আমাদের বাংলা সন

স্বদেশ দত্ত

14

সুকুমার রায়ের ‘পাকাপাকি’ ছড়ার প্রথম দুইটি পঙক্তি-
আম পাকে বৈশাখে, কুল পাকে ফাগুনে,
কাঁচা ইট পাকা হয় পোড়ালেতা আগুনে।
পঙক্তি দুইটিতে দুইটি মাসের উল্লেখ পাওয়া যায়। যার একটি আমাদের ভাষার মাস ফাল্গুন এবং আরেকটি আমাদের বাংলা সনের সূচনাকারি মাস বৈশাখ। নতুন স্বপ্নও সম্ভাবনা নিয়ে চৈত্রের শেষে বৈশাখ আসে। কবি শামসুর রাহমানের ভাষায়-
হৃদয়ে জড়ানো চৈতি স্মৃতির কান্না,
দৃষ্টিতে জ¦লে জীবন রাঙানোর পান্না।
নতুন বছর! নতুন স্বপ্ন! বছর প্রবাহমান সময়কে ছকে বাঁধার চেষ্টা। নানান দেশে বছরের নানান রকম হিসাব। কোথাও চাঁদকে কেন্দ্র করে, কোথাও সূর্যকে কেন্দ্র করে। আবার তা হতে পারে নক্ষত্র নির্ভর। সেই হিসেবে বছর বা বর্ষ গণনার প্রধান পদ্ধতি তিনটি – (ক) সৌরবর্ষ (খ) চান্দ্রবর্ষ ও (গ) নাক্ষত্রবর্ষ। সৌরবর্ষে সাধারণত ৩৬৫ দিনে বছর। চান্দ্রবর্ষে তা ৩৫৪ দিন। আর নাক্ষত্রবর্ষ হয় ৩৬০ দিনে।
বছরকে ভাগ করা হয় মাসে। মাসকে সপ্তাহ বা দিনে। বছরের এই হিসাব হচ্ছে বর্ষপঞ্জি। এই বর্ষপঞ্জি সময়ের প্রয়োজনে পরিবর্তিত হয়। স্থানীয় ঐতিহ্য এবং পারিপাশির্^ক পরিস্থিতির বিবেচনায় বছর বা সন এর কাঠামো ও হিসাব গড়ে উঠে, যা ইতিহাসের অংশ। আমাদের বাংলা সন বা বঙ্গাব্দও নানান পরিবর্তনের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। আমাদের বাংলা সন সূর্য ও চাঁদকে ঘিরে গড়ে উঠেছে।
প্রশ্ন হতে পারে, কেন বাংলা সনের উৎপত্তি হলো? কৃষি কাজ প্রধানত সূর্য নির্ভর। খাজনা আদায় এই কৃষির উপর নির্ভর করে। সম্রাট আকবর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য ‘বাংলাসন’-সহ আরও কয়েকটি নতুন সনের প্রবর্তন করেন বা চান্দ্রসনকে সৌরসনে রূপান্তরিত করেন। এই সনগুলি হলো- আমলি (উরিষ্যা), বিলায়তি এবং ফসলি বা মৌসুমী (অঞ্চল বিশেষের জন্য) এবং সুরসান (মহারাষ্ট্র)। আইন-ই-আকবরি থেকে জানা যায়, সম্রাট আকবর এমন একটি ত্রুটিমুক্ত ও বিজ্ঞান সম্মত সৌরসনের প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, যা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্যই আদর্শ হয়। বাংলা সন তারই ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠেছে।
বাংলা সনের শুরু সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহনের সময় থেকে। বঙ্গাব্দের মূল ভিত্তি হিজরি সাল। হিজরি সাল একটি চান্দ্রবর্ষ। আকবরের সিংহাসন লাভের কাল ৯৬৩ হিজরির পরবর্তী বৎসরগুলো সৌরবৎসর অনুসারে ৯৬৪, ৯৬৫, ৯৬৬ ইত্যাদি হিসাবে বাংলা সন গণনা করা হয়েছে।
আকবর ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাহলে ৯৬৩ বঙ্গাব্দ = ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ। বঙ্গাব্দের সাথে খ্রিষ্টাব্দের পার্থক্য ৫৯৩। তাই খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৫৯৩ বাদ দিলে বঙ্গাব্দ পাওয়া যায়। তবে ১৪ এপ্রিলের আগে হলে ৫৯৪ বাদ দিতে হবে। কারণ ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ শুরু।
