আবুল হাশিম (১৯০৫-১৯৭৪)

25

রাজনীতিবিদ ও ইসলামী চিন্তাবিদ আবুল হাশিম ১৯৭৪ সালের ৫ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। তিনি মুসলিম লীগ ও খেলাফত রব্বানী পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন ও আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তার লেখা বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘দ্য ক্রিড অব ইসলাম’। আবুল হাশিম ১৯০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের কাশিয়াড়ায় জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা আবুল কাশেম বর্ধমানের কংগ্রেস নেতা ছিলেন। ১৯২৩ সালের বর্ধমান মিউনিসিপাল স্কুল থেকে আবুল হাশিম ম্যাট্রিকুলেশন, কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯২৫ সালে আইএ এবং ১৯২৮ সালের বিএ পাস করেন। ১৯৩১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে বিএল ডিগ্রি লাভ করেন। তার পর বর্ধমান আদালতে আইন পেশায় যুক্ত হন।
আবুল হাশিম ১৯৩০ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে মুসলিম স¤প্রদায়ের অন্যতম নেতা হিসেবে যোগ দেন। ১৯৩৬ সালে তিনি বর্ধমান থেকে নির্দলীয় পার্থী হিসেবে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করে বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩৭ সালের মুসলিম লীগে যোগ দেন। মুসলিম লীগের উদারপন্থী অংশ গড়ে তোলার কাজে মনোনিবেশ করেন। অনেক প্রগতিশীল বাঙালি মুসলিম তরুণকে তিনি উদ্বুদ্ধ করেন। ১৯৩৮ সালে তিনি বর্ধমান জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি ও ১৯৪২ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৩ সালের ৭ নভেম্বর মুসলিম লীগের কাউন্সিল সভায় বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৪০ সালে মুসলিম লীগের লাহোর প্রস্তাবে পাকিস্তানকে একটি অখÐ রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করা হয়। এতে ভারতের উত্তর, পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় পৃথক পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়। সেই হিসেবে বাংলায় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বিজয়ের পর ৯ এপ্রিল দিল্লিতে ডাকা মুসলিম লীগের নব-নির্বাচিত বিধায়কদের সভায় মুহম্মদ আলী জিন্নাহর পরামর্শে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তান প্রস্তাব পেশ করেন। এ প্রস্তাব উত্থাপনের পর বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম খুব দৃঢ়ভাবে বিরোধিতা করেন। এর পর ভাষাভিত্তিক স্বাধীন বাংলা গঠনের প্রচেষ্টায় আবুল হাশিম বাঙালি কংগ্রেস নেতা শরৎচন্দ্র বসুর সঙ্গে দেখা করেন। এদিকে ভারতের ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেনের তার চিফ অব স্টাফ লর্ড ইসমকে ভারত বিভাগের ভিত্তিতে একটি পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেন। পরিকল্পনাটি ‘প্ল্যান বলকান’ নামে পরিচিত। এ অনুযায়ী ভারতকে দুইয়ের অধিক অংশে বিভক্ত করার কথা হয়। ভারত ও পাকিস্তানকে দুই অংশে বিভক্ত করা এবং এর যে কোনো অংশের অন্তর্গত কোনো প্রদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে গঠিত হতে চাইলে তার ব্যবস্থাও এতে ছিল। কিন্তু কংগ্রেস নেতা জওহরলাল নেহেরু ও কংগ্রেসের তীব্র বিরোধিতায় শেষ পর্যন্ত স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলা গঠনের সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণভাবে রোধ করে। ১৯৪৭ সালের ১০ মে আবুল হাশিম শরৎচন্দ্র বসুকে নিয়ে মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে সোদপুর আশ্রমে দেখা করেন। সেখানে তিনি গান্ধীর কাছে ভাষা, সংস্কৃতি এবং ইতিহাস যা হিন্দু-মুসলমান উভয়কে একসূত্রে আবদ্ধ করেছিল, তার ওপর ভিত্তি করে যুক্ত বাংলার ওপর বক্তব্য তুলে ধরেন।
আইয়ুব খানের আমলে আবুল হাশিম ইসলামিক একাডেমির পরিচালক ছিলেন। এ পদে থাকার সময়ে তার উদ্যোগে কোরআন শরিফের মূল আরবি থেকে বাংলায় তর্জমা প্রকাশিত হয়। ওই সময়ও তিনি আইয়ুব খানের বাঙালিবিরোধী কার্যক্রমের প্রতিরোধ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৭ সালের ২২ জুন পাকিস্তান সরকারের বেতারমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দীন রেডিও-টেলিভিশন থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার বন্ধের ঘোষণা করলে তিনি এ সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানান। তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে-ঞযব ঈৎববফ ড়ভ ওংষধস (১৯৫০), অং ও ঝবব ওঃ (১৯৬৫), ওহঃবমৎধঃরড়হ ড়ভ চধশরংঃধহ (১৯৬৭), অৎধনরপ গধফব ঊধংংু (১৯৬৯), রব্বানীর দৃষ্টিতে (১৯৭০) ও ওহ জবঃৎড়ংঢ়বপঃরড়হ (১৯৭৪)। বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও লেখক বদরুদ্দীন উমর তার ছেলে।