আবারও ধর্ষণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এ অপবিত্র মনুষ্যমুক্ত হবে কবে

12

শিক্ষা মানে তো মনুষ্যত্ব অর্জন করা। বই-এর কালো হরফের মধ্যে লোকায়িত আলো খুঁজে আনার নামই শিক্ষা। যা মানুষকে জ্ঞানী করে, বিবেকবোধে জাগ্রত করে, মানবিক ও সৃজনশীরতায় উৎকর্ষ সাধন করে। সুতরাং শিক্ষার্থী মানেই নিজেকে আলোকিত করা, সময়ের ব্যবধানে সেই আলো অন্যজনের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া। কিন্তু ছাত্র পরিচয়ে সম্প্রতি যেসব ধর্ষণ-ব্যবিচার হচ্ছে তা কোনভাবেই মানা যায় না। আমাদের চিত্তে রক্তক্ষরণ হয়, যখন এ ধর্ষণের অভিযোগের তীর দেশের গৌরবগাঁথা সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের উপর গিয়ে পড়ে। এ অভিযোগ নতুনও নয়, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এধরনের বহু ঘটনা ঘটে আসছে। গণমাধ্যমে ঘটনা প্রকাশের পর ব্যাপক হৈচৈ পড়ে গেলেও সময়ের ব্যবধানে ঘটনা চাপা পড়ে যায়। ধর্ষকের কি হলো সেই খবর আর কারো থাকেনা। সূত্র প্রকাশ, করোনা পরিস্থিতির মধ্যে চলতি মাসেই দেশের বিভিন্ন স্থানে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের নামে অন্তত পাঁচটি ধর্ষণ মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। সর্বশেষ সিলেটের এমসি কলেজে গৃহবধূ গণধর্ষণের ঘটনাটি সারাদেশে ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে। সচেতন মহল ক্ষোভ প্রকাশ করছে। এমন বর্বর ঘটনা খুবই দুঃখজনক, নিন্দনীয় ও ধিক্কারযোগ্য। ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী নামে এমন বর্বর ঘটনা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে সংগঠন নয় শুধু আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ গভীর সংকটে পতিত হবে। জানা গেছে, গত শুক্রবার বিকালে স্বামীর সঙ্গে এমসি কলেজে বেড়াতে গিয়েছিলেন এক গৃহবধূ। সন্ধ্যায় তাদের কলেজ থেকে ছাত্রাবাসে ধরে নিয়ে যায় ছাত্রলীগের ৬-৭ জন নেতাকর্মী। এরপর দুজনকে মারধর করা হয়। একই সঙ্গে স্বামীকে আটকে রেখে তার সামনে স্ত্রীকে গণধর্ষণ করে তারা। খবর পেয়ে রাতে ছাত্রাবাস থেকে ওই দম্পতিকে উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীকে ওসমানী হাসপাতালের ওসিসি সেন্টারে ভর্তি করা হয়। পরেরদিন শনিবার ধর্ষণের শিকার নারীর স্বামী বাদী হয়ে শাহপরাণ থানায় মামলা করেন। মামলায় ছাত্রলীগের ৬ নেতাকর্মীসহ অজ্ঞাত আরো ৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে অভিযুক্ত কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। প্রায় ১২ বছর ধরে ছাত্রলীগ মূলত আলোচনায় এসেছে হত্যা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই কিংবা টেন্ডারবাজির কারণে। ইদানীং ধর্ষণের ঘটনাও শুনতে হচ্ছে। শিক্ষা, শান্তি, প্রগতি এই তিনটি হলো ছাত্রলীগের মূলনীতি। দেশের ঐতিহ্যবাহী সংগঠনটি আজ নানা অপকর্মে জড়িয়ে বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের বেপরোয়া দৌরাত্ম্যের রাশ টানতে পারছে না ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও ক্ষমতাশীল অভিভাবক রাজনৈতিক দলটি। সরকারের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেক ইতিবাচক অর্জন ও গৌরবগাথাঁ সাফল্যকে ম্লান করে দিচ্ছে ছাত্রলীগের এহেন দুষ্কর্ম। এটা ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকরা বুঝেন না তা নিশ্চয়ই নয়। বিভিন্ন সময় ছাত্রলীগ ও আওয়ামী নেতৃত্বের পক্ষ থেকে শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি নেয়ার কথা বলা হয়েছে। অপরাধী যে দলের পরিচয়ধারীই হোক তাকে ছাড় না দেয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসবের কোনো প্রতিফলন নেই। অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রলীগের তান্ডব-সন্ত্রাস পুলিশ দেখেও দেখে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষও এড়িয়ে চলে। এভাবে তো চলা যায় না। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগ পরিচয়ধারীদের সন্ত্রাসী তৎপরতা বন্ধ করতে শক্ত ভূমিকা নিতে হবে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে; অভিভাবক রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে। অপরাধীর পরিচয় যাই হোক তাকে ছাড় দেয়া যাবে না এটা যে কথার কথা নয় তার প্রমাণ দিতে হবে নিজেদের পদক্ষেপে। সরকারকেও তার ভাবমূর্তির স্বার্থেই শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস মোকাবিলায় কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতীয় রাজনীতি দূষিত হয়ে পড়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েই ধর্ষণের মতো ঘৃণিত অপরাধে জড়ানোর সাহস পাচ্ছেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীকে কেড়ে নিয়ে ধর্ষণের মতো অকল্পনীয় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তারা। আমরা দেখতে চাই, সিলেট এমসি কলেজে সংঘটিত ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হোক। অভিযুক্তরা উপযুক্ত শাস্তি পাক। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মানেই পবিত্র অঙ্গন। যেখানে অপবিত্র কোন কীট থাকতে পারেনা। সুতরাং মানুষ নামের অপবিত্র মনুষ্যমুক্ত করতে সরকারকে কঠোর হতে হবে।