বঙ্গাব্দ বা ফসলি সন প্রবর্তনের সাথে সাথে সেই সময়ে প্রচলিত স্থানীয় চান্দ্রমাসগুলোকেও সৌর মাসে পরিণত করা হয়। ফলে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ প্রভৃতি মাসও বঙ্গাব্দের বিভিন্ন মাসের নামরূপে গৃহীত হয়।
বাংলা সন হিজরি সনের উপর ভিত্তি করে প্রবর্তন করা হলেও এর গঠন পদ্ধতি ভারতীয় শকাব্দেরমত। কিন্তু এটি শকাব্দেরও সমগোত্রীয় নয়। শকাব্দের সাথে বঙ্গাব্দের সম্পর্ক এতটুকু যে, এর মাস ও দিনের নাম শকাব্দ থেকে নেওয়া হয়েছে। শকাব্দে বর্ষ শুরু হয় ‘চৈত্র’ মাসে, বাংলা সনের শুরু ‘বৈশাখে’। শকাব্দে বৈশাখের মর্যাদা দ্বিতীয় এবং অগ্রহায়ণের মর্যাদা নবম।
আমরা বাংলা মাসগুলোর নামের দিকে লক্ষ্য করলে দেখতে পাব, অগ্রহায়ণ ছাড়া বাংলার অন্যান্য মাসগুলো নক্ষত্রের সাথে সম্পর্কযুক্ত। বিশাখা নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠা নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম জ্যৈষ্ঠ, পূর্বাষাঢ়া নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম আষাঢ়, শ্রাবণা নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম শ্রাবণ, ভদ্রা নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম ভাদ্র, আশ্বিনী নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম আশি^ন, কৃত্তিকা নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম কার্তিক, প্রষ্যা নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম পৌষ, মঘা নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম মাঘ, ফাল্গুনি নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম ফাল্গুন আর চিত্রা নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম চৈত্র।
অগ্রহায়ণ শব্দের অর্থ বৎসরের অগ্রে যে যায়। অন্য অর্থে ধান্য উৎপাদনের মাস বা নতুন ধান আসার সময়। তাই নামের বিচারে অগ্রহায়ণ বছরের প্রথম মাস ধরা উচিত। কিন্তু প্রচলন অনুসারে বৈশাখই বৎসরের প্রথম মাস। ধারণা করা হয় প্রাচীনকালে অগ্রহায়ণ থেকে বাংলা গণনা করা হতো। অগ্রহায়ণ যে বাঙ্গালির জীবনে সুখ ও সমৃদ্ধির মাস ছিলো, তা মধ্যযুগের কবি মুকুন্দ রামের কাব্যে প্রকাশিত হয়েছে –
ধন্য অগ্রহায়ণ মাস;
বিফল জনম তার
নাহি যার চাষ।
কৃষিকেন্দ্রিক সমাজ ও সভ্যতায় এই ছিলো বৎসরের শ্রেষ্ঠ সময়। কিন্তু কালের পরিবর্তনে সময়ের প্রয়োজনে বৈশাখকে প্রথম মাস ধরা হয়। এর প্রধান কারণ হিসেবে মনে করা হয় যে, প্রচলনকালে যখন যে মাস চালু ছিল তার সাথে সামঞ্জস্য বিধানের ফলে এরূপ হয়েছে- নাম বা তার অর্থের দিকে নজর দেওয়া হয় নি।
বাাংলা সন আমাদের ঐতিহ্যকে ধারণ করে গড়ে উঠা একটি সন। এই সন যেমন সময়ের প্রয়োজনে গড়ে উঠেছে, তেমন তা সময়ের প্রয়োজনে সংস্কারও করা হয়েছে।
