজপথে গণতান্ত্রিক সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধ তথা যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে রাজপথে সোচ্চার ছিলেন। ২০০২ সালে তাঁকে ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় কারাবরণ করতে হয়। তবুও তিনি ক্ষান্ত হননি।
ইতিহাস চর্চা ও সৃজনশীলতার স্বীকৃতি স্বরূপ মুনতাসীর মামুনের পুরস্কার পাওয়া শুরু ছাত্র জীবন থেকে। ২০০১ সালে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদক লাভ করেন তিনি। এছাড়া বঙ্গীয় সাহিত্য পুরস্কার, সিটি আনন্দ, আলো পুরস্কার, লেখক শিবির পুরস্কার, ড. হিলালী স্বর্ণ পদক, অগ্রণী ব্যাংক পুরস্কার, মার্কেন্টাইল ব্যাংক পুরস্কার, অন্যান্য সাহিত্য পুরস্কার, বেণী মাধব স্মারক সম্মননাসহ বহু পুরস্কার ও সম্মাননা তিনি লাভ করেছেন। আজ থেকে শতবর্ষ পরে কেউ যখন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উত্থানের ইতিহাস পড়বে, বাঙালির অহমের ইতিহাস পড়বে, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণের গল্প শুনবে সেখানে লেখক গবেষকদের ফুটনোটে বার বার ফিরে আসবে মুনতাসীর মামুনের নাম।
৬৭তম জন্মদিনে তাঁর প্রতি নিরন্তর শুভেচ্ছা ও বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক : শিক্ষক, ইতিহাস বিভাগ, চট্টগ্রাম কলেজ