সনাতনী যে পদ্ধতিতে বঙ্গাব্দের তারিখ নির্ণয় করা হয়ে থাকে, তা অনেকটা চাঁদ দেখার মতো করে নক্ষত্রের অবস্থান দেখে নির্ণীত হয়। এ পদ্ধতির বড়ো সমস্যা হলো একাধিক মাসের দৈর্ঘ্য কখনো ২৯ দিনের হয়, আবার কখনও তা হয় ৩০ দিনের। কোন কোন মাস কোন কোন বছর ৩২ দিনেও হয়। বছরের দৈর্ঘ্যও সুনিয়মিত নয়। চার বছর পরও অধিবর্ষ হতে পারে, আবার পাঁচ বছর পরও হতে পারে। তারই প্রেক্ষিতে বাংলা সনের সংস্কার করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। যার জন্য বিভিন্ন সময়ে বাংলা সনের সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানে বাংলা একাডেমীর উদ্যোগে ১৯৬৩ সালে ‘বাংলা পঞ্জিকা সংস্কার’ নামে বিশিষ্ট ভাষাবিদ ড. মোহম্মদ শহীদুল্লার সভাপতিত্বে একটি কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটির সুপারিশে কিছু দুর্বলতা ছিল। যার মধ্যে একটি বড় দুর্বলতা হচ্ছে, অধিবর্ষ সংক্রান্ত অস্পষ্টতা ও জটিলতা। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে বাংলা পঞ্জিকা সংস্কারের জন্য সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একটি টাস্কফোর্স গঠিত হয়। এই টাস্কফোর্সেও সুপারিশসমূহ হচ্ছে –
(ক) সাধারণভাবে বাংলা বর্ষপঞ্জির বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত প্রতি মাসে ৩২ দিন এবং আশি^ন থেকে চৈত্র পর্যন্ত ৩০ দিনে গণনা করা হবে।
(খ) গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির অধিবর্ষে যে বাংলা বছরের ফাল্গুন মাস পড়বে, সেই বাংলা বছরকে অধিবর্ষরূপে গণ্য করা হবে এবং অধিবর্ষে ফাল্গুন মাস ৩১ দিনে গণনা করা হবে।
(গ) ১৪০২ সালের ১লা বৈশাখ থেকে কার্যকর হবে এবং তারিখ পরিবর্তনের সময় হবে আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী রাত ১২.০০টায়।
উল্লেখিত সুপারিশের ভিত্তিতে বাংলা একাডেমী প্রণীত ‘বাংলা ক্যালেন্ডার’ বর্তমানে সারা বাংলাদেশে অনুসৃত হচ্ছে। এর ফলে মাসগুলোর দৈর্ঘ্য সুনির্দিষ্ট, বছরগুলোর বৃদ্ধি অর্থাৎ অধিবর্ষও সুনিয়মিত। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে বঙ্গাব্দের সাথে খ্রিষ্টাব্দের স্থাযী সংযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।
আমাদের জাতীয় সন বাংলা সনের বর্ষপঞ্জির সংস্কার বাংলা বর্ষপঞ্জিকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করেছে। বাংলা ও ইংরেজি মাসের সমন্বিত তারিখ চিরকাল একই থাকার কারণে জাতীয়তা বাদী চেতনার আলোকে বাংলা তারিখ অনুযায়ী স্মরণীয় জাতীয় দিবসগুলো পালন করা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার প্রচলিত বাংলা সনের নতুন বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী স্বাধীনতা দিবস ২৬ শে মার্চের প্রতিষঙ্গী বাংলা তারিখ ১২ই চৈত্র, ২১শে ফেব্রুয়ারি, ৯ই ফাল্গুন এবং ১৬ই ডিসেম্বর, ২রা পৌষ আর ১লা বৈশাখের প্রতিষঙ্গী ইংরেজি তারিখ সব সময় ১৪ই এপ্রিল। সত্যি আমাদের বাংলা সন ঐতিহ্য এবং আন্তর্জাতিক তার চমৎকার মেল বন্ধন। সুকুমার রায়ের ‘পাকাপাকি’ ছড়ার প্রথম দুইটি পঙক্তি-
আম পাকে বৈশাখে, কুল পাকে ফাগুনে,
কাঁচা ইট পাকা হয় পোড়ালেতা আগুনে।
পঙক্তি দুইটিতে দুইটি মাসের উল্লেখ পাওয়া যায়। যার একটি আমাদের ভাষার মাস ফাল্গুন এবং আরেকটি আমাদের বাংলা সনের সূচনাকারি মাস বৈশাখ। নতুন স্বপ্নও সম্ভাবনা নিয়ে চৈত্রের শেষে বৈশাখ আসে। কবি শামসুর রাহমানের ভাষায়-
হৃদয়ে জড়ানো চৈতি স্মৃতির কান্না,
দৃষ্টিতে জ¦লে জীবন রাঙানোর পান্না।
নতুন বছর! নতুন স্বপ্ন! বছর প্রবাহমান সময়কে ছকে বাঁধার চেষ্টা। নানান দেশে বছরের নানান রকম হিসাব। কোথাও চাঁদকে কেন্দ্র করে, কোথাও সূর্যকে কেন্দ্র করে। আবার তা হতে পারে নক্ষত্র নির্ভর। সেই হিসেবে বছর বা বর্ষ গণনার প্রধান পদ্ধতি তিনটি – (ক) সৌরবর্ষ (খ) চান্দ্রবর্ষ ও (গ) নাক্ষত্রবর্ষ। সৌরবর্ষে সাধারণত ৩৬৫ দিনে বছর। চান্দ্রবর্ষে তা ৩৫৪ দিন। আর নাক্ষত্রবর্ষ হয় ৩৬০ দিনে।
বছরকে ভাগ করা হয় মাসে। মাসকে সপ্তাহ বা দিনে। বছরের এই হিসাব হচ্ছে বর্ষপঞ্জি। এই বর্ষপঞ্জি সময়ের প্রয়োজনে পরিবর্তিত হয়। স্থানীয় ঐতিহ্য এবং পারিপাশির্^ক পরিস্থিতির বিবেচনায় বছর বা সন এর কাঠামো ও হিসাব গড়ে উঠে, যা ইতিহাসের অংশ। আমাদের বাংলা সন বা বঙ্গাব্দও নানান পরিবর্তনের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। আমাদের বাংলা সন সূর্য ও চাঁদকে ঘিরে গড়ে উঠেছে।
প্রশ্ন হতে পারে, কেন বাংলা সনের উৎপত্তি হলো? কৃষি কাজ প্রধানত সূর্য নির্ভর। খাজনা আদায় এই কৃষির উপর নির্ভর করে। সম্রাট আকবর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য ‘বাংলাসন’-সহ আরও কয়েকটি নতুন সনের প্রবর্তন করেন বা চান্দ্রসনকে সৌরসনে রূপান্তরিত করেন। এই সনগুলি হলোÑআমলি (উরিষ্যা), বিলায়তি এবং ফসলি বা মৌসুমী (অঞ্চল বিশেষের জন্য) এবং সুরসান (মহারাষ্ট্র)। আইন-ই-আকবরি থেকে জানা যায়, স¤্রাট আকবর এমন একটি ত্রæটিমুক্ত ও বিজ্ঞান সম্মত সৌরসনের প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, যা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্যই আদর্শ হয়। বাংলা সন তারই ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠেছে।
বাংলা সনের শুরু সট আকবরের সিংহাসনে আরোহনের সময় থেকে। বঙ্গাব্দের মূল ভিত্তি হিজরি সাল। হিজরি সাল একটি চান্দ্রবর্ষ। আকবরের সিংহাসন লাভের কাল ৯৬৩ হিজরির পরবর্তী বৎসরগুলো সৌরবৎসর অনুসারে ৯৬৪, ৯৬৫, ৯৬৬ ইত্যাদি হিসাবে বাংলা সন গণনা করা হয়েছে।
আকবর ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাহলে ৯৬৩ বঙ্গাব্দ = ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ। বঙ্গাব্দের সাথে খ্রিষ্টাব্দের পার্থক্য ৫৯৩। তাই খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৫৯৩ বাদ দিলে বঙ্গাব্দ পাওয়া যায়। তবে ১৪ এপ্রিলের আগে হলে ৫৯৪ বাদ দিতে হবে। কারণ ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ শুরু।
বঙ্গাব্দ বা ফসলি সন প্রবর্তনের সাথে সাথে সেই সময়ে প্রচলিত স্থানীয় চান্দ্রমাসগুলোকেও সৌর মাসে পরিণত করা হয়। ফলে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ প্রভৃতি মাসও বঙ্গাব্দের বিভিন্ন মাসের নামরূপে গৃহীত হয়।
বাংলা সন হিজরি সনের উপর ভিত্তি করে প্রবর্তন করা হলেও এর গঠন পদ্ধতি ভারতীয় শকাব্দেরমত। কিন্তু এটি শকাব্দেরও সমগোত্রীয় নয়। শকাব্দের সাথে বঙ্গাব্দের সম্পর্ক এতটুকু যে, এর মাস ও দিনের নাম শকাব্দ থেকে নেওয়া হয়েছে। শকাব্দে বর্ষ শুরু হয় ‘চৈত্র’ মাসে, বাংলা সনের শুরু ‘বৈশাখে’। শকাব্দে বৈশাখের মর্যাদা দ্বিতীয় এবং অগ্রহায়ণের মর্যাদা নবম।
আমরা বাংলা মাসগুলোর নামের দিকে লক্ষ্য করলে দেখতে পাব, অগ্রহায়ণ ছাড়া বাংলার অন্যান্য মাসগুলো নক্ষত্রের সাথে সম্পর্কযুক্ত। বিশাখা নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠা নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম জ্যৈষ্ঠ, পূর্বাষাঢ়া নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম আষাঢ়, শ্রাবণা নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম শ্রাবণ, ভদ্রা নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম ভাদ্র, আশি^নী নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম আশি^ন, কৃত্তিকা নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম কার্তিক, প্রæষ্যা নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম পৌষ, মঘা নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম মাঘ, ফাল্গুনি নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম ফাল্গুন আর চিত্রা নক্ষত্রযুক্ত মাসের নাম চৈত্র।
অগ্রহায়ণ শব্দের অর্থ বৎসরের অগ্রে যে যায়। অন্য অর্থে ধান্য উৎপাদনের মাস বা নতুন ধান আসার সময়। তাই নামের বিচারে অগ্রহায়ণ বছরের প্রথম মাস ধরা উচিত। কিন্তু প্রচলন অনুসারে বৈশাখই বৎসরের প্রথম মাস। ধারণা করা হয় প্রাচীনকালে অগ্রহায়ণ থেকে বাংলা গণনা করা হতো। অগ্রহায়ণ যে বাঙ্গালির জীবনে সুখ ও সমৃদ্ধির মাস ছিলো, তা মধ্যযুগের কবি মুকুন্দ রামের কাব্যে প্রকাশিত হয়েছে Ñ
ধন্য অগ্রহায়ণ মাস;
বিফল জনম তার
নাহি যার চাষ।
কৃষিকেন্দ্রিক সমাজ ও সভ্যতায় এই ছিলো বৎসরের শ্রেষ্ঠ সময়। কিন্তু কালের পরিবর্তনে সময়ের প্রয়োজনে বৈশাখকে প্রথম মাস ধরা হয়। এর প্রধান কারণ হিসেবে মনে করা হয় যে, প্রচলনকালে যখন যে মাস চালু ছিল তার সাথে সামঞ্জস্য বিধানের ফলে এরূপ হয়েছেÑনাম বা তার অর্থের দিকে নজর দেওয়া হয় নি।
বাাংলা সন আমাদের ঐতিহ্যকে ধারণ করে গড়ে উঠা একটি সন। এই সন যেমন সময়ের প্রয়োজনে গড়ে উঠেছে, তেমন তা সময়ের প্রয়োজনে সংস্কারও করা হয়েছে।
সনাতনী যে পদ্ধতিতে বঙ্গাব্দের তারিখ নির্ণয় করা হয়ে থাকে, তা অনেকটা চাঁদ দেখার মতো করে নক্ষত্রের অবস্থান দেখে নির্ণীত হয়। এ পদ্ধতির বড়ো সমস্যা হলো একাধিক মাসের দৈর্ঘ্য কখনো ২৯ দিনের হয়, আবার কখনও তা হয় ৩০ দিনের। কোন কোন মাস কোন কোন বছর ৩২ দিনেও হয়। বছরের দৈর্ঘ্যও সুনিয়মিত নয়। চার বছর পরও অধিবর্ষ হতে পারে, আবার পাঁচ বছর পরও হতে পারে। তারই প্রেক্ষিতে বাংলা সনের সংস্কার করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। যার জন্য বিভিন্ন সময়ে বাংলা সনের সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানে বাংলা একাডেমীর উদ্যোগে ১৯৬৩ সালে ‘বাংলা পঞ্জিকা সংস্কার’ নামে বিশিষ্ট ভাষাবিদ ড. মোহম্মদ শহীদুল্লার সভাপতিত্বে একটি কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটির সুপারিশে কিছু দুর্বলতা ছিল। যার মধ্যে একটি বড় দুর্বলতা হচ্ছে, অধিবর্ষ সংক্রান্ত অস্পষ্টতা ও জটিলতা। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে বাংলা পঞ্জিকা সংস্কারের জন্য সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একটি টাস্কফোর্স গঠিত হয়। এই টাস্কফোর্সেও সুপারিশসমূহ হচ্ছে Ñ
(ক) সাধারণভাবে বাংলা বর্ষপঞ্জির বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত প্রতি মাসে ৩২ দিন এবং আশি^ন থেকে চৈত্র পর্যন্ত ৩০ দিনে গণনা করা হবে।
(খ) গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির অধিবর্ষে যে বাংলা বছরের ফাল্গুন মাস পড়বে, সেই বাংলা বছরকে অধিবর্ষরূপে গণ্য করা হবে এবং অধিবর্ষে ফাল্গুন মাস ৩১ দিনে গণনা করা হবে।
(গ) ১৪০২ সালের ১লা বৈশাখ থেকে কার্যকর হবে এবং তারিখ পরিবর্তনের সময় হবে আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী রাত ১২.০০টায়।
উল্লেখিত সুপারিশের ভিত্তিতে বাংলা একাডেমী প্রণীত ‘বাংলা ক্যালেন্ডার’ বর্তমানে সারা বাংলাদেশে অনুসৃত হচ্ছে। এর ফলে মাসগুলোর দৈর্ঘ্য সুনির্দিষ্ট, বছরগুলোর বৃদ্ধি অর্থাৎ অধিবর্ষও সুনিয়মিত। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে বঙ্গাব্দের সাথে খ্রিষ্টাব্দের স্থাযী সংযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।
আমাদের জাতীয় সন বাংলা সনের বর্ষপঞ্জির সংস্কার বাংলা বর্ষপঞ্জিকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করেছে। বাংলা ও ইংরেজি মাসের সমন্বিত তারিখ চিরকাল একই থাকার কারণে জাতীয়তা বাদী চেতনার আলোকে বাংলা তারিখ অনুযায়ী স্মরণীয় জাতীয় দিবসগুলো পালন করা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার প্রচলিত বাংলা সনের নতুন বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী স্বাধীনতা দিবস ২৬ শে মার্চের প্রতিষঙ্গী বাংলা তারিখ ১২ই চৈত্র, ২১শে ফেব্রুয়ারি, ৯ই ফাল্গুন এবং ১৬ই ডিসেম্বর, ২রা পৌষ আর ১লা বৈশাখের প্রতিষঙ্গী ইংরেজি তারিখ সব সময় ১৪ই এপ্রিল। সত্যি আমাদের বাংলা সন ঐতিহ্য এবং আন্তর্জাতিক তার চমৎকার মেল বন্ধন।